জবাই করার সময় বিসমিল্লাহ না বললে কি গোশত হারাম?

Halal and Haram · Hanafi

Questioner: Al shariya shawon
Question Asked: 02 Jun 2026, 11:16 AM
Reviewed & Published: 02 Jun 2026, 12:00 PM
Views: 18
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

কোন পশু জবাই করা হলে যদি আল্লাহর নাম না নেয়া হয় মানে কিছুই বলল না তাহলে কি এটা হারাম হবে অনেক সময় মুরগির দোকানদার কিছু করেন না এমনিতেই মুরগি জবাই করে দিয়া দেই এটা কি খাওয়া হালাল হবে । আবার তার অন্তরে খবরও তোমার জানা নেই

Answer

উত্তর:
প্রশ্নে উল্লেখিত বিষয়টি হানাফি ফিকহের গুরুত্বপূর্ণ মাসআলা। নিচে কুরআন, হাদিস এবং হানাফি কিতাবের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো।

১. জবাইয়ের সময় “বিসমিল্লাহ” বলা কি ওয়াজিব?

হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ মত অনুযায়ী, কোনো পশু বা পাখি জবাই করার সময় “বিসমিল্লাহ” (আল্লাহর নাম) বলা ওয়াজিব (আবশ্যক)। ইচ্ছাকৃতভাবে না বললে সেই জবাইকৃত প্রাণীর গোশত হারাম হয়ে যায়। তবে যদি ভুলে বলে না দেওয়া হয়, তাহলে তা হালাল।
(সূত্র: রদ্দুল মুহতার, ৬/২৯৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ৫/২৮৮; বাহিশতি জেওর, ২/২২৪)

২. কুরআন ও হাদিসের দলিল

  • কুরআন: “আর যে (প্রাণী) জবাই করার সময় আল্লাহর নাম নেওয়া হয় না, তা খেও না।” (সূরা আনআম: ১২১)
    এই আয়াতে ইচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর নাম না নেওয়া নিষিদ্ধ করা হয়েছে। হানাফি তাফসিরবিদরা এটাকে ওয়াজিবের দলিল হিসেবে নিয়েছেন।
    (সূত্র: মাআরিফুল কুরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফি)

  • হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর নাম স্মরণ না করে জবাই করে, তার জবাই করা গোশত খাওয়া জায়েজ নয়।” (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৮১৫; ইমাম তহাবিও এটাকে সহিহ বলেছেন)

৩. ইচ্ছাকৃত না ভুলে বলা—প্রভেদ

  • ইচ্ছাকৃত না বলা: হারাম। গোশত খাওয়া জায়েজ নয়।
  • ভুলে না বলা: হালাল।
  • মুখে না বললেও মনে মনে নিয়ত করা: হানাফি মতে, শুধু মনে মনে ‘বিসমিল্লাহ’ বললে যথেষ্ট নয়; মুখে উচ্চারণ করা ওয়াজিব।
    (সূত্র: শরহু মাআনিল আসার, ইমাম তহাবি; ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৩০)

৪. প্রশ্নের প্রেক্ষাপটে বিধান

প্রশ্নে বলা হয়েছে, “মুরগির দোকানদার কিছু বলেন না, এমনিতেই মুরগি জবাই করে দেয়।”
এক্ষেত্রে নিম্নোক্ত বিষয় বিবেচনা করতে হবে:

