রোমান্টিক উপন্যাস পড়া কি জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
রোমান্টিক উপন্যাস পড়ার শরয়ী বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—বর্তমানে প্রচলিত রোমান্টিক উপন্যাস (যেমন: "রিদ মায়ার প্রেম গাঁথা", "আমৃত্যু ভালোবাসি", "পদ্মজা" ইত্যাদি) পড়া শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েজ কি না।
সংক্ষিপ্ত উত্তর
সাধারণভাবে এসব রোমান্টিক উপন্যাস পড়া জায়েজ নয়; বরং নাজায়েজ বা নিষিদ্ধ। তবে যদি কোনো উপন্যাসে অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, অবৈধ প্রেম-প্রণয়ের glorification, হারাম সম্পর্কের প্রশংসা ইত্যাদি না থাকে এবং তা নিছক সাহিত্যিক মূল্যের জন্য হয়—তবে কেবল সময় নষ্ট ও অপ্রয়োজনীয় হওয়ার কারণে তা মাকরূহ। কিন্তু বাস্তবে প্রচলিত রোমান্টিক উপন্যাসগুলোর অধিকাংশই ইসলামী আদর্শবিরোধী।
বিস্তারিত আলোচনা
১. দৃষ্টি ও হৃদয়ের হেফাজতের বিধান
আল্লাহ তাআলা বলেন:
قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ "মুমিনদেরকে বলুন, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে এবং লজ্জাস্থানের হেফাজত করবে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।" (সূরা আন-নূর: ৩০)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
الْعَيْنَانِ تَزْنِيَانِ وَزِنَاهُمَا النَّظَرُ "দুই চোখও যিনা করে, আর তার যিনা হলো (হারাম) দৃষ্টি।" (সহীহ মুসলিম, হাদীস নং ২৬৫৭)
রোমান্টিক উপন্যাসে সাধারণত অবৈধ প্রেম, শারীরিক আকর্ষণ, প্রেমিকার রূপ-বর্ণনা ইত্যাদি বিস্তারিত থাকে—যা চোখ ও হৃদয় উভয়ের জন্য ফিতনার কারণ।
২. হারাম সম্পর্ককে আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন
বর্তমান রোমান্টিক উপন্যাসগুলোর একটি বড় সমস্যা হলো—এগুলোতে প্রেম-প্রণয়, প্রেমিকার সঙ্গে অবৈধ সম্পর্ক, বিবাহপূর্ব প্রেম ইত্যাদিকে অত্যন্ত রোমান্টিক ও আকর্ষণীয়ভাবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ ইসলামে এসব সম্পূর্ণ হারাম।
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ ۖ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا "তোমরা যিনার কাছেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।" (সূরা আল-ইসরা: ৩২)
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا يَخْلُوَنَّ رَجُلٌ بِامْرَأَةٍ إِلَّا كَانَ ثَالِثَهُمَا الشَّيْطَانُ "কোনো পুরুষ কোনো নারীর সঙ্গে নির্জনে মিলিত হবে না; তাদের তৃতীয়জন হবে শয়তান।" (সুনানে তিরমিযী: ২১৬৫)
৩. ফিকহী দৃষ্টিকোণ (হানাফী মাযহাব)
রাদ্দুল মুহতার-এ ইবনে আবিদীন (রহ.) উল্লেখ করেন—যে কোনো বস্তু বা বিষয় যা হারামের প্রতি আকর্ষণ সৃষ্টি করে বা ফিতনার দিকে নিয়ে যায়, তা থেকে বিরত থাকা ওয়াজিব। (রাদ্দুল মুহতার: ৬/৩৫৪ প্রসঙ্গে)
ফাতাওয়া আলমগীরী-তে বিনোদন ও অপ্রয়োজনীয় বিষয়ে সময় ব্যয়ের ব্যাপারে কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে—যা দ্বীনি দায়িত্ব থেকে গাফিল করে। (ফাতাওয়া আলমগীরী: ৫/৩৪৩)
ইমদাদুল ফাতাওয়া-তে হাকীমুল উম্মত আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেন—যেসব বই-পুস্তক পড়লে হৃদয়ে ফিতনা সৃষ্টি হয়, চরিত্রে প্রভাব পড়ে বা আল্লাহর স্মরণ থেকে গাফিলতি আসে, সেগুলো পড়া মুসলিমের জন্য অনুচিত। (ইমদাদুল ফাতাওয়া: ৪/৩৫০-এর কাছাকাছি আলোচনা)
বাহিশতী যেওর-এ হযরত থানভী (রহ.) স্পষ্টভাবে বলেছেন—অশ্লীল ও ফিতনাময় গল্প-উপন্যাস পড়া থেকে বিরত থাকা কর্তব্য। (বাহিশতী যেওর, ১ম খণ্ড, "দৃষ্টির হেফাজত" অধ্যায়)
৪. সময়ের অপচয়
আল্লাহ তাআলা কিয়ামতের দিন সময় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করবেন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
لَا تَزُولُ قَدَمَا عَبْدٍ يَوْمَ الْقِيَامَةِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ عُمْرِهِ فِيمَ أَفْنَاهُ "কিয়ামতের দিন বান্দার পা সরবে না যতক্ষণ না তাকে তার জীবনকাল সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হয়—সে তা কোথায় ব্যয় করেছে।" (সুনানে তিরমিযী: ২৪১৬)
রোমান্টিক উপন্যাসে যে বিপুল সময় ব্যয় হয়—তা দ্বীনি ইলম অর্জন, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির-আযকার ও প্রয়োজনীয় কাজে ব্যয় করা অনেক উত্তম।
৫. ব্যতিক্রমী অবস্থা
যদি কোনো উপন্যাসে:
- অশ্লীলতা ও অশ্লীল বর্ণনা না থাকে,
- অবৈধ প্রেমকে উৎসাহিত না করা হয়,
- ইসলামী আদর্শের পরিপন্থী কোনো বিষয় না থাকে,
- এবং তা নিছক সাহিত্যিক মূল্য বা ইতিহাস-জ্ঞান অর্জনের জন্য পড়া হয়—
তাহলে তা মাকরূহে তানযীহী (অপছন্দনীয়) হবে, তবে হারামের পর্যায়ে পৌঁছাবে না। কিন্তু বর্তমানে প্রচলিত রোমান্টিক উপন্যাসগুলোর ক্ষেত্রে এই শর্তগুলো সাধারণত পূরণ হয় না।