নেফাসের ৪০ দিন পর রক্ত আসলে নামাজের হুকুম, অন্যের সন্তানকে দুধ পান করানোর বিধান, মাগরিবের কতক্ষণ পর বাচ্চাদের বাইরে বের করা যাবে?

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 8045
Questioner: Arfina Sheikh
Question Asked: 06 Nov 2026, 08:02 AM
Reviewed & Published: 06 Nov 2026, 02:32 PM
Views: 38
Tokens: 5,587
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ। আমার কয়েকটা বিষয়ে জানার ছিল।
১) নেফাসের ৪০ দিন পরেও সাদাস্রাব না আসলে ব্লাড /ভিন্ন কালারের স্রাব আসলে টানা নামাজ পড়ে যেতে হবে কি?? কারও যদি এ অবস্থা ৫/৭ মাস ধরে থাকে তাহলে ৫/৭ মাস একটানা নামাজ পড়বে নাকি দুই হায়েজের মাঝে ১৫ দিনের যে গ্যাপ থাকে সেই হিসেব করবে??

২) কোন অবস্থায় নিজ বাচ্চা ব্যতীত অন্যের বাচ্চাকে দুধ পান করানো যাবে??
৩) জরুরত ব্যতীত বাচ্চার বাবা-মায়ের অনুমতি না নিয়ে কোন বাচ্চাকে দুধ খাওয়ালে গুন্নাহ হবে কি?? এবং ১ বার পান করালেও কি দুধ মাতা হবে??
৪)জরুরত ব্যতীত অন্যের বাচ্চাকে দুধ খাওয়ানো হলে এতে কি নিজের বাচ্চার হক নষ্ট হবে??
৫)স্ত্রী বর্তমান থাকতে স্বামি বাচ্চাকে অন্য মহিলার দুধ পান করানোর জন্য অনুমতি দিতে পারবেন কি, এখানে স্ত্রীর অনুমতি নিতে হবে কি??
৬) মাগরিবের কতক্ষণ পরে বাচ্চাদের বাইরে বের করানো যাবে??

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

সমাধান

আপনার জিজ্ঞাসিত ছয়টি ফিকহী মাসআলার ফিকহে হানাফী ও প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ সুনির্দিষ্ট ও নির্ভরযোগ্য শরঈ ফয়সালা নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:


১. ১ম প্রশ্নের উত্তর: নেফাসের ৪০ দিন পর অনবরত রক্ত/স্রাব আসলে নামাযের নিয়ম

  • ৪০ দিনের পরের স্রাবের হুকুম: ফিকহে হানাফী অনুযায়ী নেফাসের সর্বোচ্চ সময়সীমা হলো ৪০ দিন। ৪০ দিন অতিবাহিত হওয়ার পরও যদি সাদা স্রাব না এসে রক্ত বা হলুদ/ঘোলা/ভিন্ন কালারের স্রাব নির্গত হতে থাকে, তবে ৪০ দিনের পরবর্তী সময়টুকু 'নেফাস' হিসেবে গণ্য হবে না; বরং তা 'ইস্তিহাজা' (অসুস্থতাজনিত রক্তপাত) হিসেবে গণ্য হবে।
  • নামাযের বিধান: ৪০ দিন পূর্ণ হওয়া মাত্রই গোসল করে পবিত্র হবেন এবং ইস্তিহাজাগ্রস্ত মাযুর হিসেবে প্রতি ওয়াক্তের নামায নিয়মিত আদায় করা শুরু করবেন।
  • ৫-৭ মাস অনবরত রক্ত আসলে গণনা পদ্ধতি: যদি কারও অনবরত রক্ত আসার এই অবস্থা দীর্ঘ ৫-৭ মাস ধরে চলতে থাকে, তবে সে টানা নামায পড়ে যাবে না এবং টানা নামায ছেড়েও দেবে না; বরং সে তার 'আদাত' (পূর্বের স্বাভাবিক অভ্যাস) অনুযায়ী হায়েয ও পবিত্রতা (তুহুর) হিসাব করবে: ১. প্রথম প্রসবকারী (মুবতাদিআহ) হলে: নেফাসের ৪০ দিন পর থেকে প্রতি মাসে তার স্বভাবজাত হায়েযের দিনগুলো (হানাফী ফিকহে সর্বনিম্ন ৩ দিন থেকে সর্বোচ্চ ১০ দিন, সাধারণ পরিমাণ ১০ দিন) হায়েয গণ্য করবে এবং দুই হায়েজের মধ্যবর্তী সর্বনিম্ন ১৫ দিনের বিরতিকে 'তুহুর' (পবিত্রতা) হিসাব করবে। ২. পূর্বের অভ্যাস (আদাত) থাকলে: যদি সন্তান হওয়ার পূর্বে তার নিয়মিত হায়েয ও পবিত্রতার নির্দিষ্ট অভ্যাস থাকে (যেমন: প্রতি মাসে ৭ দিন হায়েয ও ২৩ দিন পবিত্রতা), তবে সে প্রতি মাসে ৭ দিন হায়েয ধরে নামায বন্ধ রাখবে এবং বাকি ২৩ দিন ইস্তিহাজা গণ্য করে নিয়মিত অযু করে নামায আদায় করে যাবে।

২. ২য় প্রশ্নের উত্তর: কোন অবস্থায় অন্যের বাচ্চাকে দুধ পান করানো যাবে?

