ইস্তিখারার ফলাফল সংক্রান্ত
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
আমি একজন ৩য় বর্ষের ভার্সিটি শিক্ষার্থী। সম্প্রতি আমি আমার পরিবারকে বিয়ের কথা বলি, এবং আমার পরিবার রাজি হয়। বিয়ের জন্য পাত্রীর খোঁজ দেওয়ার জন্য আব্বু তার বিভিন্ন কলিগ, এলাকার ইমাম সাহেবকে বলে রাখেন এবং আমাকে বলেন আমার কোনও পছন্দ থাকলেও যেন জানাই। আমার কোনো পছন্দ ছিলো না। তবে, আমাদের ভার্সিটির একজন দ্বীনদার মেয়ের খোঁজ পাই, সোশ্যাল মিডিয়ায়। উল্লেখ্য যে, মেয়েটিকে আমি কোনদিন সামনা সামনি দেখিও নি, কখনও মেসেজও দেইনি। ফেসবুক থেকে শুধু দেখেছি ভার্সিটির পড়াশুনার পাশাপাশি একটি ইসলামিক একাডেমিতেও পড়াশুনা করে। তাই বন্ধুর আহ্লিয়ার মাধ্যমে একটু খোঁজ করি এবং যতদূর জানতে পেরেছি, ভালো মেয়েই মনে হয়েছে। তাই, মেয়েটির বাবার নাম্বার জোগাড় করে আব্বুকে দেই যেন আব্বু কথা বলেন, যদিও এখনও যোগাযোগ করা হয়নি
পাশা পাশি আমি ইস্তিখারার নামাজ পড়ি ৭ দিন এবং ৭ দিনেই আমার ঝোক বাড়তে থাকে, এবং সবকিছুই ইতিবাচক মনে হয়। কিন্তু গতরাতে, আমি ইস্তিখারার নামাজ পড়ে শুইনি, ফজরে উঠার পরও মনের ঝোক ইতিবাচকই মনে হয়েছে। ফজরের পর ঘুম দিয়ে খারাপ স্বপ্ন দেখলাম। এখন, এটি কি আমার অবহেলা করা উচিত? যেহেতু ফজরের পর র সময়টায় সাধারণত অজগুবি স্বপ্ন এসে থাকে। নাকি ইস্তিখারার ফলাফল হিসেবে ধরা উচিত? যদিও আজকে ইস্তিখারার নামাজ পড়িনি আর যেই ৭ দিন পড়েছিলাম সেই ৭ দিন মনের ঝোক ইতিবাচকই ছিলো?
Answer
وعليكم السلام ورحمة الله وبركاته
ইস্তিখারার ফলের ব্যাপারে স্পষ্ট দিকনির্দেশনা
প্রিয় ভাই, আপনার প্রশ্নের উত্তর কয়েকটি ধাপে দেওয়া হলো:
১. ইস্তিখারার মূল ভিত্তি
ইস্তিখারা হলো—আল্লাহ তাআলার কাছে কল্যাণ প্রার্থনা করা এবং সিদ্ধান্তে তাঁর পক্ষ থেকে দিকনির্দেশনা কামনা করা। হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ সাহাবিদেরকে সব কাজে ইস্তিখারা শেখাতেন। ইস্তিখারার দুআয় আছে:
«اللَّهُمَّ إِنْ كَانَ هَذَا الْأَمْرُ خَيْرًا لِي فِي دِينِي وَدُنْيَايَ وَآخِرَتِي فَاقْدُرْهُ لِي وَيَسِّرْهُ لِي ثُمَّ بَارِكْ لِي فِيهِ، وَإِنْ كَانَ شَرًّا لِي فَاصْرِفْهُ عَنِّي وَاقْدُرْ لِي الْخَيْرَ حَيْثُ كَانَ»
(সহিহ বুখারি: ১১৬৬)
২. ইস্তিখারার ফলাফল কীভাবে বোঝা যায়?
