বিতরের নামাজে ভুলে দ্বিতীয় রাকাতে দুআ কুনুত পড়লে নামাজ হবে কি?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 7683
Questioner: Limon
Question Asked: 01 Nov 2026, 06:24 AM
Reviewed & Published: 01 Nov 2026, 03:14 PM
Views: 14
Tokens: 8,515
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১. বিতর এর নামাজে ভুল করে ৩য় রাকাত মনে করে ২য় রাকাতে দুআ কুনুত পড়ে ফেলেছিলাম পরে ভুল বুঝতে পেরে ৩য় রাকাতে দুআ কুনুত পড়ে সাহু সিজদা দিয়ে নামাজ শেষ করি। নামাজ কি আদায় হয়েছে?( বিতর ২৫ শে অক্টোবর ২৬)

২.কোনো কারণে ঘরে কোনো কিছুর ভিডিও করার সময় বাহিরে একজন মহিলার আওয়াজ আসল যা ভিডিওতে চলে আসল পরে এই ভিডিও আমি ডিলিট করে দেই।এখন কি ঐ মহিলার কাছে ক্ষমা চাইতে হবে?

৩.রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আগমন এর আগে ঈসা আঃ অনুসারী আহলে কিতাব খ্রিষ্টানরা যারা ঈসা আঃ কে আল্লাহর রাসূল বলে বিশ্বাস করত,মূসা আঃ এর অনুসারী ইহুদি,আরবদের মধ্যে যারা ইব্রাহিম আঃ এর হানিফ ধর্মের অনুসারী তারা কি তখন সঠিক পথে ছিল? তারা মুসলিম ছিল এবং ইসলাম ধর্মের অনুসারী হিসেবে গণ্য হবে এবং তারা ছাড়া বাকিরা কাফের?

৪.আমি একজন ছেলে।আম্মু যদি আমার ফোনে কোনো মহিলার সাথে কথা এবং সেই মহিলার কথা মোবাইল থেকে শোনা যাচ্ছে (যদিও লাউড স্পিকার দেওয়া নাই) ।সেই মহিলার কথা যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে আমার কানে আসে বা কোনো পরপুরুষ শোনে তাহলে কি আমার গুণাহ হবে?

৫.আম্মু যদি আমার ফোনে কোনো মহিলার সাথে কথা এবং আম্মু ইচ্ছাকৃতভাবে লাউড স্পিকার দেয় ফলে সেই মহিলার কথা মোবাইল থেকে শোনা যাচ্ছে।সেই মহিলার কথা যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে আমার কানে আসে বা কোনো পরপুরুষ শোনে তাহলে কি আমার গুণাহ হবে?

Answer

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

১. বিতরের নামাজে ভুল করে দ্বিতীয় রাকাতে দুআ কুনুত পড়া

উত্তর: আপনার বর্ণনা অনুযায়ী আপনি দ্বিতীয় রাকাতে ভুলে দুআ কুনুত পড়েছেন, অতঃপর তৃতীয় রাকাতে পুনরায় দুআ কুনুত পড়ে সাহু সিজদা দিয়ে নামাজ শেষ করেছেন। আপনার নামাজ আদায় হয়ে গেছে, । পুনরায় পড়ার প্রয়োজন নেই।

ব্যাখ্যা: বিতরের নামাজে দুআ কুনুত তৃতীয় রাকাতে পড়া সুন্নত। তবে ভুলে দ্বিতীয় রাকাতে পড়ে ফেললে নামাজ বাতিল হয় না; বরং শেষে সাহু সিজদা দিলে নামাজ সহীহ হয়ে যায়। যেহেতু আপনি সাহু সিজদা দিয়েছেন, তাই নামাজ আদায় হয়েছে।

হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যখন কেউ নামাজে ভুল করে, তখন সে যেন দুইটি সিজদা (সাহু) দেয়।" — সহীহ বুখারী, হাদিস ৪০১; সহীহ মুসলিম, হাদিস ৫৭২

হানাফি ফিকহ: ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, ওয়াজিব কাজ ভুলে ছুটে গেলে বা ওয়াজিব সময়ের আগে পড়ে ফেললে সাহু সিজদা ওয়াজিব হয়। — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ২, পৃ. ৬৪; আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃ. ৭৫; ফাতাওয়া আলমগিরি, খণ্ড ১, পৃ. ১২৬

সতর্কতা: ভবিষ্যতে বিতরে দুআ কুনুত শুধু তৃতীয় রাকাতে পড়বেন। তবে আপনার নামাজ সহীহ হয়েছে, পুনরায় পড়তে হবে না।


