এমন কোনো আমল আছে শরীয়ত সম্মত যেটা করলে ফেরেশতারা আমার জন্য আল্লাহর কাছে মাফ চাবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
ফেরেশতাদের দুআ ও ইস্তিগফার লাভের শরীয়তসম্মত আমল
প্রশ্ন: এমন কোনো আমল আছে শরীয়ত সম্মত যেটা করলে ফেরেশতারা আমার জন্য আল্লাহর কাছে মাফ চাবে? আমার জন্য দোয়া করবে? ফেরেশতারা তো নিষ্পাপ।
উত্তর
আলহামদুলিল্লাহ, হ্যাঁ—কুরআন ও সুন্নাহে এমন বহু আমল বর্ণিত আছে, যেগুলো করার কারণে ফেরেশতারা বান্দার জন্য আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার ও দুআ করেন। ফেরেশতারা নিষ্পাপ (মাসুম) হওয়া সত্ত্বেও আল্লাহ তাআলা তাদেরকে মুমিনদের জন্য দুআ ও ইস্তিগফার করার দায়িত্ব দিয়েছেন—এটা বান্দার প্রতি আল্লাহর বিশেষ রহমত ও সম্মান।
নিচে কুরআন-হাদীস ও হানাফী কিতাবের আলোকে আমলগুলো উল্লেখ করা হলো:
১. জ্ঞান অন্বেষণ (ইলমে দ্বীন শিক্ষা)
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
رَبَّنَا اغْفِرْ لَنَا وَلِإِخْوَانِنَا الَّذِينَ سَبَقُونَا بِالْإِيمَانِ "হে আমাদের রব! আমাদের ক্ষমা করুন এবং আমাদের সেই ভাইদেরও, যারা ঈমানে আমাদের পূর্ববর্তী হয়েছে।" (সূরা হাশর: ১০)
হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
إِنَّ اللَّهَ وَمَلَائِكَتَهُ وَأَهْلَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرَضِينَ لَيُصَلُّونَ عَلَى مُعَلِّمِ النَّاسِ الْخَيْرَ "নিশ্চয়ই আল্লাহ, তাঁর ফেরেশতাগণ এবং আসমান-জমিনের অধিবাসীরা সেই ব্যক্তির জন্য দুআ করেন, যে মানুষকে কল্যাণ (দ্বীনী ইলম) শিক্ষা দেয়।" (তিরমিযী: ২৬৮৫)
ব্যাখ্যা: ইলম অন্বেষণকারী ও শিক্ষাদানকারীর জন্য ফেরেশতারা দুআ করেন। ইমাম নববী (রহ.) এ হাদীসের ব্যাখ্যায় বলেন, ফেরেশতাদের দুআ মানে তাদের ইস্তিগফার ও রহমতের প্রার্থনা। (শরহু সহীহ মুসলিম)
২. অসুস্থ ব্যক্তির সেবা করা
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
مَا مِنْ مُسْلِمٍ يَعُودُ مُسْلِمًا غُدْوَةً إِلَّا صَلَّى عَلَيْهِ سَبْعُونَ أَلْفَ مَلَكٍ حَتَّى يُمْسِيَ "কোনো মুসলিম যদি সকালে কোনো রোগী মুসলিমকে দেখতে যায়, তবে সন্ধ্যা পর্যন্ত সত্তর হাজার ফেরেশতা তার জন্য দুআ (রহমতের প্রার্থনা) করে।" (তিরমিযী: ৯৬৯; ইবনে মাজাহ: ১৪৪২)
৩. মসজিদে অবস্থান ও জামাতে নামায
হাদীসে এসেছে:
الْمَلَائِكَةُ تُصَلِّي عَلَى أَحَدِكُمْ مَا دَامَ فِي مَجْلِسِهِ الَّذِي صَلَّى فِيهِ، تَقُولُ: اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ، اللَّهُمَّ ارْحَمْهُ "তোমাদের কেউ যতক্ষণ নামাযের স্থানে (মসজিদে) বসে থাকে, ফেরেশতারা তার জন্য দুআ করতে থাকে—তারা বলে: 'হে আল্লাহ! তাকে ক্ষমা করুন, হে আল্লাহ! তার প্রতি রহম করুন।'" (বুখারী: ৪৪৫; মুসলিম: ৬৪৯)
হানাফী ফিকহের প্রয়োগ: ইমাম বদরুদ্দীন আইনী (রহ.) «عمدة القاري»-তে বলেন, এ হাদীস প্রমাণ করে মসজিদে অপেক্ষমাণ ব্যক্তির জন্য ফেরেশতাদের ইস্তিগফার চলমান থাকে।
৪. জানাযার নামাযে অংশগ্রহণ
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন:
مَنْ شَهِدَ الْجَنَازَةَ حَتَّى يُصَلَّى عَلَيْهَا فَلَهُ قِيرَاطٌ "যে ব্যক্তি জানাযায় উপস্থিত থাকে এবং জানাযার নামায পড়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে, তার জন্য এক কীরাত (সাওয়াব)।" (বুখারী: ১৩২৫)
সহীহ মুসলিমের অন্য বর্ণনায় এসেছে, জানাযায় উপস্থিত ব্যক্তির জন্য ফেরেশতারা দুআ করেন। (মুসলিম: ৯৪৫)
৫. সদকা ও দান-খয়রাত
আল্লাহ তাআলা বলেন:
وَمَا تُقَدِّمُوا لِأَنفُسِكُم مِّنْ خَيْرٍ تَجِدُوهُ عِندَ اللَّهِ "তোমরা নিজেদের জন্য যে কল্যাণ আগে পাঠাবে, তা আল্লাহর কাছে পাবে।" (সূরা বাকারা: ১১০)
