তেলাপোকার মল নাপাক কি

Taharah Purity · Hanafi

Question No: 7784
Questioner: Dilsha Tani
Question Asked: 02 Nov 2026, 10:37 AM
Reviewed & Published: 02 Nov 2026, 02:23 PM
Views: 13
Tokens: 9,233
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম,

(১) আচ্ছা আমি যদি জানি যে এই পাপসে নাপাকি থাকার সম্ভাবনা আছে কিন্তু আমি দেখিনি নাপাকির ছিঁটা লাগতে তাহলে কি নাপাকির কোন মাসায়েল বর্তাবে? যেমন, ছোটববাচ্চারা প্রস্রাব করার পর পা ধুয়ে এসে পাপসে পা মুছে আলহামদুলিল্লাহ, এখন কখনো যদি পা ঠিকভাবে ধুয়ে না এসে পাপসে পা মোছে তাহলে এবং আমি সেটা জানলাম না, তাহলে কি সেখানে নাপাকের হিসাব হবে?
মোটকথা, নাপাক এক স্থানে লেগে আছে কিন্তু আমি সেটা দেখিনি বা আমার জানা হলনা আমি আমার মতন কাজ করে গেছি তাহলে তো নাপাকের হুকুম আসবেনা তাইনা?

(২) এই বিষয়টা একটু সহজভাবে বুঝিয়প দিবেন কষ্ট করে ইনশা আল্লাহ, মাসায়েলটা আমি জানি। শুধুমাত্র বোঝার জন্য প্রশ্ন।

এই শীতের সময়ে তো সবসময় মাথার সম্পূর্ণ চুল ধোয়া যায়না এখন, কাপড় ধুতে গেলে মাথায় চুলে কাপড় কাচাঁ পানি ছিটে লাগল এবং চুল খোপা কর আছে তাহলে এই অবস্থায় চুলে পানি দিলে সেই নাপাক পানি তো চুলের গোড়ায় পৌঁছে যায়। যায় কি? তাহলে যে মাসায়েলে বলা হয়, চুলের গোড়া না খুলে ধুলেই হবে!

নাকি এইখানে কি এইভাবে ধরে নেওয়া যাবে যে, নাপাক পানি নাকি কি পানি সেইটা তো আমি শিওর চুল খুলে দেখতে পাচ্ছি না তাহলে সাধারণ হিসেবে নিলেই হচ্ছে। যেমন, কোন বাচ্চা প্রস্রাব করলে তার তো আলামত দেখে নাপাক বিবেচনা করতে পারি। এখন চুলের নাপাক লেগে থাকার পানি দূুর করতে খোপা অবস্থায় পানি কোথায় যাচ্ছে কি যাচ্ছে না সেটাতো আমি দেখছিনা, জানছিনা তাইনা?? তাহলে এই খোপা অবস্থায় পানি দিলেই পাক হয়ে যাবে চুল?

(৩) টিকটিকির, তেলাপোকার মলও নাপাক। এখন চারিদিকে, বেলকনিতেও এইগুলোর ছড়াছড়ি। বৃষ্টিতে বেলকনি ভিজে ঘরের মধ্যে তাই পানি চলে আসে আর ওই বেলকনিতে তো তেলাপোকা মল টিকটিকির মল বিভিন্ন চিপায় লেগে থাকে অনেক। তাহলে এর মাসায়েল কি হবে? বাচ্চারা সেই বেলকনিতে পানি নিয়ে ঘরে আসলে সবকিছুই নাপাক হয়ে যাবে?

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

সংক্ষিপ্ত উত্তর: ইসলামে নাপাকির বিধান "ইয়াকীন" (নিশ্চিত জ্ঞান) ও "গালাবা-ই যন্ন" (প্রবল ধারণা)-এর উপর নির্ভর করে, শুধু সম্ভাবনা বা সন্দেহের উপর নয়। যা চোখে দেখা যায়নি বা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি, তা নাপাক ধরা হবে না। তবে যে ব্যক্তি নিজেই জানে যে তার পায়ে/কাপড়ে নাপাকি লেগেছে, তার জন্য সে নাপাকি ধুয়ে পাক করা ওয়াজিব। আর চুল খোপা অবস্থায় ধোয়ার মাসআলা হলো—চুলের গোড়া পর্যন্ত পানি পৌঁছানো শর্ত, খোপা খোলা শর্ত নয়; যদি পানি গোড়া পর্যন্ত পৌঁছে যায় তবে খোপা খুলে চুল এলোমেলো করা জরুরি নয়। আর টিকটিকি-তেলাপোকার মল সম্পর্কে বিস্তারিত নিচে দেওয়া হলো।


(১) সন্দেহ ও সম্ভাবনার ভিত্তিতে নাপাকির হুকুম

মূলনীতি: ফিকহের একটি সুপ্রতিষ্ঠিত কায়েদা হলো—

«اليقين لا يزول بالشك» — নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না। (মাজাল্লাতুল আহকাম, কায়েদা নং ১; রদ্দুল মুহতার ১/১৮৭)

