বিয়েের প্রস্তাবের সময় একাধিক পাত্র/পাত্রীর বায়োডাটা দেখা, সংগ্রহ করা ও নিজের বায়োডাটা শেয়ার করা কি জায়েয?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
২.একসাথে কয়েকজনের বায়োডাটা কিনা, দেখা, নিজের বায়োডাটা শেয়ার করা কি বৈধ?
Answer
বিবাহের প্রস্তাবের সময় একাধিক পাত্র/পাত্রীর বায়োডাটা দেখা ও শেয়ার করার বিধান
প্রশ্নের সারসংক্ষেপ
প্রশ্নকারী জানতে চেয়েছেন—(১) এক পাত্র-পাত্রীর বায়োডাটা শেয়ার হওয়ার পর অন্য পাত্রের বায়োডাটা দেখা/গ্রহণ করা বৈধ কি না; (২) একসাথে কয়েকজনের বায়োডাটা সংগ্রহ করা, দেখা এবং নিজের বায়োডাটা শেয়ার করা শরীয়তসম্মত কি না।
মূল আলোচনা
১. বিবাহের প্রস্তাব (খিতবা) সম্পর্কিত শরীয়তের মূলনীতি
ইসলামে বিবাহের প্রস্তাব বা সম্বন্ধের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি হলো—কোনো নারীর (বা পুরুষের) সম্বন্ধ চূড়ান্তভাবে চলমান থাকা অবস্থায় তার প্রতি অন্য কারো প্রস্তাব দেওয়া বা সম্বন্ধ চালানো নিষিদ্ধ। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেছেন:
«لَا يَخْطُبُ الرَّجُلُ عَلَى خِطْبَةِ أَخِيهِ حَتَّى يَنْكِحَ أَوْ يَتْرُكَ»
"কোনো ব্যক্তি তার ভাইয়ের (মুসলিম ভাইয়ের) বিবাহের প্রস্তাবের উপর নিজের প্রস্তাব দেবে না, যতক্ষণ না সে বিবাহ করে ফেলে অথবা প্রস্তাব ছেড়ে দেয়।"
— সহীহ বুখারী, হাদীস ৫১৪২; সহীহ মুসলিম, হাদীস ১৪১২
ইমাম আবু হানীফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী, এ নিষেধাজ্ঞা তখনই প্রযোজ্য যখন প্রথম পক্ষের প্রস্তাব স্পষ্টভাবে প্রকাশিত ও উভয় পক্ষ সম্মত হয়েছে (বা পাত্রীপক্ষ সম্মতি দিয়েছে) এবং দ্বিতীয় প্রস্তাবদাতা তা জানা সত্ত্বেও প্রস্তাব দেয়। এমতাবস্থায় দ্বিতীয় প্রস্তাব হারাম ও গুনাহের কাজ; তবে উক্ত বিবাহ সংঘটিত হলে তা বাতিল হবে না, সহীহ হবে (কেননা নিষেধাজ্ঞা বাহ্যিক/নৈতিক, আকদের মূল শর্ত নয়)।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদীন), খণ্ড ৩, পৃ. ৮–৯ — "وَلَا يَخْطُبُ عَلَى خِطْبَةِ أَخِيهِ" অধ্যায়ে ইমাম আবু হানীফার মত ব্যাখ্যা।
- আল-হিদায়া, কিতাবুন নিকাহ — খিতবার বিধান প্রসঙ্গে।
- ফাতাওয়া আলমগীরি (ফাতাওয়া হিন্দিয়া), খণ্ড ১, কিতাবুন নিকাহ।
২. বায়োডাটা সংগ্রহ ও দেখা প্রসঙ্গে বিস্তারিত
বায়োডাটা আদান-প্রদান নিজে থেকে নিষিদ্ধ কোনো বিষয় নয়; এটি কেবল তথ্য বিনিময়ের মাধ্যম। তবে এর সাথে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি দিক বিবেচ্য:
(ক) একাধিক বায়োডাটা সংগ্রহ ও দেখা: শরীয়তের দৃষ্টিতে পাত্র/পাত্রী নির্বাচনের সময় একাধিক সম্ভাব্য প্রার্থীর তথ্য দেখা ও যাচাই করা মূলত জায়েয। কারণ বিবাহের পূর্বে পাত্র-পাত্রীকে পরস্পরকে দেখা ও জানার অনুমতি শরীয়তে রয়েছে। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«إِذَا خَطَبَ أَحَدُكُمُ الْمَرْأَةَ فَإِنِ اسْتَطَاعَ أَنْ يَنْظُرَ إِلَى مَا يَدْعُوهُ إِلَى نِكَاحِهَا فَلْيَفْعَلْ»
"তোমাদের কেউ যখন কোনো নারীকে বিবাহের প্রস্তাব দেয়, তখন যদি সে তার দিকে এমনভাবে দেখতে পারে যা তাকে বিবাহে উৎসাহিত করে, তবে সে যেন তা করে।"
— সুনানে আবু দাউদ, হাদীস ২০৮২; সুনানে তিরমিজি, হাদীস ১০৮৭ (হাসান)
