স্বামী মুখে তালাক দিতে না চাইলে কী করবেন, খুলা তালাকের শরীয়তসম্মত পদ্ধতি, শর্ত, লিখিত তালাকের হুকুম, ফাসখের আবেদন, এবং হানাফি ফিকহ অনুযায়ী বিস্তারিত সমাধান জানতে চাই?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
এখন সে আমাকে মুখে তালাক দিতে পারবে নাহ, এমন বলছে ।
এখন আবার প্রশণ সে যদি মন থেকে নাহ চায় আমাকে তালাক নাহ দিতে , কিন্তু আমার জন্য সে খুলা তালাক লিখে দিল , তাহলে কি হবে ?
আখন সে আমাকে রাখতেও পাচ্ছে নাহ , তার উপর হারামে জড়িয়ে যাবার এক রিস্ক , এমন মানুষের সাথে আমার পক্ষে সম্ভব নাহ , আমার অর্থনীনি ভরন পোষ ন কি দিবে , যেখানে সে ১৫ লাখের মত দেনা , পালিয়ে পালিয়ে থাকে , তার সাথে সং সার করে , বাচ্চা নেওয়া , মানুষ করা কিভাবে সম্ভব , আমি তার সাথ কইয়েক মাস ছিলাম , তার ওসব জানার পর যদি শুধরায় , কিন্তু আমাকে সে ধার এ ডূবিয়েছিল, আমি আলহামদুলিল্লাহ জব করে পার পেলেও আমার সেমিস্টার ড্রপ গিয়েছিল, ্তারপর মুখে মুখে সে আমাকে বলেছিল তালাকের ব্যপারে , আপনি যা চান তাই হবে , পরে ১ বছর আর কথা হয় নি , এখন জানলাম সেই তালাক হয় নি, সে তখনো বলেছিল ,আমি মুখে তালাক শব্দ উচ্চারন করে , মুখে দিতে পারবো নাহ , এখন আমি তাকে টেক্সট দিলাম , একই কথা , আমি মুখে এটা দিতে পারব নাহ , অন্য উপায় আছে কি। এখন আমি কি করবো, ইস লামে সমাধান কি
অন্য কোনো কি উপায়ে আমি তার থেকে কিভাবে কি নিলে খুলা তালাক হবে । প্রসেস বলেন , যেটা করতেই হবে , আর এটাও বলেন কি কি করলে আবার কুলা হবে নাহ ।
Answer
তালাক ও খুলা সম্পর্কে ইসলামী সমাধান
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
জবাব
বোন, আপনার চরম মানসিক কষ্ট, স্বামীর জুয়া খেলা, বিপুল ঋণ, খোরপোষ না দেওয়া এবং দায়িত্বহীনতার কারণে বিচ্ছেদের সিদ্ধান্ত সম্পূর্ণ যৌক্তিক। ইসলামি শরীআত কোনো নারীকে অত্যাচার, নাফাকা (খোরপোষ) না পাওয়া এবং অনিশ্চিত ভবিষ্যতের মুখে জীবন কাটাতে বাধ্য করে না।
আপনার উত্থাপিত প্রশ্নগুলোর সুনির্দিষ্ট ফিকহী সমাধান ও বিচ্ছেদের শরয়ী পদ্ধতি ফাতাওয়া ও ফিকহে হানাফীর প্রামাণ্য কিতাবসমূহের আলোকে ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বরসহ নিচে বিস্তারিত পেশ করা হলো:
১. স্বামী মন থেকে না চেয়েও যদি মুখে না বলে কেবল লিখিতভাবে (সাইন করে) দেয়, তবে কি বিচ্ছেদ/খোলা হবে?
