গায়রে মাহরাম আত্মীয়দের বাসায় আসা-যাওয়া
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমার স্বামীর নিজের কোনো বোন নাই।উনার এক খালাতো বোন আছে,উনার থেকে ১০-১১ বছরের বড়।ছোট থেকে এই বোনের অনেক আদর পাইছেন উনি,আর এই খালার বাসাতেই আমার স্বামী ছোট থেকে বড় হয়েছে।আমাদের বিয়ের ক্ষেত্রেও অনেক দায়িত্ব পালন করেছেন এই বোন।অর্থাৎ উনার এই বোন অনেক কিছু করছেন উনার জন্য নিজের ছোট ভাই হিসেবে।কিন্তু উনার বোন এর দ্বীন এর বুঝ নাই,বেপর্দা(সামাজিকভাবে শালীন) চলাফেরা করে।আমার স্বামী মাহরাম-গায়রে মাহরাম মানার চেষ্টা করে।কিন্তু উনার এই বোনের ক্ষেত্রে কীভাবে আত্মীয়তা বজায় রেখে,বোনের এতো ঋণের প্রতি কৃতজ্ঞতা রেখে কীভাবে পর্দা রক্ষা করবে?উনার এই বোনের বাসায় না গেলে,দাওয়াত গ্রহণ না করলে উনারা কষ্ট পায়,রাগ করে।মনে করে ছোট থেকে এই ভাইয়ের জন্য এতো কিছু করার পরও তাদের ভুলে গেছে।
এক্ষেত্রে আমার স্বামী কি উনাদের মন রক্ষার জন্য উনাদের বাসায় যাওয়া আসা দেখা সাক্ষাৎ করতে পারবে?এটা কি জায়েজ হবে এভাবে যে যতটুকু সম্ভব উনার বোন এর সাথে কম কথা বলে,কম তাকিয়ে উনার বাসায় দাওয়াত গ্রহণ করা?
(২)আমার খুব রাগ হয় আমার স্বামী উনার বোনের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করলে,কথা বললে।এটা নিয়ে আমি আমার স্বামীর সাথে অভিমান করলে আমার গুনাহ হবে?যদি গুনাহ হয় তাহলে আমার আসলে কী করা উচিত?কারণ আমি নিজে মাহরাম মানার চেষ্টা করি,কিন্তু আমার স্বামী এক্ষেত্রে কঠোরভাবে মেইনটেইন করেনা দেখে আমার কষ্ট লাগে,গায়রতে লাগে....দ্বীনের প্রতি ছাড় দিচ্ছে এমন খারাপ লাগা কাজ করে।এই ব্যাপারগুলোর সাথে কীভাবে ডিল করা উচিত?
এগুলো নিয়ে সংসারি অশান্তি, দিনের পর দিন কথা বলাও অফ থাকে মাঝে মাঝে।
বিদ্র:আমরা দুজনেই দ্বীনের বুঝ রাখি।কিন্তু সব মেনে চলতে পারিনা সিচুয়েশনের দিকে তাকিয়ে।উক্ত বিষয়ের জন্য আমি আল্লাহর কাছেও দোয়াও করি নিয়মিত..
