সবার রিজিকি কি আল্লাহর পক্ষ থেকে পূর্বনির্ধারিত ? যারা পতিতা তাদের রিজিক কি এভাবেই নির্ধারিত?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 7882
Questioner: Binte Tahsin
Question Asked: 03 Nov 2026, 06:49 PM
Reviewed & Published: 03 Nov 2026, 07:00 PM
Views: 31
Tokens: 5,960
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

সবার রিযক্ব তো পূর্বনির্ধারিত আল্লাহর পক্ষ থেকে তাহলে যারা পতিতা তারা রিযিক্ব কি এভাবেই নির্ধারিত?
অথবা যারা হারাম সহশিক্ষা ছেড়ে দেয় (মেয়ে) তারা পরবর্তীতে রিযিকের তাগিতে অসহায় হয়ে পড়ে(স্বামী মারা গেলে বা ছেড়ে দিলে), পর্দায় ছাড় দিতে হয় তাদের ব্যাপারে কি বলা যায়?
এরকম প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় সঠিক, উপযুক্ত উত্তর আশা করছি।

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রশ্নটি দুটি অংশে বিভক্ত। প্রথমত, রিযিক্ব কি পূর্বনির্ধারিত এবং পতিতাদের রিযিক্ব কি এভাবেই নির্ধারিত? দ্বিতীয়ত, পর্দা ও হারাম সহশিক্ষা ছেড়ে দেওয়া মেয়েরা স্বামীর মৃত্যু বা বিচ্ছেদের পর অসহায় হয়ে পড়লে এবং রিযিক্বের প্রয়োজনে পর্দায় ছাড় দিতে বাধ্য হলে শরীয়তের বিধান কী?

নিচে কুরআন, হাদীস ও হানাফী ফিকহের প্রামাণ্য কিতাবের আলোকে বিস্তারিত উত্তর প্রদান করা হলো।


প্রথম অংশ: রিযিক্ব কি পূর্বনির্ধারিত? পতিতাদের রিযিক্ব কি এভাবেই নির্ধারিত?

১. রিযিক্বের মূল উৎস ও নির্ধারণ

আল্লাহ তাআলা কুরআনে ইরশাদ করেন:

وَمَا مِن دَابَّةٍ فِي الْأَرْضِ إِلَّا عَلَى اللَّهِ رِزْقُهَا "পৃথিবীতে বিচরণশীল প্রতিটি প্রাণীর রিযিক্ব আল্লাহরই দায়িত্বে।" (সূরা হূদ: ৬)

إِنَّ اللَّهَ هُوَ الرَّزَّاقُ ذُو الْقُوَّةِ الْمَتِينُ "নিশ্চয়ই আল্লাহই রিযিক্বদাতা, শক্তির অধিকারী, পরাক্রমশালী।" (সূরা যারিয়াত: ৫৮)

হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

إِنَّ أَحَدَكُمْ يُجْمَعُ خَلْقُهُ فِي بَطْنِ أُمِّهِ أَرْبَعِينَ يَوْمًا... ثُمَّ يُؤْمَرُ بِأَرْبَعِ كَلِمَاتٍ: بِكَتْبِ رِزْقِهِ وَأَجَلِهِ وَعَمَلِهِ وَشِقْوَتِهِ أَوْ سَعَادَتِهِ "তোমাদের প্রত্যেকের সৃষ্টি মায়ের গর্ভে চল্লিশ দিনে সংগৃহীত হয়... অতঃপর তাকে চারটি বিষয় লিখার আদেশ দেওয়া হয়: তার রিযিক্ব, তার আয়ু, তার আমল এবং তার সৌভাগ্য বা দুর্ভাগ্য।" (সহীহ বুখারী: ৩২০৮; সহীহ মুসলিম: ২৬৪৩)

তাহলে রিযিক্ব নির্ধারিত—এতে কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু এখানে একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বুঝতে হবে:

