মাকরূহ তাহরীমা করলে গুনাহ সগীরা না কবীরা? কাযা নামাজ থাকা অবস্থায় জামাতে শরিক হওয়ার হুকুম, এবং হাদিস তাহকীক ছাড়া বর্ণনা করা কি জায়েজ?

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 7990
Questioner: bul bul
Question Asked: 05 Nov 2026, 10:37 AM
Reviewed & Published: 05 Nov 2026, 11:18 PM
Views: 34
Tokens: 5,100
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১/মাকরূহ তাহারিমা করলে গুনাহ হয় হলে কি গুনাহ সগিরা না কবিরা
২/যার জিম্মায় ছয় ওয়াক্তের কম কোন নামাজ কাযা নেই কোন কারণে তার মাগরিব নামাজ কাযা হয় সে যখন এশা পড়তে যায় তখন তার কাযা সরন থাকার পর ও সে এশার জামাতে শরিক হয় তার নামাজ হবে আর এক ব্যক্তি তার আছর কাযা হয় মাগরিব পড়ে আছর পড়ে তার হুকুম কি তার ও কাযা নেই ওনাদায়ি
৩/মাসিক আল কাওসার এ বলা আছে কেউ যদি কোন হাদিসের তাহাররী না করে বলে সাধারণ মানুষ ঘটনা ক্রকে হাদিস সহিহ হলেও সে গুনাহ গার হবে এর ব্যাখ্যা কি

Answer

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।

জবাব

আপনার তিনটি গুরুত্বপূর্ণ ও ফিকহী জিজ্ঞাসার প্রামাণ্য উত্তর ফিকহে হানাফী ও কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ নিচে বিস্তারিত তুলে ধরা হলো:


১. ১ম প্রশ্নের উত্তর: মাকরূহে তাহরীমী করলে গুনাহের ধরণ (সগীরা না কবিরা?)

মূল শরঈ ফয়সালা: ১. মাকরূহে তাহরীমীর হুকুম: শরীআতে মাকরূহে তাহরীমী (المكروه تحريماً) হলো এমন কাজ, যা থেকে বিরত থাকার জন্য শরীআত নির্দেশ দিয়েছে, তবে তা অকাট্য প্রমাণের পরিবর্তে যন্নী (সংশয়যুক্ত/খবরে ওয়াহিদ) দলীল দ্বারা প্রমাণিত। হুকুমের দিক থেকে মাকরূহে তাহরীমী হারামের কাছাকাছি (قريب من الحرام)। ২. গুনাহের ধরণ:

  • ইচ্ছাকৃতভাবে মাকরূহে তাহরীমী কাজ করলে অবশ্যই গুনাহ হয়।
  • প্রাথমিক বা অনিয়মিত অবস্থায় মাকরূহে তাহরীমী করার কারণে 'গুনাহে সগীরা' (ছোট গুনাহ) হয়।
  • তবে বিশেষ সতর্কতা: যদি কেউ অনবরত, বারবার বা অভ্যাসে পরিণত করে মাকরূহে তাহরীমী কাজে লিপ্ত থাকে (ইসরার - إصرار করে), তবে সেই সগীরা গুনাহ আর সগীরা থাকে না; বরং তা 'গুনাহে কবিরায়' (বড় গুনাহে) পরিণত হয়ে যায়। কারণ ফিকহী মূলনীতি হলো: «لا صغيرة مع الإصرار» (অর্থাৎ অটল ও অনবরত করার দরুন সগীরা গুনাহ কবিরায় রূপান্তরিত হয়)।

সংযুক্ত কিতাবসমূহের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):

  • নূরুল ঈযাহ (বাংলা সংস্করণ):
    • পৃষ্ঠা: ৫ (নূরুল ঈযাহ পৃষ্ঠা ৫) (সংজ্ঞা ও পরিচ্ছেদ: মাকরূহ দু'প্রকার — তাহরীমী ও তানযীহী; মাকরূহে তাহরীমী হারামের কাছাকাছি হওয়ার বিবরণ)।
    • পৃষ্ঠা: ১০০ (নূরুল ঈযাহ পৃষ্ঠা ১০০) (অনুচ্ছেদ: নামাযের মাকরূহ বিষয়াদি — 'মাকরূহে তাহরীমীর দ্বারা নামায পুনরায় পড়া ওয়াজিব হওয়া এবং ইচ্ছাকৃত মাকরূহে তাহরীমী করলে গুনাহ হওয়া')।
  • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
    • পৃষ্ঠা: ৯০ (দরসুল ফিকহ ১/৯০) (অধ্যায়: নামায পুনরায় পড়া ওয়াজিব হওয়া — 'মাকরূহে তাহরীমী সম্পাদনে গুনাহ হওয়ার বিবরণ')।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (৯ম খণ্ড):
    • পৃষ্ঠা: ৩৫ (মাহমুদিয়া ৯/৩৫) (অধ্যায়: বাবুল জানাইয — 'সগীরা গুনাহের ওপর অটল থাকলে তা কবিরায় পরিণত হওয়া সংক্রান্ত ফতোয়া')।

