ফজরের ওয়াক্তে বেতের নামাজ পড়া যাবে কি?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
Answer
ফজরের ওয়াক্তে বেতের নামাজ পড়া যাবে?
সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর বেতের নামাজ আদায় করা যাবে না। বেতেরের ওয়াক্ত ইশার নামাজের পর থেকে সুবহে সাদিক (ফজরের ওয়াক্ত শুরু) পর্যন্ত।
কুরআন ও হাদিসের দলিল
রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
«إِنَّ اللَّهَ زَادَكُمْ صَلَاةً، وَهِيَ الْوِتْرُ، فَصَلُوهَا بَيْنَ صَلَاةِ الْعِشَاءِ إِلَى صَلَاةِ الْفَجْرِ»
"নিশ্চয়ই আল্লাহ তা'আলা তোমাদেরকে একটি অতিরিক্ত নামাজ দান করেছেন, তা হলো বেতের। সুতরাং তোমরা তা ইশার নামাজ ও ফজরের নামাজের মধ্যবর্তী সময়ে আদায় করো।"
— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৪১৬; সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৪৫২; মুসনাদে আহমাদ
আরেক হাদিসে এসেছে:
«الْوِتْرُ حَقٌّ، فَمَنْ لَمْ يُوتِرْ فَلَيْسَ مِنِّي»
"বেতের নামাজ সত্য (অবশ্যক)। যে ব্যক্তি বেতের পড়ল না, সে আমার (উম্মতের) অন্তর্ভুক্ত নয়।"
— সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৪১৯
হানাফি ফিকহের বিস্তারিত আলোচনা
১. বেতেরের ওয়াক্ত: ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর সর্বসম্মত মত অনুযায়ী বেতেরের ওয়াক্ত ইশার নামাজ আদায়ের পর থেকে শুরু হয়ে সুবহে সাদিক পর্যন্ত থাকে। ফজরের ওয়াক্ত শুরু হলে বেতেরের ওয়াক্ত শেষ হয়ে যায়।
২. ফজরের ওয়াক্তে বেতের কাজা হবে না: হানাফি মাজহাবের প্রসিদ্ধ ও মুফতাবিহি (যার উপর ফতোয়া) মত হলো—ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর বেতেরের কাজা আদায় করা হবে না। কেননা বেতেরের ওয়াক্ত নির্দিষ্ট এবং তা চলে গেলে আর কাজা থাকে না (অন্যান্য ওয়াজিবের মতো)। তবে কেউ যদি রাতের বেলা বেতের পড়তে ভুলে যায়, সে ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার আগেই তা আদায় করে নেবে।
ইমাম হাসকাফি (রহ.) বলেন: «وَوَقْتُهُ بَعْدَ الْعِشَاءِ إِلَى الْفَجْرِ» — "বেতেরের ওয়াক্ত ইশার পর থেকে ফজর পর্যন্ত।" — আদ-দুররুল মুখতার, খণ্ড ২, পৃ. ৪
ইবনে আবিদিন শামি (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন: «وَلَا يُقْضَى بَعْدَ طُلُوعِ الْفَجْرِ» — "ফজর উদয়ের পর বেতেরের কাজা আদায় করা হবে না।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৪৪
৩. ফজরের ওয়াক্তে পড়লে কী হবে? যদি কেউ ভুলে বা অজ্ঞতাবশত ফজরের ওয়াক্তে বেতের পড়ে, তবে তা বেতের হিসেবে সহিহ হবে না; বরং তা নফল হিসেবে গণ্য হবে। আর বেতের তার যিম্মায় (দায়িত্বে) থেকে যাবে—তবে হানাফি মুফতাবিহি মত অনুযায়ী পরবর্তীতে তার কাজা আদায় করতে হবে না, বরং তাওবা ও ইস্তিগফার করবে।
৪. ইশার আগে বেতের পড়া: ইশার নামাজের আগে বেতের পড়া সহিহ নয়। ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে ইশার আগে বেতের পড়লে তা আদায় হবে না।
৫. সুবহে সাদিকের সীমা: সুবহে সাদিক (ফজরের ওয়াক্ত শুরু) উদয় হওয়ার সাথে সাথেই বেতেরের ওয়াক্ত শেষ। তাই ফজরের আজান হওয়ার পর বেতের পড়া যাবে না।
ব্যবহারিক নির্দেশনা
- বেতের নামাজ রাতের শেষভাগে (তাহাজ্জুদের পর) পড়া সর্বোত্তম, তবে ঘুমিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকলে ইশার পরপরই পড়ে নেওয়া উত্তম।
- ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর বেতের পড়া যাবে না; কেউ যদি রাতে বেতের না পড়ে ঘুমিয়ে যায়, তবে ফজরের আগে জাগলে পড়ে নেবে, নাহলে তাওবা করবে।
- বেতের এক রাকআত, তিন রাকআত, পাঁচ রাকআত, সাত রাকআত—সবই সহিহ; তবে হানাফি মাজহাবে তিন রাকআত (দুই সালামে বা এক সালামে) পড়া সর্বাধিক প্রচলিত ও উত্তম।
উপসংহার
ফজরের ওয়াক্ত শুরু হওয়ার পর বেতের নামাজ আদায় করা যাবে না; বরং বেতেরের ওয়াক্ত ইশার পর থেকে সুবহে সাদিক পর্যন্ত। তাই মুসল্লি হিসেবে আমাদের উচিত রাতের বেলা যথাসময়ে বেতের আদায় করে নেওয়া এবং ফজরের ওয়াক্তে তা না পড়া।
আল্লাহ তা'আলা আমাদেরকে যথাসময়ে ইবাদত আদায় করার তাওফিক দান করুন। আমিন।
তথ্যসূত্র
- সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ১৪১৬, ১৪১৯
- সুনানে তিরমিজি, হাদিস ৪৫২
- আদ-দুররুল মুখতার (ইমাম হাসকাফি), খণ্ড ২
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন শামি), খণ্ড ২
- আল-হিদায়া (ইমাম বুর্হানুদ্দিন মারগিনানি)
- ফতোয়ায়ে আলমগিরি (ফতোয়ায়ে হিন্দিয়া)
- ইমদাদুল ফতোয়া (আশরাফ আলী থানভি রহ.)
- ফতোয়ায়ে উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি)
- বেহেশতি জেওর (আশরাফ আলী থানভি রহ.)
- মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি রহ.)