পিতার মৃত্যুর পর রেখে যাওয়া রমজানের মাসের ফরয রোজাগুলো কি কন্যা রেখে দিলে হবে?নাকি রোজাগুলোর ফিদিয়া দিতে হবে?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
২।কোন মুমূর্ষু পুরুষ ব্যক্তিকে পাশে কি নন মাহরাম মহিলা স্পর্শ করতে পারবে। আশেপাশে যদি কেউ না থাকে অথবা থাকলেও তারা তাকে মেইনটেইন করতে পারছে না এমন জরুরি পরিস্থিতিতে কি ঐ মুমূর্ষু ব্যক্তিকে কি স্পর্শ করা যাবে?
Answer
ইসালে সওয়াব ও মুমূর্ষু ব্যক্তিকে স্পর্শ সংক্রান্ত ফতোয়া
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম
সমস্ত প্রশংসা আল্লাহ তাআলার জন্য, যিনি সমগ্র জগতের প্রতিপালক। দরুদ ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মদ ﷺ-এর উপর, তাঁর পরিবার-পরিজন ও সাহাবায়ে কেরামের উপর।
প্রথম প্রশ্ন: পিতার মৃত্যুর পর অবশিষ্ট ফরয রোজার বিধান
প্রশ্নের সারমর্ম
পিতার মৃত্যুর পর যদি রমজানের কিছু ফরয রোজা কাযা বাকি থাকে, তাহলে কি কন্যা সন্তান সেই রোজাগুলো রাখতে পারবে, নাকি ফিদিয়া দিতে হবে?
ফিকহী বিশ্লেষণ
মূলনীতি: হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে কেউ রোজা রাখতে পারে না। কারণ রোজা একটি শারীরিক ইবাদত (বাদানিয়্যাহ ইবাদত), যা প্রত্যেক ব্যক্তিকে নিজে আদায় করতে হয়। কেউ কারও পক্ষ থেকে রোজা রাখলে তা আদায় হবে না।
দলিল:
১. হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন—
«لَا يُصَلِّي أَحَدٌ عَنْ أَحَدٍ، وَلَا يَصُومُ أَحَدٌ عَنْ أَحَدٍ»
"কেউ কারও পক্ষ থেকে নামায আদায় করবে না এবং কেউ কারও পক্ষ থেকে রোজা রাখবে না।"
— (সুনানে নাসাঈ, হাদিস নং ২৩১৫; সুনানে আবু দাউদ, হাদিস নং ২৪০০; মুসনাদে আহমাদ)
২. হাদিস: ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, এক ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ ﷺ-কে জিজ্ঞাসা করল, "আমার মা মারা গেছেন এবং তাঁর এক মাসের রোজা বাকি আছে। আমি কি তাঁর পক্ষ থেকে রোজা রাখব?" রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন—
«لَوْ كَانَ عَلَى أُمِّكَ دَيْنٌ أَكُنْتَ قَاضِيَهُ؟» قَالَ: نَعَمْ. قَالَ: «فَدَيْنُ اللَّهِ أَحَقُّ أَنْ يُقْضَى»
"যদি তোমার মায়ের উপর ঋণ থাকত, তুমি কি তা পরিশোধ করতে? সে বলল: হ্যাঁ। তিনি বললেন: আল্লাহর ঋণ (ইবাদত) পরিশোধের অধিক হকদার।"
— (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ১৯৫৩; সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১১৪৮)
তবে হানাফি মাযহাবের ব্যাখ্যা: ইমাম আবু হানিফা রহ. এবং ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর মতে, এই হাদিসে উল্লিখিত "আল্লাহর ঋণ" বলতে নফল রোজা বা মানতের রোজা (সদকা-ফিতর বা ফিদিয়ার মাধ্যমে) বোঝানো হয়েছে, ফরয রোজা নয়। ফরয রোজার ক্ষেত্রে ফিদিয়া দিতে হবে, কেউ তার পক্ষ থেকে রোজা রাখতে পারবে না।