উত্তর: হ্যাঁ, অবশ্যই ১০০% বিচ্ছেদ ও খোলা কার্যকর হয়ে যাবে।
- ফিকহী কারণ ও মূলনীতি: ইসলামি ফিকহে (হানাফী মাযহাবে) লিখিতভাবে তালাক বা বিচ্ছেদ প্রদান করা শাব্দিক বা মৌখিক উচ্চারণের সমতুল্য গণ্য হয়—«الكتابة كالخطاب» (অর্থাৎ, 'লিখিত চুক্তি বা স্বাক্ষর মুখের উচ্চারণের স্থলাভিষিক্ত')। যদি স্বামী মুখে "তালাক" বা "বিচ্ছেদ করলাম" উচ্চারণ করতে রাজি না-ও হয়, কিন্তু সে নিজের ইচ্ছায় স্বহস্তে বা বুঝে-শুনে কাজী অফিসের বা স্ট্যাম্পের তৈরি খুলা চুক্তিপত্রে বা তালাকনামায় স্বাক্ষর (Sign) করে দেয়, তবে তার অন্তরের ইচ্ছা থাকুক বা না থাকুক, স্বাক্ষর করার সাথে সাথেই ১টি তালাকে বায়েইন (১টি তালাকে বাইন/খোলা তালাক) কার্যকর হয়ে যাবে। এর জন্য মুখে কোনো শব্দ উচ্চারণ করা মোটেই বাধ্যতামূলক নয় ।
২. স্বামী মুখে উচ্চারণ করতে না চাইলে বিচ্ছেদের অন্য উপায়ে 'খুলা' বা বিচ্ছেদের সুনির্দিষ্ট ৩টি প্রসেস:
স্বামী মুখে উচ্চারণ না করলেও নিচে বর্ণিত ৩টি পদ্ধতির যেকোনো একটি অনুসরণ করে আপনি শরীআতসম্মত উপায়ে বিচ্ছেদ সম্পন্ন করতে পারবেন:
উপায় ১: লিখিত 'খুলা চুক্তিপত্র' (সবচেয়ে সহজ ও সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি)
- পদ্ধতি: ১. আপনি একজন কাজী সাহেব বা আইনজীবীর মাধ্যমে একটি 'খুলা তালাকনামা / চুক্তিপত্র' প্রস্তুত করবেন। ২. এতে স্পষ্ট উল্লেখ থাকবে: "স্ত্রী তার পাওনা দেনমোহর এবং স্বামীর নিকট পাওনা ১ লাখ+ টাকা মওকুফ করার বিনিময়ে খোলার প্রস্তাব দিল এবং স্বামী তা গ্রহণ করে স্ত্রীকে ১টি তালাকে বায়েইন প্রদান করল।" ৩. স্বামী সেখানে ২ জন বালেগ মুসলিম পুরুষ সাক্ষীর সামনে স্বাক্ষর (Sign) করে দেবে। ৪. স্বামী স্বাক্ষর করে দিলে সাথে সাথে ১টি তালাকে বায়েইন কার্যকর হয়ে যাবে। মুখে এক শব্দও বলতে হবে না।
উপায় ২: 'তাফবীযে তালাক' (কাবিননামার ১৮ নম্বর ধারার ক্ষমতা ব্যবহার)
- পদ্ধতি: ১. আপনার বিবাহের কাবিননামা পরীক্ষা করুন। ১৮ নম্বর ঘরে স্বামী আপনাকে নিজেকে তালাক নেওয়ার ক্ষমতা (তাফবীযে তালাক) দিয়ে থাকলে, স্বামীর সই বা মুখে বলা—কোনোটারই প্রয়োজন নেই। ২. আপনি নিজেই কাজী অফিসে গিয়ে কাজী সাহেবের উপস্থিতিতে বলবেন: "আমি আমার স্বামী প্রদত্ত 'তাফবীযে তালাকের' ক্ষমতাবলে নিজ নফসের ওপর ১টি তালাকে বায়েইন গ্রহণ করলাম।" ৩. এতে শরীআত ও আইন অনুযায়ী আপনার বিচ্ছেদ সাথে সাথে কার্যকর হয়ে যাবে।
উপায় ৩: কাজী বা আদালতের মাধ্যমে 'ফাসখে নিকাহ' (বিবাহ বাতিল)
- পদ্ধতি: ১. স্বামী যদি সই না করে বা ঝুলিয়ে রাখে, তবে আপনি কাজী অফিস বা মুসলিম পারিবারিক আদালতের শরণাপন্ন হয়ে 'ফাসখে নিকাহ' (বিবাহ বিচ্ছেদ)-এর আবেদন করতে পারবেন। ২. আদালতে স্বামীর হারামে লিপ্ত থাকা, জুয়া খেলা, খোরপোষ (নাফাকা) না দেওয়া, ঋণগ্রস্ত হয়ে পালিয়ে থাকা এবং আপনার পাওনা শোধ না করার তথ্য পেশ করলে আদালত তাকে নোটিশ পাঠাবে। ৩. সে হাজির না হলে বা অধিকার আদায়ে ব্যর্থ হলে কাজী/আদালত শরয়ী ক্ষমতাবলে বিবাহ বাতিল (ফাসখ) ঘটিয়ে দেবে। এতে স্বামীর কোনো অনুমতি বা তালাকের প্রয়োজন হবে না।
৩. কী কী করলে 'খুলা' হবে না বা বাতিল হয়ে যাবে?