গুরুত্বপূর্ণ মূলনীতি: ইস্তিখারার ফলাফল শুধু স্বপ্নের উপর নির্ভর করে না। ইস্তিখারার প্রকৃত ফল হলো—আল্লাহ তাআলা সেই কাজের প্রতি অন্তরে প্রশান্তি ও সহজতা সৃষ্টি করে দেন, অথবা বাধা-প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে দেন। ইমাম ইবন আবিদিন রহ. «رد المحتار»-এ এবং মুফতি মুহাম্মদ শফী রহ. «মাআরিফুল কুরআন»-এ এ বিষয়ে আলোচনা করেছেন যে, ইস্তিখারার পর অন্তরের দিকে লক্ষ্য রাখতে হবে—যদি কাজটি সহজ ও স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে যায় এবং অন্তরে প্রশান্তি থাকে, তবে তা কল্যাণের আলামত।
৩. আপনার ক্ষেত্রে বিশেষ বিবেচনা
আপনি ৭ দিন ইস্তিখারা পড়েছেন এবং প্রতিবারই অন্তরে ইতিবাচক ঝোঁক অনুভব করেছেন—এটিই ইস্তিখারার প্রধান আলামত হিসেবে গণ্য হবে। কারণ:
- ইস্তিখারার মূল লক্ষ্য হলো অন্তরের প্রশান্তি ও সহজতা।
- ৭ দিন ধরে ধারাবাহিকভাবে ইতিবাচক অনুভূতি একটি শক্তিশালী ইঙ্গিত।
- ফজরের পরের স্বপ্ন—বিশেষত আপনি নিজেই স্বীকার করছেন যে ওই সময়ে সাধারণত অযাগুবি (অর্থহীন/এলোমেলো) স্বপ্ন দেখা যায়—তাকে ইস্তিখারার ফল হিসেবে ধরা উচিত নয়।
৪. স্বপ্নের শরয়ি মূল্যায়ন
হাদিসে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:
«الرُّؤْيَا الصَّالِحَةُ مِنَ اللَّهِ، وَالْحُلْمُ مِنَ الشَّيْطَانِ»
(সহিহ বুখারি: ৬৯৯০)
অর্থাৎ ভালো স্বপ্ন আল্লাহর পক্ষ থেকে, আর খারাপ স্বপ্ন শয়তানের পক্ষ থেকে। খারাপ স্বপ্ন দেখলে বাম দিকে থুতু ফেলা, শয়তান থেকে আশ্রয় চাওয়া এবং সেই স্বপ্ন কারও কাছে বর্ণনা না করার নির্দেশ আছে (সহিহ মুসলিম: ২২৬২)। তাই একটি খারাপ স্বপ্নের কারণে ৭ দিনের ইতিবাচক ইস্তিখারার ফল বাতিল হয় না।
৫. ইমাম ইবন আবিদিনের বক্তব্য
«رد المحتار»-এ ইস্তিখারার আলোচনায় এসেছে যে, ইস্তিখারার পর যা অন্তরে প্রবল ও সহজ মনে হয়, সেদিকেই অগ্রসর হওয়া উচিত; আর স্বপ্ন যদি স্পষ্ট ও সুসংবাদবাহী হয় তবে তা অতিরিক্ত আলামত হিসেবে গ্রহণযোগ্য। কিন্তু এলোমেলো বা ভয়ংকর স্বপ্নকে দলিল হিসেবে ধরা যায় না।
৬. ব্যবহারিক পরামর্শ
- অবহেলা করবেন না, বরং অগ্রসর হোন—৭ দিনের ইতিবাচক ঝোঁক এবং অন্তরের প্রশান্তি ইস্তিখারার প্রধান আলামত।
- আব্বুকে বলুন কথা বলতে—মেয়েটির পরিবারের সাথে যোগাযোগ করুন, ইস্তিখারার শরয়ি পদ্ধতি হলো—সিদ্ধান্তের পূর্বে খোঁজখবর নেওয়া, তারপর ইস্তিখারা করা। আপনি ইতিমধ্যে খোঁজ নিয়েছেন।
- সালাতুল হাজত ও ইস্তিখারা চালিয়ে যান—সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হওয়ার আগ পর্যন্ত।
- স্বপ্নকে অতিরিক্ত গুরুত্ব দেবেন না—বিশেষত ফজরের পরের এলোমেলো স্বপ্নকে।
- পাত্রী দেখা (শরয়ি পদ্ধতিতে)—বিয়ের পূর্বে শরয়ি সীমা মেনে একবার দেখা ও কথা বলার সুযোগ নিন, এতে অন্তরের প্রশান্তি আরও স্পষ্ট হবে।
- ইস্তিখারার সাথে ইসতিশারা (পরামর্শ)—আব্বু, দ্বীনদার আলিম ও অভিজ্ঞদের পরামর্শ নিন। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন: «مَا خَابَ مَنِ اسْتَخَارَ» (যে ইস্তিখারা করে সে ব্যর্থ হয় না—তিরমিজি: ২২৫৮-এর সমর্থনে)।
সারসংক্ষেপ
আপনার ৭ দিনের ইতিবাচক ঝোঁকই ইস্তিখারার প্রধান ফল হিসেবে গণ্য হবে। ফজরের পরের একটি এলোমেলো স্বপ্নের কারণে তা বাতিল বা অবহেলা করার কোনো শরয়ি ভিত্তি নেই। বরং আপনি সাহসের সাথে আব্বুকে মেয়েটির পরিবারের সাথে যোগাযোগ করতে বলুন, এবং শরয়ি পদ্ধতিতে এগিয়ে যান। আল্লাহ তাআলা আপনার জন্য কল্যাণময় সিদ্ধান্ত দান করুন।