স্বপ্নে কালোজাদু দেখা।
Miscellaneous Fiqh · Hanafi
Question
Answer
আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।
প্রশ্নটি দীর্ঘ এবং এতে কয়েকটি দিক রয়েছে—স্বপ্ন, কালোজাদুর ধারণা, স্বপ্নের ব্যাখ্যা, এবং দাম্পত্য অশান্তি। নিচে কুরআন, হাদিস ও হানাফি ফিকহের আলোকে ধাপে ধাপে উত্তর দেওয়া হলো।
১. স্বপ্ন কি বাস্তব ঘটনার প্রমাণ?
না। স্বপ্ন ইসলামে কোনো প্রমাণ (হুজ্জাত) নয়। শরীয়তের বিধান, কারো বিরুদ্ধে অভিযোগ, বা কারো innocence প্রমাণে স্বপ্ন ব্যবহার করা যায় না।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «الرُّؤْيَا مِنَ الشَّيْطَانِ» — "স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে হতে পারে।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস ২২৬৩)
আরও ইরশাদ: «الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللَّهِ، وَالرُّؤْيَا السَّوْءُ مِنَ الشَّيْطَانِ» — "ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, মন্দ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে।" (সহীহ বুখারী, হাদিস ৬৯৮৪)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ উল্লেখ করেছেন যে, স্বপ্ন দ্বারা কোনো শরয়ী হুকুম বা কারো বিরুদ্ধে দাবি সাব্যস্ত হয় না। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, কিতাবুত তাহারাতের ভূমিকা দ্রষ্টব্য)
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) «বেহেশতী জেওর»-এ বলেছেন: স্বপ্নকে ভিত্তি করে কারো প্রতি সন্দেহ পোষণ করা বা অভিযোগ করা জায়েয নয়।
২. "স্বপ্নের ব্যাখ্যা তাই হয় যা তার ব্যাখ্যা করা হয়" — এ কথাটি কতটা সঠিক?
এটি একটি অসম্পূর্ণ ও ভুল ধারণা। হাদিসে এসেছে:
«الرُّؤْيَا عَلَى مَا تُعَبَّرُ» — "স্বপ্ন তার ব্যাখ্যা অনুযায়ী হয়।" (সুনানে তিরমিজি, হাদিস ২২৭৮ — তবে এটি যায়িফ/দুর্বল সনদে বর্ণিত)
মুহাদ্দিসিনের মত: এই হাদিস দুর্বল; আর এর অর্থ হলো—কোনো যোগ্য মুফাসসিরে স্বপ্ন যদি ভালো ব্যাখ্যা দেন, তাহলে তা কল্যাণের আশা করা যায়। কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, যে কেউ যা বলবে তাই বাস্তবে ঘটবে। ইমাম তিরমিজি (রহ.) নিজেই এই হাদিসকে «غريب» বলেছেন।
মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) «ইসলাম ও আমাদের জীবন»-এ স্পষ্ট করেছেন: স্বপ্নের ব্যাখ্যা নিয়ে অতিরিক্ত ব্যস্ত হওয়া, বিশেষত কারো বিরুদ্ধে সন্দেহ পোষণ করা—এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা।
৩. কালোজাদু (সিহর) সম্পর্কে ইসলামের বিধান
ক) সিহর বাস্তবে বিদ্যমান
কুরআনে সূরা আল-বাকারার ১০২ নং আয়াতে সিহরের অস্তিত্ব স্বীকৃত। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর উপরও সিহর করা হয়েছিল (সহীহ বুখারী, হাদিস ৩২৬৮; সহীহ মুসলিম, হাদিস ২১৮৯)।
খ) তবে কারো বিরুদ্ধে সন্দেহ করা জায়েয নয়
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ (খণ্ড ৬, কিতাবুল জিহাদ) বলেছেন: কোনো মুসলিমের বিরুদ্ধে সিহরের অভিযোগ প্রমাণ ছাড়া করা গীবত ও বুহতান-এর অন্তর্ভুক্ত, যা কবিরা গুনাহ।
রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «إِنَّ مِنْ أَكْبَرِ الْكَبَائِرِ... وَقَذْفَ الْمُحْصَنَاتِ» — "নিশ্চয়ই কবিরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত... সতী নারীর প্রতি অপবাদ আরোপ করা।" (সহীহ বুখারী, হাদিস ২৬৫৪)