২. ২য় প্রশ্নের উত্তর: সাহেবে তারতীবের কাজা নামায ও ওয়াক্তিয়ার ক্রমবিধান

মূল শরঈ ফয়সালা: যার জিম্মায় অনধিক ৫ ওয়াক্ত (ছয় ওয়াক্তের কম) কাজা নামায রয়েছে, শরীআতের পরিভাষায় তাকে 'সাহেবে তারতীব' (صاحب ترتيب) বলা হয়। সাহেবে তারতীব ব্যক্তির জন্য ওয়াক্তিয়া নামায আদায়ের পূর্বে তার পূর্বের ছুটে যাওয়া কাজা নামায আগে আদায় করা ওয়াজিব (তরতীব রক্ষা করা ফরয/ওয়াজিব)।

ক. ১ম ব্যক্তির হুকুম (মাগরিব কাজা থাকা সত্ত্বেও স্মরণ নিয়ে এশার জামাতে শরিক হলে):

  • যদি মাগরিব নামায কাজা থাকে এবং তা স্মরণ থাকা সত্ত্বেও সে আগে মাগরিবের কাজা না পড়ে এশার জামাতে শরিক হয়ে এশা আদায় করে, তবে তার এই এশার নামায সাময়িকভাবে ফাসিদ (অকার্যকর/বাতিল) হয়ে যাবে।
  • করণীয়: তাকে প্রথমে মাগরিবের কাজা নামায পড়ে নিতে হবে, এবং এরপর পূর্বে পড়া এশার নামাযটি পুনরায় আদায় (আদাহ) করা ওয়াজিব।

খ. ২য় ব্যক্তির হুকুম (আসর কাজা হওয়া সত্ত্বেও আগে মাগরিব পড়ে পরে আসর পড়লে):

  • স্মরণ থাকা সত্ত্বেও যদি কেউ কাজা আসর না পড়ে আগে ওয়াক্তিয়া মাগরিব পড়ে নেয় এবং তারপর আসর কাজা পড়ে, তবে তার পড়া মাগরিবের নামাযটি ফাসিদ হয়ে যাবে।
  • করণীয়: আসরের কাজা পড়া শেষ করার পর তাকে মাগরিব নামাযটি পুনরায় পড়ে নিতে হবে [১৪৭]। এতে আসর ও মাগরিব উভয় নামাযই সঠিক ও সহীহভাবে আদায় হয়ে যাবে।

সংযুক্ত কিতাবসমূহের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):

  • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড - বাংলা সংস্করণ):
    • পৃষ্ঠা: ৩৫৩, ৩৫৪ (হিন্দিয়াহ ১/১৫৫, ১৫৬) (অধ্যায়: সালাত, ৯ অনুচ্ছেদ: ফাওয়াইত বা কাজা নামাযের বিবরণ — 'সাহেবে তারতীবের জন্য কাজা ও ওয়াক্তিয়ার মাঝে তরতীব রক্ষা করা ওয়াজিব হওয়া, স্মরণ থাকা সত্ত্বেও ওয়াক্তিয়া পড়লে তা ফাসিদ হওয়া এবং পুনরায় আদায়ের ফিকহী বিধান')।
    • পৃষ্ঠা: ২৫১, ২৫২ (হিন্দিয়াহ ১/১১২, ১১৩) (অধ্যায়: সালাত, ১১শ পরিচ্ছেদ — 'কাজা নামায আদায়ের সুনির্দিষ্ট শরঈ নিয়মাবলী')।
  • নূরুল ঈযাহ (বাংলা সংস্করণ):
    • পৃষ্ঠা: ১২৯, ১৩০ (নূরুল ঈযাহ পৃষ্ঠা ১২৯, ১৩০) (পরিচ্ছেদ: কাজা নামায আদায় করা — 'সাহেবে তারতীব ব্যক্তির কাজা নামাযের ক্রমবিকাশ ও তরতীবের বাধ্যবাধকতা')।

