কাদিয়ানীদের পণ্য বয়কটকে ভঙ্গ করা, হিন্দু দোকান থেকে কেনাকাটা করা, মাথা মাসেহের সঠিক নিয়ম, ওজুর সন্দেহ ও ওয়াসওয়াসা এবং ফানি ভিডিও দেখার ইসলামী বিধান সম্পর্কে জানতে চাই?

Miscellaneous Fiqh · Hanafi

Question No: 7628
Questioner: Jannat Nisha
Question Asked: 30 Oct 2026, 09:20 PM
Reviewed & Published: 30 Oct 2026, 11:05 PM
Views: 32
Tokens: 7,263
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

السلام عليكم و رحمة الله و بركاته

কাদিয়ানীদের ব্যাপারে বলা হয়ে থাকে যে, তাদের আকিদা ঠিক নেই। তারা নবী ﷺ কে শেষ নবী হিসেবে বিশ্বাস করে না। তাই তাদের সব ধরনের প্রোডাক্ট বয়কট করতে বলা হয়ে থাকে। মিঠাই, টেস্টি ট্রিট, প্রাণ কোম্পানি গুলো কাদিয়ানী। তাই এসব শপের খাবার খেতেও নিষেধ করা হয়ে থাকে।

প্রশ্ন ০১. Foodi এপ্সে খাবারের উপর ৫০% ছাড় দিচ্ছে। এখানে মিঠাই শপে এক্সট্রা ছাড় আছে। কাদিয়ানীদের বয়কট করতে বলা হয়েছে। সেক্ষেত্রে Foodi তে যদি মিঠাই বা টেস্টি ট্রিট থেকে কোনো খাবার অর্ডার দিই, তাহলে কি বয়কট অমান্য করার কারণে ইমান নষ্ট হয়ে যাবে? আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন?

প্রশ্ন ০২. হিন্দু দোকান থেকে কিছু কেনা জায়েজ?

প্রশ্ন ০৩. মাথা মাসেহ এর সঠিক নিয়ম কোনটি?

প্রশ্ন ০৪. অনেক সময় দেখা যায় ওজু আছে নাকি নেই সেই ব্যাপারে সন্দেহ থেকে যায়। একবার মনে হয় ওজু নেই। আবার মনে হয় এটা শয়তানের ওয়াসওয়াসা। এক্ষেত্রে করণীয় কি?

প্রশ্ন ০৫. ফানি ভিডিও দেখার বিধান কি?

جزاك الله خيرا في الدنيا والاخره

Answer

وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته

بسم الله الرحمن الرحيم

الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على سيدنا محمد، وعلى آله وصحبه أجمعين، أما بعد:

প্রশ্ন ০১: কাদিয়ানীদের পণ্য বয়কট ও Foodi অ্যাপ থেকে অর্ডার করা প্রসঙ্গে

উত্তর: কাদিয়ানীরা (আহমদীরা) তাদের আকিদা অনুযায়ী নিজেদের মুসলিম দাবি করলেও, তাদের মূল আকিদা হলো—মির্যা গোলাম আহমদকে নবী মানা এবং হযরত মুহাম্মদ ﷺ-কে শেষ নবী না মানা। এটি সুস্পষ্ট কুফর ও ইসলাম থেকে বহিষ্কারযোগ্য আকিদা। কারণ, কুরআনে কারীমে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: "وَلَٰكِن رَّسُولَ اللَّهِ وَخَاتَمَ النَّبِيِّينَ" (সূরা আহযাব: ৪০)। অর্থাৎ, তিনি আল্লাহর রাসূল এবং সর্বশেষ নবী। হাদীসে রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন: "لَا نَبِيَّ بَعْدِي" (আমার পরে কোনো নবী নেই)। (সহীহ বুখারী: ৪৪১৬, সহীহ মুসলিম: ১৮৪২)