হাদীসে রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন:
مَا مِنْ يَوْمٍ يُصْبِحُ الْعِبَادُ فِيهِ إِلَّا مَلَكَانِ يَنْزِلَانِ، فَيَقُولُ أَحَدُهُمَا: اللَّهُمَّ أَعْطِ مُنْفِقًا خَلَفًا "প্রতিদিন সকালে দুজন ফেরেশতা অবতীর্ণ হন; একজন বলেন: 'হে আল্লাহ! দানকারীকে বরকত দিন।'" (বুখারী: ১৪৪২; মুসলিম: ১০১০)
৬. কুরআন তিলাওয়াত ও কুরআন শিক্ষা
হাদীসে এসেছে:
مَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللَّهِ يَتْلُونَ كِتَابَ اللَّهِ ... إِلَّا حَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ "যে দল আল্লাহর ঘরে (মসজিদে) একত্র হয়ে আল্লাহর কিতাব তিলাওয়াত করে... তাদেরকে ফেরেশতারা ঘিরে রাখে।" (মুসলিম: ২৬৯৯)
৭. দ্বীনি মজলিসে উপস্থিত থাকা
রাসূল ﷺ বলেন:
إِنَّ لِلَّهِ مَلَائِكَةً سَيَّارَةً ... فَإِذَا وَجَدُوا مَجْلِسًا فِيهِ ذِكْرٌ جَلَسُوا مَعَهُمْ "আল্লাহর কিছু ভ্রমণকারী ফেরেশতা আছেন... যখন তারা কোনো মজলিসে আল্লাহর যিকির পায়, তারা তাদের সাথে বসে যায়।" (বুখারী: ৬৪০৮; মুসলিম: ২৭১৬)
৮. মুমিনদের জন্য দুআ করা (বিশেষত গায়েবানা দুআ)
রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন:
مَا مِنْ عَبْدٍ مُسْلِمٍ يَدْعُو لِأَخِيهِ بِظَهْرِ الْغَيْبِ إِلَّا قَالَ الْمَلَكُ: وَلَكَ بِمِثْلٍ "কোনো মুসলিম বান্দা তার ভাইয়ের জন্য গায়েবানা দুআ করলে ফেরেশতা বলেন: 'তোমার জন্যও অনুরূপ।'" (মুসলিম: ২৭৩২)
৯. মিসওয়াক ও পবিত্রতা রক্ষা
হাদীসে এসেছে, রাসূল ﷺ রাতে উঠে মিসওয়াক করতেন এবং নামায পড়তেন। (বুখারী: ২৪৫; মুসলিম: ২৫৫)
ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন, পবিত্রতা ও মিসওয়াক ফেরেশতাদের উপস্থিতির কারণ এবং বান্দার জন্য রহমতের মাধ্যম। (রাদ্দুল মুহতার: ১/১১৪)
১০. মৃত্যুর পরও চলমান সদকা ও ইলম
রাসূল ﷺ বলেন:
إِذَا مَاتَ الْإِنْسَانُ انْقَطَعَ عَمَلُهُ إِلَّا مِنْ ثَلَاثٍ: صَدَقَةٍ جَارِيَةٍ، أَوْ عِلْمٍ يُنْتَفَعُ بِهِ، أَوْ وَلَدٍ صَالِحٍ يَدْعُو لَهُ "মানুষ মৃত্যুবরণ করলে তার আমল বন্ধ হয়ে যায়, তবে তিনটি ছাড়া: চলমান সদকা, উপকারী ইলম, এবং নেক সন্তান যে তার জন্য দুআ করে।" (মুসলিম: ১৬৩১)
ফেরেশতারা নিষ্পাপ হওয়া সত্ত্বেও কেন দুআ করেন?
ইমাম তহাবী (রহ.) «আকীদাতুত তহাবীয়া»-তে বলেন, ফেরেশতারা আল্লাহর আদেশ পালনকারী, নিষ্পাপ এবং তাঁরা আল্লাহর নির্দেশেই বান্দার জন্য দুআ ও ইস্তিগফার করেন। এটি বান্দার প্রতি আল্লাহর রহমতের প্রকাশ।
আল্লামা আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.) «ফয়যুল বারী»-তে উল্লেখ করেন, ফেরেশতাদের দুআ বান্দার আমলের বরকত ও আল্লাহর নৈকট্যের কারণ। (ফয়যুল বারী: ২/৩৪৫)
মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ সূরা হাশরের ১০ নং আয়াতের ব্যাখ্যায় বলেন, ফেরেশতাদের ইস্তিগফার মুমিনদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশেষ সম্মান। (মাআরিফুল কুরআন: ৭/৫৪০)
উপসংহার
উপরোক্ত আমলগুলো শরীয়তসম্মত এবং কুরআন-সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। এগুলো করার মাধ্যমে ফেরেশতারা বান্দার জন্য আল্লাহর কাছে ইস্তিগফার ও দুআ করেন। তবে মনে রাখতে হবে—ফেরেশতাদের দুআ আল্লাহর অনুমতিক্রমেই হয়, এবং প্রকৃত ক্ষমা ও রহমতের মালিক একমাত্র আল্লাহ তাআলা। তাই তাওবা-ইস্তিগফার, নেক আমল ও দুআর মাধ্যমে সরাসরি আল্লাহর কাছেই ক্ষমা প্রার্থনা করা সর্বোত্তম।
আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে নেক আমল করার তাওফিক দান করুন। আমীন।
আল্লাহ ভালো জানেন।