বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫০:৫০ ঋণ ও অনুদান স্কিমে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য ঋণ নেওয়া জায়েজ কি না?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
বাংলাদেশ ব্যাংকের ৫০:৫০ স্কিমে ঋণ ও অনুদান গ্রহণের শরয়ি বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
বাংলাদেশ ব্যাংকের উদ্যোগে তরুণ উদ্যোক্তাদের জন্য উপজেলা ভিত্তিক ৫০:৫০ অনুপাতে ব্যাংক ঋণ ও অনুদান প্রদান করা হচ্ছে। প্রশ্ন হলো—এই ঋণ গ্রহণ জায়েজ কি না, এবং অনুদান ও ঋণ আলাদা করে কোনো "হিলা" করার সুযোগ আছে কি না।
শরয়ি বিশ্লেষণ
১. মূলনীতি: ঋণে অতিরিক্ত শর্ত আরোপ সুদ
ইসলামি শরিয়তে ঋণ একটি ইহসান (দয়া) ও সহযোগিতার চুক্তি। ঋণের বিনিময়ে ঋণদাতা কোনো অতিরিক্ত সুবিধা শর্ত হিসেবে আরোপ করলে তা সুদ (রিবা) হিসেবে গণ্য হয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «كُلُّ قَرْضٍ جَرَّ نَفْعًا فَهُوَ رِبًا» — "প্রত্যেক এমন ঋণ যা (ঋণদাতার জন্য) উপকার টেনে আনে, তা সুদ।" — (মুহাম্মদ ইবনুল হাসান, কিতাবুল আছার; বায়হাকি, আস-সুনানুল কুবরা: ১১৩০৬; ইবন আবি শায়বা, আল-মুসান্নাফ: ২৩০৮৮)
ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, শর্ত হিসেবে অতিরিক্ত কিছু নেওয়া সুদ; আর শর্ত ছাড়া স্বেচ্ছায় দিলে তা জায়েজ। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে, শর্ত ছাড়া স্বেচ্ছায় দিলেও তা মাকরুহ। (ইবন আবিদিন, রাদ্দুল মুহতার, খ. ৫, পৃ. ১৬৬—"باب المرابحة والربا"; আল-মারগিনানি, আল-হিদায়া, কিতাবুর রিবা)
২. ব্যাংক ঋণে সুদ আরোপিত হলে
বাংলাদেশের প্রচলিত ব্যাংকিং ব্যবস্থায় সাধারণত ঋণের উপর নির্দিষ্ট হারে সুদ আরোপ করা হয়। যদি এই ৫০:৫০ স্কিমের "ঋণ" অংশে নিম্নোক্ত যেকোনো একটি থাকে, তবে তা সুদ:
- নির্দিষ্ট হারে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধের শর্ত;
- বিলম্বে জরিমানা যা ব্যাংকের আয়ে যায়;
- ঋণদানের শর্ত হিসেবে অনুদান/সুবিধা প্রদান।
সিদ্ধান্ত: সুদভিত্তিক ঋণ গ্রহণ করা জায়েজ নয়। কুরআনে সুদ পরিত্যাগের কঠোর নির্দেশ রয়েছে:
«وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا» — "আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।" (সূরা বাকারা: ২৭৫)
«يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَذَرُوا مَا بَقِيَ مِنَ الرِّبَا إِنْ كُنْتُمْ مُؤْمِنِينَ» — "হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সুদের যা বাকি আছে তা ছেড়ে দাও, যদি তোমরা মুমিন হও।" (সূরা বাকারা: ২৭৮)