  • যদি দোকানদার মুসলিম হয়: তাহলে তাকে সাধারণত আমানতদার (trustworthy) ধরা হয়। তার জবাইয়ের সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলার অভ্যাস আছে কি না, তা না জানলে আমরা ধরে নেব যে তিনি বলেছেন অথবা ভুলে বলতে পারেননি। তবে যদি তিনি প্রতিনিয়ত চুপ করে জবাই করেন (এবং আপনি নিশ্চিত হন যে তিনি ইচ্ছাকৃতভাবে বলেন না), তাহলে সেদিক থেকে গোশত খাওয়া মাকরুহে তাহরিমি (হারামের কাছাকাছি) এবং বর্জন করা উচিত।
  • যদি দোকানদার অমুসলিম হয়: তাহলে তার জবাইকৃত গোশত আসলেই হারাম, কারণ অমুসলিমদের জবাইয়ের সময় ‘বিসমিল্লাহ’ বলার বিশ্বাস নেই।
  • যদি দোকানদারের অন্তর সম্পর্কে আপনি জানেন না: তবে তার বাহ্যিক আমলের ভিত্তিতে ফয়সালা করতে হবে। যদি তাকে আপনি মুসলিম হিসেবে চেনেন এবং তার জবাইয়ের সময় ‘বিসমিল্লাহ’ না বলার অভ্যাস দেখে থাকেন, তাহলে সতর্কতা হিসেবে ঐ দোকান থেকে গোশত না খাওয়াই ভালো। আর যদি নিশ্চিত না হন, তাহলে অনুমান করে বিচার করবেন না; বরং তাকে জিজ্ঞেস করে বা অন্য কোনো নির্ভরযোগ্য উৎস থেকে জেনে নিন।

৫. হানাফি ফকিহদের বক্তব্য

  • ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: “মুসলিম জবাইকারী যদি ইচ্ছাকৃতভাবে বিসমিল্লাহ না বলে, তবে তার জবাই করা প্রাণী খাওয়া জায়েজ নয়। তবে যদি ভুলে যায়, তাহলে জায়েজ। আর যদি আমরা না জানি যে সে ভুলেছে না ইচ্ছাকৃত, তবে আসল কথা হলো—যতক্ষণ না তার ইচ্ছাকৃত প্রমাণিত হয়, ততক্ষণ তাকে মুসলিম হিসেবে সঠিক ধরা হবে।” (রদ্দুল মুহতার, ৬/২৯৬)
  • মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) বলেন: “বাজারের মুরগির দোকানদার বেশিরভাগই মুসলিম। কিন্তু যদি তাদের জবাই করার সময় বিসমিল্লাহ না বলতে দেখা যায়, তবে তাদেরকে নসিহত করা উচিত। আর যদি নসিহত করার পরও না মানে, তাহলে তাদের থেকে গোশত খাওয়া অনুচিত।” (জাওয়াহিরুল ফিকহ, ২/৩৪৫)
  • মুফতি তাকি উসমানি (দামাত বারাকাতুহুম) বলেন: “আজকাল অনেক দোকানদার সচেতনতার অভাবে বিসমিল্লাহ বলে না। এ অবস্থায় তাদের গোশত খাওয়া জায়েজ, তবে তাকওয়া (সতর্কতা) হলো—যেখানে সন্দেহ নেই সেখান থেকে খাওয়া।” (ফাতাওয়া উসমানি, ২/৪৩২)

৬. ব্যবহারিক পরামর্শ

  • নিজে দেখে নিন: যদি সম্ভব হয়, দোকানদারকে জিজ্ঞেস করুন যে তিনি জবাইয়ের সময় বিসমিল্লাহ বলেন কি না। অথবা নিজ চোখে দেখে নিন।
  • অভ্যাসগত যদি না বলেন: যদি তিনি নিয়মিত চুপ করে জবাই করেন, তাহলে নিকটস্থ অন্য একজন ধার্মিক মুসলিম কসাইয়ের কাছ থেকে গোশত কেনা উত্তম।
  • সন্দেহের ক্ষেত্রে: “যে ব্যক্তি সন্দেহজনক জিনিস থেকে বেঁচে থাকে, সে তার দ্বীন ও ইজ্জতকে বাঁচায়।” (বুখারি, হাদিস: ৫২) সুতরাং স্পষ্ট নিশ্চিত না হলে পরিহার করাই ভালো।

৭. সারসংক্ষেপ

  • ইচ্ছাকৃতভাবে বিসমিল্লাহ না বললে: গোশত হারাম।
  • ভুলে না বললে: গোশত হালাল।
  • অজানা অবস্থায়: মুসলিম কসাইয়ের জবাইকে হালাল ধরবেন, যতক্ষণ না উল্টো প্রমাণিত হয়। কিন্তু বাস্তবে দোকানদার যদি চুপ করে জবাই করে, তাহলে তাকে নসিহত করা এবং সতর্ক থাকা কর্তব্য।

আল্লাহ সবচেয়ে ভালো জানেন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.