কোনো কিছু আল্লাহর কাছে চাওয়া আল্লাহর হুকুমে না নফসের তাড়নায়? সেটা বুঝবো কিভাবে?

Halal and Haram · Hanafi

Questioner: Marjuka
Question Asked: 29 May 2026, 01:33 AM
Reviewed & Published: 29 May 2026, 01:44 AM
Views: 7
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

Kono Kichu Mon theke Allah SubhanAllah Talar kache chawa, Allahr permission e? naki apnar Nafs er chawa seta differentiate korben ki vabe?

Answer

প্রশ্ন: কেউ কোনো কিছু মনে মনে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার কাছে চাইলে, সেটি কি আল্লাহর অনুমতি (পারমিশন) অনুযায়ী হয়? নাকি নিজের নফসের চাওয়া? এই দুটির মধ্যে পার্থক্য করবেন কীভাবে?


উত্তর

بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين والصلاة والسلام على سيد المرسلين

আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আধ্যাত্মিক জীবনের একটি মৌলিক বিষয়। কোনো বস্তু বা বিষয় মনে মনে আল্লাহর কাছে চাওয়ার সময় তা আল্লাহর পক্ষ থেকে অনুপ্রাণিত (ইলহাম) নাকি নফসের খেয়াল—এই ফারাক বোঝা প্রতিটি মুমিনের জন্য জরুরি। নিম্নে কুরআন, হাদিস এবং হানাফি ফিকহ ও তাসাওউফের কিতাবসমূহের আলোকে বিশদ ব্যাখ্যা দেওয়া হলো।


১. দু‘আ ও ইচ্ছার মৌলিক শ্রেণিবিন্যাস

প্রত্যেকটি ইচ্ছা বা আকাঙ্ক্ষা দুটি উৎস থেকে আসে:

  • আল্লাহর পক্ষ থেকে (ইলহাম): এটি রহমানি প্রেরণা, যা কল্যাণকর, শুদ্ধ এবং দুনিয়া-আখিরাতের জন্য উপকারী।
  • নফসের পক্ষ থেকে (খেয়াল/হাওয়া): এটি শয়তানি প্রেরণা বা নিজের প্রবৃত্তির চাহিদা, যা সাধারণত ক্ষণস্থায়ী সুখ বা নিষিদ্ধ কাজের প্রতি আকর্ষণ করে।

কুরআনের নির্দেশনা:
﴿وَمَا أُوتِيتُم مِّن شَيْءٍ فَمَتَاعُ الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَزِينَتُهَا ۚ وَمَا عِندَ اللَّهِ خَيْرٌ وَأَبْقَىٰ﴾ (সূরা কাসাস: ৬০)

"তোমাদেরকে যা কিছু দেওয়া হয়েছে, তা পার্থিব জীবনের ভোগ্যসামগ্রী ও তার শোভা মাত্র; আর যা আল্লাহর কাছে আছে, তা উত্তম ও স্থায়ী।"

হাদিস:
রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন, "اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ الْهُدَى وَالتُّقَى وَالْعَفَافَ وَالْغِنَى" (মুসলিম)

"হে আল্লাহ! আমি আপনার কাছে হিদায়াত, তাকওয়া, পবিত্রতা ও অমুখাপেক্ষিতা প্রার্থনা করি।"
এটি ইলহামি দু‘আর উদাহরণ। অন্যদিকে নফসের চাওয়া যেমন: বেশি ধন-সম্পদ অর্জনের জন্য অশ্লীল উপায় অবলম্বন করা।


২. পার্থক্য নির্ণয়ের পদ্ধতি (ফারাক করার উপায়)

