দরুদ শরীফ ও ইস্তেগফারের উচ্চারণ

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 7635
Questioner: Asad sarker
Question Asked: 31 Oct 2026, 01:54 AM
Reviewed & Published: 31 Oct 2026, 06:03 AM
Views: 10
Tokens: 7,608
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

১.আমি যদি দরুদে ইব্রাহিমের শুধু প্রথম লাইনটুকু পড়ি তাহলে কি দরুদ শরীফ পড় মর্যাদা ও ফজিলত পাওয়া যাবে, দরুদ শরীফ পড়া কি আদায় হয়ে যাবে? আর কি কি ছোট ছোট দরুদ শরীফ পড়া যেতে পারে।
উচ্চারণ আল্লাহ হুম্মা (নাকি) আল্লহ হুম্মা, ছল্লিআলা নাকি ছাল্লিআলা
২.ইস্তেগফারের উচ্চারণ কি আস্তাগফিরুল্লাহ নাকি আস্তাগফিরুল্লহ, আল্লাহুম্মাগফিরলি পড়লেও কি সমান মর্যাদা? নামাজ মাঝে মাঝে বাদ পড়লেও তাসবীহ পড়া যাবে কি? আর ইস্তেগফার করার সময় ঠিক কি আগে পাপের কথা মনে রাখতে হয়, তওবার শর্ত মানতে হয়? আর কপ্রবো না, ঘৃণা করা, পাপকে এগুলা মনে রাখতে হয়? নাকি শুধ্য মাফ চাইলেই হয়?

৩। জোহরের নামাজের পর ১০০ বার ইস্তেগফার, আসরের নামাজের পর আলহামদুলিল্লাহ, মাগরিবের পর ১০০বার দরুদ, ১০০ বার এশার নামাজের পর লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ পড়া। এগুলা কি করা যাবে নাকি বিদাত হবে? আর এমন ছোট ছোট কিছু আমল এর উপায় বলে দিন যেগুলো করতে পারি, উযু ছাড়া মোবাইল এপ্সে কোর আন তিলাওয়াত করে করে খতম করতে পারবো? সওয়াব পাওয়া যাবে খতমের?

Answer

দরুদ, ইস্তেগফার ও কিছু নির্দিষ্ট আমল সম্পর্কে ফিকহি বিধান

বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম আলহামদু লিল্লাহি রাব্বিল আলামিন, ওয়াস সালাতু ওয়াস সালামু আলা রাসূলিহিল কারিম


প্রশ্ন ১: দরুদে ইবরাহিমের প্রথম অংশ ও দরুদের উচ্চারণ

(ক) শুধু প্রথম লাইন পড়লে কি দরুদ আদায় হবে?

দরুদে ইবরাহিমের পূর্ণ রূপ হলো:

اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا صَلَّيْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ، اللَّهُمَّ بَارِكْ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ كَمَا بَارَكْتَ عَلَى إِبْرَاهِيمَ وَعَلَى آلِ إِبْرَاهِيمَ إِنَّكَ حَمِيدٌ مَجِيدٌ

শুধু প্রথম অংশ (اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ...) পড়লে দরুদের মূল উদ্দেশ্য (নবী ﷺ-এর উপর দরুদ পাঠ) আদায় হয়ে যায় এবং এর ফজিলতও পাওয়া যায়। তবে নামাজের মধ্যে দরুদে ইবরাহিমের পূর্ণ পাঠই সুন্নত।

নামাজের বাইরে যেকোনো সংক্ষিপ্ত দরুদ যেমন "صَلَّى اللَّهُ عَلَى مُحَمَّدٍ" বা "اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ" পড়লেও দরুদের সওয়াব পাওয়া যায়। হাদিসে এসেছে:

«مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا» "যে ব্যক্তি আমার উপর একবার দরুদ পাঠ করে, আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত পাঠান।" [সহিহ মুসলিম, হাদিস ৪০৮]

(খ) উচ্চারণ: "আল্লাহুম্মা" নাকি "আল্লহুম্মা"? "ছাল্লি" নাকি "সাল্লি"?

