হারাম উপার্জনের উপর নির্ভরশীল বালেগ ছেলের আমল ও দোয়া কবুল হবে কি?
Family Life · Hanafi
Question
Answer
উত্তর
প্রশ্ন: একজন বালেগ (প্রাপ্তবয়স্ক) ছেলে যদি তার অভিভাবকের উপার্জনের উপর নির্ভরশীল থাকে এবং সেই উপার্জন যদি হারাম হয়, তাহলে তার আমল ও দোয়া কি কবুল হবে?
উত্তর: বালেগ ছেলের জন্য তার অভিভাবকের হারাম উপার্জন থেকে নিজেকে রক্ষা করা আবশ্যক। ইসলামী শরিয়ত অনুসারে, হারাম উপার্জন গ্রহণ করা ও তা ভোগ করা কবিরা গুনাহ। আর এ ধরনের হারাম ভক্ষণ ইবাদত ও দোয়ার কবুল হওয়ার পথে অন্তরায় হতে পারে। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করতে হবে।
১. কুরআনের নির্দেশনা
আল্লাহ তাআলা বলেন:
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُلُوا مِنْ طَيِّبَاتِ مَا رَزَقْنَاكُمْ
“হে ঈমানদারগণ! আমি তোমাদের যে পবিত্র ও হালাল রিজিক দিয়েছি তা থেকে খাও।” (সূরা আল-বাকারা: ১৭২)
ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, এ আয়াতে হালাল রিজিক খাওয়ার আদেশ দিয়ে হারাম থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। কারণ, হারাম ভক্ষণ ইবাদতের কবুলের অন্তরায়। (তাফসীরে ইবনে কাসীর, ১/৪৭১)
২. হাদীসের বর্ণনা
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
إِنَّ اللَّهَ طَيِّبٌ لَا يَقْبَلُ إِلَّا طَيِّبًا
“নিশ্চয়ই আল্লাহ পবিত্র, তিনি পবিত্র বস্তু ছাড়া কবুল করেন না।” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০১৫)
অন্য হাদীসে এসেছে:
ثُمَّ ذَكَرَ الرَّجُلَ يُطِيلُ السَّفَرَ أَشْعَثَ أَغْبَرَ يَمُدُّ يَدَيْهِ إِلَى السَّمَاءِ يَا رَبِّ يَا رَبِّ وَمَطْعَمُهُ حَرَامٌ وَمَشْرَبُهُ حَرَامٌ وَمَلْبَسُهُ حَرَامٌ وَغُذِيَ بِالْحَرَامِ فَأَنَّى يُسْتَجَابُ لَهُ
“তারপর তিনি এক ব্যক্তির উল্লেখ করলেন যে দীর্ঘ সফর করেছে, এলোমেলো চুল ও ধুলিমাখা অবস্থায় আসমানের দিকে হাত তুলে ‘ইয়া রব, ইয়া রব’ বলে ডাকছে, কিন্তু তার খাদ্য, পানীয়, পোশাক ও ভরণপোষণ সবই হারাম। তাহলে কিভাবে তার দোয়া কবুল হবে?” (সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১০১৫)
ইমাম নববী (রহ.) এই হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন: “হারাম ভক্ষণকারীর ইবাদত ও দোয়া কবুল হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম। তবে যদি সে তাওবা করে এবং হারাম ত্যাগ করে, তবে আল্লাহ কবুল করতে পারেন।” (শরহে নববী, ৭/১০৪)
৩. হানাফি ফিকহের দৃষ্টিভঙ্গি
ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও তার শিষ্যগণ (আবু ইউসুফ, মুহাম্মাদ) এ ব্যাপারে একমত যে, হারাম ভক্ষণ ইবাদতের পূর্ণ প্রতিদান থেকে বঞ্চিত করে। তবে ইবাদতটি আদায় হওয়ার জন্য তার শর্ত পূর্ণ হলে ফরজ আদায় হয়ে যায়, কিন্তু সওয়াব কমে যায় বা নষ্ট হয়। (রদ্দুল মুহতার, ১/২১৮)
ইবনে আবিদীন (রহ.) লিখেছেন: “হারাম উপার্জনে লালিত-পালিত ব্যক্তির ইবাদত কবুল হওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ, তবে যদি সে অজ্ঞতাবশত বা বাধ্য হয়ে সেটা গ্রহণ করে, তাহলে তার অবস্থা ভিন্ন।” (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩৯৮)
মুফতি মুহাম্মাদ শফি (রহ.) বলেন: “যে ব্যক্তি জেনে-বুঝে হারাম ভক্ষণ করে, তার নেক আমলগুলো বিনষ্ট হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে দোয়া কবুলের জন্য পবিত্রতা জরুরি।” (মা’আরিফুল কুরআন, ২/১২৫)
মুফতি তাকি উসমানি (হাফি.) বলেন: “যদি কোনো বালেগ ছেলে তার পিতার হারাম উপার্জনের উপর নির্ভরশীল হয় এবং তার অন্য কোনো উপায় না থাকে (যেমন পড়াশোনারত), তাহলে সে যদি অনিচ্ছায় গ্রহণ করে, তবে তার ওপর গুনাহ হবে না, বরং গুনাহ হবে পিতার। কিন্তু তবুও হারাম ভক্ষণের কারণে তার ইবাদতের পূর্ণ সওয়াব কমে যেতে পারে। তাই উচিত, ছেলে নিজে হালাল উপার্জনের চেষ্টা করবে এবং পিতাকে নাসীহত করবে।” (ফতোয়া উসমানি, ২/৪৯৭)
৪. ব্যবহারিক সমাধান
- নিজের দায়িত্ব: বালেগ ছেলে নিজেও উপার্জনের চেষ্টা করবে। যদি অক্ষম হয় (যেমন পড়াশোনার কারণে), তাহলে পিতার হারাম উপার্জন থেকে রক্ষার উপায় খুঁজবে।
- তাওবা ও ইস্তিগফার: ছেলে ও পিতা উভয়েই তাওবা করবে এবং ভবিষ্যতে হালাল রিজিকের চেষ্টা করবে।
- দোয়া ও আমল: দোয়া কবুলের জন্য হারাম ত্যাগ করা শর্ত নয়, তবে হারাম ভক্ষণ দোয়ার কবুলের পথে অন্তরায়। তাই দোয়ার পাশাপাশি নিজের অবস্থা সংশোধন করতে হবে।
সারসংক্ষেপ
বালেগ ছেলের আমল ও দোয়া কবুল হওয়ার জন্য হারাম ভক্ষণ বড় বাধা। যদিও ফরজ ইবাদত আদায় হয়ে যায়, কিন্তু পূর্ণ সওয়াব ও দোয়া কবুল হওয়া নির্ভর করে হারাম ত্যাগের ওপর।
সুতরাং তার ইবাদত কবুল হবেনা।
সর্বাবস্থায় হালাল রিজিক অর্জনের চেষ্টা করা ও পিতাকে নাসীহত করা জরুরি।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হালাল রিজিক দান করুন এবং আমাদের আমল ও দোয়া কবুল করুন। আমীন।