অসুস্থ ওজরগ্রস্ত ব্যক্তির নামাজ ও পবিত্রতার হুকুম।
Salah-Prayer · Hanafi
Question
আমার নানা বেশ কিছুদিন যাবত অসুস্থ এবং অপারেশন হয়েছে। উনার অপারেশনের দরুন প্রস্রাব ফোঁটা ফোঁটা পড়তে থাকে ফলে উনি সবসময় নাপাক হয়ে থাকেন।মূলত উনার অপারেশন হয়েছে প্রস্রাবের রাস্তায় তাই এখনো ঠিক না হওয়ায় এমন হচ্ছে। কিছুদিন আগেই আবার উনার অপারেশন শেষে ক্যান্সার ধরা পড়ে।এই কথা আমার নানা জানেন না,আমরা বাকিরা জানি।উনি ভয় পায় যদি তাই কেউ জানাচ্ছে না।উনি মা শা আল্লাহ দ্বীন পালনে খুবই আগ্রহী,,, আজানের সাথে সাথে নামাজ পড়তেন এবং প্রতিদিন কুরআন তিলাওয়াত করতেন যদিও বয়স ৮৩ বছর প্রায়।কিন্তু উনার আফসোস এখন এগুলো কিছু করতে পারছেন না।
সালাত মিস হওয়ার জন্য উনি এই পরিস্থিতিতে কি করতে পারেন? আর উনার ক্যান্সার একেবারে লাস্ট স্টেজে কিন্তু কেউ উনাকে বলছে না এবং উনি ভাবছেন উনি সুস্থ হয়ে যাবেন আবার।তবে আমার কেনো জানি বিষয়টা নিয়ে চিন্তা লাগে,,কখন আল্লাহ উনাকে ডেকে নেন বলা যায় না।তাই উনি যদি উনার এই অবস্থা সম্পর্কে জানতেন হয়তো উনি কষ্ট পাবে কিন্তু পাশাপাশি আল্লাহর কাছে মাফ চেয়ে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগও পাবেন হয়তো। এখন এই মুহুর্তে কি উনাকে এই বিষয়টা জানানো বেশি ভালো হবে নাকি না? আর কিভাবে জানালে উনাকে কি কি করতে বললে উনার জন্য ভালো হবে বিস্তারিত বললে বা পরামর্শ দিলে মুনাসিব হবে ইন শা আল্লাহ
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
প্রথমে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি
রোগীর সামনে রোগের ভয়াবহতা প্রকাশ করা বা তাকে হতাশ করা ইসলামে নিন্দনীয়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِذَا دَخَلْتُمْ عَلَى الْمَرِيضِ فَنَفِّسُوا لَهُ فِي الْأَجَلِ، فَإِنَّ ذَلِكَ لَا يَرُدُّ شَيْئًا وَيُطَيِّبُ بِهِ نَفْسَ الْمَرِيضِ» — সুনানে তিরমিযী, হাদীস ২০৮৭; সুনানে ইবনে মাজাহ, হাদীস ১৪৩৮
অর্থ: “তোমরা রোগীর কাছে গেলে তার আয়ু সম্পর্কে আশা জাগাও; এতে কোনো কিছু ফিরে আসে না, বরং রোগীর মন ভালো হয়ে যায়।”
তাই ক্যান্সারের লাস্ট স্টেজের কথা সরাসরি বলে তাকে ভয় দেখানো বা হতাশ করা ইসলামসম্মত নয়। তবে তাকে মৃত্যুর প্রস্তুতির দিকে উৎসাহিত করা, তাওবা-ইস্তিগফার বাড়ানো, দান-সদকা করা, ক্ষমা চাওয়া—এসব করা যাবে এবং করানো উচিত। এতে ভয় না দেখিয়ে বরং প্রতিদান ও কল্যাণের দিক তুলে ধরুন।
