প্রস্রাবের পর ফোঁটা পড়ার সমস্যা থাকলে নামাজ ও জামাতের হুকুম কী?
Taharah Purity · Hanafi
Question
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
প্রেশ্নোক্ত ব্যক্তির প্রস্রাবের সমস্যা, ইস্তিবরা (প্রস্রাবের ফোঁটা বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা), প্রস্রাব চেপে রেখে নামায পড়া এবং জামাতে শরীক হওয়ার বিধান সংক্রান্ত শরঈ ফয়সালা নিচে প্রামাণ্য কিতাবসমূহের রেফারেন্স (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ) উপস্থাপন করা হলো:
১. মূল শরঈ সিদ্ধান্ত:
১. প্রস্রাবের ফোঁটা বের হওয়া অবস্থায় নামাযে দাঁড়ানো নাজায়েয: যদি কোনো ব্যক্তি নিশ্চিত থাকে যে প্রস্রাব করার পর ১০–১৫ মিনিট পর্যন্ত তার লজ্জাস্থান দিয়ে প্রস্রাবের ফোঁটা বের হতে থাকে, তবে ওই ফোঁটা নির্গত হওয়ার সময় নিশ্চিত জানা সত্ত্বেও ওযু করে নামায বা জামাতে দাঁড়ানো জায়েয হবে না [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ২০, ৩১; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫৫]। কারণ নামায চলাকালীন ফোঁটা নির্গত হলে ওযু ভেঙে যাবে এবং নামায বাতিল (ফাসিদ) হয়ে যাবে [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৩১]।
২. উক্ত ব্যক্তি শরঈ 'মা'যূর' (ওজরগ্রস্ত) নন: ফিকহের বিচারে ওই ব্যক্তি 'মা'যূর' নন। কারণ শরঈ মা'যূর হওয়ার শর্ত হলো— পুরো এক ওয়াক্ত নামাযের সময়ের ভেতরে প্রস্রাবের ফোঁটা বন্ধ হয়ে ওযু করে কেবল ফরয নামাযটুকু আদায় করার মতো সামান্য সময়ও না পাওয়া [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২০]। যেহেতু উনার ফোঁটা ১০–১৫ মিনিট পর বন্ধ হয়ে যায়, তাই উনি মা'যূর নন; বরং উনাকে ফোঁটা বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতেই হবে [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ২০]।
৩. প্রস্রাবের বেগ চেপে নামায পড়ার হুকুম: প্রস্রাব বা পায়খানার বেগ চেপে রেখে নামায পড়া মাকরুহে তাহরীমী [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৫৬; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৬৪]।
২. ফিকহী বিশ্লেষণ ও সুনির্দিষ্ট বিধানসমূহ:
ক. ইস্তিবরা (প্রস্রাব নিঃসরন নিশ্চিত করা) ফরয/ওয়াজিব:
- প্রস্রাব করার পর ফোঁটা বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করাকে ফিকহের পরিভাষায় 'ইস্তিবরা' (الاستبراء) বলা হয় [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ২০]।
- ফোঁটা বের হওয়া বন্ধ হয়েছে বলে মন আশ্বস্ত না হওয়া পর্যন্ত ওযু করা এবং নামাযে দাঁড়ানো শরী'আতে জায়েয নেই [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ২০]।
খ. জামাত বনাম পবিত্রতা (পবিত্রতা রক্ষা অগ্রাধিকারযোগ্য):
- নামাযের জন্য 'তাহারাত' বা শরীর ও কাপড়ের পবিত্রতা শর্ত (রুকন/শর্ত), যা বজায় রাখা ফরয [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৩১]। পক্ষান্তরে জামাতে নামায পড়া সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ বা ওয়াজিব।
- অতএব, জামাত ছুটে যাওয়ার ভয়ে বা জামাত ধরার জন্য নাপাক অবস্থায় (বা নামাযে ফোঁটা বের হবে জানা সত্ত্বেও) নামাযে দাঁড়ানো যাবে না। যদি প্রস্রাব করার পর ১০–১৫ মিনিট ফোঁটা আসার কারণে জামাত ছুটেও যায়, তবে পবিত্রতা অর্জন করে একাকী নামায আদায় করে নিতে হবে; এতে কোনো গোনাহ হবে না [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ২০; ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫৫]।