যেহেতু কাদিয়ানীদের আকিদা কুফরী, তাই তাদের ব্যবসা-বাণিজ্য, পণ্য ক্রয়-বিক্রয় এবং তাদের প্রতিষ্ঠান থেকে খাবার কেনা-খাওয়া থেকে বিরত থাকা কর্তব্য। তবে এটা মনে রাখা জরুরি যে, কোনো মুসলিমের ওপর ফরজ বা ওয়াজিব স্তরের নির্দেশ না থাকলে, কোনো ব্যক্তিগত বা সামাজিক বয়কট অমান্য করার কারণে কারো ঈমান নষ্ট হয় না। বয়কট করা হলো কুফরী আকিদার প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ ও তাদের অর্থনৈতিকভাবে সমর্থন না করার একটি গুরুত্বপূর্ণ ইসলামী নীতি। কিন্তু এটি ঈমান-কুফরের মূল বিষয় নয়। সুতরাং, Foodi অ্যাপ থেকে মিঠাই বা টেস্টি ট্রিটের খাবার অর্ডার করলে ঈমান নষ্ট হবে না, আল্লাহ অসন্তুষ্ট হবেন না—এটি বলা ঠিক নয়। তবে কাদিয়ানীদের ব্যবসা সমর্থন করা থেকে বিরত থাকাই উত্তম ও সতর্কতামূলক পন্থা। আর যদি কোনো ব্যক্তি ভুলবশত বা অসতর্কতাবশত অর্ডার করে ফেলে, তবে তাওবা করাই যথেষ্ট; ঈমান নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা নেই।

তবে হ্যাঁ, যদি কেউ কাদিয়ানীদের কুফরী আকিদাকে সঠিক মনে করে বা তাদের সমর্থন করে, তাহলে সেটি ভিন্ন বিষয় এবং তা ঈমান বিধ্বংসী। কিন্তু শুধু তাদের দোকান থেকে খাবার কেনা বা বয়কট অমান্য করা ঈমান নষ্টের কারণ নয়।

সতর্কতা: কাদিয়ানীদের পণ্য বয়কট করা ইসলামী ভ্রাতৃত্ব ও আকিদার হেফাজতের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তাই সম্ভব হলে তাদের পণ্য এড়িয়ে চলাই বাঞ্ছনীয়।


প্রশ্ন ০২: হিন্দু দোকান থেকে কিছু কেনা জায়েজ?

উত্তর: হিন্দু দোকান থেকে হালাল পণ্য (যেমন: শাকসবজি, ফলমূল, হালাল মাংস নয় এমন খাদ্য, কাপড়, ইলেকট্রনিকস ইত্যাদি) কেনা জায়েজ। ইসলামে ব্যবসায়িক লেনদেনে পক্ষের ধর্ম কোনো বাধা নয়, বরং পণ্য হালাল ও পবিত্র হওয়া এবং লেনদেনে সুদ, প্রতারণা, জুলুম ইত্যাদি হারাম বিষয় থেকে মুক্ত হওয়া শর্ত।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: "وَأَحَلَّ اللَّهُ الْبَيْعَ وَحَرَّمَ الرِّبَا" (সূরা বাকারা: ২৭৫)। অর্থাৎ, আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করেছেন এবং সুদকে হারাম করেছেন।

তবে হিন্দুদের এমন কোনো খাবার কেনা যাবে না, যা তাদের ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের জন্য উৎসর্গীকৃত (যেমন: মন্দিরের প্রসাদ) বা যা ইসলামে হারাম (যেমন: শূকরের মাংস, মূর্তির উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত খাদ্য)। আর যদি হিন্দু দোকানে হালাল পণ্য পাওয়া যায় এবং তাতে কোনো হারাম মিশ্রণ না থাকে, তবে কেনা জায়েজ।

ফতোয়ার কিতাবসমূহে আছে: "المسلم إذا اشترى من الكافر شيئاً طاهراً جاز" (মুসলিম যদি কাফিরের কাছ থেকে পবিত্র বস্তু ক্রয় করে, তবে তা জায়েজ)। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৬, পৃষ্ঠা ৩৯০; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ৩, পৃষ্ঠা ১০৭)


প্রশ্ন ০৩: মাথা মাসেহ করার সঠিক নিয়ম কোনটি?

