না জেনে চুরি করা দ্রব্য কেনার পর প্রকৃত মালিককে না পেলে কী করবো?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 7833
Questioner: Maymona Jahan Tanny
Question Asked: 02 Nov 2026, 09:41 PM
Reviewed & Published: 03 Nov 2026, 06:59 AM
Views: 30
Tokens: 4,050
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

না জেনে চুরি করা দ্রব্য কেনার পর সেই দ্রব্যটি চুরি করে এনেছে পরে তা জানতে পারলে প্রকৃত মালিকের কাছে দ্রব্যটি না ফিরাতে পারলে তা কি সাদাকা করা যা,এই নিয়তে যে এর সওয়াব সম্পূর্ণ ঐ দ্রব্যটির প্রকৃত মালিকের

Answer

না জেনে চুরি করা দ্রব্য কেনা: প্রকৃত মালিককে ফিরাতে না পারলে করণীয়

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—কেউ না জেনে একটি চুরি করা দ্রব্য কিনেছেন, পরে জানতে পেরেছেন যে দ্রব্যটি চুরি করে আনা হয়েছিল। এখন যদি প্রকৃত মালিককে খুঁজে বের করে দ্রব্যটি ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব না হয়, তাহলে কি দ্রব্যটি সদকা করা যাবে—এই নিয়তে যে এর সওয়াব সম্পূর্ণ প্রকৃত মালিকের কাছে পৌঁছাবে?

ফিকহি বিশ্লেষণ

১. মূলনীতি: চুরি করা দ্রব্য ক্রয় করা জায়েয নয়

চুরি করা মাল ক্রয় করা ইসলামে নাজায়েয। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«مَنْ اشْتَرَى سَرِقَةً وَهُوَ يَعْلَمُ أَنَّهَا سَرِقَةٌ فَقَدْ شَارَكَ فِي إِثْمِهَا»

"যে ব্যক্তি জেনে-বুঝে চুরি করা মাল ক্রয় করে, সে চুরির গুনাহে শরিক হয়।"

— সুনানে বায়হাকি, হাদিস নং ১১৩০১; মুসান্নাফ ইবনে আবি শায়বা

তবে প্রশ্নকারী না জেনে কিনেছেন—এ অবস্থায় তার উপর ক্রয়ের গুনাহ নেই, কারণ তিনি অজ্ঞ ছিলেন। কিন্তু দ্রব্যটি যেহেতু প্রকৃত মালিকের সম্পত্তি, সেহেতু তা তার কাছে আমানতস্বরূপ; প্রকৃত মালিকের কাছে ফিরিয়ে দেওয়া তার দায়িত্ব।

২. প্রকৃত মালিককে ফিরিয়ে দেওয়া সম্ভব না হলে করণীয়

হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো—কোনো মুসলিমের সম্পত্তি তার অনুমতি ছাড়া ভোগ করা জায়েয নয়। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

«يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَكُم بَيْنَكُم بِالْبَاطِلِ»

"হে ঈমানদারগণ! তোমরা একে অপরের সম্পদ অন্যায়ভাবে ভোগ করো না।"

— সূরা নিসা: ২৯

আরও ইরশাদ হয়েছে:

«وَلَا تَأْكُلُوا أَمْوَالَهُم بِإِسْرَافٍ وَإِسْرَاعًا»

— সূরা নিসা: ৬

এবং রাসূল ﷺ বলেছেন:

«لَا يَحِلُّ مَالُ امْرِئٍ مُسْلِمٍ إِلَّا بِطِيبِ نَفْسٍ مِنْهُ»

"কোনো মুসলিমের সম্পদ তার মনোতুষ্টি ছাড়া হালাল নয়।"

— সুনানে দারাকুতনি, হাদিস নং ২৮৮৫; মুসনাদে আহমাদ

৩. হানাফি ফুকাহায়ে কেরামের বিধান

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন—যদি কেউ চুরি করা মাল ক্রয় করে এবং প্রকৃত মালিককে খুঁজে না পায়, তাহলে তার জন্য কর্তব্য হলো:

  1. প্রথমে যথাসাধ্য চেষ্টা করা প্রকৃত মালিককে খুঁজে বের করার—আশেপাশের এলাকা, ক্রেতা-বিক্রেতা, ঘোষণা ইত্যাদির মাধ্যমে।
  2. যদি খুঁজে না পাওয়া যায়, তাহলে সদকা করা—তবে এই শর্তে যে, সদকার সওয়াব প্রকৃত মালিকের কাছে পৌঁছাবে এবং ভবিষ্যতে মালিক পাওয়া গেলে তার অনুমোদন নিতে হবে; যদি মালিক অনুমোদন না দেন, তাহলে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।

