অসুস্থতা নিয়ে হতাশা ও মৃত্যু কামনা করা কি গুনাহ?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 8026
Questioner: Didar Hossain Akondo
Question Asked: 05 Nov 2026, 11:26 PM
Reviewed & Published: 05 Nov 2026, 11:41 PM
Views: 69
Tokens: 8,270
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম প্রিয় শায়েখ।
জন্ম,মৃত্যু,হায়াত,রিজিক,বিয়ে সবকিছুই আল্লাহর হাতে এটা আমি বিশ্বাস করি।।কিন্তু আমার অনেক ছোটোবেলা থেকেই ঘনঘন অসুখ হয়,যেকোনো অসুখ হলেই সেটা বড় পর্যায়ে চলে যায়।এখন বালেগ হওয়ার পরে অসুখ হলেই শুধু হতাশ হয়ে পড়তাম,খুব তিক্ত মন নিয়েই বলতাম আল্লাহ শুধু আমাকেই অসুখ দেয়,দুনিয়াতে তো আমার চাইতেও খারাপ লোক আছে।ইদানিং অসুস্থতা শুধু একটার পর একটা লেগেই থাকে।তাই আমি হতাশ হয়ে শরীর ছেড়ে দিয়েছি,জীবনের আশা ছেড়ে দিয়েছি।।।মনে মনে শুধু ভাবনা করি এবং মানুষকে বলে বেড়াই”” আমি ছোটো থেকেই অসুস্থ থাকি,আমি এই জীবনে যে পরিমাণ ওষুধ এবং এন্টিবায়োটিক খেয়েছি একটা মানুষ ততোটুুকু ভাতও খাইনাই,আমি মনে হয় ২০-২৫ বছরের বেশি বাঁচবোনা কারণ জীবনে যে পরিমাণ অসুখ হয়েছে এভাবে অসুখ কি আর কারো হয়,আমিতো মরেই যাবো,এত কিছু করে লাভ কি””।।বাড়ি থেকে ক্যারিয়ার এবং বিয়ের কথা বললে আমি উত্তরে বলি””আমিতো মরেই যাবো,জীবনে অনেক অসুখ খেয়েছি,অহেতুক বিয়েসাদী করে একটা মেয়ে মানুষকে কষ্ট দেওয়ার দরকার কি? আমার অসুস্থতার কথা শুনলে কি ভালো ফ্যামিলির মেয়ে বিয়ে করবে,তার চেয়ে চিরকুমার থেকে মরে যাই,,,আমার মনে শুধু এখন এরকম ভাবনা ঘুরপাক খায়””””আমার প্রশ্ন হচ্ছে আমি যে নিজে থেকেই আমার ভবিষ্যৎ এভাবে বলতেছি,আমিতো হতাশ হয়েই বলতেছি,কিন্তু আমি সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষের মতোই চলাচল করতে পারতাছি।।এমতাবস্থায় আমার করণীয় কি একটু বলবেন??

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

প্রিয় ভাই, আপনার প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এবং আপনার কষ্টগুলোও বাস্তব। আল্লাহ তাআলা আপনার সব কষ্টের কাফফারা দিন এবং সুস্থতা ও প্রশান্তি দান করুন। আমিন।

নিচে শরীয়াহর দৃষ্টিতে বিস্তারিত উত্তর দিচ্ছি:


১. অসুস্থতা ও ভাগ্য নিয়ে চিন্তা করা কি গুনাহ?

সংক্ষেপে: হ্যাঁ, আপনার এই ধরনের চিন্তা ও কথা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। কারণ এটি কয়েকটি মারাত্মক রোগের লক্ষণ:

(ক) আল্লাহর ফয়সালা নিয়ে অসন্তুষ্টি (سخط بالقضاء)

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

وَعَسَىٰ أَن تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَّكُمْ ۖ وَعَسَىٰ أَن تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَّكُمْ ۗ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنتُمْ لَا تَعْلَمُونَ "আর হতে পারে তোমরা কোনো জিনিসকে অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর; আর হতে পারে তোমরা কোনো জিনিসকে ভালোবাসছ, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আল্লাহ জানেন, তোমরা জানো না।" (সূরা বাকারা: ২১৬)

(খ) আল্লাহর প্রতি সুধারণা না রাখা (سوء الظن بالله)

হাদিসে কুদসিতে আল্লাহ তাআলা বলেন:

أَنَا عِنْدَ ظَنِّ عَبْدِي بِي "আমি আমার বান্দার আমার প্রতি ধারণার নিকটেই থাকি।" (সহিহ বুখারি: ৭৪০৫, সহিহ মুসলিম: ২৬৭৫)

আপনি যখন বলেন "আল্লাহ শুধু আমাকেই অসুখ দেন" — এটি আল্লাহর প্রতি সুধারণার পরিপন্থী। অথচ আল্লাহ তাআলা বলেন:

مَا أَصَابَكَ مِنْ حَسَنَةٍ فَمِنَ اللَّهِ ۖ وَمَا أَصَابَكَ مِن سَيِّئَةٍ فَمِن نَّفْسِكَ "তোমার কাছে যে কল্যাণ আসে তা আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর যে বিপদ আসে তা তোমার নিজের কারণে।" (সূরা নিসা: ৭৯)

(গ) মৃত্যু কামনা করা (تمني الموت)

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

لَا يَتَمَنَّيَنَّ أَحَدٌ مِنْكُمُ الْمَوْتَ لِضُرٍّ نَزَلَ بِهِ، فَإِنْ كَانَ لَا بُدَّ فَاعِلًا فَلْيَقُلْ: اللَّهُمَّ أَحْيِنِي مَا كَانَتِ الْحَيَاةُ خَيْرًا لِي، وَتَوَفَّنِي مَا كَانَتِ الْوَفَاةُ خَيْرًا لِي "তোমাদের কেউ যেন বিপদে পড়ে মৃত্যু কামনা না করে। যদি কামনা করতেই হয়, তবে বলবে: 'হে আল্লাহ! যতদিন জীবন আমার জন্য কল্যাণকর, ততদিন আমাকে জীবিত রাখুন; আর যখন মৃত্যু আমার জন্য কল্যাণকর, তখন আমাকে মৃত্যু দিন।'" (সহিহ বুখারি: ৫৬৭১, সহিহ মুসলিম: ২৬৮০)

(ঘ) ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিশ্চিতভাবে বলা (যা গায়েবের জ্ঞান)

"আমি ২০-২৫ বছরের বেশি বাঁচব না" — এটি গায়েবের খবর, যা কেবল আল্লাহ জানেন। এভাবে নিশ্চিতভাবে বলা শরীয়াহতে নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ مَّاذَا تَكْسِبُ غَدًا ۖ وَمَا تَدْرِي نَفْسٌ بِأَيِّ أَرْضٍ تَمُوتُ "কোনো প্রাণী জানে না আগামীকাল সে কী করবে, আর কোনো প্রাণী জানে না কোন ভূমিতে সে মৃত্যুবরণ করবে।" (সূরা লুকমান: ৩৪)


২. অসুস্থতার ফজিলত ও হিকমত

আপনি ভাবছেন অসুস্থতা শুধু শাস্তি — কিন্তু হাদিসে অসুস্থতাকে গুনাহ মোচন ও দরজা বাড়ানোর মাধ্যম বলা হয়েছে:

مَا يُصِيبُ الْمُسْلِمَ مِنْ نَصَبٍ وَلَا وَصَبٍ وَلَا هَمٍّ وَلَا حُزْنٍ وَلَا أَذًى وَلَا غَمٍّ، حَتَّى الشَّوْكَةِ يُشَاكُهَا، إِلَّا كَفَّرَ اللَّهُ بِهَا مِنْ خَطَايَاهُ "মুসলিমকে যে কষ্ট, রোগ, দুশ্চিন্তা, দুঃখ, কষ্ট বা পেরেশানি পৌঁছে — এমনকি যে কাঁটা ফুটে — আল্লাহ তা দিয়ে তার গুনাহসমূহ মিটিয়ে দেন।" (সহিহ বুখারি: ৫৬৪১, সহিহ মুসলিম: ২৫৭৩)

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন যে, রোগ-বালাই মুমিনের জন্য গুনাহ মোচনের মাধ্যম, শর্ত হলো ধৈর্য ধারণ করা। (রাদ্দুল মুহতার: ২/২৩০ প্রসঙ্গ)


৩. আপনার করণীয় (শরীয়াহর নির্দেশনা)

(ক) তাওবা করুন

আপনি যে কথাগুলো বলেছেন — আল্লাহর ফয়সালা নিয়ে অসন্তুষ্টি, মৃত্যু কামনা, গায়েবের কথা বলা — এসব থেকে আন্তরিক তাওবা করুন। আল্লাহ তাআলা বলেন:

إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ "নিশ্চয়ই আল্লাহ তাওবাকারীদের ভালোবাসেন।" (সূরা বাকারা: ২২২)

(খ) চিকিৎসা চালিয়ে যান — এটি সুন্নাহ

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

تَدَاوَوْا فَإِنَّ اللَّهَ لَمْ يَضَعْ دَاءً إِلَّا وَضَعَ لَهُ دَوَاءً "চিকিৎসা করো; কেননা আল্লাহ কোনো রোগ দেননি যার ঔষধ দেননি।" (সুনানে আবু দাউদ: ৩৮৫৫, সুনানে তিরমিজি: ২০৩৮)