রাসূলুল্লাহ ﷺ সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, লেখক ও সাক্ষী—সবাইকে অভিসম্পাত করেছেন। (সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮)
৩. "অনুদান" অংশের বিধান
যদি সরকার/ব্যাংক নিঃস্বার্থভাবে (কোনো প্রতিদানের শর্ত ছাড়া) অনুদান দেয়, তবে তা হিবা/অনুদান হিসেবে হালাল। কিন্তু শর্ত হলো—অনুদানটি ঋণের সাথে শর্তযুক্ত বা ঋণের বিনিময়ে প্রদত্ত না হওয়া। যদি বলা হয় "ঋণ নিলে তবেই অনুদান পাবে", তবে তা ঋণের উপর শর্তারোপিত সুবিধা—যা সুদের অন্তর্ভুক্ত।
৪. "হিলা" করার প্রশ্ন
প্রশ্নে উল্লেখিত "অনুদান ও ঋণ আলাদা করে হিলা করা"—এর শরয়ি অবস্থান:
হিলা (কৌশল) দ্বারা সুদ হালাল করা যায় না। ইবন আবিদিন (রহ.) বলেন, হিলার মাধ্যমে রিবা থেকে বাঁচার চেষ্টা করা এবং রিবাকে হালাল মনে করা—উভয়ই নিষিদ্ধ। (রাদ্দুল মুহতার, খ. ৫, পৃ. ১৬৭; খ. ৬, পৃ. ৩৯১)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «لَعَنَ اللَّهُ آكِلَ الرِّبَا وَمُوكِلَهُ وَكَاتِبَهُ وَشَاهِدَيْهِ» — "আল্লাহ সুদগ্রহীতা, সুদদাতা, এর লেখক ও দুই সাক্ষীকে অভিসম্পাত করেছেন।" (সহিহ মুসলিম: ১৫৯৮)
ইমাম আনোয়ার শাহ কাশ্মীরি (রহ.) ও মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) স্পষ্ট করেছেন—শরিয়তের উদ্দেশ্য (মাকাসিদ) ব্যঙ্গ করার উদ্দেশ্যে কৃত হিলা বাতিল। (মা'আরিফুল কুরআন, সূরা বাকারা ২৭৫-এর তাফসির; ইমদাদুল ফাতাওয়া, খ. ৩, পৃ. ৩৬৮)
৫. হালাল বিকল্প
১. মুরাবাহা/বাই মুয়াজ্জাল ভিত্তিক ইসলামি ব্যাংকিং স্কিম—যেখানে ব্যাংক পণ্য কিনে নির্দিষ্ট মুনাফায় বিক্রি করে। ২. মুশারাকা/মুদারাবা ভিত্তিক অংশীদারত্ব। ৩. করযে হাসানা (নিঃস্বার্থ ঋণ)—যেখানে কোনো অতিরিক্ত শর্ত নেই। ৪. সরকারি অনুদান—যদি নিঃস্বার্থ ও শর্তমুক্ত হয়।
চূড়ান্ত ফতোয়া
- যদি ঋণে সুদ/অতিরিক্ত শর্ত থাকে — তবে উক্ত ঋণ গ্রহণ জায়েজ নয়; তা সুদ।
- যদি অনুদান ঋণের শর্ত হিসেবে দেওয়া হয় — তবে অনুদানটিও সুদের সাথে সংশ্লিষ্ট হওয়ায় গ্রহণ করা জায়েজ নয়।
- "হিলা" করে সুদ হালাল করার কোনো সুযোগ নেই — এটি শরিয়তে নিষিদ্ধ ও গুনাহ।
- একমাত্র হালাল পথ — ইসলামি ব্যাংকিংয়ের শরিয়ত-সম্মত স্কিম (মুরাবাহা, মুশারাকা, ইজারা ইত্যাদি) অথবা শর্তমুক্ত নিঃস্বার্থ অনুদান/কর্দে হাসানা।
পরামর্শ: নির্দিষ্ট স্কিমের চুক্তিপত্র (agreement) নিয়ে কোনো বিশ্বস্ত মুফতি/শরিয়ত বোর্ডের কাছে যাচাই করিয়ে নিন; কারণ শর্তাবলির সূক্ষ্ম পার্থক্যে হুকুম বদলে যায়।
আল্লাহ ভালো জানেন।