সঠিক উচ্চারণ হলো: "আল্লহুম্মা" (اللَّهُمَّ) — অর্থাৎ "আল-লহুম্মা", লাম পুর তথা মোটা হয়ে "আল্লহুম্মা" হয়। "

★ছল্লিআলা সঠিক উচ্চারণ।

(গ) ছোট ছোট দরুদ

নিম্নোক্ত সংক্ষিপ্ত দরুদগুলো পড়া যায়:

  1. اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ — "আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদ"
  2. صَلَّى اللَّهُ عَلَى مُحَمَّدٍ — "সাল্লাল্লাহু আলা মুহাম্মাদ"
  3. اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَآلِهِ — "আল্লাহুম্মা সাল্লি আলা মুহাম্মাদিও ওয়া আলিহি"
  4. اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ وَعَلَى آلِ مُحَمَّدٍ — (দরুদে ইবরাহিমের প্রথম অংশ)
  5. صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ — "সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম"

প্রশ্ন ২: ইস্তেগফারের উচ্চারণ ও তাওবার শর্ত

(ক) "আস্তাগফিরুল্লাহ" নাকি "আস্তাগফিরুল্লাহ"?

সঠিক উচ্চারণ: "আস্তাগফিরুল্লাহ" (أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ) — শেষে "হু" নয়, বরং "হা" (فتحة)। তবে "আস্তাগফিরুল্লাহু" বললেও ভুল নয়, কারণ ওয়াকফ (থামা) ছাড়া পড়লে "আস্তাগফিরুল্লাহু" উচ্চারিত হয়। মূল আরবি: أَسْتَغْفِرُ اللَّهَ — "আস্তাগফিরুল্লাহ"। [মিশকাত, কিতাবুদ দাওয়াত]

(খ) "আল্লাহুম্মাগফিরলি" পড়লে কি সমান মর্যাদা?

"اللَّهُمَّ اغْفِرْ لِي" (আল্লাহুম্মাগফিরলি) — এটিও কুরআন-হাদিসে বর্ণিত ইস্তেগফারের দুআ। তবে "আস্তাগফিরুল্লাহ" হলো সর্বাধিক বর্ণিত ও সর্বোত্তম সংক্ষিপ্ত ইস্তেগফার। উভয়েরই সওয়াব আছে, তবে "আস্তাগফিরুল্লাহ" বেশি ফজিলতপূর্ণ, কারণ এটি নবী ﷺ-এর সুন্নত এবং প্রতিদিন ১০০ বার পড়ার নির্দেশ এসেছে। [সহিহ বুখারি, ৬৩০৭; সহিহ মুসলিম, ২৭০২]

(গ) নামাজের মাঝে মাঝে বাদ পড়লেও তাসবিহ পড়া যাবে?

বিষয়টি অস্পষ্ট মনে হচ্ছে,প্রশ্নটি স্পষ্ট করলে জবাব প্রদানে সুবিধা হতো।

তাওবার শর্ত ও পাপ স্মরণ

তাওবার শর্ত তিনটি (হক্কুল ইবাদ সংশ্লিষ্ট না হলে):

  1. পাপ থেকে বিরত থাকা (الإقلاع عن المعصية)
  2. পাপের জন্য অনুতপ্ত হওয়া (الندم على فعلها)
  3. ভবিষ্যতে না করার দৃঢ় সংকল্প (العزم على عدم العود)

যদি পাপটি বান্দার হক সংশ্লিষ্ট হয়, তবে চতুর্থ শর্ত: হক ফিরিয়ে দেওয়া বা ক্ষমা চাওয়া। [রাদ্দুল মুহতার, ৫/৩২৭; ফাতাওয়া উসমানি, ৩/৫৬৭]

ইস্তেগফারের সময় পাপের কথা মনে রাখা: তাওবার জন্য পাপের কথা স্মরণ করা শর্ত নয়, বরং অনুতপ্ত হওয়াই মূল। তবে পাপ স্মরণ করে লজ্জিত হওয়া তাওবার রুকন। আর কবিরা গুনাহকে ঘৃণা করা ঈমানের অংশ; পাপকে মনে রাখা নয়, বরং পাপ থেকে দূরে থাকা ও আল্লাহর কাছে মাফ চাওয়াই যথেষ্ট। আল্লাহ বলেন:

«وَالَّذِينَ إِذَا فَعَلُوا فَاحِشَةً أَوْ ظَلَمُوا أَنفُسَهُمْ ذَكَرُوا اللَّهَ فَاسْتَغْفَرُوا لِذُنُوبِهِمْ» "আর যারা কোনো অশ্লীল কাজ করে ফেললে বা নিজেদের প্রতি জুলুম করলে আল্লাহকে স্মরণ করে এবং নিজেদের গুনাহের জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করে..." [সূরা আলে ইমরান: ১৩৫]


প্রশ্ন ৩: নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট সংখ্যক আমল ও বিদআতের প্রশ্ন

(ক) নামাজের পর নির্দিষ্ট সংখ্যক ইস্তেগফার/দরুদ/তাসবিহ — বিদআত কি?