গ. তুলা বা টিস্যু ব্যবহারের বিশেষ শরঈ পন্থায় সমাধান:
- যদি জরুরি প্রয়োজনে (যেমন: ফজরের সময় কম থাকা বা জামাত ধরার জন্য) প্রস্রাব করতে হয়, তবে লজ্জাস্থানের ছিদ্রে তুলা বা টিস্যু এমনভাবে আটকে বা ভেতরে প্রবিষ্ট করে রাখা যায়, যাতে প্রস্রাবের ফোঁটা ছিদ্রের ভেতরের অংশেই শোষিত হয়ে যায় এবং বাহিরে বা কাপড়ে ছড়িয়ে না পড়ে [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫৫]।
- শর্ত হলো: তূলার যে অংশে প্রস্রাব লেগেছে তা যেন লজ্জাস্থানের ছিদ্রের বাইরের অংশে বা কাপড়ে বের হয়ে না আসে। যদি ভেজা অংশ বাইরে প্রাকটীক্যালি বের না হয়, তবে ওযু ভাঙবে না এবং উক্ত অবস্থায় ওযু করে জামাতে নামায পড়া জায়েয হবে [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫৫]। তবে যদি তুলা ভিজে বাইরে বের হয়ে আসে বা প্রস্রাব বাইরে গড়িয়ে পড়ে, তবে ওযু ভেঙে যাবে [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫৫]।
৩. আপনার জন্য চূড়ান্ত পরামর্শ ও করণীয়:
১. সময় ব্যবস্থাপনা: প্রতিদিন বিশেষ করে ফজরের সময় জামাতের অন্তত ২০–২৫ মিনিট আগে ঘুম থেকে ওঠার চেষ্টা করবেন, যাতে স্বাভাবিকভাবে প্রস্রাব করে ১০–১৫ মিনিট অপেক্ষা (ইস্তিবরা) করে পবিত্র হয়ে নিশ্চিন্তে ওযু ও জামাতে শরিক হওয়া যায়। ২. হঠাৎ সময় কম থাকলে: যদি কখনো ফজরের জামাতের মাত্র ১০ মিনিট আগে ঘুম ভাঙে এবং প্রস্রাবের প্রচণ্ড বেগ থাকে, তবে প্রস্রাব আটকে রেখে মাকরুহ অবস্থায় নামায পড়ার চেয়ে প্রস্রাব করে নেওয়া উত্তম। এরপর যদি ফোঁটা ঝরার কারণে জামাত না পাওয়া যায়, তবে ফোঁটা বন্ধ হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করে সম্পূর্ণ পবিত্র হয়ে একা নামায আদায় করে নেবেন। ৩. তুলা/টিস্যু কায়দা ব্যবহার: জামাত পাওয়ার প্রয়োজন হলে লজ্জাস্থানের মুখে বা নালীতে শুকনা তুলা বা টিস্যু সঠিকভাবে ব্যবহার করবেন, যাতে বাইরে ফোঁটা না আসে [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫৫]।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- নূরুল ঈযাহ (বাংলা সংস্করণ):
- পৃষ্ঠা: ২০ (পরিচ্ছেদ: ইস্তিনজার বর্ণনা — 'পুরুষের জন্য ইস্তিবরা করা অপরিহার্য ও ফোঁটা বন্ধ হওয়া পর্যন্ত ওজু জায়েয না হওয়া সংক্রান্ত মাসআলা') [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ২০]।
- পৃষ্ঠা: ৩১ (পরিচ্ছেদ: ওজু ভঙ্গের কারণসমূহ — 'মূত্রদ্বার থেকে কিছু নির্গত হলে ওজু ভঙ্গ হওয়া') [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৩১]।
- পৃষ্ঠা: ৫৬ (পরিচ্ছেদ: নামাযের মাকরুহাত — 'পেশাব বা পায়খানা চেপে রেখে নামায পড়া মাকরুহ হওয়া সংক্রান্ত মাসআলা') [নূরুল ঈযাহ, পৃষ্ঠা: ৫৬]।
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৫৫ (অধ্যায়: তাহারাত, ৫ম অনুচ্ছেদ: ওজু ভঙ্গের কারণসমূহ — 'প্রস্রাবের ফোঁটা নির্গত হওয়া এবং লজ্জাস্থানে তুলা ব্যবহারের ফিকহী আহকাম') [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৫৫]।
- পৃষ্ঠা: ১২০–১২১ (অধ্যায়: তাহারাত, ৩য় অনুচ্ছেদ: 'মা'যূরের আহকাম ও ওজরগ্রস্ত হওয়ার শরঈ শর্তাবলী') [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২০, ১২১]।
- পৃষ্ঠা: ২৬৪ (অধ্যায়: সালাত, ২য় অনুচ্ছেদ: 'প্রস্রাব-পায়খানা চেপে রেখে নামায পড়ার ফিকহী হুকুম') [ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী ১ম খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৬৪]।
والله أعلم بالصواب