আর নাপাকি সম্পর্কে মূলনীতি হলো: «الأصل في الأشياء الطهارة» — প্রত্যেক বস্তুর মূল অবস্থা পবিত্রতা, যতক্ষণ নাপাকির নিশ্চিত প্রমাণ না পাওয়া যায়। (রদ্দুল মুহতার ১/১৮৭; আল-আশবাহ ওয়ান নাযাইর)

আপনার প্রশ্নের প্রয়োগ:

১. যদি আপনি না জানেন, না দেখেন যে পাপসে নাপাকি লেগেছে — তাহলে সেই পাপস নাপাক গণ্য হবে না, তাতে নামাজ পড়া জায়েজ। কারণ নাপাকি একটি "হাদাস/নাজাসাত" যা প্রমাণসাপেক্ষ; শুধু "সম্ভাবনা" প্রমাণ নয়।

২. কিন্তু যদি আপনি নিজেই জানেন যে শিশুর পা ভালোভাবে ধোয়া হয়নি এবং সেই ভেজা পা পাপসে লেগেছে — তাহলে যেখানে লেগেছে সেই স্থান নাপাক, এবং তা ধোয়া ওয়াজিব। এখানে "আমি দেখিনি" বলে এড়ানো যাবে না, কারণ আপনার কাছে ইয়াকীন (নিশ্চিত জ্ঞান) আছে যে নাপাক পা লেগেছে।

৩. যদি সত্যিই জানা না থাকে (যেমন শিশু নিজে পা ধুয়েছে, আপনি দেখেননি, তার পা ভেজা ছিল কিনা তাও জানেন না) — তাহলে সন্দেহের কারণে কিছুই নাপাক হবে না। ইমাম ইবনে আবিদিন রহ. বলেন, নাপাকির ব্যাপারে শুধু প্রবল ধারণা (যন্নে غالب) যথেষ্ট, সাধারণ সন্দেহ নয়। (রদ্দুল মুহতার ১/১৮৭, ১/৩১৬)

সারকথা: "নাপাক লেগে আছে কিন্তু আমি দেখিনি/জানি না" — এ অবস্থায় নাপাকির হুকুম আসবে না। কিন্তু "আমি জানি নাপাক লেগেছে" — এ অবস্থায় হুকুম আসবে, দেখেছি কি দেখিনি তা বিবেচ্য নয়।


(২) চুল খোপা অবস্থায় ধোয়ার মাসআলা

মাসআলা: গোসল বা পবিত্রতায় চুলের গোড়া (চুলের মূল/খোপার নিচের ত্বক) পর্যন্ত পানি পৌঁছানো ফরজ। খোপা খুলে চুল এলোমেলো করা ফরজ নয় — যদি পানি গোড়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। (রদ্দুল মুহতার ১/১৫৪; আল-হিদায়া ১/১৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৩)

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«إِنَّ تَحْتَ كُلِّ شَعْرَةٍ جَنَابَةً فَاغْسِلُوا الشَّعْرَ وَأَنْقُوا الْبَشَرَةَ» "প্রতিটি চুলের নিচে জানাবাত (নাপাকি) আছে, সুতরাং চুল ধোও এবং ত্বক পরিষ্কার করো।" (সুনানে আবু দাউদ ২৩২; সুনানে তিরমিজি ১০৬ — যদিও সনদে দুর্বলতা আছে, ফুকাহায়ে কেরাম এর মর্ম গ্রহণ করেছেন)

আপনার দ্বিধার সমাধান:

১. নাপাক পানি চুলের গোড়ায় পৌঁছালে — সেটা নাপাকি হিসেবে গণ্য হবে এবং গোড়া পর্যন্ত পৌঁছানো পানি দিয়ে ধুতে হবে। কিন্তু এখানে প্রশ্ন হলো: আপনি কি নিশ্চিত যে সেই পানি নাপাক? যদি কাপড় ধোয়ার পানি পাক হয় (যা সাধারণত পাকই থাকে), তাহলে চুলে লাগলে চুল নাপাক হবে না — বরং চুল পাকই থাকবে।

২. "দেখছি না, জানছি না" — এ অজুহাতে পাক ধরে নেওয়া যাবে কি? — হ্যাঁ, যাবে। কারণ মূলনীতি হলো পবিত্রতা (الأصل الطهارة)। যতক্ষণ নাপাকির নিশ্চিত প্রমাণ না পাওয়া যায়, ততক্ষণ পাকই ধরা হবে। আপনি যদি না জানেন যে পানি নাপাক, তাহলে সেটা পাক; চুলও পাক। কিন্তু যদি জানেন যে পানি নাপাক (যেমন কাপড়ে নাপাকি ছিল এবং সেই পানি চুলে লেগেছে), তাহলে গোড়া ধোয়া ওয়াজিব — খোপা খোলা জরুরি নয়, শুধু পানি গোড়া পর্যন্ত পৌঁছানো নিশ্চিত করতে হবে।

