নামাজে শ্বাস ছাড়ার সময় শব্দ হলে নামাজ ভাঙবে কি? সিগারেটের গন্ধে নামাজে কষ্ট হলে করণীয় কী? বাবার অনুমতি ছাড়া দোকান থেকে খাওয়া ও টাকা নেওয়ার পর বাবা মারা গেলে করণীয় কী?
Salah-Prayer · Hanafi
Question
২। একজনের বাবা আগে দোকান চালাতেন। সে মাঝেমধ্যেই দোকানে বসত ও বেচাকেনা করত। যখন তার বাবা দোকানে থাকত না তখন সে তার বাবাকে না বলে দোকান থেকে অনেক কিছুই খেত। এই খাওয়ার জন্য হয়তো তার বাবা তাকে বকা দিত না। আবার মাঝেমধ্যে সে তার বাবাকে না জানিয়ে দোকান থেকে কিছু টাকা নিত এতে তার বাবা তাকে বকা দিত কিনা সে জানে না। সে কত টাকা নিয়েছিল তার মনেও নাই। বর্তমানে তার বাবা বেঁচে নাই। সে তার বাবাকে না বলে খেয়েছে ও টাকা নিয়েছে এখন তার কি করণীয়?
Answer
বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম।
আপনার জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন দুটির হানাফী ফিকহ ও প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ বিস্তারিত শরঈ ফয়সালা নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ১ম প্রশ্নের উত্তর: সিগারেটের গন্ধে শ্বাস ছাড়ার সময় শব্দ হওয়ায় সালাতের বিধান
উত্তর: না, উক্ত নিঃশ্বাসের জোরালো শব্দ হওয়ার কারণে আপনার সালাত (নামাজ) ভাঙেনি; আপনার সালাত সম্পূর্ণ বিশুদ্ধ হয়েছে।
শরঈ কারণ ও ফিকহী বিশ্লেষণ: ১. বর্ণমালা বা কথা সৃষ্টি না হওয়া: হানাফী ফিকহে সালাত ফাসিদ (বাতিল) হওয়ার জন্য স্বনিয়ন্ত্রিত মুখ নিঃসৃত শব্দে স্পষ্ট বর্ণ বা বর্ণমালা (যেমন: দুই বা ততোধিক অক্ষর বিশিষ্ট অর্থবোধক শব্দ 'আহ', 'উহ', 'উফ' ইত্যাদি) গঠিত হওয়া শর্ত। ২. শ্বাসের আওয়াজ ফাসিদকারী নয়: সিগারেটের তীব্র গন্ধে কষ্ট হওয়ার কারণে আপনি অস্বস্তি দূর করতে যে শ্বাস ছেড়েছেন, তার ফলে যদি কেবল বাতাসের বা নিঃশ্বাসের জোরালো শব্দ বের হয়ে থাকে (কোনো কথা বা স্পষ্ট বর্ণ গঠিত না হয়), তবে এতে সালাত বাতিল হয় না। ৩. অনিচ্ছাকৃত ও ওজরের হুকুম: হাঁচি, কাশি বা শ্বাস নেওয়ার সময় স্বাভাবিক বা কষ্টজনিত যে আওয়াজ নিঃশ্বাসের সাথে বেরিয়ে আসে, তা শরী'আতে ওজরের অন্তর্ভুক্ত এবং এর দরুন সালাত নষ্ট হয় না।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ২৫৪–২৫৫ (অধ্যায়: সালাত, পরিচ্ছেদ: যে কারণে সালাত ফাসিদ হয় — মাসআলা ২৩ ও ২৫: শ্বাসের আওয়াজ, ফু দেওয়া বা ওজরের কারণে নিঃশ্বাসের শব্দে সালাত ফাসিদ না হওয়া সংক্রান্ত ফতোয়া)।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (২২তম খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১২১ (অধ্যায়: 'বাব মাইয়ুফসিদুস সালাত' — জোড়া বর্ণ ছাড়া শ্বাসের আওয়াজ বা ধোঁয়ার গন্ধে অস্ফুট শব্দে সালাত ফাসিদ না হওয়া সংক্রান্ত ফতোয়া)।