শাশুড়ি বা তার খালার বিরুদ্ধে "বিচ্ছেদের জাদু করেছে" — এ ধরনের অভিযোগ শুধু গুজবের ভিত্তিতে করা সম্পূর্ণ নাজায়েয। এটি পরিবারে ভয়ানক ফিতনা সৃষ্টি করে।
গ) সিহরের চিকিৎসা
সিহরের প্রকৃত চিকিৎসা হলো:
- তাওবা ও ইস্তিগফার — গুনাহ থেকে ফিরে আসা
- পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পাবন্দি — বিশেষত ফজর ও ইশা জামাতে
- আয়াতুল কুরসি, সূরা ফালাক, সূরা নাস, সূরা বাকারার শেষ দুই আয়াত — সকাল-সন্ধ্যা পড়া
- সূরা বাকারা ঘরে তিলাওয়াত — রাসূল ﷺ বলেছেন: «لَا تَجْعَلُوا بُيُوتَكُمْ مَقَابِرَ، إِنَّ الشَّيْطَانَ يَنْفِرُ مِنَ الْبَيْتِ الَّذِي تُقْرَأُ فِيهِ سُورَةُ الْبَقَرَةِ» — "তোমাদের ঘরগুলোকে কবর বানিও না; নিশ্চয়ই শয়তান সেই ঘর থেকে পালিয়ে যায় যেখানে সূরা বাকারা পড়া হয়।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস ৭৮০)
- প্রয়োজনে রুকইয়াহ শরীয়াহ — কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক, শিরকমুক্ত রুকইয়াহ
মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) «মাআরিফুল কুরআন»-এ সূরা ফালাকের তাফসিরে বলেছেন: সিহর থেকে বাঁচার সর্বোত্তম উপায় হলো আল্লাহর উপর ভরসা, কুরআনের আমল, এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকা।
৪. "গাছ লাগিয়ে দেবো যা কালোজাদু চুষে নেবে" — এটি ইসলামিক নয়
এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও কুসংস্কার। কোনো গাছ জাদু "চুষে" নিতে পারে না। এটি হিন্দু-তান্ত্রিক বিশ্বাসের প্রভাব, ইসলামে এর কোনো ভিত্তি নেই।
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ (খণ্ড ৬) বলেছেন: এ ধরনের বিশ্বাস শিরক ও কুফরের অন্তর্ভুক্ত, কারণ এতে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছুর প্রতি অলৌকিক ক্ষমতা আরোপ করা হয়।
ফতোয়ায়ে আলমগিরি-তেও (খণ্ড ৫, কিতাবুল কারাহিয়াত) এ ধরনের কুসংস্কার নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে।
৫. তিন কুল পড়ে ঘুমানো
এটি সুন্নত। রাসূল ﷺ প্রতি রাতে ঘুমানোর আগে সূরা ইখলাস, ফালাক ও নাস পড়ে দুই হাতে ফুঁ দিয়ে সমস্ত শরীরে মাসেহ করতেন (সহীহ বুখারী, হাদিস ৫০১৭)। এটি সিহর থেকে হেফাজতের অন্যতম মাধ্যম। তবে এটি স্বপ্নকে সত্য বানায় না।
৬. দাম্পত্য অশান্তির প্রকৃত সমাধান
আপনার দাম্পত্য জীবনে অশান্তি থাকলে—জাদুর কল্পনায় না গিয়ে শরীয়তসম্মত উপায়ে সমাধান করুন:
- স্ত্রীর সাথে সরাসরি খোলামেলা আলোচনা করুন — সন্দেহ নয়, ভালোবাসা ও ধৈর্য নিয়ে
- শাশুড়ি বা তার আত্মীয়ের বিরুদ্ধে অভিযোগ পরিহার করুন — এটি ফিতনা বাড়াবে
- নামাজ, দোয়া ও কুরআন তিলাওয়াত বাড়ান — বিশেষত সূরা বাকারা ঘরে পড়ুন
- প্রয়োজনে পারিবারিক পরামর্শদাতা বা বিশ্বস্ত আলেমের পরামর্শ নিন
- সন্দেহ ও ওয়াসওয়াসা থেকে আল্লাহর আশ্রয় চান — «أَعُوذُ بِاللَّهِ مِنَ الشَّيْطَانِ الرَّجِيمِ» বেশি পড়ুন
রাসূল ﷺ বলেছেন: «لَا يَفْرَكْ مُؤْمِنٌ مُؤْمِنَةً، إِنْ كَرِهَ مِنْهَا خُلُقًا رَضِيَ مِنْهَا آخَرَ» — "কোনো মুমিন পুরুষ কোনো মুমিন নারীকে ঘৃণা করবে না; যদি তার একটি স্বভাব অপছন্দ হয়, অন্যটি পছন্দ হবে।" (সহীহ মুসলিম, হাদিস ১৪৬৯)
والله أعلم بالصواب والسلام