বিয়ের জন্য ঘটকের সাহায্য নেওয়া ও ঘটককে টাকা দেওয়া কি জায়েজ? এটি সুদ হবে কি?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 7232
Questioner: Trisha Moni
Question Asked: 21 Oct 2026, 10:23 PM
Reviewed & Published: 21 Oct 2026, 10:33 PM
Views: 18
Tokens: 3,387
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

বিয়ের জন্য ঘটক দের সাহায্য নিয়া যাবে কি? আর ঘটক কে টাকা দিয়া কি জায়েজ? এই টা কি সুদ হবে?

Answer

বিয়ের জন্য ঘটকের সাহায্য নেওয়া ও পারিশ্রমিক প্রদান: ইসলামী দৃষ্টিকোণ

প্রশ্নের সারসংক্ষেপ

বিয়ের জন্য ঘটকের (মধ্যস্থতাকারী) সাহায্য নেওয়া যাবে কি? ঘটককে টাকা দেওয়া জায়েজ কি? এটি সুদ হবে কি?


উত্তর (সংক্ষেপে)

হ্যাঁ, বিয়ের জন্য ঘটকের সাহায্য নেওয়া জায়েজ। ঘটককে তার সেবার পারিশ্রমিক (উজরত/হাদিয়া) হিসেবে টাকা দেওয়াও জায়েজ, এবং এটি সুদ নয়। তবে শর্ত হলো—ঘটককে দেওয়া অর্থ যেন নির্দিষ্ট সেবার বিনিময় হয়, এবং তাতে কোনো প্রতারণা, মিথ্যা প্রশংসা বা শরীয়তবিরোধী শর্ত না থাকে।


বিস্তারিত আলোচনা

১. ঘটকের সাহায্য নেওয়ার বিধান

বিবাহ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত ও সামাজিক চুক্তি। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

«لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَشَاهِدَيْ عَدْلٍ» "ওয়ালি ও দুইজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোনো বিবাহ নেই।" — (সুনানে তিরমিজি: ১১০২; সুনানে আবু দাউদ: ২০৮৫)

বিবাহের প্রস্তাব পৌঁছানো, পাত্র-পাত্রীর পরিচয় ও গুণাবলি জানানো—এসব বৈধ ও প্রয়োজনীয় কাজ। ঘটক এই কাজটি করেন। তাই শরীয়তে ঘটকের মাধ্যমে প্রস্তাব পাঠানো বা গ্রহণ করা জায়েজ ও বৈধ। এটি একটি সামাজিক মাধ্যম মাত্র; শরীয়ত এটিকে নিষিদ্ধ করেনি।

তবে ঘটককে অবশ্যই সত্য বলতে হবে, পাত্র-পাত্রীর দোষ-গুণ সঠিকভাবে বর্ণনা করতে হবে। মিথ্যা প্রশংসা বা গোপন করা হারাম।

২. ঘটককে টাকা দেওয়ার বিধান

ঘটককে টাকা দেওয়া দুইভাবে হতে পারে:

(ক) পারিশ্রমিক/উজরত হিসেবে: ঘটক যদি নির্দিষ্ট সেবার (যেমন—পাত্রী খোঁজা, যোগাযোগ করানো) বিনিময়ে টাকা নেন, তবে এটি ইজারাহ (সেবা চুক্তি)-এর অন্তর্ভুক্ত এবং জায়েজ। ইসলামে সেবার বিনিময়ে পারিশ্রমিক নেওয়া বৈধ। আল্লাহ তা'আলা বলেন:

«فَإِنْ أَرْضَعْنَ لَكُمْ فَآتُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ» "যদি তারা তোমাদের জন্য সন্তানকে দুধ পান করায়, তবে তাদের পারিশ্রমিক দাও।" — (সূরা আত-তালাক: ৬)

ইমাম আবু হানিফা ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, ইজারাহ (সেবা চুক্তি) বৈধ, যদি কাজ ও পারিশ্রমিক সুস্পষ্ট হয়। (আল-হিদায়া, কিতাবুল ইজারাহ)

(খ) হাদিয়া/উপহার হিসেবে: ঘটক যদি পারিশ্রমিক নির্ধারণ না করেন, বরং খুশি হয়ে টাকা দেন, তবে তা হাদিয়া হিসেবে বৈধ।

৩. এটি কি সুদ হবে?

