একজন মুসলিম বোনের পারিবারিক দ্বন্দ্ব, দ্বীনি শিক্ষার ইচ্ছা, সুদের ঋণ ও বিয়ে সংক্রান্ত শরিয়ত সম্মত সমাধান চান?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
এখন তার বাবা মা এর মধ্যেও শুরু থেকেই দ্বন্দ্ব ছিল, মনোমালিন্য ছিল, বাবা মায়ের উপর রীতিমতো বিভিন্ন বিষয়ে জুলুম করে এখনোও। বাবা ওতটা প্যাক্টিসিং না বলতে গেলে একদমই না, মাঝেমধ্যে নামাজও ছেড়ে দেয়, প্রায়ই ছেড়ে দেয়, দাড়িও রাখতো না ইদানীং রাখছে। এটা বলার কারণ হলো মায়ের যখন বাবার সাথে মনোমালিন্য হয় তখন হায় হুতাশ করে এসে বলে আমি আর জীবনে বেচে থেকে কি করব! নিজের জীবনেও সারাজীবন এগুলো দেখলাম এখন মেয়ের টাও দেখতে হবে, তাই ভালো হয় এখনই মরে যাই এগুলা দেখার চেয়ে, আর বাচতে চাই আল্লাহকে এটাই বলি, কেউ জিজ্ঞেস করলেও এটাই বলব তাড়াতাড়ি মরে যাই,আরও বলে তোরও ভাগ্য আমার মতই, সারাজীবনে মায়ের জীবন দেখেও শিক্ষা হলো না এখনও বিয়ে বসে স্বামীকে আদর্শ বানাতে চাস?
তো মেয়েকে এখন!এই বয়সে!পড়ালেখা ছেড়ে বিয়ে বসতে চাইছে তাও দ্বীনদার ছেলের সাথে এটা আপত্তি!
ছোটভাই দুইটাও বোনের কাছে কিছুই শিখবে না!
আরেকটা বিষয় হলো আল্লাহ তায়ালার তাওফীক্ব আর মা বাবার দুয়া ছাড়া তো কিছুই হয় না, কিন্তু মেয়ের তো খুবই ইচ্ছা যে যেহেতু ফ্রি মিক্সিং এর কারণে ভার্সিটিতে পড়তে পারছে না (তার খুবই ইচ্ছা ছিলো,তার ইচ্ছা ছিলো তাও সে যায় নি এটা তো পরিবারে ডিরেক্ট বলা যায় না, বললে তো বলে কোনো উগ্রবাদী গ্রুপে যুক্ত হয়ে ব্রেইনওয়াশড হপ্যেছে, এগুলো কোথায় থেকে শিখলো,এগুলো মাথায় কিভাবে আসলো,এই ধরণের চিন্তা কিভাবে আসে!) তাই সে চায় সে কোনোভাবেই তার সময় নষ্ট না করে মনোযোগ দিয়ে আলেমা এবং হাফেজা উভয় লাইনেই পড়াশোনা চালিয়ে যাবে বিয়ের আগেও, পরেও, বিয়ে কিংবা সংসার তার স্বপ্নে বাধা মন থেকে চাইছে কিন্তু....
তার আপন মানুষরা বলছে, হুজুর তো জীবনেও বিয়ে দেয়া যাবে না,তাঁরা নাকি বলএ নিবে দাওরায়ে হাদীস পড়াবে বিয়ের পরে কিন্তু ঘরে তুলে নাকি জীবনেও পড়াবে তো দূর, এমনভাবে বন্দি করবে যে কোনোদিকেই নড়তে পারবি না!
মাদ্রাসায়তেও দেয়া যাবে না,মাদ্রাসা নাকি খুউব খারাপ,খুউব, ওখানে নাকি চরিত্র নষ্ট এমন হুজুররা আছে বেশিরভাগ সব (এর চেয়ে ভয়ানক শব্দ, উল্লেখ করা যাচ্ছে না)
দ্বীনদার ছেলে খুঁজতে বললে বলে দাঁড়ি টুপিওয়ালারা ১০ বিয়ে করে ৪ বিয়ে করে!
নামাজী খুঁজতে বললে বলে আমি তো চাই না চাকরি বাকরি রেখে সারাদিন মসজিদে গিয়ে পড়ে থাকুক!
দাঁড়ি খুঁজলে বলে দাঁড়ি রাখতে কতক্ষণ? চাপা স্টাইল দাঁড়িকে বলে দাঁড়ি!