Answer
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রথমেই জানিয়ে রাখি, আপনার মানসিক অশান্তি ও দ্বীনের ব্যাপারে সচেতনতা এবং আল্লাহর কাছে দো‘আ করার অভ্যাস প্রশংসনীয়। ইনশাআল্লাহ আল্লাহ আপনার জন্য সহজ করে দেবেন। নিচে শরীয়তের আলোকে বিস্তারিত উত্তর দিচ্ছি।
(১) স্বামীর জন্য খালাতো বোনের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও দাওয়াত গ্রহণের বিধান
সাধারণ নিয়ম:
খালাতো বোন (মায়ের ভাই বা বোনের মেয়ে) স্বামীর জন্য গায়রে মাহরাম। অর্থাৎ তার সাথে পর্দা করা ফরজ। পর্দার মধ্যে রয়েছে:
- একান্তে দেখা-সাক্ষাৎ না করা (খালওয়াত)
- চেহারার দিকে তাকানো থেকে বিরত থাকা (প্রয়োজন ছাড়া)
- হাত মেলানো, আলিঙ্গন করা ইত্যাদি সম্পূর্ণ হারাম
- কথা বলার সময় দরকারি কথার বেশি না বলা, সুর নরম না করা
সিলাতুর রহিম (আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা) অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা কখনো হারাম কাজের মাধ্যমে হতে পারে না। আল্লাহ তায়ালা বলেন:
وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সাহায্য করো, এবং পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সাহায্য করো না।” (সূরা মায়িদাহ: ২)
তাই স্বামীর জন্য খালাতো বোনের সাথে পূর্ণ পর্দা না করে, গায়রে মাহরামের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও দাওয়াত গ্রহণ করা জায়েজ নয়। যদি তারা মন খারাপ করে বা রাগ করে, তবে সেটা তাদের দোষ, স্বামীর নয়। বরং স্বামীকে নম্রভাবে দ্বীনের বাধ্যবাধকতা বোঝানোর চেষ্টা করতে হবে।
হানাফী কিতাবের রেফারেন্স:
- রদ্দুল মুহতার (৫:২৬৩): “গায়রে মাহরাম নারীর দিকে ইচ্ছাকৃতভাবে তাকানো হারাম, এবং তার সাথে একান্তে সাক্ষাৎও হারাম।”
- ফাতাওয়া উসমানী (২:২৬৬): “আত্মীয়তার সম্পর্ক বজায় রাখা ফরজ বা ওয়াজিব, কিন্তু পর্দা ভঙ্গ করে বা খালওয়াত করে রাখা জায়েজ নয়। বরং শরীয়তসম্মত পন্থায় (যেমন ফোনে দোয়া করা, উপহার পাঠানো, স্বামী বা মাহরামের মাধ্যমে খোঁজ নেওয়া) সিলাতুর রহিম আদায় করতে হবে।”
- ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪:২২৫): “যদি কারো সাথে পর্দা না করে ওঠাবসা করার কারণে সম্পর্ক ছিন্ন করা আবশ্যক হয়, তবে সেটাই উত্তম। কারণ পাপের মাধ্যমে সম্পর্ক রাখা জায়েজ নয়।”
সতর্কতা:
স্বামী যদি বলেন, “আমি কম কথা বলব, কম তাকিয়ে থাকব, তবুও দেখা করব,” তবে শরীয়তে কম বা বেশি সবার ক্ষেত্রেই হারামের বিধান একই। চেহারার দিকে একবার ইচ্ছাকৃত তাকানোও হারাম। তাই দেখা-সাক্ষাৎ না করাই উত্তম। যদি বাসায় যেতেই হয় বিশেষ দরকারে, তবে অবশ্যই তার স্বামী বা অন্য কোনো মাহরাম উপস্থিত থাকতে হবে, কথা অল্প ও আওয়াজ স্বাভাবিক রাখতে হবে, তাকানো থেকে বিরত থাকতে হবে এবং যত দ্রুত সম্ভব চলে আসতে হবে।