খোলা একটি শরয়ী চুক্তি। বিচ্ছেদ যেন বাতিল বা অকার্যকর না হয়, সেজন্য নিচের বিষয়গুলো কঠোরভাবে মেনে চলতে হবে:
১. মজলিস ভিন্ন হয়ে যাওয়া (ইত্তিহাদে মজলিস না থাকা): খোলার প্রস্তাব (ইজাব) ও সম্মতি (কবুল) একই বৈঠকে বা একই লিখিত চুক্তির আওতায় হতে হয়। যেমন: স্ত্রী খোলার প্রস্তাব দিল আর স্বামী সাথে সাথে রাজি না হয়ে ভিন্ন বিষয়ে চলে গেল বা রাজি হলো না, পরে অনেক দিন পর সই করলো—মাঝখানে মজলিস বদলে গেলে আগের প্রস্তাবে খোলা হবে না। ২. বিনিময় (এওয়াজ) স্পষ্ট ধার্য না করা: খোলার মূল ভিত্তি হলো বিনিময়। তাই আপনি কী ছাড় দিচ্ছেন (যেমন: দেনমোহর ও ১ লাখ টাকার ঋণ মাফ করা) তা লিখিত চুক্তিতে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করতে হবে; তা না হলে চুক্তিটি অস্পষ্ট থেকে যাবে। ৩. স্বামীর কোনো সই বা সম্মতি না থাকা: স্ত্রী একা একা মুখে বা লিখে "আমি তোমাকে খোলা করলাম" বললে কোনো খোলা হয় না; যতক্ষণ না স্বামী তাতে সই করে বা তাফবীযে তালাকের ক্ষমতা ব্যবহার করা হয়। ৪. অস্পষ্ট শর্ত দেওয়া: খুলা চুক্তিতে অবাস্তব বা অনৈতিক শর্ত দিলে তা ঝামেলা তৈরি করে। তবে আপনার দেনমোহর ও ঋণ মাফ করা সম্পূর্ণ বৈধ ও সঠিক বিনিময়।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৩৯৮–৩৯৯ (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক, ৬ষ্ঠ পরিচ্ছেদ: লিখিত তালাকের বিবরণ): (স্বামী মুখে উচ্চারণ না করলেও লিখিত তালাক পত্রে সই করলে বা পাঠালে তালাক কার্যকর হওয়ার সর্বসম্মত ফিকহী মূলনীতি)।
- পৃষ্ঠা: ৪৮৮ (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক, ৮ম পরিচ্ছেদ: আল-খোলা): (খোলার শর্তাবলী, বিনিময় ধার্য করা এবং ইজাব-কবুলের নিয়ম)।
২. দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ২৬৭ (অধ্যায়: তালাক ও ডিভোর্সের শর'য়ী বিধান — লিখিত তালাক): (লিখিত বা সই করা তালাক শাব্দিক উচ্চারণের সমতুল্য হওয়া)।
- পৃষ্ঠা: ২৬৯ (অধ্যায়: খোলা তালাকের নিয়ম): (অর্থ বা পাওনার বিনিময়ে খোলার মাধ্যমে ১টি তালাকে বায়েইন হওয়া)।
- পৃষ্ঠা: ২৭১–২৭২ (অধ্যায়: কোর্ট/কাজী অফিস থেকে তাফবীযে তালাক গ্রহণ): (কাবিননামার ১৮নং ধারার ক্ষমতাবলে স্ত্রীর নিজস্ব তালাক গ্রহণের পদ্ধতি)।
৩. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া:
- ১৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১৮০–১৮১ (অধ্যায়: বাবুল ফাসখি ওয়াত তাফরীইক): *(স্বামী খোরপোষ না দিলে, জুয়া বা পাপে লিপ্ত থাকলে কাজী/আদালতের মাধ্যমে বিবাহ বাতিল বা ফাসখ করানোর ফিকহী সিদ্ধান্ত)।
- ১১শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ২৫৫ (অধ্যায়: কিতাবুল খোলা): (দেনমোহর ও ঋণ মওকুফের বিনিময়ে খোলার শরয়ী বৈধতা ও নিয়ম)।
আল্লাহ ভালো জানেন।