ইমাম ইবনে আবিদিন বলেন:

«وَلَوْ تَصَدَّقَ بِهَا عَنْ رَبِّهَا فَهُوَ الْأَصَحُّ، لِأَنَّهُ أَدَاءُ حَقٍّ لِمَجْهُولٍ»

"যদি সে তা প্রকৃত মালিকের পক্ষ থেকে সদকা করে, তবে এটাই সর্বাধিক বিশুদ্ধ মত; কারণ এটি অজ্ঞাত ব্যক্তির হক আদায় করা।"

— রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, পৃ. ২৭৩ (কিতাবুল গাসব)

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে উল্লেখ আছে:

«إِذَا لَمْ يَجِدْ صَاحِبَ الْمَالِ فَلْيَتَصَدَّقْ بِهِ عَنْهُ، فَإِنْ جَاءَ صَاحِبُهُ بَعْدَ ذَلِكَ فَهُوَ عَلَى خِيَارٍ: إِنْ شَاءَ أَجَازَ الصَّدَقَةَ، وَإِنْ شَاءَ ضَمَّنَهُ»

"যদি মালিককে না পাওয়া যায়, তবে তার পক্ষ থেকে সদকা করে দেবে। পরে মালিক এলে সে ইখতিয়ার পাবে—চাইলে সদকা অনুমোদন করবে, নয়তো ক্ষতিপূরণ নেবে।"

— ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ৩, পৃ. ৩৮৫ (কিতাবুল গাসব)

৪. সদকার সওয়াব মালিকের কাছে পৌঁছানো প্রসঙ্গে

প্রশ্নকারীর নিয়ত—"সদকার সওয়াব সম্পূর্ণ প্রকৃত মালিকের কাছে পৌঁছাবে"—এটি সঠিক ও উত্তম নিয়ত। কারণ হানাফি মাযহাব অনুযায়ী, সদকার সওয়াব অন্যকে হাদিয়া করা জায়েয এবং তা তার কাছে পৌঁছায়। তবে এখানে মূল বিষয় হলো—সদকাটি মালিকের পক্ষ থেকে তার সম্পত্তি হিসেবে দেওয়া হচ্ছে, যাতে মালিকের হক আদায় হয়। সওয়াব মালিকের কাছে পৌঁছানো একটি অতিরিক্ত কল্যাণ।

মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ সূরা নিসার ২৯ নং আয়াতের তাফসিরে বলেন—অন্যের সম্পদ তার অনুমতি ছাড়া ভোগ করা হারাম; তবে যদি মালিককে খুঁজে পাওয়া না যায়, তাহলে ইসলামি শরিয়তের নির্দেশনা হলো তার পক্ষ থেকে সদকা করা, যাতে কিয়ামতের দিন তার দায় থেকে মুক্তি পাওয়া যায়।

৫. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা

  • সদকা করার আগে যথাসাধ্য খোঁজ করা আবশ্যক—যেমন: ক্রেতা/বিক্রেতার কাছে জিজ্ঞাসা, স্থানীয় ঘোষণা, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে খোঁজ ইত্যাদি।
  • সদকা করার সময় সাক্ষী রাখা এবং লিখিতভাবে সংরক্ষণ করা উত্তম, যাতে ভবিষ্যতে মালিক এলে প্রমাণ দেওয়া যায়।
  • ভবিষ্যতে মালিক পাওয়া গেলে—তাকে বিষয়টি জানাতে হবে। যদি মালিক সদকা অনুমোদন করেন, দায়িত্ব শেষ; আর যদি অনুমোদন না করেন, তাহলে তাকে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে (দ্রব্যের মূল্য বা সমপরিমাণ)।
  • সদকাটি গরিব-মিসকিনকে দেওয়া—যেহেতু এটি মালিকের সম্পত্তি, তাই সদকায়ে ওয়াজিবা বা নফল সদকার নিয়মে গরিবদের মধ্যে বণ্টন করতে হবে।
  • নিজের জন্য রাখা বা ভোগ করা জায়েয নয়—এটি আমানত, তাই নিজে ভোগ করা হারাম।

This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.