ইসলামে আইভিএফ জায়েজ কিনা?

Halal and Haram · Hanafi

Questioner: Sadeka0170
Question Asked: 02 Jun 2026, 11:42 AM
Reviewed & Published: 02 Jun 2026, 12:23 PM
Views: 33
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আমার হাসবেন্ড এর সিমেন এর সমস্যা আছে। ডক্টর বলছে আইভিএফ করতে। এ ক্ষেত্রে আমাদের মাজহাবে কি আইভিএফ জায়েজ?জায়েজ হলেও কি কি বিষয় খেয়াল রাখতে হবে?

Answer

উত্তর

আইভিএফ (ইন ভিট্রো ফার্টিলাইজেশন) একটি চিকিৎসা পদ্ধতি যেখানে স্বামী-স্ত্রীর শুক্রাণু ও ডিম্বাণু কৃত্রিম উপায়ে নিষিক্ত করে ভ্রূণ তৈরি করা হয় এবং পরে তা স্ত্রীর জরায়ুতে স্থাপন করা হয়। আপনার স্বামীর সিমেনের সমস্যার কারণে ডাক্তার আইভিএফ করার পরামর্শ দিয়েছেন। হানাফী মাযহাবে আইভিএফ জায়েজ কি না এবং জায়েজ হলে কী কী শর্ত পালন করতে হবে, তা নিচে উল্লেখ করা হলো।


হানাফী মাযহাবে আইভিএফ-এর বিধান

হানাফী ফিকহের মূলনীতি হলো—সন্তান লাভের জন্য বৈধ পদ্ধতি গ্রহণ করা জায়েজ, তবে অবশ্যই তা স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে হবে। আধুনিক ফকীহগণ (যেমন: মুফতি মুহাম্মদ শফী, মুফতি তকি উসমানী) আইভিএফ-কে নিম্নোক্ত শর্তে জায়েজ বলেছেন:

১. শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রীর নিজস্ব গ্যামেট ব্যবহার

  • শুক্রাণু (স্পার্ম) এবং ডিম্বাণু (ওভাম) উভয়ই স্বামী-স্ত্রীর নিজস্ব হতে হবে।
  • তৃতীয় কোনো ব্যক্তি (দাতা) থেকে গ্যামেট গ্রহণ করা হারাম এবং এটি জিনা (ব্যভিচার) সদৃশ।

২. সারোগেসি (ভাড়াটে মা) নিষিদ্ধ

  • ভ্রূণ অন্য কোনো নারীর জরায়ুতে স্থাপন করা হারাম। কারণ এটি বংশগতির মিশ্রণ ঘটায়।

৩. বিবাহ বহাল থাকতে হবে

  • নিষিক্তকরণ এবং ভ্রূণ স্থাপন অবশ্যই বিদ্যমান বিবাহের সময় করতে হবে। তালাক বা মৃত্যুর পর এটি জায়েজ নয়।

৪. শুক্রাণু সংগ্রহের পদ্ধতি

  • স্বামীর শুক্রাণু সংগ্রহের জন্য হস্তমৈথুন (মাস্টারবেশন) সাধারণত হারাম। তবে প্রয়োজনীয়তার কারণে (চিকিৎসার জন্য) কিছু ফকীহ ইজাজত দিয়েছেন, যদি অন্যান্য বৈধ উপায় (যেমন: বিশেষ কনডম ব্যবহার বা সহবাসের পর সংগ্রহ) সম্ভব না হয়।
  • সর্বোত্তম পদ্ধতি হলো: স্বামী-স্ত্রীর সহবাসের পর যোনি থেকে শুক্রাণু সংগ্রহ করা অথবা চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে বিশেষ পাংচার বা কনডম ব্যবহার করা।

৫. পর্দা ও গোপনীয়তা রক্ষা

  • স্ত্রীর শরীর (সতর) দেখা ও স্পর্শ করা মাহরাম না হলে জায়েজ নয়। তাই প্রয়োজনে মহিলা ডাক্তার দ্বারা চিকিৎসা করানো উত্তম। যদি মহিলা ডাক্তার না থাকে, তবে পুরুষ ডাক্তার প্রয়োজনীয় পরিমাণ দেখতে পারবেন, তবে গুনাহ থেকে বাঁচতে সবসময় আল্লাহর ভয় রাখতে হবে।

