মনে মনে ইস্তিগফার পড়ার বিধান ও ফজিলত এবং নফল নামাজের সিজদায় বাংলায় দোয়া করার হুকুম সম্পর্কে জানতে চাই?
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমরা জানি ইস্তিগফার করার গুরুত্ব সম্পর্কে জানি। তসবীহ কাউন্টার দিয়ে ইস্তিগফার যখন পড়ি সহজেই ১০০০ বারেরও বেশী পড়া যায়। কিন্তু এভাবে পড়লে শরীর দূর্বল হয়ে যায়। এখন যদি আমি জিহ্বা না নেড়ে মনে মনে ইস্তিগফার পড়ি তাহলে মৌখিকভাবে ইস্তিগফার পড়ার যে ফজিলত আছে আমি কি তা পাবো নাকি কম নেকী পাবো?
জানতে চাই।
আরও একটি প্রশ্ন আছে।
নফল নামাজের সিজদায় কি বাংলায় দোয়া করা যাবে? একজনের কাছে শুনেছি নামাজের সালাম ফিরিয়ে তারপর সিজদায় পড়ে দোয়া করা যায়। নফল নামাজের সিজদায় দোয়া করলে নামাজ হবেনা এবং দোয়াও কবুল হবেনা। এটা কতোটা সত্যি?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথম প্রশ্ন: মনে মনে ইস্তিগফার পড়ার বিধান ও ফজিলত
ইস্তিগফার বা যিকিরের মূল রূহ হলো জিহ্বা ও অন্তরের সমন্বয়। শুধু মনে মনে (জিহ্বা না নেড়ে) যিকির করলে তা "যিকরে খফি" (গোপন যিকির) হিসেবে গণ্য হবে, তবে মুখে উচ্চারণ করে যিকির করার যে বিশেষ ফজিলত ও সওয়াব রয়েছে, তা পূর্ণভাবে হাসিল হবে না।
হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
«مَثَلُ الَّذِي يَذْكُرُ رَبَّهُ وَالَّذِي لَا يَذْكُرُ رَبَّهُ مَثَلُ الْحَيِّ وَالْمَيِّتِ» "যে ব্যক্তি তার প্রতিপালককে স্মরণ করে এবং যে স্মরণ করে না, তাদের দৃষ্টান্ত হলো জীবিত ও মৃতের ন্যায়।" (সহিহ বুখারি: ৬৪০৭)
আরেক হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ قَالَ سُبْحَانَ اللَّهِ وَبِحَمْدِهِ مِائَةَ مَرَّةٍ...» "যে ব্যক্তি একশত বার 'সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি' বলবে..." (সহিহ মুসলিম: ২৬৯১)
এখানে "বলা" (قال) শব্দটি মুখে উচ্চারণকে অন্তর্ভুক্ত করে। ফুকাহায়ে কেরাম বলেছেন, যিকিরের ক্ষেত্রে জিহ্বা দ্বারা উচ্চারণ করা উত্তম, কারণ এতে জিহ্বা ও অন্তর উভয়ের ইবাদত হয় এবং এর প্রতিদান বেশি হয়। তবে মনে মনে যিকিরও নাজায়েজ নয়; বরং তা জায়েজ এবং তাতে সওয়াব রয়েছে। কিন্তু মুখে পড়ার তুলনায় সওয়াব কম হবে।
সমাধান: আপনি চাইলে মনে মনে ইস্তিগফার করতে পারেন, এটি জায়েজ। তবে শরীর দুর্বল হয়ে যাওয়ার ভয়ে যদি মুখে পড়তে না পারেন, তাহলে অল্প সংখ্যায় মুখে পড়ুন এবং বাকিটা মনে মনে করুন। অথবা বিশ্রাম নিয়ে ধীরে ধীরে মুখে পড়ুন। মুখে পড়ার ফজিলত পূর্ণভাবে পেতে চাইলে জিহ্বা নাড়িয়ে পড়াই উত্তম। তবে মনে মনে পড়লে গুনাহ হবে না এবং সওয়াবও পাবেন, শুধু মুখে পড়ার তুলনায় কম হবে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন: নফল নামাজের সিজদায় বাংলায় দোয়া করা