দ্বিতীয়ত: প্রস্রাব ফোঁটা ফোঁটা পড়ার কারণে নামাজ ও পবিত্রতা
আপনার নানার অবস্থা ফিকহের পরিভাষায় “সালিসুল বাওল” (সালিসুল বাওল) বা “মাজুর” (মাজুর) — অর্থাৎ ওজরগ্রস্ত ব্যক্তি। এ অবস্থায় ইসলামে অনেক সহজতা দেওয়া হয়েছে। তিনি মোটেও হতাশ হবেন না; বরং এই সহজতা আল্লাহর পক্ষ থেকে উপহার।
(১) প্রত্যেক নামাজের ওয়াক্তে একবার ওজু করবেন
ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, ওজরগ্রস্ত ব্যক্তি প্রত্যেক নামাজের ওয়াক্ত শুরু হলে একবার ওজু করবেন এবং সেই ওজু দিয়ে ওই ওয়াক্তের ফরজ-সুন্নত-নফল যত নামাজ চান পড়তে পারবেন। ওজু ভঙ্গ হবে না, যদিও প্রস্রাব পড়তে থাকে।
ইমাম সারাখসী, আল-মাবসূত, ১/২২৩; আল-হিদায়া, কিতাবুস সালাত, বাবুল আযর; ইবনে আবিদীন, রাদ্দুল মুহতার, ১/৩০৫–৩০৮
(২) নামাজের ওয়াক্ত শেষ হলে ওজু ভঙ্গ
ওয়াক্ত শেষ হওয়ার সাথে সাথে তার ওজু ভঙ্গ হয়ে যাবে; পরবর্তী ওয়াক্তের জন্য আবার ওজু করবেন।
(৩) নামাজের ভেতরে যা কিছু হবে
নামাজের ভেতরে প্রস্রাব পড়লে নামাজ ভঙ্গ হবে না। তবে নামাজের বাইরে অন্য কোনো কারণে (যেমন বায়ু নির্গত হওয়া) ওজু ভঙ্গ হলে আবার ওজু করবেন।
(৪) কাপড়ের হুকুম
- এক ওয়াক্তের নামাজের জন্য যতটুকু কাপড় নাপাক হবে, তা ধুয়ে ফেলা কষ্টকর হলে তিনি সেই কাপড়ে নামাজ পড়তে পারবেন; এতে নামাজ হয়ে যাবে।
- তবে সম্ভব হলে প্রত্যেক নামাজের জন্য পবিত্র কাপড় রাখা বা একবার ধুয়ে নেওয়া উত্তম।
- আল-হিদায়া ও রাদ্দুল মুহতার (১/৩০৮) এ বিস্তারিত আছে।
(৫) শুয়ে বা বসে নামাজ
অপারেশনের কারণে দাঁড়ানো বা বসা কষ্টকর হলে:
- দাঁড়াতে না পারলে বসে,
- বসতে না পারলে ডান কাত হয়ে শুয়ে,
- তাও না পারলে চিত হয়ে শুয়ে ইশারায় নামাজ পড়বেন।
সহীহ বুখারী, হাদীস ১১১৭ — «صَلِّ قَائِمًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَقَاعِدًا، فَإِنْ لَمْ تَسْتَطِعْ فَعَلَى جَنْبٍ»
(৬) কুরআন তিলাওয়াত
তিনি মুখস্থ সূরা দিয়ে নামাজে পড়তে পারবেন। নামাজের বাইরে কুরআন স্পর্শ না করে বা পবিত্র কাপড়/গ্লাভস দিয়ে পড়তে পারবেন; মুখে তিলাওয়াত করতে কোনো বাধা নেই।
(৭) জামাতে নামাজ
মসজিদে গিয়ে জামাতে শরিক হতে কষ্ট হলে ঘরে বা বিছানায় একা পড়বেন; ইনশাআল্লাহ পূর্ণ সওয়াব পাবেন। অসুস্থ ব্যক্তির ঘরে বসে নামাজ পড়ার সওয়াব সম্পর্কে সহীহ বুখারী, হাদীস ২৯৯ এ বর্ণনা আছে।
তৃতীয়ত: ক্যান্সারের কথা জানানো উচিত কি না?
