ইজাব-কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) স্পষ্টভাবে আদায় না হলে বিয়ে হবে?
Marriage and Divorce · Hanafi
Question
অভিভাবককে না জানিয়েই একজনের সঙ্গে বিয়ে করি। আমরা একে অপরকে পছন্দ করতাম। পরিবারকে জানিয়ে বিয়ে করতে পারতাম। কিন্তু ছেলের পরিবার থেকে চাকরি না হওয়া পর্যন্ত বিয়ে দেবে না। আর আমাদের দুজনেরই বয়স ২৩ বছর।
এজন্য আমরা বিয়েটা করে রাখি। কারণ, সম্পর্কটা হালাল বানাতে চাচ্ছিলাম। পরে সময়মতো পরিবারের অনুমতি নিয়ে সংসার শুরু করব, ইনশাআল্লাহ।
তো, বিয়েটা আমাদের এক পরিচিত ভাই ছিলেন, উনি করাতে সাহায্য করেন। তার সাথে আমার কোনো আত্মীতার সম্পর্ক নেই। উনি উকিলের দায়িত্ব পালন করেন। ওনার এক ফ্রেন্ড ছিলেন, যিনি কাজীর দায়িত্ব পালন করেন। যিনি মূলত কাজীর ছেলে ছিলেন।ওনার বাবার বয়স বেশি হয়ে যাওয়ায় ছেলের উপর কিছু বিয়ে পড়ানোর দায়িত্ব দিয়ে দেন। তো, ওনার পরিবর্তে ওনার ছেলে এই দায়িত্ব পালন করেছেন। তো পরে বিয়ের রেজিস্ট্রি হয়, আমরা সাক্ষর করি। উকিল হিসেবে যিনি ছিলেন উনি আমাকে বিয়ের শুরুতে এটা জিজ্ঞাসা করেন যে আমি এই বিয়ের জন্য মানসিক ভাবে প্রস্তুত কি না। আর বলেছিল আমি এই বিয়ে টা করা নিয়ে sure কিনা। আমি তা তে হ্যাঁ বলি। আর সাক্ষী হিসেবে ৪ জন ছিলেন। তার মধ্যে ২ জন সাক্ষী কে দেখি।একজন বিয়ে পড়ানো দেখে যান। আর একজন সেখানেই উপস্থিত ছিলেন। আর দেনমোহরও ধার্য করা হয় ৩ লাখ ১০১ টাকা। এখন সমস্যা হচ্ছে, বিয়েতে আলাদাভাবে কবুল বলতে বলা হয়নি বা শেষে দোয়া করা হয়নি।
এই ঘটনার পর কিছু বিষয়ে সন্দেহের কারণে আলেমকে প্রশ্ন করি ও জানতে পারি ইজাব-কবুল পালন না হওয়ায় ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক বিয়ে পালন হয়নি।
আমরা বুঝতে পারি..
এটা মূলত কোর্ট ম্যারেজ করেছি আমরা।
এখন যিনি কাজীর দায়িত্ব পালন করেছেন, উনি মূলত কাজীর ছেলে, আসল কাজী নন। কাজীর ছেলে দ্বারা বিয়ের শর্তগুলো পালন করলে কি বিয়েটা সহিহ হবে?
বা কাজী কি যে কেউ হতে পারেন?
আথবা অন্য কোনো মৌলভি/হুজুর দ্বারা বিয়ে পড়িয়ে নিলে কি সেটা সহিহ হবে? তখন কি দেনমোহর আবার ধার্য্য করতে হবে?
মৌলভি দিয়ে বিয়ে পড়িয়ে নেওয়ার সময় রেজিস্ট্রির সময় যারা সাক্ষী ছিলেন, ওনাদের ছাড়া অন্য কেউ সাক্ষী হিসেবে থাকলে কি বিয়ে সহিহ হবে?
যারা সাক্ষী ছিলেন বিয়ে রেজিস্ট্রি এর সময় তাড়া যদি তখন থাকতে না পারেন সেক্ষেত্রে কী করনীয়...
আর ইসলামি বিয়ের শর্ত গুলো কি কি যেটা অবশ্যই পালন করতে হয় অভিভাবকে বিয়ের বিষয়ে জানিয়ে বা না জানিয়ে করার সময়.. উভয় ক্ষেত্রেই?
