স্বপ্নে মৃত দাদীকে দেখা, মৃত্যুর মাস ঘনিয়ে আসলে বারবার স্বপ্ন দেখার কারণ, এবং ইসলামে এর ব্যাখ্যা কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 7821
Questioner: Munni Aktar
Question Asked: 02 Nov 2026, 07:18 PM
Reviewed & Published: 02 Nov 2026, 08:29 PM
Views: 18
Tokens: 6,230
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম।
আমার দাদী, আজ থেকে প্রায় ১৪ বছর আগে আল্লাহর মেহমান হয়ে যান। তখন থেকেই, প্রতিবছর ঈদে এবং দাদীর মৃত্যুর তারিখের মাসে, আমার মা-বাবা তাদের হয়ে, গরীব ও মাদ্রাসার লোকজনকে খাওয়া-দাওয়া করান ও দুআকালাম পড়ান। এই ডিসেম্বরেই ১৪ বছর আগে দাদী আল্লাহর মেহমান হয়ে যান, এই মাস ঘনিয়ে আসলেই বা প্রায় সময়ই আমার মা আমার দাদীকে স্বপ্নে দেখেন। যেমন কিছুদিন আগে দেখলেন, দাদী আমার মাকে বাড়িতে যাওয়ার কথা বলতেছেন, মায়ের পেটে বাচ্চা তাঈ বলতেছেন তোমার ঢাকা যাওয়া লাগবে না তুমি বাড়িতে থাকো । আমার মাকে আমার দাদী অনেক স্নেহ করতেন। শেষ মুহূর্তেও মাকে দুআ দিয়ে গেছেন। আমার মা খুব পরহেজগার ও নামাজ, কুরআনে মগ্ন থাকেন। সবসময় দাদা-দাদীর জন্য দুআ করেন। আমার বাবা অথবা ফুফুরা তাদেথ মাকে স্বপ্নে দেখেন না, আমার মা-ই দেখেন বেশিরভাগ। এরকম স্বপ্ন বা তার মৃত্যুর মাস ঘনিয়ে আসার আগে এরকম দেখার কারণ কী?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর:
স্বপ্ন আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এক প্রকার ইশারা, খুশির সংবাদ, সতর্কতা কিংবা শয়তানের ওয়াসওয়াসা হতে পারে। মৃত ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখা নিজে থেকেই কোনো বাধ্যতামূলক হুকুম বা আজাব-প্রমাণ নয়। আপনার মা যেহেতু পরহেজগার, নামাজি ও কুরআনে মগ্ন, এবং দাদীর জন্য নিয়মিত দুআ করেন—এ ধরনের স্বপ্নকে সাধারণত আল্লাহর পক্ষ থেকে সান্ত্বনা ও দুআর প্রতি উৎসাহ হিসেবে নেওয়া ভালো। তবে স্বপ্নের ভিত্তিতে নতুন কোনো ধর্মীয় রীতি, বিশেষ দিন বা বিশেষ খাওয়া-দাওয়ার বিধান তৈরি করা যাবে না। দাদীর জন্য দুআ, সদকা, কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছানো—এসবই শরীয়তসম্মত এবং উপকারী। আর মৃত্যুর মাস ঘনিয়ে আসলে স্বপ্ন দেখা স্বাভাবিক মনস্তাত্ত্বিক কারণেও হতে পারে; কারণ ওই সময়ে মায়ের মনে দাদীর স্মৃতি ও দুআ বেশি জাগে। এতে ভয় পাওয়ার বা কোনো অশুভ ধারণা করার কিছু নেই।

বিস্তারিত:

১) স্বপ্নের প্রকৃত অবস্থান:
হাদিসে স্বপ্নকে তিন ভাগে ভাগ করা হয়েছে—(ক) আল্লাহর পক্ষ থেকে সুসংবাদ বা সান্ত্বনা, (খ) শয়তানের ওয়াসওয়াসা/ভয় দেখানো, (গ) নিজের মনের চিন্তা-ভাবনার প্রতিফলন।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللَّهِ، وَالْحُلْمُ مِنَ الشَّيْطَانِ»
“সৎ স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর (ভয়ংকর) দুঃস্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে।”
— সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৯৮৪; সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২৬৩ (আনাস রা. থেকে)