মূল বিষয়: নামাজের পর যিকির-আযকার করা সুন্নত। তবে নির্দিষ্ট সংখ্যা (যেমন ১০০ বার) ও নির্দিষ্ট সময়কে ফরজ/ওয়াজিব বা বিশেষ ফজিলতের বিশ্বাসে আবদ্ধ করা — যদি হাদিসে তার ভিত্তি না থাকে — তবে তা বিদআত হতে পারে। [ফাতাওয়া উসমানি, ১/৫৬৭; ইমদাদুল ফাতাওয়া, ১/২৩৪]

তবে সাধারণভাবে বেশি বেশি ইস্তেগফার, দরুদ ও তাসবিহ পড়া সম্পূর্ণ জায়েয ও মুস্তাহাব। হাদিসে রাসূল ﷺ প্রতিদিন ৭০-১০০ বার ইস্তেগফার করতেন। [সহিহ বুখারি, ৬৩০৭]

সুতরাং:

  • জোহরের পর ১০০ ইস্তেগফার, আসরের পর আলহামদুলিল্লাহ, মাগরিবের পর ১০০ দরুদ, এশার পর ১০০ লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ — এগুলো করা জায়েয, যদি আপনি এগুলোকে ফরজ বা সুন্নতে মুয়াক্কাদা মনে না করেন এবং নির্দিষ্ট ফজিলতের বিশ্বাস না রাখেন। বরং সাধারণ যিকির হিসেবে করুন।
  • তবে নির্দিষ্ট সময়ে নির্দিষ্ট সংখ্যাকে দ্বীনের অংশ মনে করা বিদআত। [মা'আরিফুস সুনান; ইমদাদুল ফাতাওয়া]

(খ) ছোট ছোট আমলের উপায়

নিম্নোক্ত আমলগুলো নিয়মিত করা সহজ ও ফজিলতপূর্ণ:

  1. প্রতিদিন ১০০ বার "আস্তাগফিরুল্লাহ" — হাদিসে বিশেষ ফজিলত [সহিহ মুসলিম, ২৭০২]
  2. প্রতিদিন ১০০ বার দরুদ — "اللَّهُمَّ صَلِّ عَلَى مُحَمَّدٍ"
  3. সকাল-সন্ধ্যা "সুবহানাল্লাহি ওয়া বিহামদিহি" ১০০ বার [সহিহ মুসলিম, ২৬৯১]
  4. "লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ" বেশি বেশি পড়া — সর্বোত্তম যিকির [তিরমিজি, ৩৩৮৩]
  5. "সুবহানাল্লাহ, আলহামদুলিল্লাহ, আল্লাহু আকবার" ৩৩ বার করে [সহিহ মুসলিম, ৫৯৭]
  6. "লা হাওলা ওয়া লা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ" — জান্নাতের ধন [সহিহ বুখারি, ৬৩৮৪]

(গ) উযু ছাড়া মোবাইল অ্যাপে কুরআন তিলাওয়াত ও খতম

উযু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা: ফিকহে হানাফি মতে, উযু ছাড়া কুরআন স্পর্শ করা জায়েয নয় (সূরা ওয়াকিআহ: ৭৯; রাদ্দুল মুহতার, ১/১৭৩)। তবে মুখস্থ পড়া বা মোবাইল/অ্যাপে পড়া — যদি কুরআন লেখা স্থান স্পর্শ করা না হয় — উযু ছাড়া জায়েয। [ফাতাওয়া উসমানি, ১/৩২৫; ফাতাওয়া রহিমিয়া]

খতমের সওয়াব: মোবাইল অ্যাপে কুরআন তিলাওয়াত করলে তিলাওয়াতের সওয়াব পাওয়া যাবে এবং খতমের সওয়াবও আল্লাহ দান করবেন ইনশাআল্লাহ। তবে মুসহাফ (কিতাব) থেকে খতম করলে যে বিশেষ ফজিলত ও সওয়াব, তা অ্যাপে সমান নাও হতে পারে। তবে অ্যাপে পড়া নিষিদ্ধ নয়। [ফাতাওয়া উসমানি; আহসানুল ফাতাওয়া, ৩/৬২২]

★উল্লেখ্য এক্ষেত্রে মোবাইলের স্ক্রিনে কোরআন লেখা অংশের উপর হাত লেগে গেলে আপনার অবশ্যই গুনাহ হবে, এক্ষেত্রে একটি স্পষ্ট নাজায়েজ কোনক্রমেই জায়েজ হবে না।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.