বাবার জীবদ্দশায় সম্পত্তিতে সন্তানের হক আছে কি? ভাইদের ব্যবসায় বিনিয়োগ ও বোনদের বঞ্চিত করা কি জায়েয? শ্বশুরবাড়ির নির্মাণে স্বামীর টাকা ও রুম না পাওয়ার শরয়ী বিধান কি ?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 8007
Questioner: ambitious suraiya
Question Asked: 05 Nov 2026, 05:09 PM
Reviewed & Published: 05 Nov 2026, 06:49 PM
Views: 49
Tokens: 7,272
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম, হুজুর। আমার একটা মাসআলা জানার আছে। তা হলো -
১। আমরা ৫ বোন, ২ ভাই। ১ ভাই বাদে সবাই বিবাহিত। বাবার সম্পদ আছে, বাবা জীবিত। বিয়ের সময় বাবা গয়না, ফ্রিজ, আলমারি, টুকিটাকি জিনিস দিয়েছেন। বর্তমানে হাদিয়া ছাড়া আর কিছু পাই না।
ভাইদেরকে স্বাবলম্বী করতে বা রাখতে ফ্ল্যাট, দোকান, আর্থিক সহায়তা যা দেন তা কি আমাদের বোনদের ও প্রাপ্য? উল্লেখ্য, বাবার সম্পত্তি বণ্টন করা হয় নাই এখনও।

২। আমার স্বামীর ধারণা এতে আমার প্রতি বেইনসাফি করা হচ্ছে এবং এসব নিয়ে মনোমালিন্য হচ্ছে। তার দৃষ্টিভঙ্গি কি সঠিক?

৩।আমার শ্বশুরবাড়িতে টিনের ঘরের জায়গায় ২ তলা বিল্ডিং উঠানো হয়েছে। তারা ৩ ভাইবোন, স্বামী সবার বড় এবং একমাত্র ছেলে সন্তান। সে অনেক টাকা দিয়েছে কিন্তু তাকে তার নিজস্ব একটা রুম যেটাতে শুধুমাত্র তার নিজের এবং তার পরিবারের অর্থাৎ আমাদের জিনিসপত্র থাকবে এমন কোনো রুম দেওয়া হয় নাই।সবগুলো রুম নিজেদের ফার্নিচার দিয়ে ভরে রেখেছে। পুরো একটা তলা বা ফ্ল্যাট দেওয়া তো দূরের কথা ।

নিচতলায় কিছু কাজ বাকি আছে যা সম্পন্ন করে তাকে দেওয়া যেতো নিচ তলাটা। কিন্তু তারা কাজ শেষ করে না কিন্তু তারা ওমরা করার পরিকল্পনা করে। এখানে আমার স্বামীর সাথে এবং আমাদের সাথে কতটুকু ইনসাফ করা হচ্ছে?

দয়া করে উত্তর গুলো জানাবেন। জাজাকাল্লাহ।

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

আপনার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ও স্পর্শকাতর পারিবারিক প্রশ্নের ফিকহে হানাফী ও শরীআতের ফয়সালা নিচে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:


১. ১ম প্রশ্নের উত্তর: পিতা জীবিত থাকা অবস্থায় সম্পত্তি বণ্টন ও বোনদের প্রাপ্য

ক. জীবদ্দশায় পিতার সম্পদ মিরাস (উত্তরাধিকার) নয়:

  • শরীআতের অকাট্য মূলনীতি অনুযায়ী, পিতা জীবিত থাকা অবস্থায় তাঁর অর্জিত সমস্ত স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির একমাত্র পূর্ণ মালিক তিনি নিজেই।
  • পিতার জীবদ্দশায় কোনো সন্তানের (চাই ছেলে হোক বা মেয়ে) পিতার সম্পদে "উত্তরাধিকার বা মিরাস সূত্রে" কোনো অংশ দাবি করার শরঈ অধিকার তৈরি হয় না; কারণ মিরাস ও ফারায়েজের আইন কেবল পিতার ইন্তেকালের পরেই প্রযোজ্য হয়।

খ. জীবদ্দশায় সন্তানদের দান করার শরঈ বিধান (হিবাহ ও ইনসাফ):