উত্তর: হানাফী মাযহাব অনুযায়ী, ওজুর সময় মাথা মাসেহ করার সঠিক নিয়ম হলো:

১. হাত ভিজিয়ে নেওয়া: প্রথমে হাত পানিতে ভিজিয়ে নিতে হবে, তবে অতিরিক্ত পানি ঝরানো যাবে না। ২. মাথার সামনের অংশ থেকে শুরু: ভেজা হাতের আঙুলগুলো মাথার সামনের চুলের সীমা থেকে শুরু করে পেছনের দিকে (ঘাড়ের দিকে) নিয়ে যেতে হবে। ৩. পেছন থেকে সামনে ফিরে আসা: এরপর হাতের তালু দিয়ে মাথার পেছন থেকে সামনের দিকে ফিরিয়ে আনতে হবে। ৪. কান মাসেহ: এরপর কানের ভেতরের অংশ শাহাদাত আঙুল দিয়ে এবং বাইরের অংশ বুড়ো আঙুল দিয়ে মাসেহ করতে হবে। ৫. ঘাড় মাসেহ: এরপর হাতের পেছন দিয়ে ঘাড় মাসেহ করতে হবে।

দলিল: হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, রাসূল ﷺ ওজু করলেন, তখন তিনি মাথা মাসেহ করলেন—দুই হাত মাথার সামনের দিকে নিয়ে গেলেন এবং পেছনের দিকে টেনে নিলেন, তারপর পেছন থেকে সামনে ফিরিয়ে আনলেন। (সহীহ বুখারী: ১৮৫, সহীহ মুসলিম: ২৩৫)

হানাফী ফিকহের বিখ্যাত কিতাব 'আল-হিদায়া'তে আছে: "ثم يمسح رأسه بيديه كلتيهما، يبدأ بمقدم رأسه إلى مؤخره، ثم يرد يديه إلى مقدمه" (অতঃপর দুই হাত দিয়ে মাথা মাসেহ করবে, মাথার সামনের অংশ থেকে পেছনের দিকে শুরু করবে, তারপর হাত ফিরিয়ে সামনের দিকে আনবে)। (আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৭)

মাসেহের পরিমাণ: মাথার চার ভাগের এক ভাগ (এক চতুর্থাংশ) মাসেহ করা ফরজ, আর পুরো মাথা মাসেহ করা সুন্নত। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১৩৫; ফাতাওয়া হিন্দিয়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ১০)


প্রশ্ন ০৪: ওজু আছে কি নেই—এই সন্দেহ ও ওয়াসওয়াসা সম্পর্কে

উত্তর: এটি শয়তানের ওয়াসওয়াসা (প্ররোচনা)। ইসলামের একটি মূলনীতি হলো: "الیقین لا یزول بالشک" (নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না)। অর্থাৎ, যদি আপনি নিশ্চিতভাবে জানেন যে আপনার ওজু ছিল, কিন্তু পরে সন্দেহ হয় যে ভেঙে গেছে কি না, তবে আপনার ওজু বহাল আছে; নতুন করে ওজু করা লাগবে না।

হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে যায়েদ (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল ﷺ-কে বলতে শুনেছেন: "إِذَا وَجَدَ أَحَدُكُمْ فِي بَطْنِهِ شَيْئًا فَأَشْكَلَ عَلَيْهِ، أَخَرَجَ مِنْهُ رِيحٌ أَمْ لَا؟ فَلَا يَخْرُجْ مِنَ الْمَسْجِدِ حَتَّى يَسْمَعَ صَوْتًا أَوْ يَجِدَ رِيحًا" (যদি তোমাদের কেউ তার পেটে কিছু অনুভব করে এবং সন্দেহ হয় যে, বাতাস বের হয়েছে কি হয়নি, তবে সে যেন মসজিদ থেকে বের না হয়, যতক্ষণ না শব্দ শোনে বা গন্ধ পায়)। (সহীহ বুখারী: ১৩৭, সহীহ মুসলিম: ৩৬১)

