ইসলামে পাত্রী পছন্দে মেয়ের মতামতের অধিকার, স্পষ্ট কথা বলার বৈধতা কতটুকু?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
এক পাত্রপক্ষ ( আমাদের আত্মীয়ই)
দেখতে এসে জিজ্ঞেস করেছেন, আপনার বিয়ের ক্ষেত্রে কেমন ছেলে পছন্দ,আপনার কি পছন্দ আছে? তখন আমি জবাব দিয়েছি চরিত্রবান, ব্যক্তিত্ববান মানুষ পছন্দ।
ওনারা কুরআন তিলাওয়াত করতে বললে ( যেহেতু পাত্র ব্যাতীত আরো লোক ছিলেন)
তাই শুরু করার পূর্বে অনুমতি নেওয়ার জন্য বলেছি, সুর দিয়েতো তিলাওয়াত করাটায় জায়েজ নেই, আপনারাতো তিলাওয়াত সহীহ কিনা দেখতে চাচ্ছেন আমি তাহলে ভেঙে ভেঙে বলি।
তো পরবর্তীতে শুনতে পেলাম। ওনারা আমার এই কথাগুলোতে দোষ ধরেছেন।
প্রশ্নের উত্তরে আমি নাকি বেশি বলেছি আর পাত্র পছন্দের ক্ষেত্রে আমার নাকি বলা উচিত ছিল, আমার কোনো পছন্দ নেই, আমার বাপ চাচার পছন্দই আমার পছন্দ।
প্রশ্ন ১: দ্বীনে পাত্র নির্বাচনে বাপ চাচাদের ভূমিকা কী? আমার নিজস্ব পছন্দ থাকা বা চাওয়া কি অভদ্রতা বা চরিত্রহীনতা? দ্বীন কি আমাকে অধিকার দেয় নিজস্ব মতামত রাখার বিষয়ে? আমার কি হক আছে আমার চাহিদা মোতাবেক পাত্র চাওয়ার ব্যাপারে?
প্রশ্ন ২: ওনারা আমাকে চালাক বলেছেন। এ ধরনের জ্ঞান রাখাটা, স্পষ্ট করে কথা বলাটায় কি বেয়াদবি, বা অভদ্রতা প্রকাশ পেয়েছে?
পাত্র পক্ষের সামনে মাথা নিচু করে চুপ করে থাকাই কি দ্বীন? লজ্জাশীলতা? স্পষ্ট ভাষায় কথা বলা কি লজ্জাহীনতা?
প্রশ্ন ৩: পাত্র কিংবা পাত্রপক্ষের সামনে কুরআন তিলাওয়াতের বিধান কী?
নরমালী যেভাবে তিলাওয়াত করা হয় সেভাবেই তিলাওয়াত করতে হবে? হায়েজ অবস্থাতে করণীয় কী হবে?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
প্রথমেই আপনার দ্বীনি জ্ঞান ও সতর্কতার জন্য আপনাকে ধন্যবাদ। আপনি যে বিষয়গুলো তুলে ধরেছেন, তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং ইসলামের দৃষ্টিতে আপনার অবস্থান সঠিক। নিচে প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে পেশ করা হলো:
প্রশ্ন ১: পাত্র নির্বাচনে বাপ-চাচার ভূমিকা ও আপনার নিজস্ব পছন্দের অধিকার
উত্তর:
ইসলামে পাত্রী পছন্দের ক্ষেত্রে মেয়ের মতামতকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"لا تُنْكَحُ الأَيِّمُ حَتَّى تُسْتَأْمَرَ، وَلاَ تُنْكَحُ البِكْرُ حَتَّى تُسْتَأْذَنَ"
"বিবাহিতা (পূর্বে বিবাহিত নারী)কে তার অনুমতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না, এবং কুমারী মেয়েকেও তার সম্মতি ছাড়া বিয়ে দেওয়া যাবে না।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৫১৩৬)
আপনার পিতা বা অভিভাবকের ভূমিকা হলো আপনাকে পরামর্শ দেওয়া এবং একজন উপযুক্ত পাত্র খোঁজে দেওয়া, কিন্তু চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত আপনারই। ইমাম আবু হানিফা (رحمه الله) বলেন:
"البَالِغَةُ العَاقِلَةُ إِذَا زَوَّجَتْ نَفْسَهَا بِكُفْءٍ جَازَ"
"প্রাপ্তবয়স্কা ও জ্ঞানবতী নারী নিজেকে কোনো সমকক্ষ পুরুষের সাথে বিয়ে দিলে তা বৈধ।" (আল-হিদায়া, ২/৩০৫)
আপনার উত্তর "চরিত্রবান ও ব্যক্তিত্ববান" ছিল অত্যন্ত যুক্তিযুক্ত। বাপ-চাচার পছন্দকে নিজের পছন্দ বলা জরুরি নয়, বরং ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়কেই নিজস্ব পছন্দ প্রকাশের অধিকার দেয়। তাই আপনার উত্তর কোনো অভদ্রতা নয়, বরং শরিয়তসম্মত।
প্রশ্ন ২: জ্ঞান রাখা ও স্পষ্ট কথা বলা কি বেয়াদবি?