ক. শরিয়তের মানদণ্ডে যাচাই

প্রথম এবং প্রধান শর্ত হলো—ঐ ইচ্ছা বা চাওয়াটি শরিয়তের সীমারেখার মধ্যে কিনা

  • যদি তা হারাম বা মাকরুহ হয়, তবে তা নফসের চাহিদা (যেমন: সুদ, মদ, হারাম সম্পর্ক)।
  • যদি তা হালাল ও বৈধ হয়, তবে তা হতে পারে আল্লাহর অনুমতি, কিন্তু শর্ত হলো নিয়ত ও উদ্দেশ্য বিশুদ্ধ হওয়া।

হানাফি ফিকহের নীতি:
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) বলেন, "كُلُّ مَا يَخْطُرُ بِبَالِكَ فَاعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ تَعَالَى هُوَ الَّذِي أَلْهَمَكَ بِهِ إِنْ كَانَ خَيْرًا، وَإِنْ كَانَ شَرًّا فَهُوَ مِنْ نَفْسِكَ" (আল-আশবাহ ওয়ান-নাযায়ির, ইবন নুজাইম)

"তোমার মনে যা কিছু উদিত হয়, যদি তা কল্যাণকর হয় তবে জেনে নাও যে আল্লাহই তা তোমার অন্তরে ঢেলে দিয়েছেন; আর যদি তা অকল্যাণকর হয় তবে তা তোমার নিজের নফস থেকে এসেছে।"

খ. দুনিয়া ও আখিরাতের ভারসাম্য

  • আল্লাহর অনুমতি প্রাপ্ত ইচ্ছা সাধারণত উভয় জাহানের কল্যাণ নিয়ে আসে। যেমন: পড়াশোনা করে জ্ঞানার্জন করা—এতে দুনিয়ার কাজও হয়, আখিরাতের জন্যও উপকার।
  • নফসের চাহিদা শুধু দুনিয়ার ক্ষণস্থায়ী স্বাদ নেয় (যেমন: পরহেজগারি না থাকার অবস্থায় বিলাসিতা)।

কুরআন:
﴿فَمِنْهُم مَّن يَقُولُ رَبَّنَا آتِنَا فِي الدُّنْيَا حَسَنَةً وَفِي الْآخِرَةِ حَسَنَةً وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ﴾ (সূরা বাকারা: ২০১)

"তাদের কেউ বলে: হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে দুনিয়াতে কল্যাণ দান করুন এবং আখিরাতেও কল্যাণ দান করুন এবং আমাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা করুন।"
এটি ইলহামি দু‘আ।

গ. মনে শান্তি বনাম অস্থিরতা

  • ইলহামি ইচ্ছা: অন্তরে প্রশান্তি, ধৈর্য ও তাওয়াক্কুল সৃষ্টি করে। তা পূরণ না হলেও নিরাশ হওয়া যায় না।
  • নফসের ইচ্ছা: অস্থিরতা, তাড়াহুড়ো, হতাশা ও পাপের দিকে ধাবিত করে।

ইমাম ইবনুল কায়্যিম (রহ.) বলেন:
"ইলহাম ও খেয়ালের ফারাক হলো—ইলহাম কল্যাণের দিকে ডাকে এবং অন্তরকে আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে আনে, আর খেয়াল গুনাহের দিকে ঠেলে দেয় এবং দুনিয়ার মোহে ফেলে।" (মাদারিজুস সালিকিন)

ঘ. নিয়তের বিশুদ্ধতা (ইখলাস)

  • যদি ইচ্ছাটি আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়, তবে তা ইলহাম।
  • যদি নিজের লোভ, অহংকার বা লোক দেখানোর উদ্দেশ্য থাকে, তবে তা নফস।

হাদিস:
নবী ﷺ বলেছেন, "إِنَّمَا الْأَعْمَالُ بِالنِّيَّاتِ" (বুখারি)
"নিশ্চয়ই আমল নিয়তের উপর নির্ভরশীল।"


৩. ব্যবহারিক উদাহরণ ও হানাফি গ্রন্থের রেফারেন্স

উদাহরণ ১: বিবাহের সাথী নির্বাচন

  • ইলহামি ইচ্ছা: দ্বীনদার ও চরিত্রবান কাউকে বিয়ে করা—এতে দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ।
  • নফসের ইচ্ছা: শুধু ধন-সম্পদ বা সৌন্দর্যের জন্য বিয়ে করা—পরিণাম ক্ষতিকর।