ইমাম তহাবী রহ. বলেন:
«وَالْحُجَّةُ فِي ذَلِكَ أَنَّ الصَّوْمَ لَا يَكُونُ إِلَّا مِنَ الصَّائِمِ نَفْسِهِ، وَلَا يَصِحُّ مِنْ غَيْرِهِ عَنْهُ»
"এ বিষয়ে দলিল হলো— রোজা কেবল রোজাদার নিজেই আদায় করতে পারে, অন্য কেউ তার পক্ষ থেকে আদায় করলে তা সহিহ হয় না।"
— (শরহু মাআনিল আসার, কিতাবুস সিয়াম)
ইমাম সারাখসী রহ. বলেন:
«وَلَا يَصُومُ أَحَدٌ عَنْ مَيِّتٍ فِي قَوْلِ أَبِي حَنِيفَةَ وَمُحَمَّدٍ رَحِمَهُمَا اللَّهُ، وَبِهِ نَأْخُذُ»
"ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর মতে কেউ মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে রোজা রাখবে না; আমরা এই মতই গ্রহণ করি।"
— (আল-মাবসূত, কিতাবুস সিয়াম)
ইমাম কাসানী রহ. (আল-হিদায়া):
«وَلَا يَصُومُ عَنْهُ وَلِيُّهُ، وَلَكِنْ يُطْعِمُ عَنْهُ لِكُلِّ يَوْمٍ مِسْكِينًا»
"মৃত ব্যক্তির পক্ষ থেকে তার অভিভাবক রোজা রাখবে না; বরং প্রত্যেক দিনের বিনিময়ে একজন মিসকিনকে খাবার খাওয়াবে (ফিদিয়া)।"
— (আল-হিদায়া, কিতাবুস সিয়াম)
ইবনে আবিদিন শামী রহ. (রাদ্দুল মুহতার):
«لَا يَصُومُ أَحَدٌ عَنْ أَحَدٍ حَيًّا كَانَ أَوْ مَيِّتًا، وَالْفَرْضُ يُفْدَى عَنْهُ»
"কেউ কারও পক্ষ থেকে রোজা রাখবে না— সে জীবিত হোক বা মৃত; আর ফরয রোজার ক্ষেত্রে ফিদিয়া দিতে হবে।"
— (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, কিতাবুস সিয়াম)
ফিদিয়ার পরিমাণ ও পদ্ধতি
ফিদিয়ার পরিমাণ: প্রত্যেক রোজার বিনিময়ে এক সা' (প্রায় ৩.৩ কেজি গম বা তার সমমূল্য) অথবা অর্ধ সা' (প্রায় ১.৬৫ কেজি গম) — হানাফি মাযহাব অনুযায়ী অর্ধ সা' গম বা তার মূল্য দেওয়াই যথেষ্ট। তবে উত্তম হলো এক সা' পরিমাণ খাদ্য বা তার মূল্য দেওয়া।
পদ্ধতি: প্রত্যেক রোজার জন্য একজন মিসকিনকে খাবার দেওয়া বা তার মূল্য দেওয়া। চাইলে এক মিসকিনকে একাধিক দিনের ফিদিয়া একসাথে দেওয়া যাবে।
ইবনে আবিদিন রহ. বলেন:
«وَالْفِدْيَةُ عَنْ كُلِّ يَوْمٍ نِصْفُ صَاعٍ مِنْ بُرٍّ أَوْ صَاعٌ مِنْ تَمْرٍ أَوْ شَعِيرٍ»
"প্রত্যেক দিনের ফিদিয়া হলো অর্ধ সা' গম অথবা এক সা' খেজুর বা যব।"
— (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২)
ফতোয়ায়ে উসমানী ও ইমদাদুল ফতোয়া থেকে
মুফতি তাকি উসমানী সাহেব বলেন:
"মৃত ব্যক্তির ফরয রোজার কাযা কেউ তার পক্ষ থেকে আদায় করতে পারবে না; বরং ফিদিয়া দিতে হবে। ফিদিয়া হলো প্রত্যেক রোজার বিনিময়ে অর্ধ সা' গম বা তার মূল্য।"
— (ফতোয়ায়ে উসমানী, খণ্ড ২, কিতাবুস সিয়াম)
মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ. (ইমদাদুল ফতোয়া):
"মৃত ব্যক্তির ফরয রোজার জন্য ফিদিয়া দেওয়া ওয়াজিব। কন্যা বা পুত্র কেউই তার পক্ষ থেকে রোজা রাখতে পারবে না।"
— (ইমদাদুল ফতোয়া, খণ্ড ২)
উপসংহার (প্রথম প্রশ্ন)
পিতার মৃত্যুর পর অবশিষ্ট ফরয রোজাগুলো কন্যা রাখতে পারবে না। বরং প্রত্যেক রোজার বিনিময়ে ফিদিয়া (অর্ধ সা' গম বা তার মূল্য) দিতে হবে। এটি পিতার সম্পত্তি থেকে দেওয়া হবে; যদি সম্পত্তি না থাকে, তাহলে সন্তানরা নিজেদের পক্ষ থেকে দিতে পারবে (এটি নফল সদকা হিসেবে গণ্য হবে)। তবে ফরয রোজার ক্ষেত্রে কেউ কারও পক্ষ থেকে রোজা রাখতে পারবে না— এটি হানাফি মাযহাবের অকাট্য বিধান।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: মুমূর্ষু পুরুষকে নন-মাহরাম মহিলার স্পর্শ
প্রশ্নের সারমর্ম
কোন মুমূর্ষু পুরুষ ব্যক্তিকে কি নন-মাহরাম মহিলা স্পর্শ করতে পারবে? আশেপাশে কেউ না থাকলে বা থাকলেও তারা তাকে মেইনটেইন করতে না পারলে জরুরি পরিস্থিতিতে কি স্পর্শ করা যাবে?
ফিকহী বিশ্লেষণ
মূলনীতি: ইসলামে নন-মাহরাম পুরুষ ও নারীর মধ্যে স্পর্শ (লামস) সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ (হারাম)। এটি কুরআন ও সুন্নাহ দ্বারা প্রমাণিত। তবে জরুরি অবস্থা (দারুরাত) -এ ইসলাম কিছু বিধান শিথিল করে, যা শরীয়তের একটি মৌলিক নীতি।
দলিল:
১. কুরআন: আল্লাহ তাআলা বলেন—
﴿وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا﴾
"তোমরা ব্যভিচারের নিকটেও যেয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ।"
— (সূরা আল-ইসরা: ৩২)
২. কুরআন: আল্লাহ তাআলা আরও বলেন—
﴿قُل لِّلْمُؤْمِنِينَ يَغُضُّوا مِنْ أَبْصَارِهِمْ وَيَحْفَظُوا فُرُوجَهُمْ ۚ ذَٰلِكَ أَزْكَىٰ لَهُمْ﴾
"মুমিন পুরুষদের বলো, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করবে; এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র।"
— (সূরা আন-নূর: ৩০)
৩. হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন—
«لَأَنْ يُطْعَنَ فِي رَأْسِ أَحَدِكُمْ بِمِخْيَطٍ مِنْ حَدِيدٍ خَيْرٌ لَهُ مِنْ أَنْ يَمَسَّ امْرَأَةً لَا تَحِلُّ لَهُ»
"তোমাদের কারও মাথায় লোহার সুচ ফোটানো তার জন্য উত্তম, নন-মাহরাম নারীকে স্পর্শ করার চেয়ে।"
— (সুনানে তিরমিজি, হাদিস নং ১১৭৩; মুসনাদে আহমাদ)
৪. হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন—
«إِنِّي لَا أُصَافِحُ النِّسَاءَ»
"আমি নারীদের সাথে মুসাফাহা (হাত মিলানো) করি না।"
— (সুনানে নাসাঈ, হাদিস নং ৪১৮৬)
৫. হাদিস: আয়েশা রা. বলেন—
«وَاللَّهِ مَا مَسَّتْ يَدُ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ يَدَ امْرَأَةٍ قَطُّ إِلَّا امْرَأَةً يَمْلِكُهَا»