  • মূল শরঈ বিধান: নিজ সন্তান ছাড়া অন্য কোনো শিশুকে প্রয়োজনবশত বা বাচ্চার কল্যাণে দুধ পান করানো শরীআতের দৃষ্টিতে মৌলিকভাবে সম্পূর্ণ বৈধ ও জায়েয।
  • প্রয়োজনের সুরত: বাচ্চার মা অসুস্থ হলে, মায়ের বুকে পর্যাপ্ত দুধ না থাকলে, কিংবা বাচ্চা লালন-পালনের সুবিধার্থে উভয় পরিবারের সম্মতিক্রমে অন্য মহিলাকে দিয়ে দুধ পান করানো যায়।
  • মনে রাখার বিষয়: অন্যের বাচ্চাকে দুধ পান করালে তাদের মাঝে 'হুরমতে রেযাআত' (দুধ-সম্পর্কীয় বৈবাহিক নিষেধাজ্ঞা) সাব্যস্ত হয় এবং দুধ-মা ও দুধ-ভাইবোনের পবিত্র সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায়।

৩. ৩য় প্রশ্নের উত্তর: অনুমতি ছাড়া দুধ পান করানো এবং ১ বার পানে দুধ-মা হওয়ার বিধান

  • মা-বাবার অনুমতি ছাড়া পান করানো: কোনো শরঈ প্রয়োজন বা জরুরত ছাড়া বাচ্চার পিতা-মাতার অনুমতি ব্যতিরেকে অনর্থক কোনো শিশুকে দুধ পান করানো অনুচিত ও অপছন্দনীয় কাজ। কারণ এর ফলে বাচ্চার বংশীয় পরিচয় ও ভবিষ্যতে বিবাহ-শাদীর ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে।
  • ১ বার পান করালেও দুধ-মা হবে কিনা: ফিকহে হানাফীর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, দুধ পানের শরঈ মেয়াদের ভেতরে (দুই/আড়াই বছরের মধ্যে) কোনো শিশু যদি অন্য মহিলার স্তন থেকে মাত্র এক বার বা এক ফোঁটা পরিমাণ দুধও পান করে এবং তা শিশুর পেটে পৌঁছায়, তবে তাতেই 'হুরমতে রেযাআত' সাব্যস্ত হয়ে যায় এবং ঐ মহিলা শিশুটির শরঈ 'দুধ-মা' (رضاعي) হয়ে যান।

৪. ৪থ প্রশ্নের উত্তর: অন্যের বাচ্চাকে দুধ খাওয়ালে নিজ বাচ্চার হক নষ্ট হবে কিনা?

  • হক নষ্ট হওয়ার পরিমাপ: মায়ের নিজের বুকের দুধের ওপর প্রাথমিক হক হলো তাঁর নিজ সন্তানের। মায়ের বুকে যদি সীমিত দুধ থাকে যা নিজ বাচ্চার জন্যই পর্যাপ্ত নয়, এমন অবস্থায় বিনা প্রয়োজনে অন্যের বাচ্চাকে দুধ পান করিয়ে নিজ বাচ্চাকে অভুক্ত বা কষ্টে রাখলে অবশ্যই নিজ বাচ্চার হক নষ্ট হবে এবং তা গোনাহের কাজ হবে।
  • হক নষ্ট না হওয়ার সুরত: তবে যদি মায়ের স্তনে প্রচুর দুধ থাকে এবং নিজ সন্তানের পুষ্টি ও প্রয়োজন পূর্ণ হওয়ার পরও অতিরিক্ত দুধ অবশিষ্ট থাকে, তবে অন্য কোনো অভাবী বা ক্ষুধার্থ শিশুকে দুধ পান করালে নিজ সন্তানের হক নষ্ট হবে না; বরং তা সওয়াবের কাজ হবে।

৫. ৫মে প্রশ্নের উত্তর: অন্য মহিলার দুধ পান করানোর অনুমতিতে স্বামী ও স্ত্রীর ভূমিকা

  • স্বামীর অধিকার ও দায়িত্ব: ফিকহে হানাফী অনুযায়ী সন্তানের ভরণ-পোষণ, স্বাস্থ্য ও দুধ পানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের প্রাথমিক শরঈ দায়িত্ব পিতার ওপর ন্যস্ত। স্ত্রী যদি অসুস্থতার কারণে বা কোনো কারণে দুধ পান করাতে অপারগ হন বা অসম্মতি জানান, তবে স্বামী বাচ্চার সুরক্ষায় অন্য কোনো মহিলাকে (দুধ-মা) দিয়ে দুধ পান করানোর সিদ্ধান্ত বা অনুমতি দিতে পারে।
  • স্ত্রীর অনুমতি ও সম্মতি: স্বামীর জন্য বাচ্চার দুধ-মা নির্ধারণের একক আইনি ক্ষমতা থাকলেও দাম্পত্য সুসম্পর্ক ও পারিবারিক শান্তির স্বার্থে স্ত্রীর সাথে পরামর্শ করা এবং স্ত্রীকে বুঝিয়ে সম্মতি নেওয়া সুন্নাত ও বাঞ্ছনীয়।

৬. ৬ষ্ঠ প্রশ্নের উত্তর: মাগরিবের কতক্ষণ পর বাচ্চাদের বাইরে বের করানো যাবে?

