নেফাস ও হায়েজ অবস্থায় কুরআন তিলাওয়াত, কায়দা-কানুন, মাখরাজ-সিফাত, হাদিস, তাফসির ও দুআ পড়া যাবে কি?

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 8016
Questioner: MobashswaraBashar Mahin
Question Asked: 05 Nov 2026, 08:10 PM
Reviewed & Published: 05 Nov 2026, 09:01 PM
Views: 55
Tokens: 4,454
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

প্রশ্ন:আস্সালামুআলাইকুম ,,
আমি নেফাস এর সময় অতিবাহিত করছি এখন এই মুহূর্তে আমি আমার বড়ো মেয়ে কে কায়দা, হাদিস,দুয়া পড়াতে পারবো কিনা আর কুরআনের বিভিন্ন সিফাত-মাখরাজ, কায়দা কানুন এগুলো পড়ার সময় কুরআন থেকে যেই উদাহরন থাকে এগুলো পড়া যাবে কি? বা ভেঙে ভেঙে পড়া যাবে কিনা। অনেক সময় মোবাইল এ তাফসীর পড়তে গেলে ভুলে আয়াত ও পরে ফেলি এখন কোন কোন বিষয় আমার পরিহার করে চলতে হবে?

Answer

নেফাস অবস্থায় কুরআন-হাদিস শিক্ষাদান ও তিলাওয়াত সংক্রান্ত মাসআলা

উত্তর (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী)

بسم الله الرحمن الرحيم الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيد المرسلين، وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد

সংক্ষিপ্ত উত্তর

নেফাস অবস্থায় কুরআনের আয়াত (যা তিলাওয়াতের নিয়তে পড়া হয়) পাঠ করা নিষিদ্ধ। তবে নিম্নোক্ত বিষয়গুলো জায়েয:

  1. কায়দা/কানুন ও মাখরাজ-সিফাতের অনুশীলন — যদি তা পূর্ণ আয়াত হিসেবে না পড়া হয়, বরং শব্দ বা হরফ আলাদা আলাদা করে (ভেঙে ভেঙে) পড়া হয়।
  2. হাদিস, দুআ, তাফসির, ফিকহের কিতাব পাঠ ও শিক্ষাদান — জায়েয।
  3. কুরআনের আয়াতের অর্থ/তাফসির পড়া — জায়েয (আয়াতের আরবি তিলাওয়াত নয়)।
  4. মোবাইলে তাফসির পড়া — জায়েয, তবে স্ক্রিনে কুরআনের আয়াত স্পর্শ করা ও তা পাঠ করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

বিস্তারিত আলোচনা

১. নেফাসে কুরআন তিলাওয়াতের হুকুম

হানাফি মাজহাব অনুযায়ী হায়েজ ও নেফাস অবস্থায় কুরআনের একটি পূর্ণ আয়াত বা তার সমপরিমাণ তিলাওয়াতের নিয়তে পাঠ করা হারাম। দলিল:

«لَا يَمَسُّ الْقُرْآنَ إِلَّا طَاهِرٌ» — সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২২৯; সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১৩১৯ (ইমাম তিরমিজি হাসান বলেছেন)

ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মত হলো: অপবিত্র ব্যক্তি কুরআনের এক আয়াতও তিলাওয়াতের নিয়তে পড়তে পারবে না; তবে এক শব্দ বা আধা আয়াত (যা স্বতন্ত্র আয়াত নয়) পড়া যাবে — বিশেষত যিকর ও দুআ হিসেবে। ([রাদ্দুল মুহতার, ১/২৯৩–২৯৪]; [আল-হিদায়া, কিতাবুত তাহারাত]; [ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৩৮])

২. কায়দা-কানুন ও মাখরাজ-সিফাতের অনুশীলন

মাখরাজ-সিফাতের অনুশীলনে হরফ বা শব্দ আলাদাভাবে উচ্চারণ করা জায়েয — কারণ এটি তিলাওয়াতের নিয়তে পূর্ণ আয়াত পাঠ নয়। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন, হায়েজা নারী কুরআন শিক্ষার জন্য শব্দ ধরে ধরে (ভেঙ্গে ভেঙ্গে কালিমা কালিমা করে) পড়তে পারবে, যদি আয়াতের নিয়ত না হয়। ([রাদ্দুল মুহতার, ১/২৯৪])

তবে পূর্ণ আয়াত একসাথে (মিলিয়ে) পড়া যাবে না — এমনকি শিক্ষার নিয়তেও নয়, কারণ হানাফি মাজহাবে শিক্ষার নিয়তেও পূর্ণ আয়াত তিলাওয়াতের অনুমতি নেই (এটি ইমাম আবু হানিফার প্রসিদ্ধ মত; ইমাম আবু ইউসুফ ও মুহাম্মদ (রহ.)-এর মত ভিন্ন, কিন্তু ফতোয়া আবু হানিফার মতেই)। ([ফাতাওয়া উসমানি, ১/৩৭৮]; [ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/৩৪৭])