২. রিযিক্বের নির্ধারণ ও উপার্জনের মাধ্যমের পার্থক্য

হানাফী ফিকহের উসূল অনুযায়ী, আল্লাহ তাআলা রিযিক্বের পরিমাণ নির্ধারণ করেছেন, কিন্তু মাধ্যম (আসবাব) নির্ধারণ করেছেন মানুষের কর্ম ও ইখতিয়ারের ওপর। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ এবং ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর অনুসারী ফুকাহায়ে কেরাম এ বিষয়ে স্পষ্ট করেছেন যে, রিযিক্বের তাকদীর কখনো হারাম উপার্জনকে হালাল বা বৈধ করে না।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

يَا أَيُّهَا النَّاسُ كُلُوا مِمَّا فِي الْأَرْضِ حَلَالًا طَيِّبًا وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ "হে মানুষ! পৃথিবীতে যা হালাল ও পবিত্র তা থেকে আহার করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না।" (সূরা বাকারা: ১৬৮)

وَلَا تَقْتُلُوا أَنفُسَكُمْ... وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا "নিজেদের হত্যা করো না... আর যিনার নিকটবর্তী হয়ো না; নিশ্চয়ই তা অশ্লীল কাজ ও মন্দ পথ।" (সূরা বনী ইসরাঈল: ৩২-৩৩)

সুতরাং সিদ্ধান্ত: পতিতাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে যে রিযিক্ব নির্ধারিত হয়েছে, তা ব্যভিচারের মাধ্যমেই অর্জন করতে হবে—এমন কোনো অর্থে নির্ধারিত নয়। বরং তাদের রিযিক্বও হালাল পথে নির্ধারিত আছে; কিন্তু তারা নিজের ইচ্ছায় হারাম পথ বেছে নিয়েছে। তাকদীরের ভুল ব্যাখ্যা দিয়ে হারামকে বৈধ বলা কুফরী ও গোমরাহীর অন্তর্ভুক্ত। ইমাম তাহাবী (রহ.) "আল-আকীদা আত-তাহাবিয়্যাহ"-এ এবং ইমাম আবু হানীফা (রহ.) "আল-ফিকহুল আকবার"-এ স্পষ্ট করেছেন যে, তাকদীরে বিশ্বাস রাখা ফরজ, কিন্তু তাকদীরকে গুনাহের অজুহাত বানানো জায়েয নয়।

৩. রিযিক্বের জন্য হালাল পথ অবলম্বন করা ফরজ

রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

لَا يَأْتِي أَحَدُكُمْ رِزْقُهُ إِلَّا كَمَا يَأْتِيهِ أَجَلُهُ "তোমাদের কারো কাছে রিযিক্ব আসবে ঠিক তেমনি যেভাবে তার মৃত্যু আসবে।" (মুসনাদ আহমাদ)

অর্থাৎ রিযিক্ব আল্লাহর পক্ষ থেকে আসবেই, কিন্তু তা হালাল পথেই আসবে। হারাম পথে অর্জিত সম্পদকে শরীয়ত "খাবীস" (অপবিত্র) বলে আখ্যায়িত করেছে। ইমাম আনোয়ার শাহ কাশ্মীরী (রহ.) "ফয়যুল বারী"-তে এবং মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) "মা'আরিফুল কুরআন"-এ সূরা বাকারার ১৬৮ নং আয়াতের তাফসীরে স্পষ্ট করেছেন যে, রিযিক্বের তালাশে হারাম পথ অবলম্বন করা তাকদীরের ওপর ভরসা নয়, বরং নফসের কুপ্রবৃত্তির অনুসরণ।


দ্বিতীয় অংশ: পর্দা ও হারাম সহশিক্ষা ছেড়ে দেওয়া মেয়েরা অসহায় হলে কী করবে?

