এমন কোনো আমল আছে শরীয়ত সম্মত যেটা করলে ফেরেশতারা আমার জন্য আল্লাহর কাছে মাফ চাবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
ফেরেশতাদের দুআ ও ইস্তিগফার লাভের শরীয়তসম্মত আমল
প্রশ্ন: এমন কোনো আমল আছে শরীয়ত সম্মত যেটা করলে ফেরেশতারা আমার জন্য আল্লাহর কাছে মাফ চাবে? আমার জন্য দুআ করবে? ফেরেশতারা তো নিষ্পাপ।
ভূমিকা: ফেরেশতারা নিষ্পাপ, তবুও বান্দার জন্য দুআ করেন
প্রশ্নটি অত্যন্ত সুন্দর ও গুরুত্বপূর্ণ। আপনি ঠিকই বলেছেন—ফেরেশতারা নিষ্পাপ (মাসুম), তাঁদের নিজেদের কোনো গুনাহ নেই, তাই তাঁদের নিজেদের জন্য ইস্তিগফারের প্রয়োজন নেই। কিন্তু কুরআন ও হাদীসে সুস্পষ্টভাবে বর্ণিত হয়েছে যে, আল্লাহ তা'আলা ফেরেশতাদেরকে মুমিন বান্দাদের জন্য দুআ ও ইস্তিগফার করার দায়িত্ব দিয়েছেন। এটি ফেরেশতাদের নিজেদের পাপের কারণে নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশ ও বান্দার প্রতি আল্লাহর রহমতের প্রকাশ হিসেবে।
আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ করেন:
الَّذِينَ يَحْمِلُونَ الْعَرْشَ وَمَنْ حَوْلَهُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيُؤْمِنُونَ بِهِ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِلَّذِينَ آمَنُوا رَبَّنَا وَسِعْتَ كُلَّ شَيْءٍ رَّحْمَةً وَعِلْمًا فَاغْفِرْ لِلَّذِينَ تَابُوا وَاتَّبَعُوا سَبِيلَكَ وَقِهِمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ
"যারা আরশ বহন করে এবং যারা তার চারপাশে আছে, তারা তাদের রবের প্রশংসাসহ তাসবীহ করে, তাঁর প্রতি ঈমান রাখে এবং মুমিনদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে (বলে): 'হে আমাদের রব! আপনি রহমত ও জ্ঞানে সবকিছু পরিব্যাপ্ত করেছেন; সুতরাং যারা তাওবা করেছে এবং আপনার পথ অনুসরণ করেছে তাদের ক্ষমা করুন এবং জাহান্নামের আযাব থেকে রক্ষা করুন।'" (সূরা গাফির: ৭)
وَالْمَلَائِكَةُ يُسَبِّحُونَ بِحَمْدِ رَبِّهِمْ وَيَسْتَغْفِرُونَ لِمَن فِي الْأَرْضِ
"আর ফেরেশতারা তাদের রবের প্রশংসাসহ তাসবীহ করে এবং পৃথিবীতে যারা আছে তাদের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে।" (সূরা শূরা: ৫)
এছাড়া সূরা আহযাব: ৪৩, সূরা বাকারা: ১৬১-১৬৩, সূরা মুহাম্মদ: ১৯ প্রভৃতিতে ফেরেশতাদের দুআর কথা এসেছে।
ফেরেশতাদের দুআ ও ইস্তিগফার লাভের আমলসমূহ
১. জ্ঞান অন্বেষণ (তালাবুল ইলম) করা
হযরত আবু দারদা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
مَنْ سَلَكَ طَرِيقًا يَطْلُبُ فِيهِ عِلْمًا سَلَكَ اللَّهُ بِهِ طَرِيقًا مِنْ طُرُقِ الْجَنَّةِ، وَإِنَّ الْمَلَائِكَةَ لَتَضَعُ أَجْنِحَتَهَا لِطَالِبِ الْعِلْمِ رِضًا بِمَا يَصْنَعُ
"যে ব্যক্তি জ্ঞান অন্বেষণের জন্য কোনো পথ অবলম্বন করে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতের একটি পথ সহজ করে দেন। নিশ্চয়ই ফেরেশতারা জ্ঞান অন্বেষণকারীর কাজে সন্তুষ্ট হয়ে তার জন্য তাদের ডানা বিছিয়ে দেন।" (সুনানে তিরমিযী: ২৬৮২; সুনানে আবু দাউদ: ৩৬৪১; ইবনে মাজাহ: ২২৪)
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে: ইলমে দ্বীন (কুরআন, হাদীস, ফিকহ, আকীদা) শিক্ষা করা ফরযে কিফায়া, আর ব্যক্তিগতভাবে প্রয়োজনীয় ইলম ফরযে আইন। ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী (রহ.) «আল-হিদায়া»-র মুকাদ্দিমায় ইলমের ফযীলত সম্পর্কে স্বতন্ত্র অধ্যায় রচনা করেছেন। ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর জীবনীই ইলম অন্বেষণের সর্বোত্তম দৃষ্টান্ত।