৬. অতিরিক্ত ভ্রূণ ধ্বংস না করা

  • তৈরি করা ভ্রূণ যাতে অকারণে নষ্ট না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। প্রয়োজনে অতিরিক্ত ভ্রূণ ফ্রিজে সংরক্ষণ না করাই ভালো। যদি সংরক্ষণ করা হয়, তবে তা ধ্বংস না করে ভবিষ্যতে ব্যবহারের নিয়ত রাখতে হবে।

৭. ডিম্বাণু উত্তোলনে মাসিক চক্রের হেরফের

  • ডিম্বাণু উত্তোলনের জন্য প্রয়োজনীয় ঔষধ ও হরমোন থেরাপি সাধারণত জায়েজ, যদি তা স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর না হয়।

প্রাসঙ্গিক ফতোয়া ও গ্রন্থের উদ্ধৃতি

  • মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) লিখেছেন: "স্বামী-স্ত্রীর নিজস্ব শুক্রাণু ও ডিম্বাণু ব্যবহার করে আইভিএফ করা জায়েজ, তবে তৃতীয় ব্যক্তির সম্পৃক্ততা না থাকতে হবে।" (মা‘আরিফুল কুরআন, ২/৪০০)
  • মুফতি তকি উসমানী (দা.বা.) বলেছেন: "আইভিএফ জায়েজ, তবে শর্ত হলো—শুধুমাত্র স্বামী-স্ত্রীর নিজস্ব গ্যামেট ব্যবহার করতে হবে এবং কোনো প্রকার দাতা বা সারোগেসি গ্রহণ করা যাবে না।" (ফতোয়া উসমানী, ২/৪০৫)
  • ইমদাদুল ফতোয়া (মুফতি আশরাফ আলী থানভী)-এ উল্লেখ আছে: "সন্তানের জন্য চিকিৎসা করা জায়েজ, তবে পদ্ধতি যেন শরিয়তের সীমার মধ্যে হয়।"

সংক্ষিপ্ত সিদ্ধান্ত

  • আইভিএফ জায়েজ যদি উপরোক্ত শর্তগুলো (বিশেষ করে নিজস্ব গ্যামেট, বৈধ বিবাহ, পর্দা রক্ষা) কঠোরভাবে পালন করা হয়।
  • হারাম হবে যদি তৃতীয় ব্যক্তির শুক্রাণু/ডিম্বাণু ব্যবহার করা হয়, সারোগেসি নেওয়া হয়, অথবা হস্তমৈথুনের মাধ্যমে শুক্রাণু সংগ্রহ করা হয় (যদি অন্য কোনো বৈধ উপায় সম্ভব না হয়, তবে শুধুমাত্র প্রয়োজনীয়তার জন্য জায়েজ)।

ব্যবহারিক পরামর্শ

  1. ডাক্তারের সাথে খোলামেলা আলোচনা করুন এবং বলুন যে আপনি শুধুমাত্র শরিয়তসম্মত পদ্ধতি গ্রহণ করতে চান।
  2. স্বামীর শুক্রাণু সংগ্রহের জন্য বৈধ পদ্ধতি (যেমন বিশেষ কনডম বা পাংচার) বেছে নিন।
  3. স্ত্রীর ডিম্বাণু উত্তোলন ও ভ্রূণ স্থাপনের সময় অবশ্যই একজন মহিলা ডাক্তার নিয়োজিত করুন; যদি সম্ভব না হয়, তাহলে পুরুষ ডাক্তারের সামনে প্রয়োজনীয় অংশ ছাড়া অন্য কিছু প্রকাশ করবেন না।
  4. অতিরিক্ত ভ্রূণ তৈরি না করার চেষ্টা করুন এবং যদি তৈরি হয়, তবে তা অন্য কারো জন্য ব্যবহার বা ধ্বংস না করে নিজের জন্যই সংরক্ষণ করুন (যদি সম্ভব না হয়, তাহলে তা আল্লাহর ভয়ে নষ্ট না করার ব্যবস্থা করুন)।
  5. চিকিৎসার শুরুতে আল্লাহর কাছে দোয়া করুন এবং নিয়ত করুন যে আপনি শুধুমাত্র বৈধ উপায়ে সন্তান লাভ করতে চান।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.