তবে শর্ত হলো—এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের উদ্দেশ্যে যাচাই হবে, কোনো পক্ষের সাথে চূড়ান্ত সম্বন্ধ/প্রস্তাব স্থির হওয়ার আগ পর্যন্ত। একাধিক প্রার্থীর তথ্য দেখা নিজে থেকে গুনাহ নয়; বরং এটি বিচক্ষণতার অংশ।
(খ) তবে সতর্কতার বিষয়: যদি কোনো একটি প্রস্তাব চূড়ান্তভাবে স্থির হয়ে যায় (উভয় পক্ষ রাজি হয়, তারিখ নির্ধারিত হয়), তখন অন্য প্রার্থীর প্রতি অগ্রসর হওয়া বা সম্বন্ধ চালানো নিষিদ্ধ—উপরের হাদীসের আলোকে। কিন্তু শুধু বায়োডাটা দেখা বা সংগ্রহ করা চূড়ান্ত সম্বন্ধ হিসেবে গণ্য হয় না।
(গ) নিজের বায়োডাটা শেয়ার করা: নিজের বায়োডাটা শেয়ার করা জায়েয, তবে নিম্নোক্ত শর্তে:
- অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য (যেমন ছবি, গোপন বিষয়) প্রকাশ না করা — বিশেষত নারীর ছবি বা পূর্ণ ঠিকানা অপ্রয়োজনে শেয়ার করা থেকে বিরত থাকা।
- মহররম/নন-মহরমের বিধান রক্ষা — পাত্রীর ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্য অমহরম পুরুষের কাছে পাঠানো শরীয়তসম্মত নয়; প্রয়োজনে অভিভাবক/মহরমের মাধ্যমে তথ্য বিনিময় করা।
- সততা ও নির্ভুল তথ্য — বায়োডাটায় মিথ্যা তথ্য দেওয়া নিষিদ্ধ (মিথ্যা হারাম)।
রেফারেন্স:
- রাদ্দুল মুহতার, খণ্ড ৯, পৃ. ৫১৩–৫১৪ — বিবাহের পূর্বে পাত্রীকে দেখা প্রসঙ্গে।
- ইমদাদুল ফাতাওয়া, খণ্ড ৩ — খিতবা ও পাত্রী দেখা সংক্রান্ত মাসায়েল।
- বাহিশতী যেওর, বিবাহ অধ্যায় — পাত্রী দেখার আদব ও শর্তাবলি।
- মা'আরিফুল কুরআন, সূরা বাকারা আয়াত ২৩৫-এর তাফসীর — "وَلَا جُنَاحَ عَلَيْكُمْ فِيمَا عَرَّضْتُم بِهِ مِنْ خِطْبَةِ النِّسَاءِ" — পরোক্ষ প্রস্তাবের অনুমতি ও সরাসরি প্রস্তাবের নিষেধাজ্ঞা।
৩. সরাসরি প্রশ্নের উত্তর
প্রশ্ন ১: পাত্র-পাত্রীর বায়োডাটা শেয়ার হয়েছে—এমতাবস্থায় অন্য পাত্রের বায়োডাটা দেখা বৈধ কি?
উত্তর: যদি শুধু বায়োডাটা শেয়ার হয়ে থাকে এবং চূড়ান্ত সম্বন্ধ/প্রস্তাব স্থির না হয়, তবে অন্য পাত্রের বায়োডাটা দেখা ও যাচাই করা জায়েয। কিন্তু যদি উভয় পক্ষ সম্মতি দিয়ে সম্বন্ধ চূড়ান্ত হয়ে যায়, তবে অন্য প্রস্তাব চালানো নিষিদ্ধ (হারাম)। শুধু বায়োডাটা দেখা বা সংগ্রহ করা চূড়ান্ত সম্বন্ধ নয়।
প্রশ্ন ২: একসাথে কয়েকজনের বায়োডাটা সংগ্রহ, দেখা, নিজের বায়োডাটা শেয়ার করা বৈধ কি?
উত্তর: হ্যাঁ, মূলত জায়েয—শর্ত হলো:
- এটি সিদ্ধান্ত গ্রহণের যাচাইয়ের উদ্দেশ্যে হবে, প্রতারণা বা অশ্লীল উদ্দেশ্যে নয়;
- চূড়ান্ত সম্বন্ধ স্থির হওয়ার পর অন্য প্রার্থীর প্রতি অগ্রসর হবে না;
- নারীর ছবি/গোপন তথ্য অমহরমের কাছে প্রকাশ করবে না;
- বায়োডাটায় মিথ্যা তথ্য দেবে না।
সারসংক্ষেপ ও সতর্কতা
| বিষয় | হুকুম | |---|---| | চূড়ান্ত সম্বন্ধের আগে একাধিক বায়োডাটা দেখা | জায়েয | | চূড়ান্ত সম্বন্ধের পর অন্য প্রস্তাব চালানো | হারাম (হাদীসে নিষিদ্ধ) | | নিজের বায়োডাটা শেয়ার (শর্তসাপেক্ষে) | জায়েয | | নারীর ছবি/গোপন তথ্য অমহরমকে পাঠানো | নাজায়েয | | বায়োডাটায় মিথ্যা তথ্য | হারাম |
পরামর্শ: বায়োডাটা বিনিময়ের ক্ষেত্রে অভিভাবকের তত্ত্বাবধান রাখা, অপ্রয়োজনীয় ব্যক্তিগত তথ্য (বিশেষত ছবি) না পাঠানো এবং চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের পর অন্য প্রস্তাব বন্ধ রাখা কর্তব্য। বিস্তারিত নির্দিষ্ট পরিস্থিতি জানা থাকলে স্থানীয় মুফতি সাহেবের সাথে সরাসরি পরামর্শ করা উত্তম।
আল্লাহ ভালো জানেন।