করণীয়: ১. সন্দেহ হলে ওয়াসওয়াসাকে গুরুত্ব দেবেন না; আপনার পূর্বের নিশ্চিত অবস্থার ওপর আমল করুন। ২. যদি নিশ্চিতভাবে জানেন যে ওজু ভেঙে গেছে, তবে নতুন করে ওজু করে নিন। ৩. শয়তানের ওয়াসওয়াসা থেকে বাঁচতে "أعوذ بالله من الشيطان الرجيم" পড়ুন এবং আল্লাহর ওপর ভরসা রাখুন। ৪. বারবার সন্দেহ হওয়ার অভ্যাস থাকলে, নিজের মনে দৃঢ় বিশ্বাস রাখুন যে, "আমার ওজু আছে" এবং সেই অনুযায়ী আমল করুন।

ফিকহের কিতাবে আছে: "من تيقن الطهارة وشك في الحدث فهو متطهر" (যে ব্যক্তি পবিত্রতার ব্যাপারে নিশ্চিত এবং অপবিত্রতার ব্যাপারে সন্দেহে আছে, সে পবিত্র)। (রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৮৫; আল-হিদায়া, খণ্ড ১, পৃষ্ঠা ২৩)


প্রশ্ন ০৫: ফানি ভিডিও দেখার বিধান কি?

উত্তর: ইসলামে সময়ের মূল্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ফানি বা অহেতুক ভিডিও দেখা সাধারণত সময়ের অপচয়, যা ইসলামে নিন্দনীয়। তবে এর বিধান নির্ভর করে ভিডিওর বিষয়বস্তুর ওপর:

১. যদি ভিডিওতে হারাম কিছু থাকে (যেমন: অশ্লীলতা, বেহায়াপনা, নাচ-গান, মূর্তিপূজা, কুফরী কথা, ইসলামের অবমাননা ইত্যাদি), তবে তা দেখা সম্পূর্ণ হারাম। ২. যদি ভিডিওটি সাধারণ বিনোদনমূলক হয় (যেমন: প্রকৃতির দৃশ্য, এবং শরীয়তবিরোধী নয় এমন ক্লিপ), তবে তা দেখা নিষিদ্ধ নয়, তবে অহেতুক সময় নষ্ট করা এবং আল্লাহর যিকির থেকে গাফিল হওয়া থেকে বিরত থাকা উচিত। ৩. যদি ভিডিওতে উপকারী কিছু থাকে (যেমন: ইসলামী শিক্ষা, জ্ঞানমূলক বিষয়, সংবাদ), তবে তা দেখা জায়েজ। শর্ত হল, শরীয়ত বিরোধী কিছু থাকতে পারবে না এবং প্রাণীর দৃশ্য তাতে থাকতে পারবে না।

আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন: "وَالَّذِينَ هُمْ عَنِ اللَّغْوِ مُعْرِضُونَ" (আর যারা অহেতুক কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে রাখে)। (সূরা মুমিনুন: ৩)

রাসূল ﷺ ইরশাদ করেন: "مِنْ حُسْنِ إِسْلَامِ الْمَرْءِ تَرْكُهُ مَا لَا يَعْنِيهِ" (মানুষের ইসলামের সৌন্দর্য হলো, যা তার কাজে আসে না তা পরিত্যাগ করা)। (তিরমিজি: ২৩১৭)

উপদেশ: ফানি ভিডিও দেখার অভ্যাস থাকলে তা কমিয়ে দিন এবং সময়কে দ্বীনি ইলম অর্জন, কুরআন তিলাওয়াত, যিকির ও পরিবারের খেদমতে ব্যয় করুন।


والله أعلم بالصواب


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.