নামাজের ভেতরে সিজদার অবস্থায় দোয়া করা যায়। ফিকহে হানাফি অনুযায়ী, সিজদায় কুরআন-হাদিসে বর্ণিত দোয়া করা উত্তম। তবে নামাজের ভেতরে দোয়া আরবি ভাষায় হওয়া আবশ্যক, কারণ নামাজে কুরআন-হাদিসে বর্ণিত আরবি দোয়া ছাড়া অন্য ভাষায় দোয়া করলে নামাজ ভঙ্গ হয়ে যাবে।
হানাফি ফিকহের মূলনীতি:
- নামাজের ভেতরে দোয়া করতে হলে তা কুরআন-হাদিসে বর্ণিত আরবি দোয়া হতে হবে।
- বাংলা বা অন্য যে কোনো অনারবি ভাষায় দোয়া করলে নামাজ ভঙ্গ হয়ে যাবে (ফাতাওয়া হিন্দিয়া, ১/১০৫; রাদ্দুল মুহতার, ১/৫২৪)।
- তবে নামাজের বাইরে বাংলায় দোয়া করা সম্পূর্ণ জায়েজ।
সিজদায় দোয়ার বিধান: হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«أَقْرَبُ مَا يَكُونُ الْعَبْدُ مِنْ رَبِّهِ وَهُوَ سَاجِدٌ فَأَكْثِرُوا الدُّعَاءَ» "বান্দা তার প্রতিপালকের সবচেয়ে নিকটে থাকে যখন সে সিজদায় থাকে, সুতরাং তোমরা সিজদায় বেশি বেশি দোয়া করো।" (সহিহ মুসলিম: ৪৮২)
তাই সিজদায় আরবি দোয়া করা উত্তম। তবে বাংলায় দোয়া করলে নামাজ ভঙ্গ হয়ে যাবে।
যে কথা শুনেছেন—"নামাজের সালাম ফিরিয়ে তারপর সিজদায় পড়ে দোয়া করা যায়"—এর ব্যাখ্যা: নামাজ শেষ করে সালাম ফিরানোর পর যদি কেউ সিজদায় গিয়ে দোয়া করে, তাহলে সেটি নামাজের অংশ নয়; বরং এটি নফল সিজদা বা সাধারণ দোয়া হিসেবে গণ্য হবে। এতে নামাজ ভঙ্গ হবে না, কারণ নামাজ শেষ হয়ে গেছে। তবে এটি নামাজের ভেতরের সিজদা নয়। আর "নফল নামাজের সিজদায় দোয়া করলে নামাজ হবে না এবং দোয়াও কবুল হবে না"—এ কথা সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। বরং সিজদা দোয়ার জন্য বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ স্থান।
সারসংক্ষেপ: ১. মনে মনে ইস্তিগফার জায়েজ, তবে মুখে পড়ার তুলনায় সওয়াব কম। ২. নামাজের ভেতরে সিজদায় বাংলায় দোয়া করা যাবে না; আরবি দোয়া করতে হবে। নামাজের বাইরে বাংলায় দোয়া করা যাবে। ৩. "সিজদায় দোয়া করলে নামাজ ও দোয়া কবুল হয় না"—এ কথা ভুল।
উল্লেখ্য: আপনি যদি নামাজের ভেতরে বাংলায় দোয়া করতে চান, তাহলে নামাজ শেষ করে সালাম ফিরানোর পর বাংলায় দোয়া করুন। এতে কোনো সমস্যা নেই।
তথ্যসূত্র:
- ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১০৫
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৫২৪
- সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৪০৭
- সহিহ মুসলিম, হাদিস ২৬৯১, ৪৮২
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৪৫০
- ফাতাওয়া উসমানি, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ৩২০
আল্লাহ ভালো জানেন।