সারকথা: খোপা অবস্থায় পানি দিলেই চুল পাক হয়ে যাবে — যদি পানি পাক হয় এবং গোড়া পর্যন্ত পৌঁছে যায়। খোপা খোলা শর্ত নয়; গোড়া পর্যন্ত পানি পৌঁছানো শর্ত। আর পানি নাপাক কিনা তা নিশ্চিত না হলে পাকই ধরা হবে।


(৩) টিকটিকি ও তেলাপোকার মল এবং বেলকনির পানি

মাসআলা: টিকটিকি ও তেলাপোকার মল সম্পর্কে ফুকাহায়ে কেরামের মত:

১. তেলাপোকা (صرصور): ইমাম আবু হানিফা রহ.-এর মতে এর মল নাপাক (নাজাসাতে মুগাল্লাযা নয়, বরং হালকা নাপাকি)। ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ রহ.-এর মতে পাক। তবে ব্যবহারিক ক্ষেত্রে অনেক ফকীহ বলেছেন, যেহেতু এগুলো সাধারণত ছোট ও দুর্বল, তাই এগুলোতে مبتلا-ই আম (সাধারণ ব্যাপকতা) থাকায় অসুবিধা এড়াতে পাক ধরা যায় — বিশেষত যেখানে কষ্ট হয়। (রদ্দুল মুহতার ১/৩১৬; ইমদাদুল ফাতাওয়া ১/৩৮)

২. টিকটিকি (وزغ): এর মলও নাপাক। তবে এগুলো সাধারণত দেয়ালে ও উঁচু স্থানে থাকে, মেঝেতে পড়া বিরল।

আপনার প্রশ্নের প্রয়োগ:

১. বেলকনিতে বৃষ্টির পানি এসে ঘরে ঢুকলে: যদি নিশ্চিতভাবে জানা যায় যে সেই পানিতে টিকটিকি/তেলাপোকার মল মিশেছে, তাহলে সেই পানি নাপাক — এবং তা যেখানে লেগেছে সেখানে ধোয়া ওয়াজিব। কিন্তু যদি শুধু সম্ভাবনা থাকে (মল আছে কিনা দেখা যায়নি), তাহলে মূলনীতি (الأصل الطهارة) অনুযায়ী পানি পাকই ধরা হবে।

২. বাচ্চারা সেই পানি নিয়ে ঘরে আসলে: যদি পানি পাক হয়, কিছুই নাপাক হবে না। যদি নাপাক হয়, যেখানে লেগেছে শুধু সেখানে ধোয়া ওয়াজিব — পুরো ঘর নাপাক হবে না।

৩. সতর্কতামূলক ব্যবস্থা: যেহেতু এগুলো সাধারণত ছোট মল এবং সাধারণত অসুবিধা হয়, ফকীহগণ এ ধরনের ক্ষেত্রে "عموم البلوى" (সাধারণ ব্যাপকতা) এর কারণে সহজতা দিয়েছেন। তবে সতর্কতা হিসেবে বেলকনির পানি ঘরে আনার আগে পরিষ্কার করে নেওয়া উত্তম।

সারকথা: নিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া শুধু সম্ভাবনায় বেলকনির পানি নাপাক হবে না; বাচ্চারা তা নিয়ে ঘরে এলে সবকিছু নাপাক হবে না। তবে নিশ্চিত হলে শুধু আক্রান্ত স্থান ধোয়া ওয়াজিব।


মূল সারসংক্ষেপ

| প্রশ্ন | হুকুম | |---|---| | নাপাকি লেগেছে কিনা জানি না/দেখিনি | নাপাক ধরা হবে না; পাকই থাকবে | | নিজে জানি নাপাক লেগেছে | সেই স্থান ধোয়া ওয়াজিব | | চুল খোপা অবস্থায় পানি দেওয়া | গোড়া পর্যন্ত পৌঁছালে যথেষ্ট; খোপা খোলা শর্ত নয় | | পানি নাপাক কিনা সন্দেহ | পাকই ধরা হবে (الأصل الطهارة) | | টিকটিকি/তেলাপোকার মল | নাপাক, তবে নিশ্চিত প্রমাণ ছাড়া পানি নাপাক হবে না |

উৎসগ্রন্থ: রদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন) ১/১৫৪, ১/১৮৭, ১/৩১৬; আল-হিদায়া ১/১৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া ১/১৩, ১/৪৬; ইমদাদুল ফাতাওয়া ১/৩৮; ফাতাওয়া উসমানি ১/৩৪৭-৩৫০; মাজাল্লাতুল আহকাম (কায়েদা ১, ৫)।

والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.