৩. ৩য় প্রশ্নের উত্তর: হাদীসের তাহকীক/তাহরীর না করে বর্ণনার ফিকহী ব্যাখ্যা

মূল শরঈ ব্যাখ্যা: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর পবিত্র মুখ নিঃসৃত বাণীর সম্মান ও মর্যাদা রক্ষা করা দ্বীনের অন্যতম মূল ভিত্তি।

১. হাদীসের কঠোর সতর্কতা: নবী করীম ﷺ ইরশাদ করেছেন:

«مَنْ كَذَبَ عَلَيَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ» (অর্থ: যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে আমার ওপর মিথ্যা আরোপ করে, সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়। — সহীহ বুখারী, সহীহ মুসলিম; দরসুল ফিকহ ১/২)।

অন্য হাদীসে নবীজী ﷺ ইরশাদ করেছেন:

«كَفَى بِالْمَرْءِ كَذِبًا أَنْ يُحَدِّثَ بِكُلِّ مَا سَمِعَ» (অর্থ: কোনো মানুষের মিথ্যাবাদী হওয়ার জন্য এতটুকুই যথেষ্ট যে, সে যা শোনে (যাচাই-বাছাই ছাড়া) তাই অন্যের কাছে বর্ণনা করে। — সহীহ মুসলিম; মাহমুদিয়া ৩/১৮২)।

২. ঘটনাক্রমে হাদীস সহীহ হলেও কেন সে গুনাহগার হবে?

  • দায়িত্বহীনতা ও দুঃসাহস (جَسَارَة): কোনো সাধারণ মানুষ যখন কোনো হাদীসের সনদ, তাহকীক বা নির্ভরযোগ্য আলেমের সত্যতা যাচাই ছাড়া কেবল লোকমুখে শুনে বা অনুমান করে "নবীজী বলেছেন" বলে দাবি করে, সে মূলত অসীম ঝুঁকি ও দায়িত্বহীনতার কাজ করে।
  • নীতিগত অপরাধ: শরীআতের নিয়ম হলো—রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর নামে কোনো কথা বলতে হলে তা নিশ্চিত জেনে বলতে হয়। যে ব্যক্তি না জেনে আন্দাজে কথা বললো, ঘটনাক্রমে বা কাকতালীয়ভাবে তা সত্য/সহীহ প্রমাণিত হলেও, উক্ত ব্যক্তি যে 'প্রক্রিয়া ও না জেনে কথা বলার দুঃসাহস' দেখিয়েছে, তার জন্য সে গোনাহগার হবে ।
  • ফিকহী মূলনীতি: ফুকাহায়ে কেরাম লিখেছেন: "না জেনে ফতোয়া দেওয়া বা না জেনে হাদীস বর্ণনা করা গোনাহ, চাই তা অলৌকিকভাবে সঠিকই হোক না কেন।" কারণ এটি আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের ওপর না জেনে মন্তব্য করার শামিল।

সংযুক্ত কিতাবসমূহের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):

  • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
    • পৃষ্ঠা: ২, ৩, ৪ (দরসুল ফিকহ ১/২-৪) (ভূমিকা ও মুকাদ্দিমা — 'না জেনে বা যোগ্যতা ছাড়া অনুমান করে হাদীস ও ফতোয়া দেওয়ার চরম নিষেধাজ্ঞা এবং তা অপরাধ গণ্য হওয়া সংক্রান্ত আল-ফাতাওয়া আল-খানিয়্যাহর ইবারত')।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (৩য় খণ্ড):
    • পৃষ্ঠা: ১৮২ (মাহমুদিয়া ৩/১৮২) (অধ্যায়: বাবুল বেদআত ওয়ার রুসূম — 'রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস না জেনে বর্ণনা করা এবং كفى بالمرء كذبا أن يحدث بكل ما سمع হাদীসের ব্যাখ্যা')।
  • ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (৪র্থ খণ্ড):
    • পৃষ্ঠা: ৩৭, ৩৯ (মাহমুদিয়া ৪/৩৭, ৩৯) (অধ্যায়: কিতাবুল হাদীস — 'তাহকীক ও সনদের সত্যতা ব্যতিরেকে হাদীস বর্ণনার গোনাহ ও অপকারিতা')।

আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.