দুর্গাপূজা উপলক্ষে হিন্দুরা বাড়িতে নাড়ু তৈরি করেন। সেই নাড়ু কি মুসলমানদের খাওয়া জায়েজ?
Halal and Haram · Hanafi
Question
Answer
দুর্গাপূজা উপলক্ষে হিন্দুদের তৈরি নাড়ু মুসলমানদের খাওয়া জায়েজ কি?
সংক্ষিপ্ত উত্তর
সাধারণভাবে জায়েজ নয়। দুর্গাপূজা উপলক্ষে হিন্দুদের বাড়িতে যে নাড়ু তৈরি হয়, তা মুসলমানদের জন্য খাওয়া জায়েজ নয়—কারণ তাতে দুটি সম্ভাব্য নিষিদ্ধ দিক বিদ্যমান:
- শিরকি অনুষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ততা (ইমতিয়াজ বিল কুফর): পূজা-উৎসব উপলক্ষে প্রস্তুত খাদ্য কুফরের শিয়ার (প্রতীক) হিসেবে গণ্য হয়।
- হারাম উপাদানের সম্ভাবনা: নাড়ু সাধারণত নারকেল, চিনি/গুড়, চালের গুঁড়া দিয়ে তৈরি হলেও হিন্দু বাড়িতে প্রস্তুত হলে তাতে হারাম (যেমন: অশুদ্ধ/নাজিস পাত্র, মাংস-মিশ্রিত উপাদান, বা পূজার নৈবেদ্য হিসেবে উৎসর্গকৃত হওয়া) উপাদান বা নাপাকির আশঙ্কা থাকে।
মূলনীতি: কাফিরদের খাদ্য সম্পর্কে কুরআন ও সুন্নাহ
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:
"আজ তোমাদের জন্য পবিত্র বস্তুসমূহ হালাল করা হয়েছে। আর আহলে কিতাবদের খাদ্য তোমাদের জন্য হালাল এবং তোমাদের খাদ্য তাদের জন্য হালাল।" — (সূরা আল-মায়িদা: ৫)
এই আয়াতে আহলে কিতাব (ইহুদি-খ্রিস্টান)-দের খাদ্য হালাল ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু হিন্দুরা আহলে কিতাবের অন্তর্ভুক্ত নয়—তারা মুশরিক। ফুকাহায়ে কেরামের সর্বসম্মত মত অনুযায়ী মুশরিকদের (হিন্দু, বৌদ্ধ, অগ্নিপূজারী প্রভৃতি) হাতে তৈরি খাদ্য মূলত হালাল নয়, যদি না তা যবাইয়ের বিধানসহ অন্যান্য শর্ত পূরণ করে (যেমন: মাংস না হওয়া, নাপাকি থেকে পবিত্র হওয়া ইত্যাদি)।
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী, আহলে কিতাব ছাড়া অন্য কাফিরদের যবাই হারাম। তবে মাংস ছাড়া অন্যান্য খাদ্য (যেমন: শাকসবজি, ফল, রুটি, মিষ্টি)—যদি তাতে হারাম বা নাজিস কিছু মিশ্রিত না থাকে এবং তা কুফরের প্রতীক না হয়—তাহলে তা খাওয়ার অনুমতি আছে। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, খ. ৬, পৃ. ৪৮৮; ফাতাওয়া আলমগিরি, খ. ৫, পৃ. ৩৪৭)
পূজার নৈবেদ্য বা উৎসবের খাদ্য: আলাদা বিধান
তবে এখানে মূল প্রশ্ন হলো—দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রস্তুত নাড়ু। এখানে দুটি দিক বিবেচ্য:
(ক) যদি নাড়ু পূজার নৈবেদ্য (ভোগ) হিসেবে উৎসর্গ করা হয়: তাহলে তা মুসলমানদের জন্য কোনোভাবেই জায়েজ নয়। কারণ তা শিরকের উদ্দেশ্যে উৎসর্গীকৃত। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"যা আল্লাহ ছাড়া অন্য নামে উৎসর্গ করা হয়েছে, তা তোমাদের জন্য হারাম করা হয়েছে।" — (সূরা আল-মায়িদা: ৩)
(খ) যদি সাধারণভাবে উৎসব উপলক্ষে তৈরি হয় (নৈবেদ্য নয়): তবুও এতে শিরকি উৎসবের সাথে সহযোগিতা ও সমর্থনের ছাপ থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন:
"তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" — (সূরা আল-মায়িদা: ২)
আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বেহেশতী জেওর-এ উল্লেখ করেন: কাফিরদের উৎসব-অনুষ্ঠানের সাথে সংশ্লিষ্ট খাদ্য গ্রহণ করা থেকে বিরত থাকা উচিত, কারণ তা তাদের ধর্মীয় আচারের প্রতি সমর্থন প্রকাশ করে। (দেখুন: বেহেশতী জেওর, খ. ৩, "কাফিরদের সাথে সম্পর্ক" অধ্যায়)
নাজিস/অপবিত্রতার আশঙ্কা
হিন্দু বাড়িতে রান্নার সময় পাত্রের পবিত্রতা (তাহারাত) নিশ্চিত নয়। হিন্দুদের ধর্মীয় বিধানে পবিত্রতার ধারণা ভিন্ন। ফিকহের মূলনীতি হলো:
"নিশ্চিত বিষয় সন্দেহ দ্বারা দূর হয় না।" (শরহু মানি'ল আসার)
তবে এখানে সন্দেহ নয়, বরং প্রবল আশঙ্কা বিদ্যমান—কারণ হিন্দু বাড়িতে সাধারণত নাপাক পাত্র, মাংস-মিশ্রিত উপাদান বা পূজার সামগ্রীর সংস্পর্শে আসার সম্ভাবনা থাকে। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতার-এ বলেন: কাফিরদের হাতে তৈরি খাদ্য গ্রহণে সতর্কতা অবলম্বন করা উত্তম, বিশেষত যখন তা তাদের ধর্মীয় অনুষ্ঠানের সাথে সম্পৃক্ত। (দেখুন: রাদ্দুল মুহতার, খ. ৬, পৃ. ৪৮৯)
চূড়ান্ত ফতোয়া
দুর্গাপূজা উপলক্ষে হিন্দুদের বাড়িতে তৈরি নাড়ু মুসলমানদের জন্য খাওয়া জায়েজ নয়। এর কারণ:
- এটি শিরকি উৎসবের সাথে সম্পৃক্ত—যা ইসলামে নিষিদ্ধ।
- পূজার নৈবেদ্য হিসেবে উৎসর্গকৃত হলে তা সম্পূর্ণ হারাম।
- নাপাকি ও হারাম উপাদানের প্রবল আশঙ্কা রয়েছে।
- কুফরের প্রতীক হিসেবে গণ্য হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।