পাত্র সম্পর্কে মোটামুটি জেনে না করলে বলে, না দেখা করেই না করস কেন, তোর কি কোথাও প্রেম আছে, প্রেম থাকলে বলে ফেল,এরকম তো পাত্র পছন্দ করে না যাদের প্রেম থাকে।
(অভিযোগ না জাস্ট জানার জন্য প্রশ্ন যে এগুলো তো বোনের মনোবল চুড়মার করে দিচ্ছে, এই কথাগুলোকে সে কিভাবে নিবে?)
আরও একটা বিষয় হলো মেয়ে বাবা লোন নিয়ে বাসা করেছে, সুদীলোন!
এখন ২ টা ইউনিট করেছে বাসা করার সময়েই মাঝে দেয়াল তুলে দিয়েছে যাতে বাসা ভাড়া পায়, যেহেতু লোনের টাকা অফিসের বেতন থেকে কাটা যাবে তাই যেন কিছু টাকা ভাড়া আসে কিন্তু এমন না যে ভাড়ার টাকা না এলে সংসার একদমই চলবে না, কিছুটা টানাটানি লাগতে পারে,
এখন ইউনিটটা খুবই ছোট হওয়াতে মেয়েটি ১০ আর ৭ বছরের ভাইয়ের সাথে একই রুমে ঘুমায় আলাদা বেডে(ভাঙা বেড),মেয়ে কিছু বললে যে দেয়াল ভেঙে দরজা বানিয়ে ফেলো কারণ চিপাচিপি হচ্ছে অনেক বেশি, ঘরে হাটারও জায়গা নেই। এরকম
বললে বলে যে কেনো তোমার কি সমস্যা হচ্ছে থাকতে! বেশি আরামে আছো তো!এই জন্য!
আরও পেতে চাও?!
উনি মূলত ৫০ লাখ টাকার হাউজবিল্ডিং লোন নিতে চাচ্ছে দোতলা করার জন্য এজন্য যখন বলা হয় চিপাচিপির কথা তখন বলে যে নিচতলায় চিপাচিপি হবেই,দোতলায় হবে না! তো হালালভাবে দোতলা করতে আরও ১০ বছর তাই মেয়ে বুদ্ধি দিতে চাইছে যে এখন তো তোমার অনেক ঋণ আছে আত্মীয়-স্বজন, অফিসেও এখন লাখ দুইয়েক খরচ করে ২ তলায়একটাও রুম দেয়াও তোঅনেক কঠিন,তাই মাঝের দেয়াল কেটে দরজা লাগিয়ে দাও,কিছু টাকা লাগবে আর ভাড়া টা কাটাযাবে, একটু হিসেব করে চললে সংসার চলে যাবে, একটু গুছিয়ে থাকা যাবে, জায়গা হবে। মেয়েরও একটা পার্সোনাল ঘর থাকলো,মেয়ের ঘর চাওয়া টা কি অন্যায়?কারণ ভাইদের সাথে থাকতে তার আনইজি লাগে।
এমনকি বিয়ে দিয়ে মেয়েকে জামাই নিয়ে থাকতে দিতে পারবে না এই জন্য বিয়েতেও কোনো তাড়াহুড়ো নেই! কাউকেই বিয়ের কথা বলবে না কেউ যদি টাকা পয়সা চাকরি ওয়ালাআসে তাহলে আগাবে নাহলে না!
Answer
উত্তর:
প্রিয় বোন, আপনার বর্ণিত পরিস্থিতি অত্যন্ত জটিল এবং কষ্টদায়ক। ইসলামের আলোকে আমরা নিম্নোক্ত বিষয়গুলো বিশ্লেষণ করব এবং সমাধানের পথ দেখাব।
১. সহশিক্ষার কারণে ভার্সিটিতে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত:
আপনার সিদ্ধান্ত শরিয়তসম্মত এবং প্রশংসনীয়। ইসলামে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা হারাম। মহিলা কলেজে ভর্তি হওয়া ভালো, তবে নিশ্চিত করুন যে সেখানেও পর্দার বিধান লঙ্ঘিত হচ্ছে না। যদি সম্ভব হয়, তাহলে ঘরে বসে অনলাইনে পড়াশোনার ব্যবস্থা করুন।
কুরআন:
"وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَىٰ"
(সূরা আহযাব, ৩৩ নং আয়াত)
"তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করো এবং প্রাচীন জাহেলিয়াতের মতো সাজসজ্জা প্রদর্শন করো না।"
২. পিতার সুদী লোন ও ঘরের সমস্যা:
পিতা সুদী লোন নেওয়া হারাম কাজ করেছেন। তাকে নম্রভাবে বোঝানোর চেষ্টা করুন। যদি তিনি না শোনেন, তাহলে আপনি এই লোনের কোনো অংশ ব্যবহার করবেন না। ঘরের চিপাচিপি সমস্যার জন্য আপনি পিতাকে বোঝাতে পারেন যে, শরিয়তে নারী-পুরুষের পৃথক ঘর রাখা জরুরি।