  • পিতা সুস্থ ও জীবিত থাকা অবস্থায় সন্তানদের যা কিছু দেন, তা শরীআতের বিচারে 'হিবাহ' (দান বা উপহার) হিসেবে গণ্য হয়।
  • সমতা রক্ষা করা উত্তম: হাদীস শরীফ ও ফিকহে হানাফীর প্রামাণ্য গ্রন্থাবলীতে উল্লেখ রয়েছে যে, পিতা তাঁর জীবদ্দশায় সন্তানদের সম্পদ হাদিয়া বা দান করার ক্ষেত্রে ছেলে ও মেয়ে সবার মাঝে সমতা ও ইনসাফ বজায় রাখা সুন্নাত ও মুস্তাহাব।
  • প্রয়োজনের খাতিরে কম-বেশি করার অবকাশ: তবে পিতা যদি কোনো সন্তানকে বিশেষ প্রয়োজনে (যেমন: ছেলেকে ব্যবসার জন্য স্বাবলম্বী করা, চিকিৎসা বা পড়ার খরচ) কিংবা কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণে কোনো ফ্ল্যাট, দোকান বা আর্থিক সহায়তা বেশি দেন, আর মেয়েদের বিয়ের সময় সাধ্যমতো গহনা বা গৃহস্থালি জিনিসপত্র দিয়ে থাকেন, তবে তা নাজায়েয বা গোনাহ হবে না।
  • বঞ্চিত করার নিয়তে দিলে গোনাহ: পিতা যদি মেয়েদের বঞ্চিত করার বা ক্ষতি করার কু-নিয়তে কেবল ছেলেদের সম্পদ লিখে দেন, তবে পিতা গোনাহগার হবেন। কিন্তু পিতা যদি জীবদ্দশায় ছেলেকে কোনো সম্পত্তি সশরীরে বুঝিয়ে দেন (দখল করিয়ে দেন), তবে তা শরঈভাবে ছেলের মালিকানায় চূড়ান্ত হয়ে যায় এবং পরবর্তীতে মেয়েরা জীবিত বাবার ওপর জোরপূর্বক তা দাবি করতে পারে না।

২. ২য় প্রশ্নের উত্তর: স্বামীর দৃষ্টিভঙ্গি ও মনোমালিন্যের শরঈ অবস্থান

  • স্বামীর দৃষ্টিভঙ্গির নৈতিক দিক: আপনার স্বামী যদি মনে করেন যে আপনার পিতা ছেলেদের বেশি দিচ্ছেন এবং মেয়েদের প্রতি সমতা রক্ষা করছেন না, তবে নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তাঁর এই পর্যবেক্ষণ ভুল নয়; কারণ পিতাদের উচিত সন্তানদের মাঝে ইনসাফ করা।
  • তবে স্বামীর জন্য মনোমালিন্য করা অনুচিত: ১. আপনার পিতার সম্পদ সম্পূর্ণ আপনার পিতার ব্যক্তিগত মালিকানাধীন। সেখানে আপনার স্বামীর কোনো শরঈ মালিকানা, দাবি বা হস্তক্ষেপের অধিকার নেই । ২. শ্বশুরের সম্পত্তি বণ্টন বা দান নিয়ে জামাতার (স্বামীর) ক্ষোভ প্রকাশ করা, এটি নিয়ে স্ত্রীর সাথে ঝগড়া করা বা মনোমালিন্য করা শরীআতের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অন্যায্য ও অনুচিত। ৩. আপনার উচিত স্বামীকে বুঝিয়ে শান্ত করা যে, জীবিত বাবার সম্পদে জোরপূর্বক কিছু দাবি করার শরঈ অধিকার কারও নেই; বাবা যা দেন তা আলহামদুলিল্লাহ, আর না দিলেও বাবার সম্পদে চাপ সৃষ্টি করা আমাদের জন্য শোভনীয় নয়।

৩. ৩য় প্রশ্নের উত্তর: শ্বশুরবাড়ির ভবনে স্বামীর টাকা প্রদান, নিজস্ব রুমের অধিকার ও ইনসাফ

ক. স্ত্রীর পৃথক বাসস্থানের (সুকনা শরইয়্যাহ) শরঈ অধিকার:

  • ফিকহে হানাফী অনুযায়ী, স্বামীর ওপর স্ত্রীর খোরপোষের (নফকা) পাশাপাশি একটি স্বতন্ত্র, নিরাপদ ও প্রাইভেসিসমৃদ্ধ বাসস্থান (المسكن الشرعي) নিশ্চিত করা শরীআতসম্মত ওয়াজিব দায়িত্ব।
  • এই বাসস্থানে স্ত্রীর অনুমতি ছাড়া পরিবারের অন্য সদস্যদের অপ্রয়োজনীয় হস্তক্ষেপ বা জিনিসপত্র দিয়ে ভরে রাখা উচিত নয়, যাতে স্ত্রীর নিজস্ব আলমারী, জিনিসপত্র রাখা ও বসবাসের পূর্ণ স্বাধীনতা থাকে।

