জেনে শুনে শশুর এর সুদ এর টাকা নেওয়া কি জায়েজ হবে?

Halal and Haram · Hanafi

Question No: 795
Questioner: Li Za
Question Asked: 26 May 2026, 03:41 PM
Reviewed & Published: 26 May 2026, 04:39 PM
Views: 87
Tokens: 3,696
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

জামাই জানে যে তার শশুর এর টাকায় বেশির ভাগ ই সুদ। তারপর তিনি হাদীয়া হিসেবে সেই সুদ মিশ্রিত টাকা নিবেন। সেই টাকা দিয়ে তার নিজের বণ্ডকি জমি খুলবেন।
জেনে শুনে করো সুদ এর টাকা নেওয়া কি জায়েজ?
জমি খুললে সেই জমির ফসল কি সুদ বা হারাম হবে?
মেয়ে যদি এই টাকা নিতে রাজি না হয় শুধু জামাই নিচ্ছে লোভ এ পরে তাহলে মেয়ের কি করা উচিৎ? স্বামীকে টাকা না নিতে বলা উঠিত না?

Answer

উত্তর

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ:
একজন জামাই জানে যে তার শ্বশুরের বেশিরভাগ টাকা সুদের (রিবা) মাধ্যমে উপার্জিত। শ্বশুর তাকে হাদিয়া (উপহার) হিসেবে সেই সুদ মিশ্রিত টাকা দিচ্ছে, যা তিনি গ্রহণ করে নিজের জমি খুলতে চান। এই প্রেক্ষাপটে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো জানতে চাওয়া হয়েছে:

  1. জেনে-শুনে সুদের টাকা হাদিয়া হিসেবে নেওয়া কি জায়েজ?
  2. সেই টাকা দিয়ে জমি খুললে তার ফসল কি হারাম হবে?
  3. স্ত্রী যদি এই টাকা নিতে রাজি না হয়, কিন্তু স্বামী লোভের বশবর্তী হয়ে তা নেয়, তাহলে স্ত্রীর করণীয় কী? সে কি স্বামীকে টাকা না নিতে বলতে পারে?

১. সুদের টাকা হাদিয়া হিসেবে নেওয়ার বিধান

ইসলামে সুদ (রিবা) স্পষ্টভাবে হারাম। কুরআন ও হাদিসে এর কঠোর নিষেধাজ্ঞা এসেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন:

"وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا"
"আল্লাহ বেচাকেনা হালাল করেছেন এবং সুদ হারাম করেছেন।" (সূরা আল-বাকারা: ২৭৫)

সুদী টাকা গ্রহণ করা, তা হাদিয়া বা অন্য কোনো নামে হোক, জায়েজ নয়। বিশেষ করে যখন জানা যায় যে টাকাটি সম্পূর্ণ বা অধিকাংশই সুদের মাধ্যমে উপার্জিত। হানাফি ফিকহের বড় বড় কিতাবে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে, হারাম মাল গ্রহণ করা, তা জেনে-শুনে কিংবা না জেনে, উভয় অবস্থায়ই নাজায়েজ। তবে যদি টাকাটি মিশ্রিত হয় (অর্থাৎ কিছু হালালও থাকে) তবে তার বিধান ভিন্ন। কিন্তু এখানে বলা হয়েছে "বেশির ভাগই সুদ", তাই সেটি গ্রহণ করা জায়েজ হবে না।

হাদিসে এসেছে:

"إِنَّ اللَّهَ إِذَا حَرَّمَ شَيْئًا حَرَّمَ ثَمَنَهُ"
"নিশ্চয়ই আল্লাহ যখন কোনো বস্তু হারাম করেন, তখন তার মূল্যও হারাম করেন।" (আবু দাউদ, সহিহ)

হানাফি ফিকহের নির্দেশনা:

  • ফাতাওয়া উসমানি (১/৩০২) তে এসেছে: "হারাম উপার্জন গ্রহণ করা এবং তা নিজের কাজে লাগানো জায়েজ নয়।"
  • রদ্দুল মুহতার (৫/২৭২) তে বলা হয়েছে: "সুদী লেনদেনের মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ গ্রহণ করা এবং তা নিজের সম্পদের সাথে মিশিয়ে ফেলা নাজায়েজ।"
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া (৪/১৯০) তে এসেছে: "জেনে-শুনে সুদের টাকা হাদিয়া নেওয়া জায়েজ নয়। বরং তা প্রত্যাখ্যান করা ওয়াজিব।"

সিদ্ধান্ত:
জামাই যদি জানে যে শ্বশুরের টাকা সুদী, তবে তা হাদিয়া হিসেবেও গ্রহণ করা হারাম ও নাজায়েজ। তাকে অবশ্যই তা প্রত্যাখ্যান করতে হবে।


