বিয়েতে যিনি উকিল,তিনি কি সাক্ষী হতে পারবেন?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমার বিয়ের সময় আমার পরিবারের কেউ ছিলো না। তারা আমাকে দ্বীন প্রাধান্য দিয়ে বিয়ে দিচ্ছিলো না। তাই আমি একা বিয়ে করেছি।
যার সাথে আমার বিয়ে হয়েছে, সে আমার কাছ থেকে ফোনে ইযন নিয়েছে এটা বলে,
"অমুক সাহেব তোমার ওলী হবে ,এতে কি তুমি রাজি আছো?"
আমি বললাম, "রাজি আছি"।
যদিও ওলী সাহেবকে আমি ভালোভাবে চিনতাম না,শুধু নাম, পরিচয়,ঠিকানা জানতাম।
এরপর ওলী সাহেব বিয়ে পড়িয়েছেন। আমি অন্য জায়গায় থাকায় সেটা আর চোখে দেখতে পাইনি।
কয়েকমাস পর জানতে পারলাম, ওখানে সাক্ষী ছিলো একজন।
আর , যিনি বিয়ে পড়িয়েছেন মানে ওলী সাহেব নিজেই একজন সাক্ষী।
বৈঠকে মোট উনারা তিনজন ছিলো, আর কেউ ছিলো না।
এখন আমার মনে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, বিয়েটা হয়েছে কি???
এখানে আমার কোন্ গোনাহগুলো হয়েছে???
যেনো তাওবা করতে পারি দ্রুত।
আর এই বিয়েতে খুলা করলে ইদ্দত পালন কীভাবে করতে হবে?
Answer
উত্তর:
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاتة
প্রথমেই জেনে রাখা জরুরি যে, ইসলামে বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সামাজিক বন্ধন। আপনার বর্ণিত পরিস্থিতির ভিত্তিতে আমরা হানাফি ফিকহের আলোকে বিশ্লেষণ করছি।
১. বিয়েটি সহীহ (বৈধ) হয়েছে কিনা?
হানাফি মতে, বিবাহের বৈধতার জন্য নিম্নলিখিত শর্তগুলি পূরণ হওয়া আবশ্যক:
- প্রস্তাব (ইজাব) ও কবুল (সম্মতি) একই মজলিসে (সভায়) বলা।
- দুইজন পুরুষ অথবা একজন পুরুষ ও দুইজন নারী সাক্ষী থাকা।
- সাক্ষীরা মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক ও সুস্থ মস্তিষ্কের হওয়া।
- সাক্ষীরা বিবাহের ঘটনা প্রত্যক্ষ করবে এবং বলতে পারবে।
আপনার ক্ষেত্রে:
-
আপনি ফোনে ইযন দেওয়ায় ইজাব-কবুল হয়েছে, যা জায়েজ।
-
সাক্ষীসংখ্যা: আপনি বলেছেন, "ওখানে সাক্ষী ছিলো একজন। আর, যিনি বিয়ে পড়িয়েছেন মানে ওলী(উকিল) সাহেব নিজেই একজন সাক্ষী। বৈঠকে মোট উনারা তিনজন ছিলেন।" অর্থাৎ, বর, ওলী (উকিল) এবং আরেকজন ব্যক্তি। কিন্তু বর নিজে সাক্ষী হতে পারে না, কারণ সাক্ষী নিরপেক্ষ হতে হবে। তাই প্রকৃত সাক্ষী মাত্র একজন (ওলী বা উকিল ব্যতীত অন্য ব্যক্তি) ছিলেন। অথচ হানাফি ফিকহ অনুযায়ী অন্তত দুইজন পুরুষ সাক্ষী থাকা আবশ্যক (সূরা বাকারা ২:২৮২; হাদিস: বুখারি, ৫০০৯)। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, সাক্ষী ছাড়া বিবাহ বাতিল (রদ্দুল মুহতার, ৩/৫৫)।
-
ওলী (উকিল) নিজে সাক্ষী হওয়া যার উকিল কেউ নিযুক্ত হবে, সে যদি আকদের অনুষ্ঠানে উপস্থিত না থাকে, তাহলে এমতাবস্থায় উকিল বিবাহের সাক্ষী হতে পারবে না। তবে যার উকিল কেউ নিযুক্ত হবে, সে যদি আকদের মজলিসে উপস্থিত হয়, তাহলে তখন উকিল বিবাহের সাক্ষী হতে পারবে। প্রশ্নের বিবরণমতে যেহেতু ফোনে ইযন বা অনুমতি/সম্মতি দেয়া হয়েছে, তাই উকিল ব্যক্তিটি সাক্ষী হতে পারবে না।
ফলাফল: আপনার বিবাহটি ফাসিদ (অবৈধ) হয়েছে। তাই এখনই পুনরায় সঠিক নিয়মে (দুইজন সাক্ষীসহ) বিবাহ করার ব্যবস্থা করুন।
২. আপনার গুনাহগুলো কী কী?