খ. শ্বশুরবাড়ির ভবনে স্বামীর টাকা ও ইনসাফের বিধান: ১. স্বামীর টাকা ও অধিকারের বিষয়: আপনার স্বামী যেহেতু তাঁর কষ্টার্জিত টাকা দিয়ে ২ তলা ভবন নির্মাণে বড় ভূমিকা রেখেছেন, তাই নৈতিক ও শরঈ বিচারে শ্বশুরবাড়ির লোকদের উচিত তাঁকে তাঁর ব্যবহৃত আসবাবপত্র ও পরিবার নিয়ে থাকার জন্য অন্তত একটি নির্দিষ্ট রুম বা নিচতলার অংশ ব্যবহার করতে দেওয়া। ২. রুম না দিয়ে ওমরাহ করার হুকুম: মানুষের পাওনা, হক ও ইনসাফ রক্ষা করা ইসলামের অন্যতম প্রধান বাধ্যবাধকতা। যে সন্তান নিজের উপার্জনের বিপুল টাকা ঘরের পেছনে খরচ করলো, তাকে ও তার পরিবারকে একটি থাকার রুম বা প্রাইভেসি না দিয়ে সম্পূর্ণ ঘর নিজেদের দখলে রাখা এবং এই অবস্থায় ওমরাহে যাওয়ার পরিকল্পনা করা চরম বেইনসাফী ও অসংবেদনশীল আচরণ । ৩. করণীয়: আপনার স্বামী যেন মুরুব্বীদের মাধ্যমে বা সুন্দর আলোচনার মাধ্যমে শাশুড়ি ও ভাইবোনদের বুঝিয়ে বলেন যে, ভবন তৈরিতে যেহেতু তাঁর বড় অবদান রয়েছে এবং তিনি বিবাহিত, তাই নিচতলার কাজ শেষ করে বা নিচতলার অন্তত একটি রুম যেন তাঁর ও তাঁর পরিবারের জিনিসপত্র রাখার জন্য এবং অবস্থানের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।


সংযুক্ত কিতাবসমূহের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):

  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (২৪শ খণ্ড):

    • পৃষ্ঠা: ৬২, ৬৩, ৬৪, ৬৭ (মাহমুদিয়া ২৪/৬২, ৬৩, ৬৪, ৬৭) (অধ্যায়: কিতাবুল হিবাহ — 'জীবদ্দশায় সন্তানদের মাঝে সম্পদ হাদিয়া দেওয়া, পুত্র-কন্যার মাঝে সমতা রক্ষা করা এবং কোনো সন্তানকে প্রয়োজনের কারণে বেশি দেওয়ার শরঈ হুকুম') ।
    • পৃষ্ঠা: ৬১, ৬৯ (মাহমুদিয়া ২৪/৬১, ৬৯) (অধ্যায়: কিতাবুল হিবাহ — 'হিবাহ বা হাদিয়া সহীহ হওয়ার জন্য দখল ও অর্পণ শর্ত হওয়া') ।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (২০শ খণ্ড):

    • পৃষ্ঠা: ১২৮, ১৫১, ১৫২ (মাহমুদিয়া ২০/১২৮, ১৫১, ১৫২) (অধ্যায়: কিতাবুল ফারায়েয — 'পিতা জীবিত থাকা অবস্থায় সন্তান ওয়ারিছ হয় না এবং জীবদ্দশায় মিরাস দাবি করা নাজায়েয হওয়ার ফতোয়া') ।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৯শ খণ্ড):

    • পৃষ্ঠা: ৫৮, ৫৯ (মাহমুদিয়া ১৯/৫৮, ৫৯) (অধ্যায়: বাব حقوق الوالدين — 'বাবার সম্পদে অন্যায়ভাবে জামাতা বা সন্তানের হস্তক্ষেপ না করা এবং পারিবারিক সম্পর্কের আদাব') ।
    • পৃষ্ঠা: ১৮৩ (মাহমুদিয়া ২০/১৮৩) (অধ্যায়: কিতাবুল ফারায়েয — 'বান্দার হক নষ্ট করে বা পরিবারের প্রতি বেইনসাফী করে নফল ইবাদতে লিপ্ত হওয়ার অপছন্দনীয়তা')।

আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.