সিগারেট খেলে ৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট হবে?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
আপনার প্রশ্নের সরাসরি উত্তর হলো—না, সিগারেট খেলে নামায বাতিল হয় না, নামায হয় না—এমন নয়, আর "৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট হয়" বা "৪০ দিন ইবাদত কবুল হয় না"—এ ধরনের কোনো সহীহ দলিল নেই। তবে সিগারেট খাওয়া নিজে হারাম/মাকরূহে তাহরীমী (মতভেদে) এবং নামাযের খুশু-খুজু ও পবিত্রতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক—এটি অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
নিচে বিস্তারিত দলিলসহ আলোচনা করছি।
১. "সিগারেট খেলে ৪০ দিন ইবাদত কবুল হয় না" — এ কথার ভিত্তি কী?
এই কথাটি সাধারণত নিম্নোক্ত হাদীসের ভুল প্রয়োগ থেকে ছড়ায়:
«مَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلَاةٌ أَرْبَعِينَ لَيْلَةً» "যে ব্যক্তি মদ পান করল, তার চল্লিশ রাতের নামায কবুল হবে না।" — তিরমিযী, হাদীস নং ১৮৬৩; ইবনে মাজাহ, হাদীস নং ৩৩৭৭ (ইবনে উমার রা. থেকে)
কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়:
- এই হাদীস মদ (খামর) সম্পর্কে—সিগারেট সম্পর্কে নয়। সিগারেটকে কেউ কেউ "খামর" বা "নেশাজাতীয়" বলে কিয়াস করেছেন, কিন্তু হাদীসের শব্দ সরাসরি সিগারেটকে শামিল করে না।
- হাদীসের অর্থ নিয়ে মুহাদ্দিসীনদের ব্যাখ্যা আছে—ইমাম তিরমিযী (রহ.) বলেন, أهل العلم يقولون: لا تقبل له صلاة... অর্থাৎ এটি কবুল না হওয়ার হুমকি, তবে নামায সাকেত (বাতিল) হয় না, ওয়াজিবও বাকি থাকে। (তিরমিযী, কিতাবুল আশরিবা)
- ইমাম নববী (রহ.) «المجموع»-এ বলেন, এ ধরনের হাদীসে "কবুল না হওয়া" অর্থ সওয়াব না পাওয়া, নামায আদায় না হওয়া নয়—কারণ ইজমা অনুযায়ী নামায আদায় হয়ে যায়, কাযা লাগে না।
সুতরাং সিগারেট খেলে ৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট হয়—এটি হাদীস-নির্ভর সহীহ কথা নয়; বরং এটি লোকমুখে প্রচলিত একটি ভিত্তিহীন ধারণা।
২. সিগারেট খাওয়ার হুকুম (হানাফী ফিকহ অনুযায়ী)
সিগারেট খাওয়া হারাম বা মাকরূহে তাহরীমী—এটি হানাফী ফকীহদের প্রাধান্যopinion। কারণসমূহ:
- এটি খাবাইস (অপবিত্র/নিকৃষ্ট বস্তু) শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত; আল্লাহ তাআলা বলেন:
«وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ» "তিনি তাদের জন্য অপবিত্র বস্তু হারাম করেন।" (সূরা আল-আরাফ: ১৫৭)
- এটি নিজের ক্ষতি করে; আল্লাহ বলেন:
«وَلَا تُلْقُوا بِأَيْدِيكُمْ إِلَى التَّهْلُكَةِ» "নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না।" (সূরা আল-বাকারা: ১৯৫)
- এটি অপ্রয়োজনীয় অপচয়; আল্লাহ বলেন:
«وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا» "অপচয় করো না।" (সূরা আল-ইসরা: ২৬)
হানাফী কিতাবের বরাত:
- ইবনে আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ তামাক/ধূমপানকে খাবাইস ও ক্ষতিকর বলে উল্লেখ করেছেন (খ. ৬, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা)।
- মুফতী মুহাম্মদ শফী (রহ.) «ইমদাদুল ফাতাওয়া»-য় সিগারেটকে মাকরূহে তাহরীমী বলেছেন (খ. ৩)।
- মুফতী তাকী উসমানী (দা.বা.) «ফাতাওয়া উসমানী»-তে সিগারেটকে হারাম/মাকরূহে তাহরীমী বলেছেন এবং পরিত্যাগের তাগিদ দিয়েছেন।
- «ফাতাওয়া আলমগীরী»-তে নেশাজাতীয় ও ক্ষতিকর বস্তুর নিষেধাজ্ঞা রয়েছে (কিতাবুল কারাহিয়্যাহ)।
সুতরাং: সিগারেট খাওয়া গুনাহ—কিন্তু তা নামায বাতিল করে না, নামায ছাড়া করে না, আর ৪০ দিনের ইবাদত নষ্ট করে না।
৩. স্বামীকে উপদেশ দেওয়ার পদ্ধতি
আপনি স্ত্রী হিসেবে স্বামীকে ভালোবাসা ও নরম ভাষায় সিগারেট ছাড়ার জন্য উৎসাহিত করুন; কঠোরতা বা তিরস্কার নয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِنَّ الرِّفْقَ لَا يَكُونُ فِي شَيْءٍ إِلَّا زَانَهُ، وَلَا يُنْزَعُ مِنْ شَيْءٍ إِلَّا شَانَهُ» "নম্রতা যে জিনিসে থাকে, তা তাকে সৌন্দর্যমণ্ডিত করে; আর যে জিনিস থেকে তা চলে যায়, তা কলুষিত হয়।" — সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৫৯৪
পরামর্শ:
- সিগারেটের শারীরিক ও আর্থিক ক্ষতি (ক্যান্সার, হৃদরোগ, অপচয়) তুলে ধরুন।
- ধর্মীয় দিক—গুনাহ, খুশু নষ্ট, মুখের দুর্গন্ধ—নরমভাবে বলুন।
- দুআ করুন তার হেদায়াতের জন্য; নিজে আদর্শ দেখান।
- প্রয়োজনে ধূমপান ছাড়ার চিকিৎসা/পরামর্শ নিতে উৎসাহিত করুন।
- তাকে জোর করে বাধা দেবেন না—এতে সম্পর্কের ক্ষতি হতে পারে; বরং ভালোবাসার মাধ্যমে প্রভাবিত করুন।
মূল কথা: সিগারেট গুনাহ, কিন্তু নামায বাতিলকারী বা ৪০ দিনের ইবাদত নষ্টকারী কোনো সহীহ দলিল নেই। স্বামীকে ভালোবাসা ও হিকমতের সঙ্গে সিগারেট ছাড়তে উৎসাহিত করুন—এটাই ইসলামের নির্দেশ।
তথ্যসূত্র:
- সূরা আল-আরাফ: ১৫৭; সূরা আল-বাকারা: ১৯৫; সূরা আল-ইসরা: ২৬
- সহীহ বুখারী: ৮৫৩; সহীহ মুসলিম: ৫৬৪, ২৫৯৪
- সুনানে তিরমিযী: ১৮৬৩; সুনানে ইবনে মাজাহ: ৩৩৭৭
- ইবনে আবিদীন, «রাদ্দুল মুহতার», খ. ৬
- মুফতী মুহাম্মদ শফী, «ইমদাদুল ফাতাওয়া», খ. ৩
- মুফতী তাকী উসমানী, «ফাতাওয়া উসমানী»
- «ফাতাওয়া আলমগীরী», কিতাবুল কারাহিয়্যাহ
- ইমাম নববী, «শরহু মুসলিম» ও «আল-মাজমূ'»