"আল্লাহর কসম! রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাত কোনো নারীর হাত স্পর্শ করেনি, তবে যে নারী তাঁর মালিকানায় ছিল (স্ত্রী বা দাসী)।"
— (সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৫২৮৮)
জরুরি অবস্থার বিধান (দারুরাত)
শরীয়তের মূলনীতি:
«الضَّرُورَاتُ تُبِيحُ الْمَحْظُورَاتِ»
"জরুরি অবস্থা নিষিদ্ধ বস্তুকে বৈধ করে দেয়।"
— (আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর, ইবনে নুজাইম)
«إِذَا ضَاقَ الْأَمْرُ اتَّسَعَ»
"যখন বিষয় সংকীর্ণ হয়, তখন তা প্রশস্ত হয়ে যায়।"
— (আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর)
তবে শর্ত: জরুরি অবস্থা কেবল ততটুকুই অনুমতি দেয় যতটুকু প্রয়োজন। একে "দারুরাত" বলে। যেমন— কেউ যদি অনাহারে মৃত্যুর মুখে পড়ে, তবে মৃত প্রাণী (ময়লা) খেতে পারবে, কিন্তু পেট ভরে নয়— কেবল প্রাণ রক্ষার পরিমাণ।
আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতারে বর্ণিত:
«وَيَجُوزُ لِلطَّبِيبِ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى مَوْضِعِ الْمَرَضِ وَيَمَسَّهُ عِنْدَ الْحَاجَةِ، وَكَذَا لِلْقَابِلَةِ»
"চিকিৎসকের জন্য রোগের স্থান দেখা ও প্রয়োজনে স্পর্শ করা জায়েয; তেমনি ধাত্রীর জন্যও।"
— (আল-হিদায়া; রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯)
ইবনে আবিদিন রহ. বলেন:
«الضَّرُورَةُ تُقَدَّرُ بِقَدْرِهَا»
"জরুরত তার পরিমাণ অনুযায়ী অনুমতি দেয়।"
— (রাদ্দুল মুহতার)
মুমূর্ষু ব্যক্তির ক্ষেত্রে বিশ্লেষণ
পরিস্থিতি ১: মাহরাম পুরুষ উপস্থিত থাকলে যদি মুমূর্ষু ব্যক্তির পাশে তার মাহরাম পুরুষ (যেমন— পুত্র, ভাই, পিতা, চাচা) উপস্থিত থাকে এবং তারা তাকে মেইনটেইন করতে পারে, তাহলে নন-মাহরাম মহিলার স্পর্শ করা সম্পূর্ণ হারাম। এমনকি মৃত্যুর সময়েও।
পরিস্থিতি ২: মাহরাম পুরুষ না থাকলে বা তারা মেইনটেইন করতে না পারলে যদি সত্যিই কোনো মাহরাম পুরুষ না থাকে অথবা থাকলেও তারা শারীরিকভাবে অক্ষম হয় (যেমন— বৃদ্ধ, অসুস্থ, বা অক্ষম), এবং মুমূর্ষু ব্যক্তির প্রাণ রক্ষা বা প্রয়োজনীয় সেবা প্রদানের জন্য নন-মাহরাম মহিলার স্পর্শ ছাড়া কোনো উপায় না থাকে— তাহলে শরীয়তের দারুরাত নীতির ভিত্তিতে সীমিত পরিমাণে স্পর্শ করা জায়েয হবে। তবে শর্তগুলো হলো:
১. সত্যিকার জরুরত প্রমাণিত হতে হবে— কেবল অসুবিধা নয়। ২. প্রয়োজন পরিমাণ স্পর্শ করা যাবে— অতিরিক্ত নয়। ৩. যতটা সম্ভব পর্দা রক্ষা করতে হবে— যেমন গ্লাভস ব্যবহার, কাপড়ের আড়াল ইত্যাদি। ৪. কামভাব (শাহওয়াত) থেকে মুক্ত থাকতে হবে।
আল্লাহ ভালো জানেন।