ধূমপান কি শয়তানের ভাই হয়? গাজা খেয়ে নামাজ পড়া যাবে কি? নাপাক অবস্থায় কোরআন তিলাওয়াত, জিনা তওবা না করলে কি হবে? রাসূলের শাফায়াত কাদের জন্য?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Questioner: Shawon
Question Asked: 29 May 2026, 02:02 PM
Reviewed & Published: 01 Jun 2026, 09:55 PM
Views: 32
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১। আমার ধুমপান করার বদঅভ্যাস আছে সিগারেট খাইলে কি অবচয় হবে সয়তানের ভাই হবে? সয়তানের ভাই বলতে কি বুঝানো হয়েছে সয়তানের ভাই হলে কি চিরস্থায়ী জাহান্নামি আল্লাহ পাক দয়া করবেন না রাসুল সাঃ এর সাফায়েত নসিব হবেনা?

২।গাজা, ইয়াবা, ঘুমের ঔষধ সেবন করার ২ ঘন্টা পরে সুরা, কালাম, নামাজের তাসবিহ সকল কিছু ঠিক করে পড়তে পারলে কি নামাজে যেতে পারবে?

৩।নেশা করার পর কোরআন পড়তে, জিকির করতে পারে সঠিক ভাবে পারে তাহলে পড়লে গোনাহ বা ইমানে সমস্যা হবে কি?

৪।নাপাক কাপড়ে নাপাক শড়ীরে, গোসল ফরজ অবস্থায় কোরআন তিলাওয়াত, দুরুধ শরীফ, জিকির করা যাবে কি


৫।পরকিয়া, জিনা , সতর খুলে করলে তওবা না করে মারা গেলে কি হাসরের মাঠ বা আখিরাতে তাকাবেন না দয়া করবেন না নবীজি সাঃ এর সাফায়েত নসিব হবেনা।

Answer

উত্তর প্রদানে কুরআন, হাদিস ও প্রামাণ্য হানাফি ফিকহের কিতাবের আলোকে নিম্নরূপ পেশ করা হলো।


প্রশ্ন ১: ধূমপান কি অপব্যয় ও শয়তানের ভাই হওয়ার কারণ? এতে কি চিরস্থায়ী জাহান্নাম হবে?

উত্তর: ধূমপান স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ও অর্থের অপচয়, তাই এটি নাজায়েয ও গুনাহের কাজ। কুরআনে বলা হয়েছে:

﴿إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ ۖ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا﴾
"নিশ্চয় অপব্যয়কারীরা শয়তানের ভাই, আর শয়তান তার পালনকর্তার প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ২৭)

  • শয়তানের ভাই বলতে বুঝানো হয়েছে শয়তানের অনুসারী বা তার মতো আচরণকারী, আক্ষরিক অর্থে ভাই নয়। এটি একটি образное উক্তি।
  • ধূমপানের কারণে চিরস্থায়ী জাহান্নাম হবে না, যদি ব্যক্তি ঈমানের সাথে মৃত্যুবরণ করে। তবে গুনাহের জন্য তওবা ও ইস্তিগফার জরুরি।
  • আল্লাহর দয়া ও রাসূল (সা.)-এর শাফায়াত পাওয়া বন্ধ হবে না, বরং শাফায়াতের জন্য শর্ত হলো গুনাহ থেকে তওবা ও ইখলাস।

হানাফি ফিকহের আলোকে:

  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, কবিরা গুনাহ করলেও ব্যক্তি মুসলিম থাকে, তবে তাকে তওবা করতে হবে। (রদ্দুল মুহতার, ৪/৫০)
  • ধূমপান হারাম না হলেও নাজায়েয ও মাকরুহ তাহরীমি। (ফাতাওয়া উসমানী, ২/৪০০)

প্রশ্ন ২: গাজা, ইয়াবা, ঘুমের ঔষধ সেবনের ২ ঘন্টা পর নামাজ পড়া যাবে কি?

উত্তর: যদি ওষুধ সেবনের পর ২ ঘন্টায় নেশার প্রভাব সম্পূর্ণ কেটে যায় এবং ব্যক্তি সম্পূর্ণ সুস্থ মস্তিষ্কে নামাজের সব শর্ত পূরণ করতে পারে (যেমন সঠিকভাবে কেরাত, তাসবিহ ইত্যাদি), তাহলে নামাজ পড়া জায়েয। কিন্তু নেশা অবস্থায় নামাজ পড়া হারাম

  • নেশা করার গুনাহ আলাদাভাবে তওবা করতে হবে।
  • নেশার পর নামাজ পড়লে নামাজ আদায় হবে, তবে নেশার পাপ মাফ হবে না।
  • হানাফি ফিকহ: নেশাদ্রব্য সেবন করা কবিরা গুনাহ, কিন্তু নামাজ শুদ্ধ হওয়ার জন্য জ্ঞান থাকা শর্ত। (আল-হিদায়া, ২/১০৫)

প্রশ্ন ৩: নেশা করার পর কোরআন পড়লে বা জিকির করলে গুনাহ বা ঈমানের সমস্যা হবে কি?