প্রয়োগ: কায়দার উদাহরণ যেমন «اَلْحَمْدُ» বা «قُلْ هُوَ» — এগুলো শব্দ হিসেবে ভেঙে পড়া যাবে, কিন্তু «قُلْ هُوَ اللَّهُ أَحَدٌ» পূর্ণ আয়াত হিসেবে একসাথে পড়া যাবে না।

৩. হাদিস, দুআ ও তাফসির

  • হাদিস পাঠ ও শিক্ষাদান: সম্পূর্ণ জায়েয। হাদিসে কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত থাকলে সেটুকু তিলাওয়াতের নিয়ত ছাড়া পড়া যাবে (যেমন তাফসির বা দলিল হিসেবে)। ([রাদ্দুল মুহতার, ১/২৯৪])
  • দুআ: সব দুআ (মাসনুন দুআসহ) পড়া যাবে — কারণ দুআ কুরআন তিলাওয়াতের অন্তর্ভুক্ত নয়। ([ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৩৮])
  • তাফসির: আরবি তাফসিরের কিতাব পড়া যাবে; তবে তাতে কুরআনের আয়াত উদ্ধৃত থাকলে তা অর্থ বোঝার নিয়তে পড়া যাবে, তিলাওয়াতের নিয়তে নয়। ([মাআরিফুল কুরআন, ভূমিকা]; [ফাতাওয়া উসমানি, ১/৩৭৯])

৪. মোবাইলে তাফসির পড়া

মোবাইলে তাফসির পড়া জায়েয। তবে স্ক্রিনে কুরআনের আয়াত দেখা ও তা পাঠ করা থেকে বিরত থাকুন — কারণ হানাফি মাজহাবে অপবিত্র অবস্থায় মুসহাফ স্পর্শ করা তো নিষিদ্ধই, বরং আয়াতের দিকে তাকিয়ে তিলাওয়াত করাও নিষেধ। ([রাদ্দুল মুহতার, ১/২৯৫]; [বাহিশতি জেওর, তাহারাত অধ্যায়])

৫. ভুলে আয়াত পড়ে ফেলা

যদি ভুলে বা অনিচ্ছায় আয়াত পড়ে ফেলেন, গুনাহ হবে না (ভুলে করা মাফ)। তবে সচেতনভাবে পরিহার করতে হবে। ([রাদ্দুল মুহতার, ১/২৯৪]; [ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/৩৪৮])


পরিহার্য বিষয়সমূহ (সারসংক্ষেপ)

| বিষয় | হুকুম | |---|---| | পূর্ণ আয়াত তিলাওয়াত (নিয়তসহ) | হারাম | | শব্দ/হরফ ভেঙে মাখরাজ অনুশীলন | জায়েয | | হাদিস, দুআ, তাফসির পাঠ | জায়েয | | কুরআনের অর্থ/তাফসির পড়া | জায়েয | | মুসহাফ স্পর্শ করা | হারাম | | মোবাইলে আয়াত দেখা ও পাঠ | পরিহার করুন | | ভুলে আয়াত পড়া | মাফ, গুনাহ নেই | | মসজিদে প্রবেশ | নিষিদ্ধ (হায়েজ-নেফাসে) |


উপসংহার

আপনি আপনার বড় মেয়েকে কায়দা (কুরআনের আয়াত হলে ভেঙে ভেঙে), হাদিস ও দুআ পড়াতে পারবেন। কুরআনের মাখরাজ-সিফাতের উদাহরণ শব্দ ধরে ধরে পড়াতে পারবেন, কিন্তু পূর্ণ আয়াত একসাথে পড়াতে পারবেন না। তাফসির ও হাদিসের কিতাব পড়া ও পড়ানো জায়েয। মোবাইলে তাফসির পড়তে পারেন, তবে কুরআনের আয়াতের স্ক্রিন স্পর্শ করা ও পাঠ পরিহার করতে হবে। ভুলে কিছু পড়া হয়ে গেলে কোনো গুনাহ হবে না, ইনশাআল্লাহ।

والله تعالى أعلم بالصواب والسلام عليكم ورحمة الله وبركاته


📚 References

  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), ১/২৯৩–২৯৫
  • আল-হিদায়া (মারগিনানি), কিতাবুত তাহারাত
  • ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৩৮
  • ফাতাওয়া উসমানি, ১/৩৭৮–৩৭৯
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/৩৪৭–৩৪৮
  • বেহেশতি জেওর, তাহারাত অধ্যায়
  • সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ২২৯; সুনানে তিরমিজি, হাদিস ১৩১৯
  • মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি), ভূমিকা

আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.