দাওয়াহ অস্বীকারকারীদের কিভাবে বোঝাবেন? দাতার ভুলত্রুটি দাওয়াতের সত্যতা নষ্ট করে না – কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে সমাধান।

Faith and Belief · Hanafi

Questioner: Tazry
Question Asked: 06 Jun 2026, 10:28 AM
Reviewed & Published: 06 Jun 2026, 01:01 PM
Views: 24
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

দাওয়াহ বিষয়টা অনেকেই মানতে চায় না। তাদের কিভাবে এই বিষয়ে অবগত করা যায়? আবার তাদের ইসলামের দাওয়াত দিলে , তাদের কথা এমন হয় যে, দাওয়াত যিনি দিচ্ছেন তারকোনো ভুলত্রুটি থাকলে সেটি উত্তাপন করে দাওয়াহ নাকচ করেন। এই বিষয়টি কিভাবে উত্তর দিয়ে দাওয়াত দেওয়া যায়?

Answer

بسم الله الرحمن الرحيم
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين محمد وعلى آله وأصحابه أجمعين

সংক্ষিপ্ত উত্তর

দাওয়াহ ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ ফরজ। যারা দাওয়াহ মানতে চান না, তাদের প্রতি কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী হিকমত ও সুন্দর উপদেশ দিয়ে দাওয়াত পেশ করতে হবে (সূরা নাহল ১২৫)। দাতার ব্যক্তিগত ভুলত্রুটি দাওয়াতের সত্যতাকে ক্ষুণ্ণ করে না; বরং কুরআন ও সুন্নাহ স্পষ্ট করে যে, দাওয়াতের মূল বক্তব্য স্বাধীনভাবে বিবেচনা করতে হবে। কেউ যদি দাতার ত্রুটি ধরে দাওয়াত নাকচ করেন, তাহলে তাদেরকে বুঝাতে হবে যে, সকল মানুষই ভুলের উর্ধ্বে নন, কিন্তু সত্য সবার জন্যই সত্য। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বিরুদ্ধেও মিথ্যা অপবাদ দেওয়া হয়েছে, তবু তাঁর দাওয়াত অগ্রাহ্য করা উচিত হয়নি।


বিস্তারিত উত্তর

১. দাওয়াহ অস্বীকারকারীদের প্রতি করণীয়

যারা দাওয়াহ মানতে চান না, তাদের জন্য কুরআনে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে:
"তুমি তোমার রবের পথে আহ্বান কর হিকমত (প্রজ্ঞা) ও সুন্দর উপদেশ দ্বারা, এবং তাদের সাথে তর্ক কর উত্তম পদ্ধতিতে।" (সূরা নাহল ১২৫)

  • হিকমত: সময়, স্থান ও ব্যক্তি বুঝে কথা বলা।
  • সুন্দর উপদেশ: কোমল ভাষা, ধৈর্য ও উদাহরণ দিয়ে বোঝানো।
  • উত্তম তর্ক: সত্য প্রমাণের জন্য যুক্তি, কিন্তু তিক্ততা ও আক্রমণাত্মক নয়।

হাদিসে রাসূল (সা.) বলেছেন: "তোমরা আমার পক্ষ থেকে একটি আয়াত হলেও পৌঁছে দাও।" (বুখারি, ৩৪৬১)
অর্থাৎ দায়িত্ব শুধু পৌঁছানোর, গ্রহণ করার দায়িত্ব তাদের ওপর।

২. দাতার ভুলত্রুটি নিয়ে আপত্তির জবাব

অনেকে বলেন, "যে ব্যক্তি দাওয়াত দিচ্ছে তার নিজের জীবনেই ত্রুটি, তাহলে তাকে কীভাবে বিশ্বাস করি?"
এর উত্তর কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে নিম্নরূপ:

(ক) কুরআনী দৃষ্টান্ত:
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
"হে ঈমানদারগণ! তোমরা ন্যায়ের সাক্ষী হও, যদিও তা তোমাদের নিজের বা পিতা-মাতা ও আত্মীয়-স্বজনের বিরুদ্ধে যায়।" (সূরা নিসা ১৩৫)
অর্থাৎ সত্যকে তার উৎস থেকে গ্রহণ করতে হবে, বক্তার ব্যক্তিগত অবস্থা দেখে নয়।

(খ) সুন্নাহর দৃষ্টান্ত:
রাসূলুল্লাহ (সা.)-কে মক্কার মুশরিকরা "যাদুকর", "পাগল" বলে অপবাদ দিত, কিন্তু তাঁর দাওয়াতের সত্যতা তখনও অটুট ছিল। সাহাবায়ে কেরামের অনেকেরই ইসলাম গ্রহণের আগে বড় বড় ত্রুটি ছিল, কিন্তু তারা দাওয়াত কবুল করেছেন।