অন্য হাদিসে এসেছে, স্বপ্ন তিন প্রকার: আল্লাহর পক্ষ থেকে, শয়তানের পক্ষ থেকে, এবং মানুষ নিজে যা মনে ভাবে তার প্রভাব। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২৬৩)

তাই স্বপ্নকে কখনো ওহি বা চূড়ান্ত দলিল মনে করা যাবে না। বিশেষ করে মৃত ব্যক্তির স্বপ্নে কোনো নির্দিষ্ট কাজের আদেশ-নিষেধ আরোপ করা ঠিক নয়।

২) মৃতকে স্বপ্নে দেখা:
মৃত ব্যক্তিকে স্বপ্নে দেখা সম্ভব এবং তা আল্লাহর কুদরতের অন্তর্ভুক্ত। তবে এটি দুনিয়ার জীবনে ফিরে আসা বা সরাসরি কথা বলার প্রমাণ নয়; বরং এটি আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে স্বপ্নদর্শীর জন্য এক ইশারা।
ইমাম ইবন আবিদিন রহ. (রাদ্দুল মুহতার) ও ফকিহদের আলোচনায় এসেছে, মৃতের জন্য দুআ, ইস্তিগফার, সদকা ও কুরআন তিলাওয়াতের সওয়াব পৌঁছানো—এসবই উপকারী। স্বপ্নে মৃতকে ভালো অবস্থায় দেখা আল্লাহর রহমতের আশা বাড়ায়; আর কষ্টে দেখা হলে বেশি বেশি দুআ ও সদকার নির্দেশ হিসেবে নেওয়া যায়। কিন্তু স্বপ্নের ভিত্তিতে বিশেষ তারিখ, বিশেষ খাবার বা বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা আবশ্যক হয়ে যায় না।

৩) মৃত্যুর মাস ঘনিয়ে আসলে স্বপ্ন দেখা:
এর কয়েকটি সম্ভাব্য কারণ হতে পারে:

  • আল্লাহর পক্ষ থেকে সান্ত্বনা: আপনার মা দাদীর জন্য দুআ করেন, দাদীও শেষ সময়ে মাকে দুআ দিয়ে গেছেন। আল্লাহ তাআলা হয়তো এই দুআর বরকতে মাকে স্বপ্নে সান্ত্বনা দিচ্ছেন।
  • মনের গভীর স্মৃতি: ডিসেম্বর মাস এলে মায়ের মনে দাদীর মৃত্যুর স্মৃতি, শোক ও দুআর আবেগ প্রবল হয়। হাদিসের ভাষায় এটি “নাফসের চিন্তার প্রভাব” হতে পারে। এটি দোষের কিছু নয়; বরং মায়ের হৃদয়ের নরমতা ও ভালোবাসার প্রকাশ।
  • দুআর প্রতি উৎসাহ: স্বপ্নে দাদী মাকে বাড়িতে থাকতে বলা, ঢাকা যাওয়ার দরকার নেই বলা—এ ধরনের কথা সরাসরি ভবিষ্যদ্বাণী হিসেবে নেওয়া উচিত নয়। বরং এটিকে মায়ের প্রতি দাদীর স্নেহের স্মৃতি এবং “নিজের আমল, নামাজ ও দুআ অব্যাহত রাখো” এ ধরনের উৎসাহ হিসেবে বোঝা ভালো।
  • শয়তানের ওয়াসওয়াসা: যদি স্বপ্ন দেখে ভয় পাওয়া, অশুভ কিছু আশঙ্কা করা বা বিশেষ কাজ করতে বাধ্যবাধকতা মনে হয়, তবে তা শয়তানের পক্ষ থেকে হতে পারে। তখন আউজুবিল্লাহ পড়া, বাম দিকে থুতু ফেলা (হালকাভাবে) এবং স্বপ্নের কথা কারো কাছে না বলা সুন্নত। (সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২৬২)

৪) কেন শুধু মা দেখেন, বাবা বা ফুফুরা নয়?
এতে কোনো আধ্যাত্মিক শ্রেষ্ঠত্ব বা অশুভ কারণ নেই। স্বপ্ন দেখা ব্যক্তিভেদে ভিন্ন হয়—কারো মন বেশি আবেগপ্রবণ, কারো ঘুমের অবস্থা ভিন্ন, কারো দাদীর স্মৃতির সঙ্গে সম্পর্ক বেশি গভীর। আপনার মা যেহেতু দাদীর জন্য বেশি দুআ করেন এবং দাদীর সঙ্গে তাঁর গভীর স্নেহের সম্পর্ক ছিল, তাই তাঁর স্বপ্নে দাদী আসা স্বাভাবিক। এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে মায়ের জন্য বিশেষ সান্ত্বনাও হতে পারে।

