স্ত্রী কর্তৃক লিখিত তালাকের পর তিন মাসের আগে পুনর্বিবাহের শরয়ী বিধান কী?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
Answer
ফিকহি মাসআলা: লিখিত তালাকের পর তিন মাসের আগে পুনর্বিবাহ
বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম
ওয়া আলাইকুমুস সালাম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।
জবাব
সংক্ষিপ্ত শরয়ী ফায়সালা:
১. স্ত্রী যদি নিজে থেকে লিখিতভাবে স্বামীকে তালাক দিয়ে থাকে (যেখানে স্বামীর কোনো তাফবীয বা অনুমতি ছিল না): তবে শরীআতের দৃষ্টিতে উক্ত লিখিত তালাক সম্পূর্ণ অকার্যকর ও বাতিল। এতে আপনাদের বিবাহ ভাঙেনি; তাই ৩ মাস পার হওয়ার আগে বা পরে নতুন করে বিবাহ করারও কোনো প্রয়োজন নেই। আপনারা পূর্বের বিবাহের ওপরই স্বামী-স্ত্রী হিসেবে একত্রে বসবাস করতে পারবেন।
২. যদি স্বামী কর্তৃক অর্পিত 'তাফবীযে তালাক' (তালাক গ্রহণের ক্ষমতা)-এর ভিত্তিতে স্ত্রী নিজের ওপর তালাক গ্রহণ করে থাকে: তবে এর মাধ্যমে ১টি তালাকে বায়েইন পতিত হয়েছে। এক্ষেত্রে তিন মাস (ইদ্দত) অতিবাহিত হওয়ার পূর্বেই আপনারা দুজনে সম্মত হয়ে নতুন করে শরীয়তসম্মত মোহর ধার্য করে ও ২ জন শরয়ী সাক্ষীর উপস্থিতিতে পুনরায় আকদ (নিকাহ) সম্পন্ন করে একত্রে সংসার শুরু করতে পারবেন।
বিস্তারিত ফিকহী ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ:
আপনার ঘটনাটিতে ফিকহে হানাফীর আলোকে দুইটি ভিন্ন পরিস্থিতি হতে পারে। নিচে দুটি সুরতেরই বিস্তারিত বিধান দেওয়া হলো:
সুরত ১: স্ত্রী কর্তৃক সরাসরি স্বামীকে লিখিত ডিভোর্স প্রদান (যেখানে স্বামী ক্ষমতা দেয়নি)
- ফিকহী মূলনীতি: ইসলামি শরীআতে তালাক প্রদান করার একচ্ছত্র অধিকার ও ক্ষমতা একমাত্র স্বামীকে দেওয়া হয়েছে, স্ত্রীকে নয়।
- হুকুম: স্ত্রী যদি স্বামীকে উদ্দেশ করে লেখে বা বলে যে—"আমি আমার স্বামীকে তালাক দিলাম/ডিভোর্স দিলাম"—তবে শরীআতের বিচারে এর দ্বারা কোনো তালাক পতিত হয় না। তাদের পূর্বের বৈবাহিক সম্পর্ক শতভাগ বহাল থাকে। সুতরাং আপনাদের ক্ষেত্রে যদি এমনটি ঘটে থাকে, তবে কোনো তালাকই হয়নি এবং নতুন করে পুনরায় বিবাহ করারও প্রয়োজন নেই।
সুরত ২: স্বামী প্রদত্ত 'তাফবীযে তালাক' (তালাকের ক্ষমতা) ব্যবহার করে ডিভোর্স দেওয়া
- ফিকহী মূলনীতি: বিবাহের সময় কাবিননামার ১৮ নম্বর ধারায় স্বামী যদি স্ত্রীকে শর্তসাপেক্ষে বা বিনাশর্তে নিজেকে তালাক দেওয়ার ক্ষমতা (তাফবীযে তালাক) অর্পণ করে থাকে, এবং স্ত্রী সেই ক্ষমতাবলে বলে বা লেখে যে—"আমি স্বামী প্রদত্ত ক্ষমতাবলে নিজেকে তালাক প্রদান করলাম", তবেই কেবল ১টি তালাকে বায়েইন (১টি তালাকে বাইন) পতিত হয়।
- তিন মাস (ইদ্দত)-এর মধ্যে পুনরায় বিবাহের হুকুম:
তালাকে বায়েইন পতিত হলে তৎক্ষণাৎ বিবাহ বন্ধন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় ঠিকই, কিন্তু এটি ৩ তালাক (তালাকে মুগাল্লাযাহ) নয়। তাই তিন মাস/তিন হায়েজ (ইদ্দত) শেষ হওয়ার পূর্বেই স্বামী-স্ত্রী উভয়ে সম্মত হয়ে কোনো প্রকার হালালা ছাড়াই নতুন মোহর ধার্য করে এবং অন্তত ২ জন স্বাধীন প্রাপ্তবয়স্ক মুসলিম পুরুষের সামনে নতুন করে আকদ (নিকাহ) পড়ে পুনরায় একত্রে সংসার শুরু করতে পারবে। ৩ মাস অতিবাহিত হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করা বাধ্যতামূলক নয়।
সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:
১. দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ২৬৬ (অধ্যায়: তালাক ও ডিভোর্সের শর'য়ী বিধান): (তালাক প্রদানের অধিকার একমাত্র স্বামীর হওয়া এবং স্ত্রী কর্তৃক তালাক দেওয়ার সুযোগ না থাকা সংক্রান্ত কুরআনী বিধান)।
- পৃষ্ঠা: ২৬৭ (অধ্যায়: তালাকের প্রকারভেদ — তালাকে বায়েইন): (তালাকে বায়েইনের পর ইদ্দতের ভেতরেই পুনরায় নতুনভাবে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার শরয়ী সুযোগ)।
- পৃষ্ঠা: ২৭১–২৭২ (অধ্যায়: তাফবীযে তালাক ও ডিভোর্স প্রসঙ্গ): (স্ত্রী সরাসরি ' স্বামীকে তালাক দিলাম' বললে তালাক না হওয়া; এবং তাফবীযে তালাকের সঠিক ব্যবহারের বিবরণ)।
২. ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড):
- পৃষ্ঠা: ৩০৩ & ৩৭৫ (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক, ১ম ও ৫ম পরিচ্ছেদ): (তালাকে বায়েইন পতিত হওয়ার পর ইদ্দতের ভেতরেই নতুন আকদ ও মোহরের মাধ্যমে স্ত্রীকে ফিরিয়ে নেওয়ার ফিকহী বিধান)।
- পৃষ্ঠা: ৩৫৭ (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক, ৩য় পরিচ্ছেদ: তাফবীযে তালাকের বিবরণ): (তাফবীযে তালাকের মাধ্যমে তালাকে বায়েইন হওয়া সংক্রান্ত মাসআলা)।
৩. ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১১শ ও ১৩শ খণ্ড):
- ১১শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ৭৬–৭৭ (অধ্যায়: বাবুল আকদিল নতুনী ফিল ইদ্দাহ): (তালাকে বায়েইন বা তাফবীজের পর ইদ্দতের মেয়াদের ভেতরেই পুনরায় নতুন কাবিন ও আকদ করা সম্পূর্ণ সহীহ হওয়ার প্রামাণ্য ফতোয়া)।
- ১৩শ খণ্ড, পৃষ্ঠা: ১২৫–১২৬ (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক): (নারীর একক তালাকের অকার্যকারিতা ও বিবাহের স্থায়িত্ব)।
আল্লাহ ভালো জানেন।