১. পর্দা ফরজ—এতে কোনো ছাড় নেই

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

وَقُل لِّلْمُؤْمِنَاتِ يَغْضُضْنَ مِنْ أَبْصَارِهِنَّ وَيَحْفَظْنَ فُرُوجَهُنَّ وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا... "মুমিন নারীদের বলো, তারা তাদের দৃষ্টি সংযত রাখবে, লজ্জাস্থান হেফাজত করবে এবং যা প্রকাশ্য তা ছাড়া তাদের সৌন্দর্য প্রদর্শন করবে না..." (সূরা নূর: ৩১)

يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ قُل لِّأَزْوَاجِكَ وَبَنَاتِكَ وَنِسَاءِ الْمُؤْمِنِينَ يُدْنِينَ عَلَيْهِنَّ مِن جَلَابِيبِهِنَّ "হে নবী! আপনার স্ত্রী, কন্যা ও মুমিন নারীদের বলুন, তারা যেন তাদের চাদরের কিছু অংশ নিজেদের ওপর টেনে দেয়।" (সূরা আহযাব: ৫৯)

হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:

الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ، فَإِذَا خَرَجَتِ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ "নারী হলো সতর (গোপনীয় বস্তু); যখন সে বের হয়, শয়তান তার দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করে।" (তিরমিযী: ১১৭৩)

সুতরাং পর্দা আল্লাহর ফরজ বিধান। রিযিক্বের প্রয়োজনে বা দারিদ্র্যের ভয়ে পর্দা ত্যাগ করা কোনোভাবেই জায়েয নয়। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ (খণ্ড ৬, কিতাবুল হাযর ওয়াল ইবাহা) এবং ইমাম বুরহানুদ্দীন আল-মারগীনানী (রহ.) "আল-হিদায়া"-তে স্পষ্ট করেছেন যে, সতর ও পর্দা সংক্রান্ত বিধান দারিদ্র্য বা প্রয়োজনের কারণে রহিত হয় না।

২. রিযিক্বের দায়িত্ব আল্লাহর—তিনি হালাল পথে দিবেন

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا ۞ وَيَرْزُقْهُ مِنْ حَيْثُ لَا يَحْتَسِبُ "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন এবং তাকে এমন জায়গা থেকে রিযিক্ব দেন যা সে কল্পনাও করেনি।" (সূরা তালাক: ২-৩)

وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُم مِّنْ إِمْلَاقٍ نَّحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ "দারিদ্র্যের ভয়ে তোমরা নিজেদের সন্তানদের হত্যা করো না; আমিই তোমাদের ও তাদের রিযিক্ব দিই।" (সূরা আনআম: ১৫১)

এ আয়াতগুলো স্পষ্ট প্রমাণ যে, তাকওয়া ও পর্দা রিযিক্বের প্রতিবন্ধক নয়, বরং রিযিক্বের নিশ্চয়তার কারণ। মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) "মা'আরিফুল কুরআন"-এ সূরা তালাকের তাফসীরে লিখেছেন: "তাকওয়া রিযিক্ব কমায় না, বরং বাড়ায়; কারণ রিযিক্বের প্রকৃত মালিক আল্লাহ, এবং তিনি মুত্তাকীদের জন্য অকল্পনীয় উৎস থেকে রিযিক্বের ব্যবস্থা করেন।"

৩. স্বামীর মৃত্যু বা বিচ্ছেদের পর নারীর করণীয়

শরীয়ত নারীর জন্য একাধিক হালাল উপায় নির্ধারণ করেছে:

ক) ইদ্দত পালন ও আল্লাহর ওপর ভরসা: সূরা তালাকের ১-৭ নং আয়াতে আল্লাহ তাআলা তালাক ও ইদ্দতের বিধান বর্ণনা করে বলেছেন, "যে আল্লাহকে ভয় করে, আল্লাহ তার জন্য উত্তরণের পথ করে দেন।"

খ) উত্তরাধিকার ও ভরণপোষণ: ইসলাম নারীকে পিতা, স্বামী, পুত্র ও ভাইয়ের সম্পদে উত্তরাধিকার দিয়েছে (সূরা নিসা: ৭, ১১, ১২)। স্বামীর মৃত্যু হলে ইদ্দতকালীন ভরণপোষণ ও মোহরের হক রয়েছে।