২. কুরআন তিলাওয়াত করা
হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
مَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ إِلَّا نَزَلَتْ عَلَيْهِمُ السَّكِينَةُ وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ وَذَكَرَهُمُ اللَّهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ
"যে দল আল্লাহর ঘরসমূহের কোনো ঘরে একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে এবং পরস্পর তা অধ্যয়ন করে, তাদের উপর অবশ্যই সাকীনাহ (প্রশান্তি) নাযিল হয়, রহমত তাদেরকে ঢেকে নেয়, ফেরেশতারা তাদেরকে ঘিরে রাখে এবং আল্লাহ তাঁর নিকটস্থদের মধ্যে তাদের কথা স্মরণ করেন।" (সহীহ মুসলিম: ২৬৯৯)
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে: তিলাওয়াতের সময় তাজবীদের খেয়াল রাখা, আদব রক্ষা করা এবং বুঝে পড়া উত্তম। «ফাতাওয়া উসমানী» (খণ্ড ১, কুরআন তিলাওয়াত অধ্যায়) ও «ইমদাদুল ফাতাওয়া»-তে তিলাওয়াতের ফযীলত ও আদব বিস্তারিত আলোচিত হয়েছে।
৩. জানাযার নামাযে অংশগ্রহণ ও মৃতকে দাফন করা
হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
مَنْ شَهِدَ الْجَنَازَةَ حَتَّى يُصَلِّيَ عَلَيْهَا فَلَهُ قِيرَاطٌ، وَمَنْ شَهِدَ حَتَّى تُدْفَنَ كَانَ لَهُ قِيرَاطَانِ... مِثْلُ الْجَبَلَيْنِ الْعَظِيمَيْنِ
"যে ব্যক্তি জানাযার নামায পড়া পর্যন্ত উপস্থিত থাকে, তার জন্য এক কীরাত (সওয়াব); আর যে দাফন পর্যন্ত উপস্থিত থাকে, তার জন্য দুই কীরাত—প্রতিটি কীরাত বিশাল দুটি পাহাড়ের সমান।" (সহীহ বুখারী: ১৩২৫; সহীহ মুসলিম: ৯৪৫)
জানাযার নামাযে ফেরেশতাদের উপস্থিতি ও মৃতের জন্য দুআর বিষয় হাদীসে বর্ণিত হয়েছে। «রাদ্দুল মুহতার» (খণ্ড ২, কিতাবুস সালাত, জানাযা অধ্যায়) ও «ফাতাওয়া আলমগীরী»-তে জানাযার বিধান বিস্তারিত।
৪. সকাল-সন্ধ্যা মসজিদে অবস্থান ও যিকির
হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
إِنَّ لِلَّهِ مَلَائِكَةً سَيَّارَةً فُضُلًا يَتَتَبَّعُونَ مَجَالِسَ الذِّكْرِ، فَإِذَا وَجَدُوا مَجْلِسًا فِيهِ ذِكْرٌ قَعَدُوا مَعَهُمْ... فَيَقُولُ اللَّهُ: فَأُشْهِدُكُمْ أَنِّي قَدْ غَفَرْتُ لَهُمْ
"নিশ্চয়ই আল্লাহর কিছু ভ্রমণকারী ফেরেশতা আছেন, যারা যিকিরের মজলিস তালাশ করেন। যখন তারা যিকিরের মজলিস পায়, তারা তাদের সাথে বসে যান... তখন আল্লাহ তা'আলা বলেন: 'আমি তোমাদের সাক্ষী রাখছি যে, আমি তাদের ক্ষমা করে দিলাম।'" (সহীহ বুখারী: ৬৪০৮; সহীহ মুসলিম: ২৭০০)
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে: মসজিদে ইতিকাফ, জামাতে নামাযের অপেক্ষা, তাসবীহ-তাহলীল-তাকবীর-তাহমীদ ইত্যাদি যিকিরে মশগুল থাকা অত্যন্ত ফযীলতপূর্ণ। «বাহিশতী যেওর» (যিকির অধ্যায়) ও «মা'আরিফুল কুরআন»-এ এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে।
৫. মসজিদে জামাতে নামাযে উপস্থিত থাকা
হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
الْمَلَائِكَةُ تُصَلِّي عَلَى أَحَدِكُمْ مَا دَامَ فِي مُصَلَّاهُ مَا لَمْ يُحْدِثْ: اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ، اللَّهُمَّ ارْحَمْهُ
"ফেরেশতারা তোমাদের কারো জন্য দুআ করতে থাকেন যতক্ষণ সে তার নামাযের স্থানে থাকে এবং উযূ ভঙ্গ না করে: 'হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করুন, হে আল্লাহ! তার প্রতি রহম করুন।'" (সহীহ বুখারী: ৬৪৫; সহীহ মুসলিম: ৬৪৯)