সমাধান:
- স্বামী বোনকে বা বোনের পরিবারকে এভাবে বুঝাতে পারেন: “ভগ্নী, আপনি আমার জন্য অনেক করেছেন, আমি কৃতজ্ঞ। কিন্তু ইসলাম আমাদের পর্দা করার নির্দেশ দিয়েছে, আমরা তা ভাঙতে পারি না। দয়া করে আপনি আমার ও আমার পরিবারের জন্য দো‘আ করবেন। আপনার প্রতি আমার সম্মান ও ভালোবাসা অটুট থাকবে।”
- প্রয়োজনে স্ত্রীকে নিয়ে বোনের বাসায় যেতে পারেন, যাতে পর্দা সহজ হয়। তবে স্ত্রীর উপস্থিতিতেও গায়রে মাহরামের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ ও আলাপ-আলোচনার সীমা অতিক্রম করা জায়েজ নয়।
- দাওয়াত গ্রহণের পরিবর্তে অন্য উপায়ে শুভেচ্ছা জানানো যেতে পারে: ফোনে দো‘আ করা, উপহার পাঠানো, ঈদের সময় দেখা না গিয়ে খোঁজ নেওয়া ইত্যাদি।
(২) স্ত্রীর অভিমান ও রাগ করা : বিধান ও করণীয়
আপনার রাগ ও গায়রাহ (স্বামীর গায়রে মাহরামের সাথে মেলামেশায় আপত্তি) হওয়া স্বাভাবিক এবং প্রশংসনীয়। যেহেতু স্বামী পর্দার ব্যাপারে শিথিলতা করছেন, আপনার অসন্তুষ্টি সঠিক। একে অভিমান বা বিরক্তি বলা চলে, কিন্তু এটাকে গুনাহ বলা যাবে না যদি এটি ন্যায্য কারণে হয় এবং আপনি তা প্রকাশের সময় শৃঙ্খলা বজায় রাখেন।
তবে হ্যাঁ, আপনার জন্য কিছু বিষয়ে সতর্কতা জরুরি:
ক. অভিমান বা ক্ষোভের কারণে স্বামীর সাথে কথা না বলা, সংসারিক অশান্তি সৃষ্টি করা: এটি উচিত নয়। কারণ স্বামীর হক হলো স্ত্রীর সাথে ভালো ব্যবহার করা এবং স্ত্রীর ওপর স্বামীর অধিকার রয়েছে। সূরা নিসা ৪:৩৪-এ বলা হয়েছে:
الرِّجَالُ قَوَّامُونَ عَلَى النِّسَاءِ
“পুরুষরা নারীদের ওপর কর্তা।”
একইভাবে, স্ত্রী যদি অভিমান করে স্বামীর হক নষ্ট করে (যেমন কথা না বলা, বিছানা ছেড়ে থাকা, সুন্দর ব্যবহার না করা), তবে তা গুনাহের কারণ হতে পারে। ইবন আবিদীন রহ. বলেন: “স্বামীর সাথে ঝগড়া করা বা তার মুখের ওপর কথা না বলা স্ত্রীর জন্য মাকরূহ। তবে যদি স্বামী স্পষ্ট হারাম কাজে লিপ্ত হয়, তবে শুধু তাকে নিষেধ করা জায়েজ, কিন্তু সম্পর্ক ছিন্ন করার পর্যায়ে না যাওয়া।” (রদ্দুল মুহতার)
খ. আপনার রাগ ও অসন্তোষকে শয়তান যেন সংসার ধ্বংসের অস্ত্র না বানায়। আপনি দ্বীনের বুঝ রাখেন, তাই সুন্দরভাবে স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করুন। কোরআন-হাদিসের দলিল দিয়ে সহজভাবে পর্দার গুরুত্ব বুঝান। কঠোরতা না করে ধৈর্য ধরুন। আল্লাহর কাছে দো‘আ চালিয়ে যান।
গ. আপনার গায়রাহ সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ গায়রাহকে ভালোবাসেন, কিন্তু শয়তান গায়রাহকে বাড়িয়ে দিয়ে অমঙ্গল তৈরি করে।” (সহীহ মুসলিম)