  • হাদীসের নির্দেশ: সহীহ হাদীস শরীফে বর্ণিত রয়েছে, মাগরিবের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার সময় (সূর্যাস্তের প্রাক্কালে) জিন ও শয়তানের আনাগোনা বৃদ্ধি পায় এবং তারা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়ে রাসুলুল্লাহ ﷺ নির্দেশ দিয়েছেন যে, মাগরিবের সময় হলে বাচ্চাদের ঘরের ভেতরে আটকে রাখো ।
  • সময়সীমা: মাগরিবের শুরুর প্রারম্ভিক সময়টুকু—অর্থাৎ মাগরিবের আজানের পর থেকে আনুমানিক ১৫ থেকে ৩০ মিনিট সময় (যতক্ষণ না সন্ধ্যার গাঢ় অন্ধকার চেপে বসে এবং মাগরিবের প্রাথমিক সময় পার হয়)—বাচ্চাদের বাইরে বের হতে দেওয়া উচিত নয়। মাগরিবের এই প্রাথমিক সময়টুকু অতিক্রান্ত হয়ে গেলে বাচ্চাদের প্রয়োজনে বাইরে বের হতে দেওয়ায় কোনো শরঈ বাধা নেই।

সংযুক্ত কিতাবসমূহের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):

  • নূরুল ঈযাহ (বাংলা সংস্করণ):

    • পৃষ্ঠা: ৪৭ (নূরুল ঈযাহ পৃষ্ঠা ৪৭) (পরিচ্ছেদ: নেফাস ও ইস্তিহাজার বিবরণ — 'নেফাসের সর্বোচ্চ সময় ৪০ দিন হওয়া এবং ৪০ দিনের পরের স্রাব ইস্তিহাজা গণ্য হওয়া')।
  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড - বাংলা সংস্করণ):

    • পৃষ্ঠা: ১১৪, ১১৫ (হিন্দিয়াহ ১/৩৭, ৩৮) (অধ্যায়: কিতাবুত তাহারাত — 'ইস্তিহাজার আহকাম ও নিয়মিত নামায আদায়ের বাধ্যবাধকতা')।
    • পৃষ্ঠা: ১২০, ১২১ (হিন্দিয়াহ ১/৪০, ৪১) (অধ্যায়: কিতাবুত তাহারাত — 'অনবরত ইস্তিহাজা আসার সুরতে পূর্বের আদাত ও অভ্যাস অনুযায়ী হায়েয-পবিত্রতা গণনা করা')।
  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (২য় খণ্ড - বাংলা সংস্করণ):

    • পৃষ্ঠা: ২২০, ২২১ (হিন্দিয়াহ ১/৫৪৩, ৫৪৪) (অধ্যায়: কিতাবুর রেযাআত — 'দুধ পানের বয়সসীমা, ১ বার বা সামান্য পানেও হুরমতে রেযাআত সাব্যস্ত হওয়া এবং দুধ-মায়ের শরঈ আহকাম')।
    • পৃষ্ঠা: ২২৩, ২২৭ (হিন্দিয়াহ ১/৫৪৭, ৫৫০) (অধ্যায়: কিতাবুর রেযাআত — 'অনুমতি ছাড়া দুধ পান করানো এবং দুধ পানের সুনির্দিষ্ট ফিকহী মাসায়েিল')।
  • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):

    • পৃষ্ঠা: ২২৮, ২২৯ (দরসুল ফিকহ ১/২২৮, ২২৯) (অধ্যায়: 'দুধ পানের সূত্রে মাহরাম ও হুরমতে রেযাআত সাব্যস্ত হওয়ার ফিকহী নীতিমালা') ।
    • পৃষ্ঠা: ২৪১, ২৪২ (দরসুল ফিকহ ১/২৪১, ২৪২) (অধ্যায়: 'সন্তানের দুধ পানের দায়িত্ব, পিতার ভূমিকা ও মায়ের অধিকার সংক্রান্ত আলোচনা')।
    • পৃষ্ঠা: ৪১০ (দরসুল ফিকহ ১/৪১০) (অধ্যায়: 'মাগরিবের সময় শয়তান ছড়িয়ে পড়া এবং শিশুদের ঘরে রাখার হাদীস সংবলিত নির্দেশ')।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (২০শ খণ্ড):

    • পৃষ্ঠা: ৩০, ৩১, ৩৩ (মাহমুদিয়া ২০/৩০, ৩১, ৩৩) (অধ্যায়: বাব মা ইউতাল্লাকু বিল জিন্নাত — 'মাগরিবের সময় জিন ও শয়তানের প্রভাব এবং শিশুদের সুরক্ষার শরঈ আমল') ।

আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.