উমরাহর নিয়ত কখন ও কোথায় করতে হবে? মিকাতের আগে ইহরাম ও নিয়ত করা কি সহিহ? মিকাতে পুনরায় নিয়ত, তালবিয়া কখন পর্যন্ত পড়তে হয় এবং মিকাতের সীমানা কতটুকু?
Hajj and Umrah · Hanafi
Question
১. সম্প্রতি আমি উমরাহ করে এসেছি। প্রথমে মদিনায় যাই পরে সেখান থেকে মক্কার জন্য রওনা হই। মক্কায় রওনা করার দিন মদিনা হোটেল থেকে ইহরাম বেধে নিই এবং সাবধানতার খাতিরে আগেই উমরাহর নিয়ত করে নিই। এতে কি আমার নিয়ত সহিহ হয়েছে?
২. যখন মিকাতে পৌছাই তখন আবারও মনে মনে নিয়ত করি এবং তালবিয়া পাঠ করেছি কয়েকবার। কিন্তু আমার সন্দেহ হচ্ছে আমি নিয়ত করেছি কিনা মিকাতে পৌছানোর পর। এতে কি আমার উপর কোনো দম ওয়াজিব হবে? কিন্তু আমার মনে আছে আমি নিয়ত করেছি মিকাতে এবং মদিনা হোটেল ইহরাম বাধার সময়ও করেছি।
৩. উমরাহর নিয়ত করার পর যে তালবিয়া পাঠ করতে হয় সেটা কি মক্কায় পৌছানো পর্যন্ত করতে হয় নাকি মিকাত অতিক্রম করলেই শেষ ?
৪. মক্কা পর্যন্ত মিকাতের সীমানা কতটুক যে এর মধ্যে নিয়ত করতে হবে?
জাযাকাল্লাহ
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর: আপনার উমরাহ ইনশাআল্লাহ সহিহ হয়েছে। মিকাতের আগে ইহরাম বেঁধে নিয়ত করে নেওয়া বৈধ ও যথেষ্ট; মিকাতে পৌঁছে পুনরায় নিয়ত করা বা তালবিয়া পড়া সুন্নত/মুস্তাহাব হিসেবে গণ্য হবে, ফরজ নয়। যেহেতু আপনি মিকাতের আগেই ইহরাম ও নিয়ত করেছেন এবং পরে মিকাতেও নিয়ত ও তালবিয়া পড়েছেন, সেহেতু সন্দেহের কারণে কোনো দম ওয়াজিব হবে না। তালবিয়া মিকাত অতিক্রমের পর থেকে শুরু করে মক্কায় (উমরাহর ক্ষেত্রে বায়তুল্লাহ দেখার সময় পর্যন্ত) পড়া সুন্নত; মিকাত অতিক্রম করলেই তা শেষ হয়ে যায় না। আর মিকাতের সীমানা নির্দিষ্ট কোনো দূরত্ব নয়—মিকাত হলো নির্ধারিত স্থানসমূহ (যুল-হুলাইফা, রাবায, ইয়ালামলাম, কারনুল-মানাযিল, যাতু ইরক ইত্যাদি) এবং সেগুলো অতিক্রম করার আগেই ইহরাম ও নিয়ত করতে হবে।
বিস্তারিত উত্তর
১. মদিনা হোটেল থেকে ইহরাম বেঁধে আগেই উমরাহর নিয়ত করা সহিহ হয়েছে কি?
হ্যাঁ, সহিহ হয়েছে। উমরাহর জন্য ইহরাম ও নিয়তের সময়সীমা হলো মিকাত অতিক্রম করার আগে। মিকাতের আগে যে কোনো স্থান থেকে (এমনকি মদিনার হোটেল থেকেও) ইহরাম বেঁধে নিয়ত করা শরীয়তসম্মত। ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, আফাকি (মিকাতের বাইরের) ব্যক্তি মিকাতের আগেই ইহরাম বাঁধলে তা সহিহ; বরং এটি অধিক সতর্কতামূলক ও নিরাপদ। ইমাম আবু ইউসুফ (রহ.)-এর মতে মিকাতের আগে ইহরাম বাঁধা মাকরুহ, তবে সংখ্যাগরিষ্ঠ হানাফি ফুকাহার রায় হলো এটি জায়েয ও সহিহ। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হজ, ইহরাম অধ্যায়; ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল মানাসিক)
সুতরাং আপনার নিয়ত ও ইহরাম সহিহ, এবং এতে কোনো দোষ নেই।
২. মিকাতে পৌঁছে পুনরায় নিয়ত করা ও তালবিয়া পড়া; মিকাতের পর নিয়তের সন্দেহে দম ওয়াজিব হবে কি?
দম ওয়াজিব হবে না। কারণ:
- আপনি মিকাতের আগেই ইহরাম বেঁধে নিয়ত করেছেন—এটাই মূল ও যথেষ্ট নিয়ত।
- মিকাতে পৌঁছে পুনরায় নিয়ত করা ও তালবিয়া পড়া ফরজ নয়; এটি সুন্নত/মুস্তাহাব। তাই মিকাতের পর নিয়ত নিয়ে সন্দেহ হলে কোনো ক্ষতি নেই।
- দম ওয়াজিব হয় তখন, যখন কেউ মিকাত অতিক্রম করে ইহরাম ছাড়া চলে যায় এবং পরে ইহরাম বাঁধে (তামাত্তু ছাড়া অন্য ক্ষেত্রে)। আপনার ক্ষেত্রে তা হয়নি, কারণ আপনি মিকাতের আগেই ইহরাম ও নিয়ত সম্পন্ন করেছেন।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতারে উল্লেখ করেন, ইহরামের মূল রুকন হলো নিয়ত; আর তা মিকাতের আগে হয়ে গেলে পরে পুনরায় নিয়তের প্রয়োজন নেই। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হজ; ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ২, হজ অধ্যায়)
তবে হ্যাঁ, যদি কেউ মিকাত অতিক্রম করে ইহরাম ছাড়া চলে যায়, তখন ফিরে এসে মিকাতে ইহরাম বাঁধা ওয়াজিব; না ফিরলে দম ওয়াজিব হয়। আপনার বর্ণনায় এমন কিছু নেই।
৩. তালবিয়া কখন পর্যন্ত পড়তে হয়—মিকাত অতিক্রম করলেই শেষ, নাকি মক্কায় পৌঁছানো পর্যন্ত?
