উদ্দেশ্য রেখে সদাকাহ করার বিধান
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
উদ্দেশ্য রেখে সদকাহ করার বিধান
প্রশ্নের সারমর্ম
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—কোনো নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য (যেমন: সন্তান হওয়া, রোগমুক্তি, ঋণমুক্তি, চাকরি পাওয়া ইত্যাদি) নিয়ত করে সদকাহ করা এবং আল্লাহর কাছে সেই উদ্দেশ্য পূরণের প্রার্থনা করা জায়েয কিনা।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
হ্যাঁ, উদ্দেশ্য রেখে সদকাহ করা সম্পূর্ণ জায়েয ও শরীয়তসম্মত। তবে কয়েকটি বিষয় লক্ষণীয়:
১. সদকাহ আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া চাই; উদ্দেশ্য পূরণই মূল লক্ষ্য নয়। ২. নির্দিষ্ট পরিমাণ বা নির্দিষ্ট সময়ে "বাধ্যতামূলক" হিসেবে ধার্য করা যাবে না (এটি মানত/নযর-এর অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে)। ৩. আল্লাহর কাছে দুআ করা যাবে—তিনি ইচ্ছা করলে পূরণ করবেন, না করলে না; এ বিশ্বাস রাখতে হবে।
কুরআন ও হাদীসের দলিল
১. সদকাহ দ্বারা বিপদ দূর হয় ও প্রয়োজন পূরণ হয়
আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমরা আল্লাহর পথে ব্যয় করো এবং নিজেদেরকে ধ্বংসের মুখে নিক্ষেপ করো না।" (সূরা বাকারা: ১৯৫)
হাদীসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
"সদকাহ কখনো সম্পদ কমায় না।" (সহীহ মুসলিম: ২৫৮৮)
অন্য হাদীসে:
"সদকাহ বিপদ-আপদ দূর করে এবং বালা-মুসিবত প্রতিরোধ করে।" (তিরমিযী: ৬৬৪ — হাসান)
২. নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে দুআ ও সদকাহ
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইস্তিস্কা (বৃষ্টির জন্য) নামাযে বের হয়ে সদকাহ করার নির্দেশ দিয়েছেন। (সুনানে আবু দাউদ: ১১৭০)
ইমাম তহাবী (রহ.) বর্ণনা করেন, নবী ﷺ বলেছেন:
"তোমরা সদকাহ দ্বারা রোগীদের চিকিৎসা করো।" (শরহু মাআনিল আছার)
হানাফী ফিকহের বিধান
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) — রাদ্দুল মুহতার
"সদকাহ ও দুআ দ্বারা বিপদ প্রতিরোধ করা মুস্তাহাব; এটি তাজরিবা (অভিজ্ঞতা) ও হাদীস দ্বারা প্রমাণিত।" (রাদ্দুল মুহতার: ২/৩৪৪)
ইমাম আশরাফ আলী থানভী (রহ.) — বেহেশতী যেওর
"কোনো বিশেষ প্রয়োজন পূরণের জন্য সদকাহ করা জায়েয; তবে তা মানতের মতো ওয়াজিব হয়ে যায় না।" (বেহেশতী যেওর, সদকাহ অধ্যায়)
ফাতাওয়া উসমানী
"নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে সদকাহ করা এবং আল্লাহর কাছে দুআ করা জায়েয। তবে 'যদি অমুক কাজ হয় তবে অমুক পরিমাণ সদকাহ দেব'—এভাবে শর্তযুক্ত করলে তা মানত হয়ে ওয়াজিব হয়ে যাবে।" (ফাতাওয়া উসমানী: ২/৩৩৫)
ফাতাওয়া আলমগীরী
"সদকাহ ফী সাবীলিল্লাহ যেকোনো নেক উদ্দেশ্যে দেওয়া যায়; নিয়ত অনুযায়ী সওয়াব পাওয়া যায়।" (ফাতাওয়া আলমগীরী: ১/১৯১)
গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য: সদকাহ বনাম মানত (নযর)
| বিষয় | সদকাহ (নফল) | মানত (নযর) | |------|-------------|-------------| | শর্তযুক্ত করা | জায়েয নয় | জায়েয | | পূরণ হলে ওয়াজিব | হয় না | ওয়াজিব হয় | | নিয়ত | আল্লাহর সন্তুষ্টি | শর্ত পূরণ হলে দিতে হবে |
সতর্কতা: যদি কেউ বলে—"যদি আমার চাকরি হয় তবে ৫০০ টাকা সদকাহ দেব"—তবে এটি মানত হয়ে যাবে এবং চাকরি হলে তা দেওয়া ওয়াজিব হবে। কিন্তু শুধু নিয়ত করে সদকাহ করা এবং দুআ করা মানত নয়।
সঠিক পদ্ধতি
১. নিয়ত: "হে আল্লাহ! আমি আপনার সন্তুষ্টির জন্য এই সদকাহ করছি এবং আমার এই নির্দিষ্ট প্রয়োজন পূরণের জন্য দুআ করছি।" ২. সদকাহ প্রদান: গোপনে, ইখলাসের সাথে। ৩. দুআ: সদকাহ দেওয়ার পর আল্লাহর কাছে প্রয়োজন পূরণের দুআ করা। ৪. তাওয়াক্কুল: ফল আল্লাহর হাতে; তিনি যা ভালো মনে করবেন তাই হবে।
উপসংহার
উদ্দেশ্য রেখে সদকাহ করা এবং আল্লাহর কাছে সেই উদ্দেশ্য পূরণের দুআ করা জায়েয ও মুস্তাহাব। তবে শর্তযুক্ত মানতের রূপ দেওয়া যাবে না। সদকাহ সর্বদা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হওয়া উচিত; আর ফলাফল আল্লাহর ইচ্ছাধীন।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।