না, এটি সুদ হবে না। সুদের সংজ্ঞা হলো—ঋণে অতিরিক্ত শর্তারোপ, অথবা সমজাতীয় বস্তুর বিনিময়ে কম-বেশি লেনদেন। ঘটককে টাকা দেওয়া একটি সেবার বিনিময় বা উপহার; এতে ঋণ-সংক্রান্ত অতিরিক্ত শর্ত নেই। তাই এটি সুদের অন্তর্ভুক্ত নয়।

ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) রাদ্দুল মুহতারে ইজারাহ ও উজরতের বিধান বিস্তারিত আলোচনা করেছেন এবং সেবার বিনিময়ে পারিশ্রমিককে বৈধ বলেছেন। (রাদ্দুল মুহতার, কিতাবুল ইজারাহ)

৪. সতর্কতা ও শর্তাবলি

ঘটকের বিষয়ে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো লক্ষ্য রাখা জরুরি:

  1. মিথ্যা ও প্রতারণা নিষিদ্ধ: পাত্র-পাত্রীর দোষ গোপন করা বা অতিরিক্ত প্রশংসা করা হারাম। রাসূল ﷺ বলেছেন: «مَنْ غَشَّنَا فَلَيْسَ مِنَّا» — "যে প্রতারণা করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।" (সহিহ মুসলিম: ১০১)

  2. পারিশ্রমিক নির্ধারিত হওয়া: ইজারাহর শর্ত হলো—কাজ ও পারিশ্রমিক সুস্পষ্ট হওয়া। (আল-হিদায়া)

  3. শরীয়তবিরোধী শর্ত না থাকা: যেমন—"বিয়ের আগে বড় অংকের যৌতুক দিতে হবে" এমন শর্তে ঘটকের সহায়তা নেওয়া যাবে না; যৌতুক দাবি করা শরীয়তবিরোধী।

  4. ঘটক যদি মিথ্যা সাক্ষী বা প্রতারণায় সহযোগিতা করে: তখন তা নাজায়েজ। আল্লাহ বলেন: «وَلَا تَعَاوَنُوا عَلَى الْإِثْمِ وَالْعُدْوَانِ» — "পাপ ও সীমালঙ্ঘনে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।" (সূরা মায়িদা: ২)

  5. অতিরিক্ত টাকা আদায়: ঘটক যদি অতিরিক্ত টাকা আদায় করেন বা চাঁদাবাজি করেন, তা নাজায়েজ।

৫. হানাফি ফিকহের সারসংক্ষেপ

  • ইমাম আবু হানিফা, ইমাম আবু ইউসুফ ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, ইজারাহ (সেবা চুক্তি) ও উজরত বৈধ। (আল-হিদায়া; ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল ইজারাহ)
  • ইমাম তাহাবি (রহ.) শরহু মাআনিল আসারে ইজারাহর বৈধতা সম্পর্কে হাদিস বর্ণনা করেছেন।
  • মুফতি মুহাম্মদ শফি (রহ.) মাআরিফুল কুরআনে সূরা তালাকের ৬ নং আয়াতের তাফসিরে পারিশ্রমিকের বৈধতা উল্লেখ করেছেন।
  • মুফতি তাকি উসমানি (দা.বা.) ফাতাওয়া উসমানিতে ইজারাহ ও উজরতের বিধান বিস্তারিত আলোচনা করেছেন।

উপসংহার

  1. বিয়ের জন্য ঘটকের সাহায্য নেওয়া জায়েজ।
  2. ঘটককে সেবার পারিশ্রমিক বা হাদিয়া হিসেবে টাকা দেওয়া জায়েজ।
  3. এটি সুদ নয়; বরং ইজারাহ/হাদিয়ার অন্তর্ভুক্ত।
  4. শর্ত: সত্যবাদিতা, পারিশ্রমিক সুস্পষ্ট হওয়া, প্রতারণা ও শরীয়তবিরোধী শর্ত থেকে মুক্ত থাকা।

রেফারেন্স

  • আল-কুরআন: সূরা আত-তালাক ৬; সূরা মায়িদা ২
  • সহিহ মুসলিম: ১০১
  • সুনানে তিরমিজি: ১১০২
  • সুনানে আবু দাউদ: ২০৮৫
  • আল-হিদায়া (মারগিনানি), কিতাবুল ইজারাহ
  • রাদ্দুল মুহতার (ইবনে আবিদিন), কিতাবুল ইজারাহ
  • ফাতাওয়া আলমগিরি, কিতাবুল ইজারাহ
  • মাআরিফুল কুরআন (মুফতি মুহাম্মদ শফি), সূরা তালাকের তাফসির
  • ফাতাওয়া উসমানি (মুফতি তাকি উসমানি), ইজারাহ অধ্যায়

আল্লাহ ভালো জানেন।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.