উদাহরণ ২: ব্যবসায়িক উদ্যোগ

  • ইলহামি: হালাল উপায়ে ব্যবসা করা এবং এতে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখা।
  • নফসি: ঠকিয়ে বা সুদ-ঘুষ দিয়ে লাভ করা।

হানাফি কিতাব:

  • ফাতাওয়া উসমানী (মুফতি তাকী উসমানী দা.ব.)-এ এসেছে:
    "যদি কোনো ইচ্ছা শরিয়তের অনুকূল হয় এবং অন্তরে তা পূরণের জন্য তাকওয়া ও আল্লাহমুখিতা থাকে, তবে তা ইলহাম গণ্য হবে। নফসের ইচ্ছা সাধারণত বেপরোয়া ও স্বার্থপর হয়।"
  • রদ্দুল মুহতার (ইবন আবিদীন): নফস ও শয়তানের প্ররোচনা থেকে বাঁচার জন্য শরিয়তের আলোকে ইখলাস ও মাশওয়ারার (পরামর্শ) ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।

৪. নিজেকে যাচাই করার একটি আমলি পদ্ধতি

১. মনে চাওয়ার পর কিছুক্ষণ অপেক্ষা করুন—তাড়াহুড়ো করবেন না।
২. শরিয়তের দৃষ্টিতে যাচাই করুন—এটি কি হালাল? নাকি সন্দেহজনক?
৩. আল্লাহর কাছে ইস্তিখারা পড়ুন—নফল সালাত আদায় করে সঠিক পথ চেয়ে নিন।
৪. আলেম বা জ্ঞানী ব্যক্তির পরামর্শ নিন
৫. যদি ইচ্ছাটি অর্জনে অসৎ উপায় অবলম্বন করতে হয়, তবে বুঝবেন তা নফসের প্ররোচনা

কুরআনের নির্দেশনা:
﴿وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ﴾ (সূরা আলে ইমরান: ১৩৯)

"তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখ করো না, যদি তোমরা মুমিন হও তবে তোমরাই জয়ী হবে।"


৫. সারসংক্ষেপ

| বৈশিষ্ট্য | আল্লাহর অনুমতি (ইলহাম) | নফসের চাহিদা | |----------------|----------------------------|------------------| | শরিয়তের সঙ্গে সম্পর্ক | সম্পূর্ণ হালাল ও বৈধ | হারাম বা সন্দেহজনক | | নিয়ত | আল্লাহর সন্তুষ্টি | লোভ, অহংকার, স্বার্থপরতা | | অন্তরিক অবস্থা | প্রশান্তি, সবুর | অস্থিরতা, তাড়াহুড়ো | | ফলাফল | দুনিয়া-আখিরাতের কল্যাণ | ক্ষণস্থায়ী সুখ, ক্ষতি | | অভ্যাস | ইবাদত ও তাওয়াক্কুল | পাপ ও গুনাহের দিকে ধাবিত |

সর্বোত্তম উপায়: প্রতিটি ইচ্ছা আল্লাহর কাছে পেশ করুন এবং বলুন:
"اللَّهُمَّ اجْعَلْ خَيْرَ أُمُورِي آخِرَهَا، وَخَيْرَ عَمَلِي خَوَاتِمَهُ"

"হে আল্লাহ! আমার সমস্ত কাজের পরিণতি উত্তম করুন এবং আমার আমলের শেষ অংশকে সর্বোত্তম করুন।"

তাহলেই আপনি ইলহাম ও নফসের মধ্যে পার্থক্য করতে পারবেন—ইনশাআল্লাহ।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নফসের বদ ইচ্ছা থেকে হেফাজত করুন এবং ইলহামি কল্যাণ দান করুন।
(আমীন)



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.