এভাবে ওসিলা করে কি নামাজ পড়া যাবে? এভাবে ওসিলা করে কি নামাজ পড়া যাবে? "ওয়াসিলা-ই-ফাতিমা নামে বিশেষ নফল নামাজ ও ২১ বার সূরা ইখলাস— এগুলো শরীয়তসম্মত কি না?

Salah-Prayer · Hanafi

Question No: 7819
Questioner: Jahan Jeba
Question Asked: 02 Nov 2026, 07:01 PM
Reviewed & Published: 02 Nov 2026, 10:42 PM
Views: 25
Tokens: 8,737
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। এভাবে ওসিলা করে কি নামাজ পড়া যাবে?

#হাজত পূরণের বিশেষ আমল:
ওয়াসিলা-ই-ফাতিমা (Waseela-e-Fatima)
নফল নামাজ

আমাদের জীবনে কতশত চাওয়া-পাওয়া, পেরেশানি বা কঠিন হাজত থাকে। মহান আল্লাহর দরবারে মা ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর এর অসীলা নিয়ে দোয়া করার একটি অত্যন্ত সুন্দর ও কার্যকরী আমল রয়েছে।

💚১ম রাকাত: সূরা ফাতিহা পড়ার পর, প্রতিবার বিসমিল্লাহসহ ২১ বার সূরা ইখলাস পড়বেন।

💚২য় রাকাত: একইভাবে সূরা ফাতিহা পড়ার পর, প্রতিবার বিসমিল্লাহসহ ২১ বার সূরা ইখলাস পড়বেন।

এভাবে পুরো নামাজ শেষ করুন।এখন,
নামাজের সালাম ফিরানোর পর নিচের আমল গুলো করুন-

১১ বার দরুদে ইব্রাহিম /দরুদে আহলে বাইত পড়ুন।(১ম ছবিতে দরুদে আহলে বাইত)

তারপর তাসবীহে ফাতিমা পড়ুন।

🔹 ৩৩ বার সুবহানাল্লাহ

🔹 ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ

🔹 ৩৪ বার আল্লাহু আকবার

শেষে আবারও ১১ বার দুরুদ শরীফ পড়ুন যে দরুদ টি প্রথমে পড়েছেন।

এরপর যদি আপনি চান, ১৪ সালাম ও পড়তে পারেন (২য় পিকে)

🟢 সওয়াব হাদিয়া দেওয়া এবং দোয়ার নিয়ম
আমল শেষ করে আল্লাহর কাছে হাত তুলে এভাবে মোনাজাত করুন:

"ইয়া আল্লাহ! আমার এই নফল নামাজ, দুরুদ শরীফ এবং তসবীহ-ই-ফাতিমীর সওয়াবটুকু আপনার দরবারে কবুল করুন।১৪ সালাম পড়ে থাকলে সেটিও উল্লেখ করবেন। এর সওয়াবটুকু প্রথমে রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর দরবারে হাদিয়া হিসেবে এবং তাঁর মাধ্যমে মা ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর পবিত্র রূহে হাদিয়া (উপহার) হিসেবে পৌঁছে দিন।নূর নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া আলিহি ওয়া সাল্লাম এর উছিলায় আমলে ভুল ত্রুটি থাকলে ক্ষমা করুন।

এরপর মা ফাতিমা রাদিয়াল্লাহু তায়ালা আনহু এর ওসীলা নিয়ে আল্লাহর কাছে আপনার মনের যত হাজত, সমস্যা বা মনের নেক আশা আছে, তা নিয়ে মন খুলে কেঁদে কেঁদে দোয়া করুন।

এভাবে ওসিলা করে কি নামাজ পড়া যাবে?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর: না, প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতিতে (নির্দিষ্ট সংখ্যা, নির্দিষ্ট সূরা, নির্দিষ্ট দরুদ ও তাসবিহর সমন্বয়ে "ওয়াসিলা-ই-ফাতিমা" নামে) নফল নামাজ পড়া এবং এটিকে হাজত পূরণের বিশেষ আমল হিসেবে গ্রহণ করা শরীয়তসম্মত নয়। এটি বিদআতের অন্তর্ভুক্ত। তবে নামাজের ভেতরে বা বাইরে সাধারণভাবে নবী ﷺ বা নেক বান্দাদের ওসিলা দিয়ে দোয়া করা জায়েজ, যদি তা শরীয়ত নির্ধারিত সীমার মধ্যে থাকে।