৫) শরীয়তসম্মত আমল:
দাদীর জন্য যা করবেন:

  • নিয়মিত দুআ করা: «اللَّهُمَّ اغْفِرْ لَهَا وَارْحَمْهَا وَعَافِهَا وَاعْفُ عَنْهَا» ইত্যাদি।
  • সদকা করা, গরীব-মিসকিনকে খাওয়ানো—এটি জায়েজ ও সওয়াবের কাজ। তবে নির্দিষ্ট দিন বা নির্দিষ্ট মাসকে আবশ্যক ধরে নেওয়া বা “এটা না করলে দাদীর রুহ কষ্ট পাবে” এমন বিশ্বাস করা ঠিক নয়।
  • কুরআন তিলাওয়াত করে সওয়াব দাদীর রুহে পৌঁছানো—আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের মত অনুযায়ী এটি জায়েজ ও উপকারী।
  • দাদীর জন্য ইস্তিগফার ও দান-সদকা অব্যাহত রাখা।
  • মায়ের মানসিক শান্তির জন্য তাঁকে বোঝানো যে স্বপ্ন কোনো ভয়ের কারণ নয়; বরং দাদীর জন্য দুআ ও সদকা চালিয়ে যাওয়াই উত্তম।

৬) যা করবেন না:

  • স্বপ্নের ভিত্তিতে নতুন কোনো ধর্মীয় রীতি বা বিশেষ আনুষ্ঠানিকতা তৈরি করবেন না।
  • স্বপ্নে পাওয়া কথাকে সরাসরি আল্লাহর হুকুম বা মৃতের বাধ্যতামূলক আদেশ মনে করবেন না।
  • ভয় পেয়ে বা অশুভ আশঙ্কায় কোনো কাজ করা থেকে বিরত থাকুন।
  • স্বপ্ন নিয়ে বেশি আলোচনা করে নিজের ও মায়ের মনে ওয়াসওয়াসা সৃষ্টি করবেন না।

উপসংহার:
আপনার মায়ের স্বপ্নকে আমরা সাধারণত আল্লাহর পক্ষ থেকে সান্ত্বনা, দাদীর স্নেহের স্মৃতি এবং দুআ-সদকা অব্যাহত রাখার উৎসাহ হিসেবে দেখি। এতে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। দাদীর জন্য দুআ, সদকা ও কুরআন তিলাওয়াত চালিয়ে যান। আর মাকে বলুন, স্বপ্নকে বাধ্যতামূলক নির্দেশ না ভেবে দাদীর জন্য দুআ ও ভালো আমল বাড়িয়ে দিতে। আল্লাহ তাআলা দাদীকে জান্নাতের أعلى মাকাম দান করুন এবং আপনার মাকে সুস্থতা ও শান্তি দান করুন। আমিন।

তথ্যসূত্র:

  • সহিহ বুখারি, হাদিস ৬৯৮৪, ৬৯৮৫, ৬৯৮৬
  • সহিহ মুসলিম, হাদিস ২২৬২, ২২৬৩
  • সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৫০২০ (স্বপ্নের প্রকার)
  • রাদ্দুল মুহতার, ইবন আবিদিন, কিতাবুল জিনায়াত/আহকামুল মাওতা (মৃতের জন্য দুআ ও সদকা)
  • ফাতাওয়া উসমানি, মুফতি তাকি উসমানি, খণ্ড ১, মৃতের জন্য ঈসালে সওয়াব প্রসঙ্গ
  • ইমদাদুল ফাতাওয়া, মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, খণ্ড ১, মৃতের জন্য দুআ ও সদকা
  • মাআরিফুল কুরআন, মুফতি মুহাম্মদ শফি, সূরা ইউসুফের স্বপ্ন-তাফসির প্রসঙ্গ
  • বেহেশতী জেওর, মাওলানা আশরাফ আলী থানভী, স্বপ্ন ও মৃতের জন্য দুআ প্রসঙ্গ

আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.