হাদীস:
"لَعَنَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ"
(সহীহ মুসলিম, হাদীস: ১৫৯৮)
"রাসূলুল্লাহ (সা.) সুদ গ্রহীতা, প্রদানকারী, লেখক ও সাক্ষীগণকে লানত করেছেন।"
৩. মায়ের নেতিবাচক কথাবার্তা:
মায়ের হতাশা এবং আপনার প্রতি কঠোর বাক্য শোনা কষ্টদায়ক। তবে মায়ের প্রতি আপনার দায়িত্ব হলো ধৈর্য ধরা এবং সদয় আচরণ করা। মা যা বলছেন তা ভুল, কিন্তু আপনি উত্তেজিত হবেন না। বরং দোয়া করুন এবং তাকে ভালোবাসা দেখান।
হাদীস:
"الْوَالِدَةُ أَوْلَى النَّاسِ بِحُسْنِ الصُّحْبَةِ"
(সহীহ বুখারী, হাদীস: ৫৯৭১)
"সন্তানের ভালো ব্যবহার পাওয়ার অধিক হকদার হলো মা।"
৪. আলেমা ও হাফেজা হওয়ার ইচ্ছা:
আপনার ইচ্ছা অত্যন্ত পবিত্র এবং দ্বীনি শিক্ষা অর্জন ফরযে কেফায়া। পরিবারের বাধা সত্ত্বেও আপনাকে এ পথে অগ্রসর হতে হবে। তবে পরিবারের সাথে সংঘাতে না গিয়ে কৌশলী হোন। ঘরে বসে অনলাইনে দ্বীনি শিক্ষা নেওয়ার ব্যবস্থা করুন।
হাদীস:
"طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ"
(ইবনে মাজাহ, হাদীস: ২২৪)
"প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর জ্ঞান অর্জন ফরয।"
৫. বিয়ে ও দ্বীনদার পাত্র:
আপনার পরিবারের দ্বীনদার পাত্র সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণা ভুল। ইসলাম দ্বীনদার ও সচ্চরিত্র পাত্র পছন্দ করতে উৎসাহিত করে। আপনি নিজে পাত্র খোঁজার চেষ্টা করুন এবং বাবার অনুমতি ছাড়া বিয়ে করার অনুমতি শরিয়তে নেই, তবে পিতা যদি অযৌক্তিক বাধা দেন, তাহলে কাজী বা মুরব্বির সাহায্য নিন।
হাদীস:
"إِذَا جَاءَكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ دِينَهُ وَخُلُقَهُ فَزَوِّجُوهُ"
(তিরমিযী, হাদীস: ১০৮৫)
"তোমাদের কাছে যখন এমন ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব নিয়ে আসে যার দ্বীন ও চরিত্র তোমরা পছন্দ কর, তাহলে তাকে বিয়ে দাও।"
৬. ছোট ভাইদের সাথে এক ঘরে থাকা:
মেয়ের জন্য বালেগ হওয়ার পর ভাইদের সাথে এক ঘরে থাকা উচিত নয়। আপনি পিতাকে বোঝানোর চেষ্টা করুন এবং যদি না পারেন, তাহলে নিজের বিছানা আলাদা করে পর্দার ব্যবস্থা করুন।
ফতোয়া:
"يَجِبُ عَلَى الْأَبِ أَنْ يُفَرِّقَ بَيْنَ الْأَوْلَادِ فِي الْمَضَاجِعِ إِذَا بَلَغُوا عَشْرَ سِنِينَ"
(হাশিয়াতুল মুহতামিন, ১৬/২৪)
"পিতার জন্য আবশ্যক যে, সন্তানদের বয়স দশ বছর হলে তাদের বিছানা আলাদা করে দেবে।"
শেষ কথা:
আপনি অত্যন্ত ধৈর্যশীল এবং দ্বীনদার মেয়ে। পরিবারের চাপে ভেঙে না পড়ে আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। অধিক পরিমাণে দোয়া করুন এবং দ্বীনি ইলম অর্জনের চেষ্টা চালিয়ে যান। আল্লাহ অবশ্যই আপনার জন্য উত্তম পথ বের করে দেবেন।
দোয়া:
"رَبَّنَا هَبْ لَنَا مِنْ أَزْوَاجِنَا وَذُرِّيَّاتِنَا قُرَّةَ أَعْيُنٍ وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا"
(সূরা ফুরকান, ৭৪ নং আয়াত)