১. মূল আপত্তি: নির্দিষ্ট পদ্ধতি ও সংখ্যা নির্ধারণ করা

ইসলামে ইবাদতের মূলনীতি হলো তাওকিফি (শরীয়তের নির্দেশের অনুগত হওয়া)। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:

«مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ» "যে ব্যক্তি এমন আমল করল, যার উপর আমাদের নির্দেশ নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।" — সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৭১৮; সহীহ বুখারী (মু'আল্লাক)

এই হাদিসের ভিত্তিতে উলামায়ে কেরাম বলেন: নফল নামাজ, তাসবিহ, দরুদ—সবকিছুই মূলত জায়েজ; কিন্তু কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যা, নির্দিষ্ট সময়, নির্দিষ্ট সূরা-কম্বিনেশন বা নির্দিষ্ট নাম দিয়ে এটিকে "বিশেষ আমল" হিসেবে চালু করা—এর দলিল রাসূল ﷺ বা সাহাবায়ে কেরাম থেকে প্রমাণিত হতে হবে। প্রশ্নে বর্ণিত পদ্ধতির কোনো প্রমাণ কুরআন-হাদিসে নেই।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রদ্দুল মুহতার-এ লিখেছেন:

"الْعِبَادَةُ تَوْقِيفِيَّةٌ، فَلَا يُشْرَعُ فِيهَا إِلَّا مَا وَرَدَ" "ইবাদত তাওকিফি (নির্দেশ-নির্ভর); তাতে কেবল তাই বৈধ যা শরীয়ত থেকে বর্ণিত হয়েছে।" — রদ্দুল মুহতার, ১/৪৫০ (দারুল ফিকর সংস্করণ)

আল্লামা আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বেহেশতী জেওর-এ নফল নামাজের আলোচনায় স্পষ্ট করেছেন যে, নফল ইবাদতে সংখ্যা ও পদ্ধতি নিজে থেকে নির্ধারণ করা ঠিক নয়; বরং হাদিসে যা এসেছে তা-ই যথেষ্ট। (বেহেশতী জেওর, নামাজ অধ্যায়)


২. "২১ বার সূরা ইখলাস" ও "১১ বার দরুদ" — এর ভিত্তি নেই

হাদিসে সূরা ইখলাসের ফজিলত বহুভাবে বর্ণিত হয়েছে (যেমন: সহীহ বুখারী ৫০১৩), কিন্তু প্রতি রাকাতে ২১ বার বা ১১ বার দরুদ—এ ধরনের নির্দিষ্ট সংখ্যা রাসূল ﷺ থেকে বর্ণিত নেই। ইমাম তহাবী (রহ.) ও ইমাম সারাখসী (রহ.)-এর বর্ণনায় নফল নামাজে কিরাআতের ক্ষেত্রে কোনো নির্দিষ্ট সংখ্যার বাধ্যবাধকতা নেই; বরং যতটুকু সহজ, ততটুকুই যথেষ্ট।

ফাতাওয়া আলমগিরি-তে আছে:

"وَيُسْتَحَبُّ فِي النَّوَافِلِ أَنْ يَقْرَأَ مَا تَيَسَّرَ مِنَ الْقُرْآنِ" "নফল নামাজে কুরআনের যতটুকু সহজ হয়, তা পড়া মুস্তাহাব।" — ফাতাওয়া আলমগিরি, ১/৭০ (নফল নামাজ অধ্যায়)


৩. "তাসবিহে ফাতিমা" নামাজের পর পড়া — জায়েজ, কিন্তু এটিকে বিশেষ আমলের অংশ বানানো নয়

হযরত ফাতিমা (রা.) থেকে বর্ণিত তাসবিহ (৩৩ বার সুবহানাল্লাহ, ৩৩ বার আলহামদুলিল্লাহ, ৩৪ বার আল্লাহু আকবার) সহীহ বুখারী (৫৩৬২) ও সহীহ মুসলিমে (২৭২৭) বর্ণিত আছে এবং এটি প্রত্যেক নামাজের পর পড়া সুন্নত। কিন্তু এটিকে "ওয়াসিলা-ই-ফাতিমা" নামে বিশেষ নামাজের সাথে যুক্ত করে নির্দিষ্ট সংখ্যক দরুদের সাথে বেঁধে ফেলা—এটি হাদিসের পদ্ধতির বাইরে।