(গ) হানাফি ফিকহের নির্দেশনা:
ইমাম ইবনে আবিদীন (رحمة الله) রদ্দুল মুহতারে লিখেছেন:
"আমর বিল মারুফ ও নাহি আনিল মুনকার (সৎ কাজের আদেশ ও অসৎ কাজের নিষেধ) ওয়াজিব, যদিও আদেশকারী নিজে পূর্ণ মারুফের ওপর না থাকে। কারণ তার ব্যক্তিগত ত্রুটি সৎকাজের আদেশের ওয়াজিবকে রহিত করে না।" (রদ্দুল মুহতার, ৯/১৬৫)
একই কথা বলা হয়েছে ফাতাওয়া আলমগীরি ও বাহেশতি জেওর-এ।

(ঘ) ব্যবহারিক দৃষ্টিভঙ্গি:
দাতা যদি বলেন: "আমিও ভুল করি, কিন্তু আল্লাহর হুকুম সবার জন্যই প্রযোজ্য। আপনি আমার দিকে না তাকিয়ে কুরআন-হাদিসের দিকে তাকান।" তাহলে আপত্তিকারীর দৃষ্টি মূল বার্তায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। রাসূল (সা.) বলেছেন: "তোমাদের কেউ কি তার ভাইয়ের মধ্যে একটি কাঠ দেখে, অথচ নিজের চোখের গোড়ায় একটি গাছ আছে?" (মুসলিম) অর্থাৎ নিজের ত্রুটিগুলোকে গুরুত্ব দেওয়া উচিত, অপরের ত্রুটিকে অজুহাত বানানো নয়।

৩. ব্যবহারিক পদ্ধতি

  • নিজেকে নম্র রাখুন: দাতা যদি নিজের দুর্বলতা স্বীকার করে বলেন, "আমি নিখুঁত নই, কিন্তু যা বলছি তা আল্লাহর বাণী," তাহলে তা গ্রহণযোগ্য হয়।
  • আপত্তিকারীর ভালো দিক উল্লেখ করুন: “আপনি ন্যায়পরায়ণতা দেখাতে চাচ্ছেন, কিন্তু ন্যায়পরায়ণতা হলো সত্যকে গ্রহণ করা, সত্যের বক্তাকে অগ্রাহ্য না করা।”
  • তাদের প্রশ্নের উত্তর দিন: যদি তারা দাতার ত্রুটি ধরে বসে, তাহলে বলুন: “আল্লাহ তাআলা পয়গম্বরদের নিষ্পাপ করেছিলেন, কিন্তু দাতা তো পয়গম্বর নন। তথাপি যে কথা সত্য, তা সবার জন্যই মানা আবশ্যক।”

৪. গুরুত্বপূর্ণ হানাফি গ্রন্থের রেফারেন্স

  • মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি): সূরা নাহল ১২৫-এর তাফসিরে দাওয়াতের আদব বর্ণিত।
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (মাওলানা আশরাফ আলী থানভি): দাওয়াতের গুরুত্ব ও শর্ত সংক্রান্ত ফতোয়া।
  • বাহেশতি জেওর (মাওলানা আশরাফ আলী থানভি): দাওয়াত ও কল্যাণকামিতার নির্দেশিকা।
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি): দাওয়াতের ফরজিয়ত ও পদ্ধতি।

উপসংহার

দাওয়াহ একটি ইবাদত, যার সওয়াব বক্তার পূর্ণতার ওপর নির্ভর করে না, বরং নিয়ত ও প্রচেষ্টার ওপর। কেউ যদি দাতার ত্রুটি ধরে দাওয়াত প্রত্যাখ্যান করে, তবে তাদের বুঝাতে হবে যে, সত্য গ্রহণের মাপকাঠি হলো কুরআন-সুন্নাহ, না কোনো ব্যক্তির জীবনের নিখুঁততা। রাসূল (সা.) বলেছেন: "তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি কোন গর্হিত কাজ দেখে, সে যেন তা হাত দ্বারা পরিবর্তন করে…" (মুসলিম) – এটি সবার জন্য প্রযোজ্য, দাতা-গ্রহীতা সকলেরই নিজেদের সংশোধন করা জরুরি।

আল্লাহ তাআলা আমাদের দাওয়াতের কাজে সহায়তা করুন এবং দাওয়াত কবুল হওয়ার তাওফিক দিন। আমিন।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.