গ) হালাল উপার্জনের সুযোগ: নারী নিজের সম্পদ, উত্তরাধিকার, হালাল ব্যবসা, হস্তশিল্প, অনলাইন হালাল ব্যবসা, শিক্ষকতা (পর্দার বিধান রক্ষা করে), ঘরে বসে হালাল কাজ ইত্যাদির মাধ্যমে রিযিক্ব অর্জন করতে পারে। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর ফতোয়া অনুযায়ী নারীর স্বাধীনভাবে সম্পদ অর্জন ও ব্যবসার অধিকার রয়েছে (আল-হিদায়া, কিতাবুল বুয়ূ)।

ঘ) রাষ্ট্র ও সমাজের দায়িত্ব: ইসলামী রাষ্ট্রে বাইতুল মাল ও যাকাতের ব্যবস্থা রয়েছে অসহায়দের জন্য। মুসলিম সমাজের দায়িত্ব হলো বিধবা ও অসহায় নারীদের সহায়তা করা। ফাতাওয়া আলমগীরীতে (কিতাবুয যাকাত) স্পষ্ট যে, যাকাতের অন্যতম খাত "আল-গারিমীন" ও "আল-মাসাকীন"-এর অন্তর্ভুক্ত বিধবারা।

ঙ) পুনর্বিবাহ: শরীয়ত বিধবাকে পুনর্বিবাহের অনুমতি দিয়েছে (সূরা বাকারা: ২৩৪-২৩৫)। এটি রিযিক্ব ও নিরাপত্তার একটি হালাল পথ।

৪. পর্দায় ছাড় দেওয়া কি জায়েয?

কোনোভাবেই জায়েয নয়। ইমাম ইবনে আবিদীন (রহ.) "রাদ্দুল মুহতার"-এ এবং মুফতি তাকী উসমানী (রহ.) "ফাতাওয়া উসমানী"-তে (খণ্ড ২, কিতাবুল হাযর) স্পষ্ট করেছেন:

  • সতর ও পর্দার বিধান কাটা-ছেঁড়ার অজুহাতে রহিত হয় না।
  • দারিদ্র্য, অসহায়ত্ব বা রিযিক্বের ভয়—কোনো কারণেই নারীর জন্য পরপুরুষের সামনে সৌন্দর্য প্রকাশ বা পর্দা ত্যাগ করা বৈধ নয়।
  • যদি কেউ বলে "রিযিক্বের জন্য পর্দা ছাড়তে হয়", তবে তা শয়তানের প্ররোচনা এবং তাকদীরের ভুল ব্যাখ্যা।

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) "বেহেশতী যেওর"-এ (নামায ও পর্দা অধ্যায়) লিখেছেন: "পর্দা ত্যাগ করে রিযিক্বের তালাশ করা সেই ব্যক্তির মতো, যে আগুনে হাত দিয়ে ঠান্ডা খোঁজে।"

৫. হারাম সহশিক্ষা ছেড়ে দেওয়ার বিষয়

হারাম সহশিক্ষা (যেখানে পর্দার বিধান লঙ্ঘিত হয়, পরপুরুষের সাথে অবাধ মেলামেশা হয়) ছেড়ে দেওয়া অবশ্যই কর্তব্য। এটি ত্যাগ করার কারণে রিযিক্ব বন্ধ হয় না। বরং আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مَخْرَجًا

মুফতি মুহাম্মদ শফী (রহ.) "ইমদাদুল ফাতাওয়া"-তে (খণ্ড ৪) লিখেছেন: "পর্দা ও হারাম মেলামেশা ত্যাগ করার কারণে যদি কোনো নারী আর্থিক কষ্টে পড়ে, তবে সে যেন আল্লাহর ওপর ভরসা রাখে এবং হালাল উপার্জনের বিকল্প পথ খোঁজে; পর্দা ত্যাগ করা তো দূরের কথা, পর্দায় সামান্য ছাড় দেওয়াও তার জন্য বৈধ নয়।"


আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.