তাই আপনার গায়রাহ যদি শুধু দ্বীনের জন্য হয়, তবে তা সওয়াবের কাজ। কিন্তু এর কারণে স্বামীর সাথে সম্পর্কের মধ্যে তিক্ততা সৃষ্টি করলে, আপনার নিয়ত ও পদ্ধতি পরীক্ষা করুন।
ঘ. কী করণীয়:
১. স্বামীর সাথে সুন্দরভাবে বসে আপনার কষ্টের কথা বলুন। “আমার গায়রাহ হয়, আমি চাই আপনি আল্লাহর হুকুম পুরোপুরি মেনে চলুন। বোনের সাথে পর্দা করা ফরজ। আপনার ঋণ স্বীকার করে বলুন, ইসলাম যেভাবে সিলাতুর রহিম রাখতে বলেছে, পর্দার মাধ্যমেই রাখুন।”
২. তাকে সহায়তা করুন: তার সাথে বোনের বাসায় যান, পর্দা রক্ষা করতে সাহায্য করুন।
৩. নিজেও ধৈর্য ধরুন। স্বামী যদি আপনার ভালোবাসা ও গায়রাহ বুঝতে পারে, তবে ইনশাআল্লাহ ধীরে ধীরে সংশোধন হবে।
৪. রাগ যখন চরমে ওঠে, তখন চুপ করে যান এবং কিছুক্ষণ পর কথা বলুন। রাগের মাথায় অভিমান করে কথা বন্ধ রাখা না করাই ভালো।
৫. স্বামীর জন্য দো‘আ করুন, যেন আল্লাহ তাকে হেদায়েত দেন। কুরআনের একটি দো‘আ:
رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ
“হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততিকে আমাদের জন্য চোখের শীতলতা বানিয়ে দাও।” (সূরা ফুরকান: ৭৪)
সংক্ষিপ্ত উত্তর ও পরামর্শ:
প্রথম প্রশ্নের উত্তর: স্বামীর জন্য খালাতো বোনের সাথে পর্দা করা ফরজ। তাই পূর্ণ পর্দা ছাড়া বাসায় যাওয়া, দাওয়াত গ্রহণ করা, দেখা-সাক্ষাৎ করা জায়েজ নয়। যদি তারা রাগ করে, তাতে গুনাহ স্বামীর নয়, বরং তাদের। স্বামীকে নম্রভাবে দ্বীনের বাধ্যবাধকতা বোঝাতে হবে এবং শরীয়তসম্মত উপায়ে (যেমন ফোনে দো‘আ, উপহার পাঠানো ইত্যাদি) সম্পর্ক বজায় রাখতে হবে।
দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর: আপনার গায়রাহ ও পর্দার প্রতি আগ্রহ প্রশংসনীয়। তবে অভিমান ও কথা বলা বন্ধ রাখা - যদি তা স্বামীর অধিকার নষ্ট করে - তবে গুনাহ হতে পারে। আপনার উচিত নরমভাবে স্বামীকে বোঝানো, তার জন্য দো‘আ করা এবং ধর্য্য ধরা। সংসারে শান্তি বজায় রাখতে আপনি উদ্যোগী হোন। স্বামী যদি কঠোরভাবে পর্দা না মানে, তবে আপনার দায়িত্ব তাকে সঠিক পথ দেখানো, কেবল অভিমান না করা।
উল্লেখযোগ্য হানাফী গ্রন্থ:
- ফাতাওয়া উসমানী
- ইমদাদুল ফাতাওয়া
- রদ্দুল মুহতার
- বেহেশতী জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভী)
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফী)
আল্লাহর কাছে দো‘আ করুন:
رَبَّنَا لَا تُزِغْ قُلُوبَنَا بَعْدَ إِذْ هَدَيْتَنَا وَهَبْ لَنَا مِنْ لَدُنْكَ رَحْمَةً ۚ إِنَّكَ أَنْتَ الْوَهَّابُ
“হে আমাদের পালনকর্তা! আমাদেরকে পথ দেখানোর পর তুমি আমাদের অন্তরকে সত্য থেকে বিচ্যুত করো না এবং তুমি আমাদের নিজের পক্ষ থেকে দয়া দান করো। নিশ্চয়ই তুমি সব কিছুর দাতা।” (সূরা আলে ইমরান: ৮)
আপনার সংসারে শান্তি ও বরকত বর্ষিত হোক। আমীন।
জাযাকাল্লাহু খয়রান।