আপনি বলেছেন আপনি স্বাভাবিক মানুষের মতো চলাচল করতে পারেন — এটি আল্লাহর বড় নিয়ামত। এটাকে কাজে লাগিয়ে একজন ভালো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ নিন। ইমাম তাহাবি (রহ.) «শারহু মাআনিল আসার»-এ চিকিৎসার বৈধতা সম্পর্কে বর্ণনা করেছেন।

(গ) দুআ ও যিকির বাড়ান

বিশেষ করে এই দুআটি পড়ুন:

اللَّهُمَّ أَحْيِنِي مَا كَانَتِ الْحَيَاةُ خَيْرًا لِي، وَتَوَفَّنِي مَا كَانَتِ الْوَفَاةُ خَيْرًا لِي

এবং রোগ-মুক্তির জন্য:

اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي بَدَنِي، اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي سَمْعِي، اللَّهُمَّ عَافِنِي فِي بَصَرِي، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ (সুনানে আবু দাউদ: ৫০৯০)

(ঘ) বিয়ে নিয়ে ভাবনা

আপনার এই ভাবনা যে "অসুস্থ মানুষ বিয়ে করলে মেয়েটি কষ্ট পাবে" — এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা। শরীয়াহতে বিয়ে হলো সুন্নাহ ও ইবাদত। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَأَنكِحُوا الْأَيَامَىٰ مِنكُمْ "তোমাদের মধ্যে যারা অবিবাহিত তাদের বিয়ে দাও।" (সূরা নূর: ৩২)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাবে বিয়ে করা সামর্থ্যবানের জন্য সুন্নাহ মুয়াক্কাদা। অসুস্থতা বিয়ের বাধা নয় — বরং অনেক সময় বিয়ে মানসিক প্রশান্তি ও সুস্থতার কারণ হয়। আপনি সৎ নিয়তে বিয়ের চেষ্টা করুন, আল্লাহ বরকত দেবেন। বিয়ের আগে সততার সাথে আপনার শারীরিক অবস্থা জানিয়ে দেওয়া উত্তম — এতে কোনো প্রতারণা থাকবে না।

(ঙ) হতাশা ও নেতিবাচক কথা বলা বন্ধ করুন

আপনি মানুষকে বলে বেড়ান "আমি মরেই যাব" — এটি শুধু নিজের ঈমান-আমল নষ্ট করে না, শ্রবণকারীর মনেও নেতিবাচকতা ছড়ায়। ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ উল্লেখ করেছেন যে, মুখে সর্বদা কল্যাণের কথা বলা উচিত, অশুভ কথা ও মৃত্যু কামনা করা উচিত নয়।

(চ) মানসিক স্বাস্থ্যের চিকিৎসা নিন

আপনার বর্ণনায় দীর্ঘমেয়াদি দুশ্চিন্তা, হতাশা ও নেতিবাচক চিন্তার চক্র (rumination) স্পষ্ট। এটি একটি চিকিৎসাযোগ্য অবস্থা। একজন ভালো চিকিৎসক বা কাউন্সেলরের পরামর্শ নিন — এটি শরীয়াহবিরোধী নয়, বরং চিকিৎসা গ্রহণের নির্দেশের অন্তর্ভুক্ত।


৪. সারসংক্ষেপ

| বিষয় | বিধান | |---|---| | আল্লাহর ফয়সালা নিয়ে অসন্তুষ্টি | গুনাহ — তাওবা আবশ্যক | | মৃত্যু কামনা করা | নিষিদ্ধ — বরং "যতদিন কল্যাণকর ততদিন জীবিত রাখো" দুআ পড়ুন | | "আমি ২০-২৫ বছরের বেশি বাঁচব না" বলা | গায়েবের দাবি — নিষিদ্ধ | | চিকিৎসা গ্রহণ | সুন্নাহ ও নির্দেশিত | | বিয়ে করা | সুন্নাহ — অসুস্থতা বাধা নয় | | হতাশা ও নেতিবাচক কথা | পরিহার করুন, দুআ ও যিকিরে মনোযোগ দিন |


শেষ কথা: ভাই, আপনি যে কষ্টে আছেন তা আল্লাহ জানেন এবং তিনি এর প্রতিদান দেবেন। কিন্তু শয়তান আপনার মাধ্যমে আপনাকে ধ্বংস করতে চায় — হতাশা তার সবচেয়ে বড় হাতিয়ার। আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَلَا تَيْأَسُوا مِن رَّوْحِ اللَّهِ ۖ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ "আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না; নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত থেকে কাফির সম্প্রদায় ছাড়া কেউ নিরাশ হয় না।" (সূরা ইউসুফ: ৮৭)

আল্লাহ তাআলা আপনাকে শিফা দান করুন, ধৈর্য দান করুন এবং আপনার সব দুশ্চিন্তা দূর করুন। আমিন।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.