মাসআলার সঠিক অনুসরণ করতে গিয়ে আমি চারপাশে সব নাপাক দেখতে পাই।
Taharah Purity · Hanafi
Question
(১) রিক্সাওয়ালা, দোকানী, স্কুল,কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া প্রায় সবাই যেখানে প্রয়োজন সেখানেই পস্রাব করে।পানি ব্যবহার করে না।হাতটা পর্যন্ত ধুতে দেখি না।ছিঁটা কাপড়ে পরছে কিনা তার তো খেয়ালই নেই।তাদের সাথে ইন্টারেকশন করতে হয়।যাদের ফরজ গোসল দরকার(বিবাহিত মানুষ।সারা বছরেও নজরে পড়ে না সকালে গোসল করতে।সন্দেহ হিসেবে নিবেন না।এটা এদেশের বাস্তবতা।) তারা দিব্যি কাজ করছে।নাপাক কাপড়ে পানি পড়ছে, ঘামে ভিজছে।সে কাপড় নিয়ে শুয়ে পড়ছে, অন্যকে জড়িয়ে ধরছে, সে কাপড়ের উপর মোবাইল বা অন্য জিনিস রাখছে।ওদের সাথে আমাদের ইন্টারেকশন করতে হচ্ছে।ওরা কিন্তু বেনামাজি বা বেদ্বীন না।আবার পস্রাবের নাপাকি যুক্ত কাপড় বৃষ্টিতে ভিজিয়ে এনে কাপড় চেঞ্জ করে দরজায়, হ্যাঙ্গারে রেখে দিচ্ছে।পরদিন আবার ব্যবহার করছে।তাহলে এমন মানুষদের কোনোকিছু পাক থাকে কী করে?আর এসব ঘরে পরিপূর্ণ মাসাআলা মানতে চাওয়া মানুষ অস্বস্তিতে পরবে না কী করবে?যেসব ঘরে ছোট বাচ্চা আছে সেসব ঘরের কথা নাই বললাম।এদেশে কখনো দেখেছেন কারো ঘরের তোষক ধুয়ে দিতে?পস্রাবের নাপাকি থাকা তোষকে আবার পানি পড়লে সে পানি হাত দিয়ে টেনে নিচে ফেলে।পাক থাকে কিছু?
(২) আবর্জনার দেশে মানুষ আরো বড় আবর্জনা হয়ে গেছে।পুরো ঘরভর্তি থাকে টিকটিকির পায়খানা।অনেকের ডাইনিং এও দেখি যেহেতু পড়াতে যাই অনেকের বাসায়।কেউ ঝাড়ু দিয়ে ফেলে দেয় বিছানা থেকে, সে চাদর আর পরিষ্কার করে না পানি দিয়ে, কেউ কলম, খাতা হাতের কাছে যা পায় তা দিয়ে ফেলে দেয়।তারপর সে জায়গায় হাত রাখে, হালকা ভেজা থালা বাসন রেখে খায়!পাক থাকে কিছু? একটা উত্তরে দেখলাম বলেছেন মেঝেতে টিকটিকির মল থাকা বিরল।এটা ভুল ধারণা।মেঝে, বিছানা, বুকশেলফ, ডাইনিং হেন কোনো জায়গা নেই যেখানে এই টিকটিকর মল পাওয়া যায় না।এমনকি রাস্তাঘাটেও পাবেন দোকানের পাশে।
(৩) কাপড় ধোয়ার নিয়ম মানা তো দূরের কথা নাপাক কাপড় ধরে ওই হাত দিয়ে কল ধরছে, পানি ছাড়ছে, ফোন ধরছে।বলবেন শুকনো কাপড় হলে সমস্যা নেই।কিন্তু শুকনো না।ভেজাই থাকে নানান নাপাকির দ্বারা।এমতাবস্থায় একটু স্ট্রেস ফ্রি বেঁচে থাকাই তো কঠিন মনে হয় মাসআলার পূর্ণ অনুসরণ করতে গেলে।টিউশনির স্টুডেন্ট সামনে বসে যদি টিকটিকর পায়খানা চোখের পলকে কলম দিয়ে ফেলে দিয়ে ওখানে বই রাখে সেখানে জীবন যাপন কীভাবে করবে মানুষ মাসআলা মেনে?যারা অতো খেয়াল করে না তারাই স্বাভাবিক জীবনযাপন করতে পারবে।অন্তত এদেশে।খেয়াল করলে কোথাও খাবার কিনে খাওয়াও মুশকিল যেখানে বিক্রেতা দোকান রেখে পস্রাব করে হাত পর্যন্ত না ধুয়ে চলে আসে।ইস্তিঞ্জা তো দূরের কথা।
