চুরি করা পণ্য না জেনে কেনা কি গুনাহ
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
আমি একটি বিষয়ে গুনাহ হবে কি না সন্দেহে আছি।আমার চাচাতো ভাই আমাদের একটি ডিম পারা মুরগি কিনে দেয়।কিন্তু কিনে আনার পর জানতে পারি মুরগিটি সে যার কাছ থেকে কিনেছে সে ঐ মুরগি চুরি করে এনে বিক্রি করেছে।
এখন আমার কি করা উচিত,আমার কি গুনাহ হবে,মুরগি ফেরত দিতে চাইলেও আমার মা-বাবা ফেরত দিতে দিবে না।আমার কাছে ঠিক মনে হচ্ছে না,এমনকি আমি নিজের টাকায়ও তা কিনে নি,তাই কিছু বলতে পারছি
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
সংক্ষিপ্ত উত্তর
আপনার সরাসরি গুনাহ হবে না — কারণ আপনি নিজে চুরি করেননি, জানতেনও না, এমনকি নিজের টাকায় কিনেননি। তবে চুরি করা মুরগি ভক্ষণ করা আপনার জন্য জায়েয নয়, যতক্ষণ না এর প্রকৃত মালিকের কাছে তা ফেরত দেওয়া হয় বা তার অনুমতি/মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয়। কারণ চুরির মাল (মালে মাগসুব) ক্রয়-বিক্রয়ের মাধ্যমে হালাল হয় না; শরীয়তে এতে ক্রেতার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হয় না।
বিস্তারিত আলোচনা (হানাফি ফিকহ অনুযায়ী)
১. চুরির মাল ক্রয় করলে মালিকানা হয় না
হানাফি ফিকহের মূলনীতি হলো—“الخبيث لا يطيب بالانتقال” অর্থাৎ অপবিত্র/হারাম বস্তু হস্তান্তরের মাধ্যমে হালাল হয় না। চুরি করা মাল যে হাতেই যাক, তা মালিকের সম্পত্তি হিসেবেই থাকে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«مَنْ أَخَذَ أَمْوَالَ النَّاسِ يُرِيدُ إِتْلَافَهَا أَتْلَفَهُ اللَّهُ» — “যে ব্যক্তি মানুষের সম্পদ ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে গ্রহণ করে, আল্লাহ তাকে ধ্বংস করে দেন।” (সহীহ বুখারী, হাদিস ২৪০৩)
ইমাম ইবন আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেন, গাসব বা চুরির মাল ক্রয়কারীর নিকট তা আমানতস্বরূপ থাকে; তাকে অবশ্যই প্রকৃত মালিককে ফেরত দিতে হবে। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৫, কিতাবুল গাসব)
২. আপনি নিজে দায়ী নন, কিন্তু ভোগ করা যাবে না
যেহেতু আপনি জানতেন না এবং নিজে কিনেননি, তাই আপনার ওপর চুরির গুনাহ নেই। কিন্তু যেহেতু এখন জেনে গেছেন যে এটি চুরির মাল, তাই এটি খাওয়া আপনার জন্য জায়েয নয়। ফিকহের নীতি:
«الْعِلْمُ كَالْعِلْمِ» — জেনে যাওয়ার পর আগের অজ্ঞতা ওজর হয় না।
আপনি জানার পরও ভক্ষণ করলে আপনি চুরির মাল ভোগের গুনাহে শরিক হবেন।
৩. মা-বাবা ফেরত দিতে না চাইলে আপনার করণীয়
আপনার ওপর যেহেতু সরাসরি দায় নেই, তাই আপনার কর্তব্য হবে:
- মা-বাবাকে বোঝানো — নরমভাবে, সম্মানের সাথে বোঝান যে এটি চুরির মাল, এতে বারাকাহ নষ্ট হয় এবং গুনাহ হয়। হাদিসে এসেছে, হারাম খাদ্য শরীরে প্রবেশ করলে দুআ কবুল হয় না (সহীহ মুসলিম, হাদিস ১০১৫-এর ধারণা)।
- নিজে সেই মুরগি না খাওয়া — সম্ভব হলে এড়িয়ে যাওয়া।
- মূল্য পরিশোধের চেষ্টা — যদি মালিককে খুঁজে পাওয়া যায়, তবে তার মূল্য (মুরগির বাজারমূল্য) তাকে দেওয়ার চেষ্টা করুন; এতে দায় থেকে মুক্তি পাওয়ার সম্ভাবনা আছে। মালিক অজানা হলে সদকা করা যেতে পারে (তবে সদকা করলেও মালিকানা হালাল হয় না, শুধু দায় হালকা হয়)।
- বিক্রেতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা — সম্ভব হলে চুরির বিষয়টি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো, যাতে সে আর কারও সাথে প্রতারণা না করে।
৪. গুরুত্বপূর্ণ সতর্কতা
«لَا يَحِلُّ لِامْرِئٍ مِنْ مَالِ أَخِيهِ إِلَّا مَا طَابَتْ بِهِ نَفْسُهُ» — “কোনো মুসলিমের জন্য তার ভাইয়ের সম্পদ হালাল নয়, যতক্ষণ না সে সন্তুষ্টচিত্তে দেয়।” (মুসনাদে আহমাদ)
সুতরাং চুরির মাল যে পথেই আসুক, তা ভক্ষণ করা হালাল নয়। আপনার বিবেকের অস্বস্তি স্বাভাবিক ও প্রশংসনীয় — এটি দ্বীনি হৃদয়ের লক্ষণ।
উপসংহার
- আপনার গুনাহ নেই (অজ্ঞতা ও নিজে না কেনার কারণে)।
- তবে জেনে-বুঝে সেই মুরগি খাওয়া আপনার জন্য জায়েয নয়।
- মা-বাবাকে নরমভাবে বোঝানোর চেষ্টা করুন; সম্ভব হলে মালিককে খুঁজে মূল্য পরিশোধ করুন।
- আল্লাহ তাওফিক দান করুন। আপনার এই সংবেদনশীলতা দ্বীনের প্রতি আপনার আন্তরিকতার প্রমাণ।
والله أعلم بالصواب