২. ভিডিওতে অনিচ্ছাকৃতভাবে মহিলার আওয়াজ এসে যাওয়া এবং ভিডিও ডিলিট করা

উত্তর: আপনি ভিডিওটি ডিলিট করে দিয়েছেন এবং তা প্রকাশ করেননি — এজন্য আপনার উপর কোনো গুনাহ নেই এবং ক্ষমা চাওয়ার প্রয়োজন নেই। কারণ:

  • অনিচ্ছাকৃতভাবে ধরা পড়া আওয়াজ আপনার ইচ্ছাধীন ছিল না।
  • আপনি তা প্রকাশ বা সংরক্ষণ করেননি; বরং ডিলিট করে দিয়েছেন, যা সততার পরিচায়ক।
  • মহিলার কোনো ক্ষতি বা সম্মানহানি ঘটেনি।

কুরআন: "আল্লাহ তাআলা তোমাদেরকে অনিচ্ছাকৃত ভুলের জন্য পাকড়াও করেন না।" — সূরা বাকারা, আয়াত ২২৫

হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি ও জোরপূর্বক কাজের (গুনাহ) মাফ করে দিয়েছেন।" — সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ২০৪৩; সুনানে বায়হাকি

তবে ভবিষ্যতে এমন ভিডিও ধারণে সতর্ক থাকবেন, যাতে অন্যের আওয়াজ বা ছবি না আসে।


৩. রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আগমনের পূর্বে ঈসা আ., মূসা আ. ও ইব্রাহিম আ.-এর অনুসারীরা কি মুসলিম ছিল?

উত্তর: এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ আকীদা বিষয়ক প্রশ্ন। বিস্তারিত উত্তর নিম্নরূপ:

(ক) মূলনীতি: প্রত্যেক নবীই ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন

প্রত্যেক নবী-রাসূলই তাওহীদ (আল্লাহর একত্ব) ও ইসলামের দাওয়াত দিয়েছেন। "ইসলাম" অর্থ আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ। তাই প্রত্যেক নবীর অনুসারী, যারা সেই নবীর শরীয়ত অনুযায়ী তাওহীদে বিশ্বাসী ছিলেন, তারা মুসলিম ছিলেন।

কুরআন: "নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে একমাত্র দ্বীন হলো ইসলাম।" — সূরা আলে ইমরান, আয়াত ১৯

কুরআন: "ইব্রাহিম ইহুদি বা খ্রিষ্টান ছিলেন না; বরং তিনি ছিলেন হানিফ মুসলিম।" — সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৬৭

কুরআন: "তোমরা বলো: আমরা ঈমান এনেছি আল্লাহর উপর, যা নাযিল হয়েছে আমাদের উপর, যা নাযিল হয়েছে ইব্রাহিম, ইসমাইল, ইসহাক, ইয়াকুব ও তাদের বংশধরদের উপর, যা দেওয়া হয়েছে মূসা ও ঈসাকে..." — সূরা বাকারা, আয়াত ১৩৬

(খ) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আগমনের পূর্বে আহলে কিতাবদের অবস্থা

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আগমনের পূর্বে আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা তাওহীদে বিশ্বাসী ছিলেন এবং নিজ নবীর শিক্ষা অনুযায়ী জীবনযাপন করতেন, তারা সঠিক পথে ছিলেন এবং মুসলিম হিসেবে গণ্য হবেন। কিন্তু যারা তাওহীদ পরিত্যাগ করে শিরক ও কুফরে লিপ্ত হয়েছিল (যেমন ঈসা আ.-কে আল্লাহর পুত্র বলা, ত্রিত্ববাদে বিশ্বাস করা), তারা কাফের ছিল।

কুরআন: "নিশ্চয়ই তারা কাফের, যারা বলে: আল্লাহ তিনজনের একজন।" — সূরা মায়িদা, আয়াত ৭৩

কুরআন: "নিশ্চয়ই তারা কাফের, যারা বলে: নিশ্চয়ই আল্লাহ মরিয়মের পুত্র ঈসা।" — সূরা মায়িদা, আয়াত ৭২

(গ) রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আগমনের পর

রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর আগমনের পর যারা তাঁর রিসালাতের খবর পেয়েও ঈমান আনেনি, তারা কাফের। কারণ তাঁর রিসালাত সর্বজনীন ও সর্বশেষ।

কুরআন: "যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য দ্বীন চায়, তা কখনো গ্রহণ করা হবে না।" — সূরা আলে ইমরান, আয়াত ৮৫

হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "যে ব্যক্তি আমার কাছে এই উম্মতের ইহুদি ও খ্রিষ্টানদের মধ্য থেকে (রিসালাতের দাওয়াত) শুনে ঈমান না আনে, সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।" — সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৫৩