আশা করি OCD বলে এড়িয়ে যাবেন না।একটি সমাধান দিবেন।সমাধান সাধারণ মানুষের কাছে চাইলে উত্তর আসে এভাবেই সবাই চলে।কী আর করা।মেনে নিতে হবে।কিন্তু মন মানতে চায় না যেহেতু পবিত্রতার নিয়ম আছে।কিন্তু নিয়ম মানতে গেলে আবার শান্তিতে থাকার সুযোগ নেই।
Answer
মাসআলার সঠিক অনুসরণ, নাপাকির ব্যাপকতা ও ওয়াসওয়াসা (OCD) — একটি সমন্বিত ফিকহি সমাধান
ভূমিকা: আপনার সমস্যার মূল চিহ্নিতকরণ
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
সমাধান
১. মূল ফিকহী দৃষ্টিভঙ্গি ও স্বস্তির মূলনীতি:
ইসলামী শরীআতের একটি সর্বসম্মত মৌলিক নিয়ম হলো: «الْمَشَقَّةُ تَجْلِبُ التَّيْسِيرَ» (অর্থাৎ যেখানে মানুষের জন্য সীমাহীন কষ্ট বা সংকীর্ণতা সৃষ্টি হয়, সেখানে শরীআত স্বয়ং সহজতা ও ছাড় দান করে)। ফুকাহায়ে কেরাম মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে স্বাভাবিক ও দ্বীন পালনকে সহনীয় রাখার জন্য কতগুলো অকাট্য নিয়ম নির্ধারণ করেছেন:
২. আপনার উত্তাপিত প্রশ্নসমূহের শরঈ বিশ্লেষণ ও ফয়সালা:
ক. অন্যের অপবিত্রীতা, গোসল না করা ও নাপাক কাপড়ের স্পর্শ (ঘটনা-১ ও ৩):
১. "সন্দেহ বা ধারণার দ্বারা কোনো বস্তু নাপাক হয় না": ফিকহে হানাফীর সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো—কোনো বস্তু, কাপড় বা মানুষের শরীর নিজের চোখে নিশ্চিতভাবে নাপাক হতে না দেখা পর্যন্ত তা মূলগতভাবে পাক বা পবিত্র গণ্য হবে।
- "রিক্সাওয়ালা ইস্তিনজা করেছে কি না", "দোকানদার হাত ধুয়ে এসেছে কি না", বা "কেউ ফরয গোসল করেছে কি না"—এগুলো কেবলই অনুমান ও সন্দেহ।
- শরীআত আপনাকে অন্যের অবস্থা তদন্ত করার বা সন্দেহ করার বিন্দুমাত্র অধিকার ও দায়িত্ব দেয়নি।
২. শুষ্ক ও ভেজা নাপাকীর স্পর্শে নাপাকী স্থানান্তরের নিয়ম:
- শুষ্ক নাপাকী: যদি কোনো নাপাক বস্তু বা কাপড় সম্পূর্ণ শুকনো থাকে এবং আপনার হাত, শরীর বা কাপড়ও শুকনো থাকে, তবে তাদের পরস্পরের স্পর্শে আপনার হাত বা কাপড় কখনোই নাপাক হবে না।
- ভেজা নাপাকী: কেবল তখনই নাপাকী এক স্থান থেকে অন্য স্থানে ছড়ায়, যখন নাপাক বস্তুটির তাজা বা আদ্র নাপাকী (যেমন: ভিজা প্রস্রাব বা মল) সরাসরি আপনার হাতে বা কাপড়ে লেগে তার রং, গন্ধ বা ভিজা আসর স্পষ্ট স্থানান্তরিত হয়।
- মানুষের সাধারণ ঘাম, বৃষ্টির পানি বা ধোয়া পানির স্পর্শে নাপাকী স্থানান্তরিত হয় না।