- ওলীর অনুমতি না নেওয়া: আপনি প্রাপ্তবয়স্কা ও সুস্থ মস্তিষ্কের মেয়ে, তাই নিজে বিবাহ করা জায়েজ। তবে ওলীর সম্মতি না নেওয়াতে কোনো গুনাহ নেই, যদি ওলী দ্বীনদার হন ও আপনার কল্যাণ চান (ফাতাওয়া শামী, ৩/৫৬)।
- সাক্ষীর শর্ত লঙ্ঘন: বিবাহের শর্ত পূর্ণ না করে বিবাহ করায় গুনাহ হয়েছে। তবে এটি তাওবার মাধ্যমে মাফ হবে।
- বিয়ে ভঙ্গের পর সংসার করা: ফাসিদ বিবাহের মাধ্যমে সংসার করাও গুনাহ। অবিলম্বে পৃথক হওয়া জরুরি।
৩. তাওবা করার পদ্ধতি:
- আল্লাহর কাছে আন্তরিকভাবে ক্ষমা প্রার্থনা করুন।
- ভবিষ্যতে শরিয়তসম্মতভাবে বিবাহ করার সংকল্প করুন।
- যদি সহবাস হয়ে থাকে, তাহলে সন্তান হলে তার হেফাজত করুন (সন্তান বৈধ হবে, কিন্তু বিবাহ ফাসিদ হওয়ায় পিতার পরিচয় স্বীকারে জটিলতা হতে পারে)।
৪. খুলা ও ইদ্দতের বিধান:
যেহেতু বিবাহ ফাসিদ (অবৈধ), তাই এটি ফাসখ (বিচ্ছেদ) করতে হবে। তালাক বা খুলার প্রয়োজন নেই, বরং একজন আলেমের মাধ্যমে ফাসখ করিয়ে নিন।
- ইদ্দত:
- যদি সহবাস না হয়: ইদ্দত পালনের প্রয়োজন নেই (ইমদাদুল ফাতাওয়া, ২/৩০০)।
- যদি সহবাস হয়ে থাকে: তাহলে তিন হায়জ (ঋতুচক্র) বা তিন মাস ইদ্দত পালন করতে হবে (বেহেশতী জেওর, ৫ম খণ্ড, বিবাহ অধ্যায়)।
- ইদ্দতকালে: বিয়ে করা জায়েজ নয়। সাবেক স্বামী থেকে সম্পূর্ণ পৃথক থাকতে হবে।
পরামর্শ:
নিকটস্থ কোনো বিশ্বস্ত আলেমের কাছে গিয়ে বিষয়টি জানান এবং পুনরায় দুইজন সাক্ষীসহ সহীহ পদ্ধতিতে বিবাহ পড়ান। যদি স্বামী দ্বীনদার হন, তবে পুনরায় তাকেই বিয়ে করুন।
আল্লাহ তাআলা আপনার তাওবা কবুল করুন এবং সহজ উপায় বের করে দিন।