- নূরুল ঈযাহ: বাংলা সংস্করণ, পৃষ্ঠা: ১০৫ (পরিচ্ছেদ: 'যে সব কারণে নামাজ নষ্ট হয় — কথা বা স্পষ্ট বর্ণ ছাড়া শব্দ হলে সালাতের বিধান')।
২. ২য় প্রশ্নের উত্তর: মৃত পিতার দোকান থেকে না বলে খাওয়া ও টাকা নেওয়ার শরঈ করণীয়
উত্তর: পিতার দোকান থেকে না বলে খাওয়ার অংশটি ক্ষমাযোগ্য; আর না বলে নেওয়া টাকার বিষয়ে একটি আনুমানিক পরিমাণ হিসাব করে পিতার ঈছালে সওয়াব ও দায়মুক্তির নিয়তে ফকীর-মিসকীনদের সদকা করে দিলে ইনশাআল্লাহ শরঈ জিম্মাদারি থেকে মুক্ত হওয়া যাবে।
শরঈ কারণ ও ফিকহী বিশ্লেষণ:
১. দোকান থেকে খাওয়ার বিষয়:
- সন্তান নিজে দোকানে বসে বেচাকেনা করত এবং পিতা তা জানতেন। পিতা সন্তানকে নিজ দোকান থেকে খানা-পিনা করার বিষয়ে বাধা দিতেন না। ফিকহের বিচারে পিতা-পুত্রের সম্পর্কের ক্ষেত্রে এটিকে পিতার অনুমিত সম্মতি (دلالةً إذن - আনুমানিক অনুমতি) হিসেবে ধরা হয়।
- সুতরাং অতীতে দোকান থেকে যে খাবার খাওয়া হয়েছে, সেগুলোর জন্য আলাদা কোনো দেনা বা গোনাহ নেই [১২, ৫০]।
২. টাকা নেওয়ার বিষয় ও বর্তমানে করণীয়:
- পিতা বেঁচে না থাকায় এখন সরাসরি উনার কাছ থেকে মাফ নেওয়ার সুযোগ নেই।
- করণীয়: সন্তান নিজের মনের প্রাবল্য ও অনুমানের ওপর ভিত্তি করে একটি আনুমানিক সর্বোচ্চ পরিমাণ টাকা হিসাব করবেন (যেমন: ২ হাজার, ৫ হাজার বা ১০ হাজার টাকা—যে পরিমাণে মন সায় দেয় যে এর চেয়ে বেশি নেওয়ার সম্ভাবনা নেই) ।
- এরপর উক্ত আনুমানিক সমপরিমাণ টাকা নিজের মৃত পিতার রূহে সওয়াব পৌঁছানো (ইছালে সওয়াব) এবং সুনির্দিষ্ট দায়মুক্তির (براءة الذمة) নিয়তে এমন ফকীর-মিসকীন বা অভাবীদের দান (সদকা) করে দেবেন যারা যাকাত পাওয়ার যোগ্য।
- পাশাপাশি আল্লাহর দরবারে নিজের এই অনিচ্ছাকৃত ভুল বা অনধিকার চর্চার জন্য ইস্তিগফার করবেন। এতে ইনশাআল্লাহ উনার জিম্মাদারি পুরোপুরি আদায় হয়ে যাবে।
সংযুক্ত কিতাবের বিবরণ (ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর সহ):
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৯শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ৫৭–৫৮ (অধ্যায়: 'حقوق العباد / হক্কুল ইবাদ — পাওনাদারের পরিমাণ ও উপস্থিতি নিশ্চিত না হলে আনুমানিক টাকা সদকা করে দায়মুক্ত হওয়ার ফতোয়া')।
- দরসুল ফিকহ (২য় খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৮৫–১৮৭ (অধ্যায়: 'হারাম অর্থ-সম্পদ: মালিকানা ও ব্যবহারবিধি — অনধিকার চর্চাকৃত মালের ক্ষেত্রে ফেরত দেওয়া বা সদকা করার ফিকহী বিধান')।
- ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া (১৪শ খণ্ড): পৃষ্ঠা: ১৮০ (অধ্যায়: 'বাব حقوق الوالدين / সন্তান ও পিতার সম্পদের শরঈ সম্পর্ক')।
আল্লাহ ভালো জানেন।