মৃত্যুর পর ৫/৭/৩০/৪০ দিনে মিলাদ, কুলখানি ও খিচুড়ি-বিরানি খাওয়ানোর বিধান কী? বিদআতের অনুষ্ঠানের খাবার খাওয়া জায়েজ কি?
Food and Drink · Hanafi
Question
মানুষ মারা যাবার পর অনেক দেখা যায় কেউ ৪০ দিন পর কেউ ৩০ দিন পর কেউ সাত দিন করার পর কেউ পাঁচ দিন পর মিলাদ পড়ায় মসজিদের ইমাম দেখে মিলাদ পড়ানো হয় তার জন্য দোয়া করা হয়। তারপর এলাকাবাসীকে খিচুড়ি বা বিরানি খাওয়ানো হয় খাওয়ানো হয়।
আমি দাওয়াত এ যাই নি।
কিন্ত উনারা আমার আত্নীয় যদি বাড়ি পাঠাই দেই তাহলে কি খাওয়া যাবে। বা তি খাবার খাওয়ার জায়েজ কি
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর:
আপনার আত্মীয়রা যদি মিলাদ/কুলখানির অনুষ্ঠান থেকে খাবার পাঠায়, তবে শুধু খাবারটি হালাল হওয়ার কারণে সেটি খাওয়া নিষিদ্ধ নয়; তবে মিলাদ-কুলখানি, নির্দিষ্ট দিনে মৃত্যুবাষিকী পালন, ইমামকে টাকা দিয়ে মিলাদ পড়ানো ইত্যাদি বিদআত ও গুনাহের কাজ। তাই এ ধরনের অনুষ্ঠানের খাবার গ্রহণ না করাই উত্তম ও সতর্কতাপূর্ণ। যদি খেতে হয়, তবে অন্তরে বিদআতকে সমর্থন না করে এবং ওই অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ না করে খাওয়া যাবে; তবে সম্পূর্ণ এড়িয়ে যাওয়াই তাকওয়ার দাবি।
বিস্তারিত:
১. মৃত্যুর পর নির্দিষ্ট দিনে (৫/৭/৩০/৪০ দিনে) মিলাদ, কুলখানি, খতমে কুরআন, খিচুড়ি/বিরানি খাওয়ানো—এসব ইসলামে প্রমাণিত নয়।
রাসূলুল্লাহ ﷺ, সাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও ফুকাহায়ে কেরামের যুগে এ ধরনের রীতি ছিল না। এটি পরবর্তীতে প্রবর্তিত বিদআত।
রাসূল ﷺ বলেছেন:
مَنْ أَحْدَثَ فِي أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ
“যে ব্যক্তি আমাদের এই দ্বীনের মধ্যে এমন নতুন বিষয় প্রবর্তন করবে, যা তার অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত।”
— সহীহ বুখারী, হাদীস ২৬৯৭; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৭১৮
আরও ইরশাদ হয়েছে:
وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ
“প্রতিটি বিদআতই পথভ্রষ্টতা।”
— সহীহ মুসলিম, হাদীস ৮৬৭
২. মৃতের জন্য দোয়া, ইস্তিগফার ও সদকা করা সুন্নত ও সওয়াবের কাজ।
কিন্তু তা নির্দিষ্ট দিন, নির্দিষ্ট খাবার বা নির্দিষ্ট অনুষ্ঠানের সাথে আবদ্ধ করা যাবে না। মৃতের জন্য দোয়া করা, কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াব পৌঁছানো এবং গরিব-মিসকিনকে সদকা করা—এসব শরীয়তসম্মত। তবে তা বিদআতের অনুষ্ঠান হিসেবে নয়, বরং নিঃশব্দে ও সুন্নাহ অনুযায়ী হওয়া চাই।
৩. মসজিদের ইমামকে টাকা দিয়ে মিলাদ পড়ানো:
ইমামতি ও দ্বীনি খেদমতের বিনিময়ে বৈধ পারিশ্রমিক দেওয়া যায়, কিন্তু নির্দিষ্ট দিনে মিলাদ পড়ানোর শর্তে টাকা দেওয়া বা মিলাদকে পারিশ্রমিকের মাধ্যম বানানো বিদআত ও গুনাহের কাজ। ইমাম সাহেবের জন্য এ ধরনের অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া উচিত নয়; তিনি শরীয়তের বিধান জানিয়ে লোকদেরকে সুন্নাহর দিকে ফেরানোই তার দায়িত্ব।
৪. খাবার খাওয়ার হুকুম:
মূলত খাবারের বস্তু হালাল হলে তা খাওয়া জায়েজ। বিদআতের অনুষ্ঠান থেকে পাঠানো খাবার শুধু এ কারণে হারাম হয়ে যায় না। তবে ফুকাহায়ে কেরাম লিখেছেন, বিদআত ও গুনাহের অনুষ্ঠানে উপস্থিত হওয়া এবং তাতে অংশগ্রহণ করা নিষিদ্ধ; আর যারা এমন অনুষ্ঠান করে, তাদেরকে উৎসাহিত করা থেকেও বিরত থাকা উচিত।
ইমাম ইবনে আবিদিন রহ. «رد المحتار»-এ বিদআতের মজলিসে উপস্থিত হওয়ার ব্যাপারে কঠোর নিষেধ উল্লেখ করেছেন এবং গুনাহের কাজে সহযোগিতা না করার নির্দেশ দিয়েছেন।
আল্লাহ তা‘আলা বলেন:
وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ
“তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।”
— সূরা আল-মায়িদা: ২
৫. আপনার করণীয়:
- মিলাদ/কুলখানির অনুষ্ঠানে যাওয়া থেকে বিরত থাকুন; আপনি ইতিমধ্যে না যাওয়ায় ভালো করেছেন।
- আত্মীয়রা খাবার পাঠালে সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে সম্পর্ক নষ্ট না করে ভদ্রভাবে বলতে পারেন যে আপনি এ ধরনের বিদআতের অনুষ্ঠানে অংশ নেন না; তবে খাবারটি যদি পাঠায়, তবে শুধু খাদ্য হিসেবে খাওয়া যাবে—এতে হারাম কিছু নেই।
- তবে সবচেয়ে উত্তম ও নিরাপদ হলো এ ধরনের অনুষ্ঠানের খাবার না খাওয়া, যাতে বিদআতকে সমর্থন করার সন্দেহ না হয়।
- মৃতের জন্য দোয়া, সদকা ও কুরআন তিলাওয়াত চালিয়ে যান; কিন্তু নির্দিষ্ট দিন বা খাবারকে আবশ্যক মনে করবেন না।
- আত্মীয়দেরকে ভালোবাসা ও হিকমতের সাথে সুন্নাহর শিক্ষা দিন; কঠোরতা নয়, বরং নরম ভাষায় বোঝান।
উপসংহার:
মিলাদ-কুলখানি ও নির্দিষ্ট দিনে মৃত্যুবাষিকী পালন বিদআত। এসব অনুষ্ঠানের খাবার মূলত হালাল হলেও বিদআতের অনুষ্ঠানকে সমর্থন ও উৎসাহিত করার আশঙ্কায় তা এড়িয়ে যাওয়াই উত্তম। আর যদি কেউ শুধু খাবার পাঠায় এবং আপনি অনুষ্ঠানে অংশ না নেন, তবে খাওয়া জায়েজ; তবে তাকওয়ার দাবি হলো এ ধরনের অনুষ্ঠানের খাবার গ্রহণ না করা।
والله تعالى أعلم بالصواب
والسلام