২. সুদের টাকায় জমি খুললে ফসলের বিধান

যদি জামাই সুদের টাকা দিয়ে জমি খোলে বা ক্রয় করে, তাহলে সেই জমির ফসল হারাম হবে না, তবে তা মাকরুহে তাহরিমি হবে। কারণ জমি নিজে হারাম নয়, কিন্তু তার মূলধন হারাম। হানাফি ফিকহের নীতি হলো:

"إذا حرم الأصل حرم الفرع"
"যখন মূল হারাম হয়, তখন শাখাও হারাম হয়।"

তবে এখানে জমির ফসল উৎপাদনে মূল টাকা হারাম, কিন্তু জমি ও ফসল নিজে হারাম নয়। তাই সে ফসল খাওয়া বা বিক্রি করা মাকরুহে তাহরিমি হবে। অর্থাৎ তা এড়িয়ে চলা ওয়াজিব।

রদ্দুল মুহতার (৪/১৯৪) তে এসেছে:

"হারাম মাল দ্বারা জমি ক্রয় করলে তা মালিকানা সাব্যস্ত হয়, তবে তা মাকরুহ এবং গুনাহের কাজ।"

ফাতাওয়া হিন্দিয়া (৫/৩১১) তে বলা হয়েছে:

"সুদী টাকা দিয়ে জমি ক্রয় করা জায়েজ নয়। কিন্তু যদি কেউ তা করে ফেলে, তাহলে জমি ও ফসল ব্যবহার করা মাকরুহ।"

সিদ্ধান্ত:
ওই জমির ফসল খাওয়া বা বিক্রি করা মাকরুহে তাহরিমি। উত্তম হলো সেই জমি ও ফসল দান করে দেওয়া বা অন্য কোনো হালাল উপায়ে তা পবিত্র করা।


৩. স্ত্রীর করণীয়

মেয়ে যদি এই টাকা নিতে রাজি না হয়, কিন্তু স্বামী লোভের বশবর্তী হয়ে তা নিচ্ছে, তাহলে স্ত্রীর কর্তব্য হলো:

ক. স্বামীকে নিষেধ করা:
স্ত্রী তার স্বামীকে এই হারাম টাকা গ্রহণ থেকে বিরত রাখার জন্য সদুপদেশ দেবেন। এটি তার ঈমানি দায়িত্ব। আল্লাহ বলেন:

"وَتَعَاوَنُوا عَلَى الْبِرِّ وَالتَّقْوَىٰ وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ"
"সৎকর্ম ও তাকওয়ায় একে অপরকে সাহায্য কর, পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" (সূরা আল-মায়েদা: ২)

খ. স্বামীর গুনাহে অংশীদার না হওয়া:
স্ত্রী যদি টাকা নিতে রাজি না হন এবং স্বামী তা গ্রহণ করেন, তাহলে স্ত্রী তার গুনাহে শরিক হবেন না, যদি তিনি স্পষ্টভাবে নিষেধ করে থাকেন। তবে তাকে চুপ থাকা উচিত নয়। বরং তাকে বারবার নিষেধ করতে হবে এবং হারাম থেকে দূরে থাকার জন্য স্বামীকে অনুরোধ করতে হবে।

গ. পরিবারের অন্য সদস্য বা আলেমের সাহায্য নেওয়া:
প্রয়োজনে স্ত্রী তার বাবা, মা বা স্থানীয় আলেমের মাধ্যমে স্বামীকে বোঝানোর চেষ্টা করবেন।

সিদ্ধান্ত:
স্বামীকে সরাসরি বলা উচিত: "আমি এই হারাম টাকা নিতে রাজি নই। আপনি যদি তা নেন, তাহলে আমার ও আপনার মধ্যে কোনো সম্পর্ক থাকবে না এই টাকার সাথে।" স্ত্রীর জন্য স্বামীকে এই হারাম কাজ থেকে বিরত রাখা ওয়াজিব


নির্দিষ্ট মাসআলার সমাধান:

  • সুদের টাকা হাদিয়া নেওয়া: জায়েজ নয়। তা প্রত্যাখ্যান করা ওয়াজিব।
  • তার দ্বারা জমি খোলা: নাজায়েজ। ফসল মাকরুহে তাহরিমি।
  • স্ত্রীর করণীয়: স্বামীকে নিষেধ করা এবং না শুনলে তাকে ছেড়ে দেওয়া নয়, বরং নরম ভাষায় বারবার বোঝানো। প্রয়োজনে আলেমের সাহায্য নেওয়া।

উত্তম পন্থা:
জামাই শ্বশুরকে বোঝান যে, তিনি সুদী লেনদেন থেকে তওবা করুন এবং হালাল উপায়ে উপার্জন করুন। আর তিনি নিজে সেই টাকা না নিয়ে তাকে সৎ পথে আসার উপদেশ দিন। মেয়ে যদি চুপ থাকে, তাহলে সে গুনাহের অংশীদার হবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে হারাম থেকে দূরে থাকার তাওফিক দান করুন। আমিন।



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.