৪. ওসিলা দিয়ে দোয়া করা — শরীয়তসম্মত সীমা

ওসিলা দুই প্রকার:

(ক) জায়েজ ওসিলা: আল্লাহর নাম-গুণাবলি, নিজের নেক আমল, নবী ﷺ-এর প্রতি ঈমান-ভালোবাসা, অথবা নেক বান্দার জন্য দোয়া করা। যেমন কুরআনে: «وَاتَّقُوا اللَّهَ الَّذِي تَسَاءَلُونَ بِهِ وَالْأَرْحَامَ» (নিসা: ১)। হাদিসে অন্ধ সাহাবির ঘটনা (তিরমিজি ৩৫৭৮) — যেখানে নবী ﷺ-এর ওসিলায় দোয়া করা হয়েছে।

(খ) নিষিদ্ধ ওসিলা: মৃত ব্যক্তিকে সরাসরি ডেকে তাদের কাছে প্রার্থনা করা, বা এমন পদ্ধতি উদ্ভাবন করা যা শরীয়তে নেই। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রদ্দুল মুহতারে স্পষ্ট করেছেন যে, মৃত নেককার ব্যক্তির রূহের মাধ্যমে দোয়া করা—যেখানে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা হয় এবং নেক ব্যক্তিকে মাধ্যম বানানো হয়—এটি সালাফদের একটি দল জায়েজ বলেছেন, তবে নিজে থেকে নতুন পদ্ধতি ও সংখ্যা বানানো কোনোভাবেই জায়েজ নয়। (রদ্দুল মুহতার, ১/৫৬০; ফাতাওয়া উসমানি, ১/৩৯০-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য)

মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানিতে ওসিলা প্রসঙ্গে বলেন: ওসিলা শরীয়তসম্মত হলে জায়েজ, কিন্তু বিদআতি পদ্ধতিতে ওসিলা করা নিষিদ্ধ। (ফাতাওয়া উসমানি, ১/৩৮৮-৩৯২)


৫. সওয়াব "হাদিয়া" দেওয়া

নফল ইবাদতের সওয়াব মৃত ব্যক্তির রূহে পৌঁছানো—আহলে সুন্নত ওয়াল জামাতের মতে জায়েজ (রদ্দুল মুহতার, ২/২৪৩)। তবে এটিকে নামাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ বা নির্দিষ্ট সংখ্যার সাথে বেঁধে ফেলা ঠিক নয়। সওয়াব হাদিয়া করা যায়, কিন্তু এটিকে "এই নামাজের এই অংশ এইভাবে দিতে হবে" —এমন বিধান বানানো বিদআত।


৬. সঠিক পদ্ধতি (বিকল্প)

হাজত পূরণের জন্য শরীয়তসম্মত পদ্ধতি:

  1. সালাতুল হাজত: দুই রাকাত নফল নামাজ পড়ে আল্লাহর কাছে দোয়া করা। রাসূল ﷺ বলেছেন: «مَنْ كَانَتْ لَهُ إِلَى اللَّهِ حَاجَةٌ... فَلْيَتَوَضَّأْ... ثُمَّ يُصَلِّي رَكْعَتَيْنِ...» (তিরমিজি ৪৭৯, ইবনে মাজাহ ১৩৮৪)।
  2. নামাজের পর তাসবিহে ফাতিমা পড়া (সুন্নত হিসেবে, বিশেষ নামাজের অংশ হিসেবে নয়)।
  3. দরুদ শরীফ পড়া—যতবার ইচ্ছা, নির্দিষ্ট সংখ্যার বাধ্যবাধকতা ছাড়া।
  4. আল্লাহর নাম বা নেক আমলের ওসিলায় দোয়া করা।
  5. নেক বান্দাদের রূহে সওয়াব হাদিয়া করা—জায়েজ, তবে সাধারণভাবে।

উপসংহার

প্রশ্নে বর্ণিত "ওয়াসিলা-ই-ফাতিমা" নামে নির্দিষ্ট সংখ্যা ও পদ্ধতির নফল নামাজ ও আমল—এর কোনো দলিল নেই; এটি বিদআত। নফল নামাজ, তাসবিহ, দরুদ ও দোয়া—সবই জায়েজ, কিন্তু শরীয়ত নির্ধারিত পদ্ধতিতে। হাজত পূরণের জন্য সালাতুল হাজত ও সাধারণ দোয়াই যথেষ্ট।

والله أعلم بالصواب



This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.