উত্তর:
ইসলাম স্পষ্টবাদিতাকে উৎসাহিত করে, তবে শালীনতা ও আদব বজায় রেখে। রাসূল ﷺ বলেছেন:
"مَنْ كَانَ يُؤْمِنُ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَلْيَقُلْ خَيْرًا أَوْ لِيَصْمُتْ"
"যে ব্যক্তি আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস করে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা চুপ থাকে।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস নং ১২৩)
আপনার কথাগুলো ছিল সম্পূর্ণ ভালো ও দ্বীনি ইলমের ভিত্তিতে। আপনি কুরআন তিলাওয়াতের সুর দেওয়ার বিধান সম্পর্কে সচেতন ছিলেন, যা প্রশংসনীয়। পাত্রপক্ষের সামনে স্পষ্ট করে কথা বলা লজ্জাহীনতা নয়, বরং দ্বীনের জ্ঞান রাখার প্রমাণ।
ইসলামে লজ্জাশীলতা (হায়া) প্রশংনীয়, তবে তার অর্থ চুপ থাকা বা মাথা নিচু করে রাখা নয়। বরং হায়া হলো আল্লাহভীতি থেকে অশ্লীলতা পরিহার করা। হাদিসে এসেছে:
"الحَيَاءُ لَا يَأْتِي إِلَّا بِخَيْرٍ"
"লজ্জা কেবল কল্যাণই নিয়ে আসে।" (সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৬১১৭)
আপনার জ্ঞান ও স্পষ্ট ভাষায় কথা বলা বেয়াদবি নয়, বরং তা দ্বীনের গভীরতা বুঝার নিদর্শন।
প্রশ্ন ৩: পাত্রপক্ষের সামনে কুরআন তিলাওয়াতের বিধান
উত্তর:
পাত্রপক্ষের (বিশেষ করে অপরিচিত বা বেগানা পুরুষদের) সামনে কুরআন তিলাওয়াত করা জায়েজ, যদি তা শোনার উদ্দেশ্যে হয় এবং তিলাওয়াত সহীহভাবে করা হয়। তবে সুর দিয়ে বা দীর্ঘ তিলাওয়াত না করাই উত্তম, কারণ এতে করে প্রদর্শনের সম্ভাবনা থাকে।
হানাফি ফিকহে বলা হয়েছে:
"وَأَمَّا الْقِرَاءَةُ بِالتَّحْزِينِ وَالتَّرْجِيعِ فَمَكْرُوهَةٌ"
"সুর দিয়ে বা রাগসহ (অনুভূতিপ্রবণ) কুরআন তিলাওয়াত করা মাকরূহ।" (রদ্দুল মুহতার, ১/৫৫১)
হায়েজ অবস্থায় করণীয়:
হায়েজ অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত করা নিষিদ্ধ। হাদিসে এসেছে:
"لَا تَقْرَأِ الْحَائِضُ وَلَا الْجُنُبُ شَيْئًا مِنَ الْقُرْآنِ"
"হায়েজ ও জুনুবী অবস্থায় কুরআনের কিছুই পড়বে না।" (জামে তিরমিযী, হাদিস নং ১৩১)
তবে আপনি যদি পাত্রপক্ষের সামনে তিলাওয়াত করতে বাধ্য হন, তাহলে শুধু মুখস্থ পড়তে পারেন, স্পর্শ না করে। অথবা আপনি তিলাওয়াতের নিয়ত না করে কুরআনের অর্থ বা তাফসির বলতে পারেন।
আপনার দেওয়া উত্তর "ভেঙে ভেঙে তিলাওয়াত করা" (অর্থাৎ সহীহভাবে পড়া) ছিল সঠিক, কারণ এতে সুর দেওয়ার অপবাদ আসে না। তবে হায়েজ থাকলে কোনো অবস্থাতেই কুরআন স্পর্শ বা তিলাওয়াত জায়েজ নয় (হানাফি মতে)।
সংক্ষেপে আপনার অবস্থান:
- আপনার পছন্দ প্রকাশ করা জায়েজ এবং ইসলামি অধিকার।
- দ্বীনি জ্ঞান রাখা ও তা স্পষ্টভাবে বলা অভদ্রতা নয়।
- পাত্রপক্ষের সামনে সহীহভাবে তিলাওয়াত করা জায়েজ, তবে সুর দেওয়া মাকরূহ।
- হায়েজ অবস্থায় তিলাওয়াত বন্ধ রাখবেন, প্রয়োজনে অর্থ বা তাফসির বলুন।
আল্লাহ আপনাকে দ্বীনের উপর অটল রাখুন এবং উত্তম পাত্র দান করুন। আমিন।
রেফারেন্স:
- সহীহ বুখারী, হাদিস নং ৫১৩৬
- আল-হিদায়া, ২/৩০৫
- রদ্দুল মুহতার, ১/৫৫১
- ফাতাওয়া উসমানী, ২/৩৫০
- বাহিশ্তি জেওর, বিয়ের অধ্যায়