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে: জামাতে নামায আদায়ের ফযীলত «আল-হিদায়া» (কিতাবুস সালাত) ও «ফাতাওয়া উসমানী»-তে বিস্তারিত বর্ণিত। জামাতের সাথে নামায একাকী নামাযের চেয়ে ২৭ গুণ বেশি ফযীলতপূর্ণ (সহীহ বুখারী: ৬৪৫)।
৬. রোগীর সেবা করা
হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
مَنْ عَادَ مَرِيضًا أَوْ زَارَ أَخًا لَهُ فِي اللَّهِ نَادَاهُ مُنَادٍ: أَنْ طِبْتَ وَطَابَ مَمْشَاكَ وَتَبَوَّأْتَ مِنَ الْجَنَّةِ مَنْزِلًا
"যে ব্যক্তি কোনো রোগীকে দেখতে যায় বা আল্লাহর জন্য তার ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করে, একজন ঘোষণাকারী ঘোষণা করে: 'তুমি পবিত্র হলে, তোমার চলার পথ পবিত্র হলো এবং জান্নাতে তোমার বাসস্থান নির্ধারিত হলো।'" (সুনানে তিরমিযী: ২০০৮; ইবনে মাজাহ: ১৪৪৩)
রোগীর সেবায় ফেরেশতাদের উপস্থিতি ও দুআর বিষয় হাদীসে বর্ণিত। «রাদ্দুল মুহতার» (কিতাবুল জিহাদ, রোগীর সেবা অধ্যায়) ও «ইমদাদুল ফাতাওয়া»-তে এ বিষয়ে আলোচনা রয়েছে।
৭. ওযূ অবস্থায় ঘুমানো
হযরত ইবনে উমর (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
مَنِ اسْتَيْقَظَ مِنَ اللَّيْلِ فَقَالَ: لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ... ثُمَّ قَالَ: اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي... غُفِرَ لَهُ
"যে ব্যক্তি রাতে জাগ্রত হয়ে... 'হে আল্লাহ! আমাকে ক্ষমা করুন' বলবে, তাকে ক্ষমা করা হবে।" (সহীহ বুখারী: ১১৫৪)
আর ওযূ অবস্থায় ঘুমানোর ফযীলত সম্পর্কে হাদীসে এসেছে: "যে ব্যক্তি পবিত্র অবস্থায় রাত যাপন করে, তার সাথে ফেরেশতা রাত যাপন করে" (সুনানে তিরমিযী: ৮১৩)। «বাহিশতী যেওর»-এ ওযূর ফযীলত ও ঘুমানোর আদব বিস্তারিত।
৮. মুমিন ভাইয়ের জন্য দুআ করা (গায়েবানা)
হযরত আবু দারদা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
مَا مِنْ عَبْدٍ مُسْلِمٍ يَدْعُو لِأَخِيهِ بِظَهْرِ الْغَيْبِ إِلَّا قَالَ الْمَلَكُ: وَلَكَ بِمِثْلٍ
"কোনো মুসলিম বান্দা তার ভাইয়ের জন্য গায়েবানা দুআ করলে ফেরেশতা বলেন: 'তোমার জন্যও অনুরূপ (হোক)।'" (সহীহ মুসলিম: ২৭৩২)
হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে: গায়েবানা দুআ জায়েয ও ফযীলতপূর্ণ। «রাদ্দুল মুহতার» (কিতাবুদ দুআ) ও «ফাতাওয়া উসমানী»-তে এ বিষয়ে বিস্তারিত।
৯. সদকা করা
হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
مَا مِنْ يَوْمٍ يُصْبِحُ الْعِبَادُ فِيهِ إِلَّا مَلَكَانِ يَنْزِلَانِ، فَيَقُولُ أَحَدُهُمَا: اللَّهُمَّ أَعْطِ مُنْفِقًا خَلَفًا، وَيَقُولُ الْآخَرُ: اللَّهُمَّ أَعْطِ مُمْسِكًا تَلَفًا
"প্রতিদিন সকালে দুজন ফেরেশতা নাযিল হন। তাদের একজন বলেন: 'হে আল্লাহ! দানকারীকে বদলা দিন।' অপরজন বলেন: 'হে আল্লাহ! কৃপণকে ধ্বংস করুন।'" (সহীহ বুখারী: ১৪৪২; সহীহ মুসলিম: ১০১০)
১০. নামাযের পর ফেরেশতাদের দুআ
হযরত আবু হুরায়রা (রাযি.) থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
إِنَّ الْمَلَائِكَةَ تُصَلِّي عَلَى أَحَدِكُمْ مَا دَامَ فِي مُصَلَّاهُ... مَا لَمْ يُحْدِثْ
"ফেরেশতারা তোমাদের কারো জন্য দুআ করতে থাকেন যতক্ষণ সে নামাযের স্থানে থাকে, যতক্ষণ উযূ ভঙ্গ না হয়।" (সহীহ বুখারী: ৬৪৫)
আল্লাহ ভালো জানেন।