৩. পুরু তোষক ও বিছানার ফিকহী হুকুম:
- কোনো তোষক বা বিছানার এক পিঠে বা ভেতরে নাপাকী লেগে থাকলেও, যদি তার ওপর চাদর বিছিয়ে দেওয়া হয় কিংবা উপরের পিঠ শুকনো ও পাক থাকে, তবে সেই তোষক বা বিছানার ওপর বসা, শুয়ে থাকা বা সালাত আদায় করা সম্পূর্ণ জায়েয ও পবিত্র।
- তোষক ধৌত করা সম্ভব না হলে; চাদর বিছিয়ে নিলেই স্থানটি ব্যবহারের জন্য ১০০% উপযোগী হয়ে যায়।
খ. টিকটিকি, মাছি ও মশার বিষ্ঠার/পায়খানার হুকুম (ঘটনা-২):
১. টিকটিকির মলের ফিকহী ছাড়: ফিকহে হানাফী ও প্রামাণ্য কিতাবসমূহের অকাট্য ফতোয়া অনুযায়ী, মাছি, মশা, টিকটিকি ইত্যাদি প্রবাহমান রক্তহীন ছোট প্রাণীর বিষ্ঠা বা মল কাপড়, বিছানা, বুকশেলফ, ডাইনিং টেবিল বা খাদ্যে লাগলে তা স্থানকে অপবিত্র বা নাপাক করে না এবং সালাত বা খাবারের ক্ষেত্রে কোনো বাধা তৈরি করে না।
২. পরিষ্কার করার শরঈ পদ্ধতি:
- বিছানা, ডাইনিং বা বইয়ের ওপর টিকটিকির বিষ্ঠা থাকলে তা ঝাড়ু, টিস্যু, কলম বা হাত দিয়ে ফেলে দিলেই স্থানটি পরিচ্ছন্ন ও ব্যবহারযোগ্য থাকে।
- ঐ স্থানে আবার পানি ঢালা, চাদর ধোয়া বা সাবান দিয়ে মোছা শরীআতের দৃষ্টিতে সম্পূর্ণ অপ্রয়োজনীয় ও অযথা কঠোরতা।
গ. 'উমূমে বালওয়া' (عموم البلوى) ও রাস্তায় চলাফেরা (ঘটনা-৩):
১. উমূমে বালওয়ার সাধারণ ছাড়: যেসব অনাকাঙ্ক্ষিত বিষয় থেকে বেঁচে থাকা সাধারণ মানুষের পক্ষে অসম্ভব বা অত্যন্ত কঠিন (যেমন: সুঁইয়ের মাথার ন্যায় সূক্ষ্ম প্রস্রাবের ছিটা, বাসের সীট, বাজারের বিক্রেতার ছোঁয়া ইত্যাদি), শরীআতের ফিকহী পরিভাষায় তাকে 'উমূমে বালওয়া' বলা হয় ।
- শরীআত উমূমে বালওয়ার ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষের কষ্টের কথা বিবেচনা করে কঠোরতা মাফ করে দিয়েছে।
- সুঁইয়ের ডগার ন্যায় ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র প্রস্রাবের ছিটা শরীরে বা কাপড়ে লাগলেও তা শরীআতে শতভাগ মাফ ও ক্ষমাযোগ্য।
২. খাবার কেনা ও স্পর্শ করার বিধান: দোকানদার হাত ধুয়ে এসেছে কি না বা ইস্তিনজা করেছে কি না—তা চিন্তা করা শরীআতের নীতি পরিপন্থী। আপনি চোখে তাজা নাপাকী না দেখলে যেকোনো দোকান থেকে খাবার কেনা ও খাওয়া সম্পূর্ণ হালাল ও পাক।
৩. আপনার জন্য মানসিক প্রশান্তি ও স্বাভাবিক জীবনের ৩টি মূলসূত্র:
আপনি যদি দ্বীন ও পবিত্রতার সঠিক নিয়ম মেনে পুরোপুরি স্ট্রেস-ফ্রি ও শান্তিতে বাঁচতে চান, তবে এই ৩টি মূলসূত্র মনে গেঁথে নিন:
১. "যা আমি নিজের চোখে স্পষ্ট নাপাক হতে দেখিনি, তা মহান আল্লাহর দরবারে ১০০% পাক"। কেবল ধারণা বা অনুমানের ওপর ভিত্তি করে কোনো কিছু ধুতে যাবেন না। ২. তদন্ত করা সম্পূর্ণ বন্ধ করুন: কোনটা নাপাক হতে পারে, কে ইস্তিনজা করল বা গোসল করল না—এসব নিয়ে চিন্তা বা অন্বেষণ করার দায়িত্ব আল্লাহ আপনাকে দেননি। ৩. ওয়াসওয়াসা কেটে ফেলার শরঈ আদেশ: ফুকাহায়ে কেরাম স্পষ্টভাবে বলেছেন, ৩ বার ধোয়ার বিধান বা প্রবল ধারণার ওপর আমল করার মূল উদ্দেশ্যই হলো মানুষের মন থেকে ওয়াসওয়াসা ও সন্দেহের ব্যাধি স্থায়ীভাবে কেটে ফেলা ।
সংযুক্ত কিতাবসমূহের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
-
ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ১৩০, ১৩১ (হিন্দিয়াহ ১/১৫১) (অধ্যায়: তাহারাত, ২য় অনুচ্ছেদ: নাজাসাত ও তাহারাত — 'সুঁইয়ের মাথার ন্যায় সূক্ষ্ম প্রস্রাবের ছিটা ক্ষমাযোগ্য ও মাফ হওয়া')।
- পৃষ্ঠা: ১৩২, ১৩৩ (হিন্দিয়াহ ১/১৫৪) (অধ্যায়: তাহারাত, ৩য় অনুচ্ছেদ — 'মাছি, মশা ও টিকটিকির মল-মূত্র কাপড়ে বা বস্তুতে লাগলে তা নাপাক না হওয়া এবং শুষ্ক নাপাক বস্তু স্পর্শে নাপাকী স্থানান্তরিত না হওয়া')।
- পৃষ্ঠা: ১৬৪, ১৬৫, ১৬৮, ১৬৯ (হিন্দিয়াহ ১/২০০, ২০৪) (অধ্যায়: সালাত — 'সন্দেহ ও অনুমানের ওপর ভিত্তি করে বস্তুর পবিত্রতা নষ্ট না হওয়া এবং বিছানায় সুনির্দিষ্ট স্থান না জানা থাকলে প্রবল ধারণার স্থানকে পাক ধরা')।
- পৃষ্ঠা: ১৬৬, ১৬৭ (হিন্দিয়াহ ১/২০২) (অধ্যায়: সালাত — 'নাপাক তোষক বা চাদরের উপরে পাক স্থান থাকলে তার ওপর বসা বা নামাজ পড়া সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ হওয়া')।
-
দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৭৬, ৭৭, ৭৮ (দরসুল ফিকহ ২/৭৬-৭৮) (অধ্যায়: 'তহারত ও পানি সংক্রান্ত কিছু জরুরি মূলনীতি — প্রবল ধারণা অনুযায়ী নাপাকী দূর হওয়া, উমূমে বালওয়া এবং ওয়াসওয়াসা দূরীকরণে শরঈ সহজতা')।
- পৃষ্ঠা: ৮৬, ৮৭ (দরসুল ফিকহ ২/৮৬-৮৭) (অধ্যায়: 'নাপাকির মূল সত্তা দূর হওয়াই পবিত্রীকরণ এবং ৩ বার ধৌত করার মাধ্যমে ওয়াসওয়াসার ব্যাধি কেটে ফেলা')।
-
নূরুল ঈযাহ (বাংলা সংস্করণ):
- পৃষ্ঠা: ৪৯, ৫০ (নূরুল ঈযাহ পৃষ্ঠা ৪৯, ৫০) (পরিচ্ছেদ: 'নাজাসাতের বর্ণনা — নাজাসাতে গলীজা ও অতি সূক্ষ্ম ছিটা মাফ হওয়া')।
- পৃষ্ঠা: ৫১ (নূরুল ঈযাহ পৃষ্ঠা ৫১) (পরিচ্ছেদ: 'শুকনো জিনিস মুছে ফেলা বা স্পর্শের ফিকহী বিধান')।
- পৃষ্ঠা: ৫৩ (নূরুল ঈযাহ পৃষ্ঠা ৫৩) (পরিচ্ছেদ: 'নামাজের স্থান — পুরু বিছানা ও তোষকের উপরের পিঠ পাক থাকলে স্পর্শ ও নামাজ শতভাগ বৈধ হওয়া')।
আল্লাহ সর্বজ্ঞ।