এই সব মিলিয়ে কী করলে ইসলামী শরিয়ত মোতাবেক বিয়েটা সহিহ হবে, সেটার পরামর্শ চাচ্ছি।
Answer
ইসলামী শরীয়ত মোতাবেক বিয়ের বিশ্লেষণ ও পরামর্শ
উত্তর,
আপনার বর্তমান বিয়েটি সহিহ নয় — কারণ ইজাব-কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) স্পষ্টভাবে আদায় হয়নি। তবে সমাধান সহজ: নতুন করে একটি সহিহ আকদ (বিয়ে) পড়িয়ে নিন — যেখানে ইজাব-কবুল স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হবে, দুজন যোগ্য সাক্ষী উপস্থিত থাকবেন, এবং দেনমোহর নির্ধারিত হবে। পূর্বের দেনমোহর (৩,১০১ টাকা) নতুন আকদেই বহাল থাকতে পারে; নতুন করে ধার্য করা জরুরি নয়, তবে নতুনভাবে নির্ধারণ করলে কোনো অসুবিধা নেই।
১. ইজাব-কবুল (প্রস্তাব ও গ্রহণ) — বিয়ের মূল রুকন
নিকাহর মূল রুকন হলো ইজাব ও কবুল। রাসূলুল্লাহ ﷺ ইরশাদ করেন:
«لَا نِكَاحَ إِلَّا بِوَلِيٍّ وَشَاهِدَيْ عَدْلٍ»
— "অভিভাবক ও দুজন ন্যায়পরায়ণ সাক্ষী ছাড়া কোনো নিকাহ নেই।"
(সুনানে তিরমিজি: ১১০২; সুনানে আবু দাউদ: ২০৮৫ — হাসান)
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মাযহাব অনুযায়ী, ইজাব-কবুল মজলিসে (একই বৈঠকে) স্পষ্টভাবে উচ্চারিত হওয়া আবশ্যক। শুধু কাগজে সাক্ষর বা রেজিস্ট্রেশন দিয়ে নিকাহ সম্পন্ন হয় না। ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ বলেন:
"النكاح ينعقد بالإيجاب والقبول، ولا يكفي الكتابة والرضا القلبي"
— "নিকাহ ইজাব-কবুল দ্বারা সম্পন্ন হয়; শুধু লেখা বা মনের সম্মতি যথেষ্ট নয়।"
(রাদ্দুল মুহতার: ৩/৯ — কিতাবুন নিকাহ)
আপনার ক্ষেত্রে: বিয়ের অনুষ্ঠানে আলাদাভাবে "কবুল করলাম" বলতে বলা হয়নি, শেষে দোয়াও হয়নি — এতে ইজাব-কবুল স্পষ্টভাবে আদায় হয়নি। তাই আকদ সহিহ হয়নি। (তবে যদি মজলিসে কোনোভাবে ইজাব-কবুল উচ্চারিত হয়ে থাকে এবং আপনি নিশ্চিত হন, তাহলে বিষয়টি ভিন্ন — কিন্তু আপনি নিজেই বলছেন স্পষ্টভাবে বলা হয়নি।)
কাজীর শর্ত
হানাফি ফিকহে নিকাহ সম্পন্ন করার জন্য কাজী হওয়া শর্ত নয়। যে কোনো মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক, বিবেকবান পুরুষ — যিনি নিকাহর রুকন ও শর্তগুলো জানেন — তিনি আকদ পড়াতে পারেন। ইমাম আল-হাসকাফি «আদ-দুররুল মুখতার»-এ বলেন:
"وينعقد النكاح بإيجاب وقبول من الأهل، ولا يشترط القاضي"
— "যোগ্য পক্ষদ্বয়ের ইজাব-কবুল দ্বারা নিকাহ সম্পন্ন হয়; কাজীর শর্ত নেই।"
(আদ-দুররুল মুখতার: ৩/৯)
(খ) কাজীর ছেলে কি কাজীর দায়িত্ব পালন করতে পারেন?
হ্যাঁ, পারেন — যদি তিনি নিজে যোগ্য হন (মুসলিম, প্রাপ্তবয়স্ক, বিবেকবান, নিকাহর শর্তাবলি জানেন)। কাজীর ছেলে হওয়া বা না হওয়া এখানে মূল বিষয় নয়; মূল বিষয় হলো আকদ সহিহভাবে সম্পন্ন হওয়া। তবে আপনার ক্ষেত্রে সমস্যা কাজীর ছেলে হওয়ায় নয়, বরং ইজাব-কবুল স্পষ্টভাবে না হওয়ায়।
নোট: বাংলাদেশে "কাজী" শব্দটি কখনো রেজিস্ট্রার বা নিকাহ রেজিস্ট্রারের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়। ইসলামী শরীয়তে নিকাহর বৈধতার জন্য সরকারি রেজিস্ট্রেশন শর্ত নয়; এটি প্রশাসনিক বিষয়। তবে রেজিস্ট্রেশন করলে পরবর্তীতে প্রমাণে সুবিধা হয়।
৩. অভিভাবক (ওয়ালী) ছাড়া বিয়ে — হানাফি মাযহাবের বিধান
এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। হানাফি মাযহাব অনুযায়ী:
(ক) প্রাপ্তবয়স্কা নারীর নিজের বিয়ের অধিকার
ইমাম আবু হানিফা (রহ.)-এর মতে, প্রাপ্তবয়স্কা (বালিগা) ও বিবেকবতী নারী নিজেই নিজের নিকাহর পক্ষ হতে পারেন — ওয়ালীর অনুমতি ছাড়াও। ইমাম আল-মারগিনানি «আল-হিদায়া»-তে বলেন:
"وللحرة البالغة العاقلة أن تزوج نفسها"
— "স্বাধীন, প্রাপ্তবয়স্কা ও বিবেকবতী নারী নিজেকে বিয়ে দিতে পারেন।"
(আল-হিদায়া: ১/১৯১ — কিতাবুন নিকাহ)
ইমাম ইবনে আবিদিন (রহ.) «রাদ্দুল মুহতার»-এ এই মতকে সমর্থন করেন এবং বলেন:
"فلا يشترط الولي في نكاح البالغة العاقلة عند أبي حنيفة"
— "ইমাম আবু হানিফার মতে প্রাপ্তবয়স্কা বিবেকবতীর নিকাহে ওয়ালী শর্ত নয়।"
(রাদ্দুল মুহতার: ৩/৫৫)