ফিকহি ও নৈতিক দিক
- রোগীর মনোবল ভেঙে দেওয়া নিষিদ্ধ। চিকিৎসাশাস্ত্র ও ইসলাম উভয়ই বলে, রোগীর আশা বাঁচিয়ে রাখা দরকার।
- তবে মিথ্যা বলা বা সরাসরি “তুমি মরে যাবে” বলা নিষিদ্ধ। রাসূল ﷺ রোগীর কাছে গিয়ে আশা জাগাতে বলেছেন।
- কিন্তু মৃত্যুর প্রস্তুতি নেওয়ার দিকে নরমভাবে উৎসাহিত করা জায়েজ ও কর্তব্য। এটি সরাসরি ক্যান্সারের কথা না বলেও করা যায়।
ব্যবহারিক পরামর্শ
১. সরাসরি “ক্যান্সার লাস্ট স্টেজ” বলে ভয় দেখাবেন না। এতে তিনি মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন, নামাজ-ইবাদতও ছেড়ে দিতে পারেন — যা ক্ষতিকর।
২. নরমভাবে দ্বীনের প্রস্তুতির দিকে ডাকুন। যেমন বলুন:
- “নানা, আপনি তো সারাজীবন নামাজ-কুরআন করেছেন, আল্লাহর রহমতে আপনার আমলনামা ভরা। এখন অসুস্থতায় কষ্ট হলেও এর প্রতিদান অনেক বড়।”
- “নানা, অসুস্থ ব্যক্তির দুআ কবুল হয় — আপনি সবার জন্য দুআ করুন।”
- “নানা, আপনি তো জান্নাতের আশায় আছেন; আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে থাকুন, ইস্তিগফার বেশি করুন।”
৩. তাকে তাওবা-ইস্তিগফার, দান-সদকা, কারও প্রতি জুলুম থাকলে ক্ষমা চাওয়া, ঋণ থাকলে আদায়ের ব্যবস্থা, ওসিয়ত লিখে রাখা — এসবের দিকে উৎসাহ দিন। এগুলো মৃত্যুর প্রস্তুতির অংশ, কিন্তু ভয় না দেখিয়ে ভালোবাসা ও কল্যাণের ভাষায় বলুন।
৪. চিকিৎসকের পরামর্শ নিন — কোনো অভিজ্ঞ মুসলিম চিকিৎসক বা কাউন্সেলর কীভাবে জানাবেন, তা ঠিক করে দিতে পারেন। কখনো কখনো রোগী নিজেই বুঝে যান; তখন তার সাথে খোলাখুলি কথা বলা যায়, তবে ভয় নয় — বরং আল্লাহর রহমতের আশা নিয়ে।
৫. পারিবারিকভাবে সিদ্ধান্ত নিন — বড়দের সাথে পরামর্শ করে সিদ্ধান্ত নিন। কেউ কেউ বলতে পারেন, শেষ সময়ে সত্য জানানো ভালো; কেউ বলতে পারেন, না জানানোই ভালো। তবে ভয় দেখানো কোনোভাবেই ঠিক নয়।
চতুর্থত: আপনার নিজের জন্য পরামর্শ
- আপনি তার জন্য বেশি বেশি দুআ করুন — “আল্লাহুম্মা শফিহি, আল্লাহুম্মা আফিহি”।
- তাকে দেখতে যান, হাসিমুখে কথা বলুন, তার হাত ধরে দুআ করুন।
- তার পাশে থেকে কুরআন তিলাওয়াত করুন (সূরা ইয়াসিন, সূরা রাহমান) — এতে তার মন শান্ত হবে।
- তার জন্য সদকা করুন, বিশেষ করে অসুস্থতার সদকা।
- তাকে কখনো একা ভাবতে দেবেন না; তার সাথে সময় কাটান।
আল্লাহ তাআলা আপনার নানাকে শিফা দান করুন, তার ঈমানের উপর খাতিমা দান করুন এবং তাকে জান্নাতুল ফিরদাউস নসিব করুন। আমিন।