তালবিয়া মিকাত অতিক্রমের পর থেকে শুরু করে উমরাহর ক্ষেত্রে মক্কায় পৌঁছে বায়তুল্লাহ দেখার সময় পর্যন্ত (অর্থাৎ তাওয়াফ শুরু করার আগ পর্যন্ত) পড়া সুন্নত। হজের ক্ষেত্রে তালবিয়া জামরায় কঙ্কর নিক্ষেপ শুরু করার আগ পর্যন্ত চলে। সুতরাং মিকাত অতিক্রম করলেই তালবিয়া শেষ হয়ে যায় না; বরং মক্কায় পৌঁছানো পর্যন্ত (উমরাহর ক্ষেত্রে) পড়তে থাকা সুন্নত।
দলিল: রাসূলুল্লাহ ﷺ মিকাত থেকে তালবিয়া শুরু করে মক্কায় প্রবেশ পর্যন্ত পড়েছেন। (সহিহ বুখারি ও মুসলিম, হজ অধ্যায়; শারহু মাআনিল আসার, কিতাবুল হজ)
ইমাম তাহাবি (রহ.) ও হানাফি ফুকাহা উল্লেখ করেন, উমরাহকারী বায়তুল্লাহ দেখার সময় তালবিয়া বন্ধ করবে। (শারহু মাআনিল আসার; রাদ্দুল মুহতার)
৪. মিকাতের সীমানা কতটুকু—এর মধ্যে নিয়ত করতে হবে?
মিকাতের সীমানা কোনো নির্দিষ্ট দূরত্ব (যেমন কত কিলোমিটার) দ্বারা নির্ধারিত নয়; বরং রাসূলুল্লাহ ﷺ কর্তৃক নির্ধারিত নির্দিষ্ট স্থানসমূহ হলো মিকাত। যেসব দিক থেকে আগমনকারীদের জন্য নির্ধারিত মিকাত:
- যুল-হুলাইফা (মদিনা থেকে আগমনকারীদের জন্য; বর্তমানে আবিয়ার আলি)
- রাবায (উত্তর দিক)
- ইয়ালামলাম (দক্ষিণ দিক/ইয়েমেন)
- কারনুল-মানাযিল (পূর্ব দিক/নজদ)
- যাতু ইরক (ইরাক দিক)
যে ব্যক্তি এসব মিকাতের ভেতরে (মিকাত ও হারামের মধ্যবর্তী এলাকায়) অবস্থান করে, তার জন্য মিকাতের ভেতর থেকেই ইহরাম বাঁধা জায়েয; আর যারা বাইরে থেকে আসে, তাদের জন্য মিকাত অতিক্রমের আগেই ইহরাম ও নিয়ত করতে হবে। মিকাত অতিক্রম করার পর ইহরাম বাঁধলে (ফিরে না এলে) দম ওয়াজিব হয়।
দলিল: ইবনে আব্বাস (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ মদিনাবাসীদের জন্য যুল-হুলাইফা, শামবাসীদের জন্য রাবায, নজদবাসীদের জন্য কারনুল-মানাযিল এবং ইয়েমেনবাসীদের জন্য ইয়ালামলামকে মিকাত নির্ধারণ করেছেন এবং বলেছেন, "এগুলো তাদের জন্য এবং যারা এগুলোর ওপর দিয়ে অতিক্রম করে তাদের জন্য—যারা তাদের বাইরে থেকে হজ ও উমরাহর ইচ্ছা করে।" (সহিহ বুখারি, হাদিস নং ১৫২৪; সহিহ মুসলিম)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, মিকাত হলো নির্ধারিত স্থানসমূহ; এর সীমানা দূরত্ব দ্বারা নয়, স্থান দ্বারা নির্ধারিত। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল হজ)
সারসংক্ষেপ
| প্রশ্ন | উত্তর | |---|---| | ১. মিকাতের আগে নিয়ত | সহিহ ও যথেষ্ট; কোনো দোষ নেই | | ২. মিকাতের পর পুনরায় নিয়তের সন্দেহ | দম ওয়াজিব নয়; মূল নিয়ত আগেই হয়েছে | | ৩. তালবিয়া কখন পর্যন্ত | মিকাত অতিক্রমের পর থেকে মক্কায় পৌঁছানো (উমরাহর ক্ষেত্রে বায়তুল্লাহ দেখা) পর্যন্ত | | ৪. মিকাতের সীমানা | নির্দিষ্ট স্থানসমূহ (যুল-হুলাইফা, রাবায, ইয়ালামলাম, কারনুল-মানাযিল, যাতু ইরক); দূরত্ব নয় |
আল্লাহ তাআলা আপনার উমরাহ কবুল করুন এবং আরও বারবার হজ ও উমরাহর তাওফিক দিন। আমিন।
আল্লাহ ভালো জানেন।