উত্তর: নেশা অবস্থায় কোরআন তিলাওয়াত করা হারাম। কিন্তু নেশার প্রভাব কেটে যাওয়ার পর সঠিকভাবে পড়লে তিলাওয়াত শুদ্ধ হবে। তবে এর দ্বারা নেশার গুনাহ মাফ হবে না।

  • ঈমানের সমস্যা তখনই হবে যদি কেউ হারাম কাজকে হালাল মনে করে। কিন্তু যদি কেউ জানে এটি হারাম এবং তওবা করে, তাহলে ঈমানের ক্ষতি হয় না।
  • হাদিসে এসেছে: "যে ব্যক্তি নেশা করে, তার ঈমান ততক্ষণ পর্যন্ত স্থির থাকে না।" (সহিহ বুখারী: ৫৫৭৪) অর্থাৎ নেশার সময় ঈমানের প্রভাব দুর্বল হয়, তবে স্থায়ীভাবে চলে যায় না।

প্রশ্ন ৪: নাপাক কাপড়ে, নাপাক শরীরে বা গোসল ফরজ অবস্থায় কোরআন তিলাওয়াত, দুরুদ শরীফ, জিকির করা যাবে কি?

উত্তর:

  • কোরআন তিলাওয়াত: জুনুবি (গোসল ফরজ) অবস্থায় কোরআন স্পর্শ করা ও তিলাওয়াত করা হারাম। ছোট নাপাকি (হায়েজ, নিফাস) অবস্থায়ও তিলাওয়াত নিষিদ্ধ। কিন্তু মনে মনে বা তেলাওয়াত না করে আয়াতের অর্থ চিন্তা করা যাবে। (রদ্দুল মুহতার: ১/৪৭৬)
  • নাপাক কাপড়ে বা শরীরে: নাপাকি থাকলে কোরআন স্পর্শ করা ও তিলাওয়াত করা জায়েয নয়, তবে নাপাকি লেগে থাকা অবস্থায় তিলাওয়াত করলে গুনাহ হবে।
  • দুরুদ শরীফ ও জিকির: জুনুবি অবস্থায়ও দুরুদ পাঠ করা, দোয়া করা, যিকির করা জায়েয। তবে মসজিদে প্রবেশ নিষিদ্ধ। (ফাতাওয়া হিন্দিয়া: ৫/৫২)

সতর্কতা: শরীর, কাপড় ও স্থান পবিত্র রেখে ইবাদত করা উত্তম।


প্রশ্ন ৫: পরকিয়া, জিনা, সতর খুলে করলে তওবা না করে মারা গেলে কি হাশরের মাঠে আল্লাহ তাকাবেন না? রাসূলের শাফায়াত পাওয়া যাবে না?

উত্তর:

  • জিনা ও পরকিয়া অত্যন্ত জঘন্য গুনাহ। কুরআনে বলা হয়েছে:
    ﴿وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا﴾
    "আর ব্যভিচারের কাছেও যেও না, নিশ্চয় তা অশ্লীল ও নিকৃষ্ট পথ।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩২)

  • তওবা না করে মারা গেলে ব্যক্তি আল্লাহর রহমত ও শাস্তির যোগ্য হবে। কিন্তু চিরস্থায়ী জাহান্নামী বলা যাবে না, যদি ব্যক্তি মুমিন হয়।

  • হাদিসে এসেছে: "যে ব্যক্তি ব্যভিচারে লিপ্ত হয়, তার জন্য জান্নাতের সুগন্ধি হারাম।" (সহিহ বুখারী: ২৪৭৪) তবে শাফায়াতের ব্যাপারে আল্লাহর ইচ্ছা প্রাধান্য পাবে।

  • রাসূল (সা.)-এর শাফায়াত পাওয়া ও না পাওয়া সম্পূর্ণ আল্লাহর ইচ্ছাধীন। তবে কঠিন গুনাহের কারণে শাফায়াত থেকে বঞ্চিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। তওবা না করলে শাফায়াত পাওয়া কঠিন। ইমাম ত্বহাবী (রহ.) বলেছেন: "কবিরা গুনাহের কারণে কেউ চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না, যদি সে মুসলিম হয়।" (শরহুল আকীদাতিত ত্বহাবিয়া)

গুরুত্বপূর্ণ:

  • তওবা কবিরা গুনাহের একমাত্র সমাধান। তওবা না করে মারা গেলে শেষ বিচারের দিন ভয়াবহ পরিণতি হবে।
  • আল্লাহর দয়া অসীম, কিন্তু তার শাস্তিও কঠিন। তাই দেরি না করে তওবা করে সোজা পথে আসা আবশ্যক।

সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ:

  1. ধূমপান বর্জন করা উচিত।
  2. নেশাদ্রব্য সম্পূর্ণরূপে পরিহার করুন।
  3. নাপাক অবস্থায় কোরআন স্পর্শ ও তিলাওয়াত না করা জরুরি।
  4. জিনা ও পরকিয়ার মতো গুনাহ থেকে তওবা করে পবিত্র জীবন গড়ুন।
  5. রাসূল (সা.)-এর শাফায়াত পেতে ঈমানের সাথে আমল সংশোধন করুন।

আল্লাহ আমাদের সবাইকে ক্ষমা করুন এবং হেদায়েত দান করুন। আমীন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.