(ঘ) সারসংক্ষেপ

| শ্রেণি | অবস্থা | |---|---| | রাসূল ﷺ-এর আগে তাওহীদে বিশ্বাসী নবী-অনুসারী | মুসলিম, সঠিক পথে | | ত্রিত্ববাদী/শিরককারী খ্রিষ্টান | কাফের | | রাসূল ﷺ-এর আগমনের পর রিসালাত অস্বীকারকারী | কাফের |

হানাফি আকীদা: ইমাম তাহাবি (রহ.) তাঁর "আকীদা তাহাবিয়া"-তে বলেন: "আমরা ঈসা আ.-কে আল্লাহর বান্দা ও রাসূল হিসেবে বিশ্বাস করি।" — আল-আকীদাতুত তাহাবিয়া, পৃ. ১৫


৪. অনিচ্ছাকৃতভাবে মহিলার আওয়াজ কানে আসা (লাউড স্পিকার ছাড়া)

উত্তর: যদি লাউড স্পিকার না দেওয়া থাকে এবং আপনি অনিচ্ছাকৃতভাবে মহিলার আওয়াজ শুনে ফেলেন, তাহলে আপনার কোনো গুনাহ হবে না। কারণ:

  • আপনি শোনার ইচ্ছা করেননি; বরং অনিচ্ছাকৃতভাবে কানে এসেছে।
  • ইসলামে অনিচ্ছাকৃত শ্রবণের জন্য গুনাহ নেই; গুনাহ হয় ইচ্ছাকৃতভাবে শ্রবণ ও উপভোগ করলে।

কুরআন: "তোমরা তোমাদের দৃষ্টি সংযত করো এবং লজ্জাস্থান হেফাজত করো।" — সূরা নূর, আয়াত ৩০ (এটি ইচ্ছাকৃত দৃষ্টির ক্ষেত্রে)

হাদিস: রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি ও জোরপূর্বক কাজ মাফ করে দিয়েছেন।" — সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ২০৪৩

হানাফি ফিকহ: ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "অনিচ্ছাকৃত শ্রবণে গুনাহ নেই; তবে ইচ্ছাকৃতভাবে শ্রবণ ও তাতে লিপ্ত থাকা নিষিদ্ধ।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৪৯

তবে সতর্কতা: যদি আওয়াজ আসার পর আপনি ইচ্ছাকৃতভাবে শুনতে থাকেন বা উপভোগ করেন, তাহলে গুনাহ হবে। সেক্ষেত্রে কান বন্ধ করা বা স্থান পরিবর্তন করা উচিত।


৫. আম্মু ইচ্ছাকৃতভাবে লাউড স্পিকার দেওয়া এবং অনিচ্ছাকৃতভাবে আওয়াজ কানে আসা

উত্তর: এখানে দুটি দিক বিবেচনা করতে হবে:

(ক) আপনার দিক থেকে

আম্মু ইচ্ছাকৃতভাবে লাউড স্পিকার দিলেও, আপনি যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে শুনে ফেলেন, তাহলে আপনার গুনাহ হবে না। কারণ শোনার ইচ্ছা আপনার ছিল না। তবে আপনি যদি সেখানে থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে শুনতে থাকেন, তাহলে গুনাহ হবে।

হাদিস: "নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার উম্মতের ভুল, বিস্মৃতি ও জোরপূর্বক কাজ মাফ করে দিয়েছেন।" — সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদিস ২০৪৩

(খ) আম্মুর দিক থেকে

আম্মু যদি ইচ্ছাকৃতভাবে লাউড স্পিকার দেন এবং তাতে কোনো নন-মাহরাম পুরুষ (যেমন আপনি বা অন্য কেউ) মহিলার আওয়াজ শোনে, তাহলে আম্মুর জন্য এটি গুনাহের কারণ হতে পারে, যদি তিনি জানেন যে নন-মাহরাম শুনছে। কারণ ইসলামে নারীর কণ্ঠস্বর নন-মাহরামের কাছে শ্রবণযোগ্য করা থেকে বিরত থাকতে বলা হয়েছে।

কুরআন: "তোমরা (নারীগণ) কোমল স্বরে কথা বলো না, যাতে যার অন্তরে রোগ আছে সে লোভ না করে।" — সূরা আহযাব, আয়াত ৩২

হানাফি ফিকহ: ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) বলেন: "নারীদের কণ্ঠস্বর নন-মাহরামের কাছে শ্রবণযোগ্য করা অনুচিত; তবে প্রয়োজনে (যেমন চিকিৎসা, ব্যবসা) কথা বলা জায়েয।" — রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃ. ৩৪৯

পরামর্শ: আম্মুকে নরমভাবে বুঝিয়ে বলবেন যে, লাউড স্পিকার দিলে নন-মাহরাম পুরুষ আওয়াজ শুনতে পারে, যা ইসলামে নিষিদ্ধ। তবে আপনি নিজে গুনাহগার হবেন না, যদি অনিচ্ছাকৃতভাবে শোনেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.