স্বামী দ্বিতীয় বিবাহ (মাসনা) করতে চাইলে স্ত্রীর করণীয় কী?

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 7158
Questioner: Nowshin Tabassum
Question Asked: 20 Oct 2026, 04:51 PM
Reviewed & Published: 20 Oct 2026, 04:58 PM
Views: 25
Tokens: 7,627
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম। আমার হাজব্যান্ড এর চার বোন, এক ভাই, মা সকলে সিহরে আক্রান্ত। বোন দের বিয়ে বন্ধের জাদু করা আছে। এক বোন ডিভোর্সি, আরেকজনের হয়নি। দুজন বিবাহিত, কিন্তু অনেক দেরিতে হয়েছে, সব সময় অসুস্থতা, সমস্যা লেগেই থাকে। জয়েন্ট পরিবার। ভুল বোঝাবুঝি। হাজব্যান্ডের ১০ লাখের মত ঋণ।ফাইন্যান্স অবস্থা কোনমতে, একটা হাইস্কুল টিচার, কোচিং এ পড়ান। বাড়ীতে তেমন বাসযোগ্য ঘর ও নেই। দুই রুমের টিনের ঘর আছে, সম্পত্তিও নেই তেমন।আমিও বাসায় বসে ফুল টাইম চাকরি করি যেহেতু বড় পরিবার আয় এর মানুষ শুধু আমার স্বামী। তাকে সাপোট দেওয়ার জন্য বিয়ের আজকে ৫ বছর অনেক কষ্ট করছি এখনো। তার লোন পরিশোধ করছি। নিজের আর বাচ্চার খরচ যোগান দিচ্ছি। এখন হুট হাট আমার হাজব্যান্ড বলে সে মাসনা করবে, তার ইচ্ছে করতেসে। আমি যদিও সম্পর্ণ সুস্থ, তাকে প্রতিনিয়ত সময় দি, চাহিদার গুরুত্ব দেই, বরং তার শারীরিক দূর্বলতা আমার চোখে পড়ে। তার এই কথায় আমি ভেঙে পড়েছি। অনেক কষ্ট পাচ্ছি যে তার জন্য এত্ত স্যাক্রিফাইস করতেসি, বিনিময়ে বিয়ের ৫ বছরের মাথায় সে শুধু ইচ্ছা করতেসে বলেই আরেকটা বিয়ে করতে চাচ্ছে। আমাদের একটা মেয়ে আছে, ৪ বছরের। এক্ষেত্রে স্ত্রী হিসেবে করণীয় কি? আমার অন্তুর দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। অসুস্থ হয়ে যাচ্ছি। আমি ছাড়া অন্য কারো সাথে দেখব, অন্য কারো ঘরে, এটা মেনেই নিতে পারছিনা যদিও এটা রব অনুমতি দিছেন।

Answer

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

প্রিয় বোন, আপনার প্রশ্নটি পড়ে বুঝতে পারছি আপনি কতটা মানসিক কষ্টের মধ্যে আছেন। আল্লাহ তাআলা আপনার সবর ও কষ্টের প্রতিদান দিন এবং আপনার সংসারকে হেফাজত করুন। আমিন।

নিচে আপনার প্রশ্নের শরীয়াহসম্মত বিস্তারিত উত্তর দেওয়া হলো:


১. স্বামীর দ্বিতীয় বিবাহের শরীয়াহ বিধান

ইসলামে স্বামীর জন্য একাধিক বিবাহের অনুমতি রয়েছে, তবে তা শর্তসাপেক্ষ ও শর্তযুক্ত। কুরআনে আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন:

فَانكِحُوا مَا طَابَ لَكُم مِّنَ النِّسَاءِ مَثْنَىٰ وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ۖ فَإِنْ خِفْتُمْ أَلَّا تَعْدِلُوا فَوَاحِدَةً "তোমরা বিবাহ করো যারা তোমাদের জন্য পছন্দনীয়—দুই, তিন বা চারজন। কিন্তু যদি আশঙ্কা করো যে, ইনসাফ করতে পারবে না, তবে একজনকেই।" (সূরা নিসা: ৩)

আল্লাহ তাআলা আরও ইরশাদ করেন:

وَلَن تَسْتَطِيعُوا أَن تَعْدِلُوا بَيْنَ النِّسَاءِ وَلَوْ حَرَصْتُمْ "তোমরা কখনোই স্ত্রীদের মধ্যে পূর্ণ ইনসাফ করতে পারবে না, যদিও তোমরা তা কামনা করো।" (সূরা নিসা: ১২৯)

হানাফি ফিকহের দৃষ্টিতে:

  • দ্বিতীয় বিবাহ করা মুবাহ (অনুমোদিত), তবে প্রথম স্ত্রীর অনুমতি শর্ত নয়।
  • কিন্তু শর্ত হলো—সাম্য রক্ষা করা (খরচ, রাত যাপন, ব্যবহারে ইনসাফ)। সাম্য রক্ষায় অক্ষম হলে দ্বিতীয় বিবাহ মাকরুহে তাহরিমি বা নাজায়েজ পর্যায়ে চলে যায়।
  • ইমাম আবু হানিফা (রহ.) ও ইমাম মুহাম্মদ (রহ.)-এর মতে, ইনসাফের আশঙ্কা থাকলে একাধিক বিবাহ না করাই উত্তম।

রদ্দুল মুহতার-এ আছে:

"যদি ইনসাফ না করার আশঙ্কা থাকে, তবে একাধিক বিবাহ মাকরুহ।" (রদ্দুল মুহতার: ৩/১৭২)

ইমদাদুল ফাতাওয়া-য় হাকিমুল উম্মত থানভী (রহ.) বলেন:

"বিনা প্রয়োজনে দ্বিতীয় বিবাহ করা নিজের ঈমান ও আমানতের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ; বিশেষত প্রথম স্ত্রীর প্রতি জুলুমের আশঙ্কা থাকলে তা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।"


২. আপনার স্বামীর পরিস্থিতি ও দ্বিতীয় বিবাহের বৈধতা

আপনার বর্ণনা অনুযায়ী:

  • স্বামীর উপর ১০ লাখ টাকা ঋণ।
  • আয় সীমিত (একজন শিক্ষক + কোচিং)।
  • বাসযোগ্য ঘর নেই, সম্পত্তি নেই।
  • বড় পরিবারের ভরণপোষণ।
  • আপনি নিজে চাকরি করে সংসার চালাচ্ছেন।

শরীয়াহর দৃষ্টিতে: দ্বিতীয় বিবাহের ক্ষেত্রে ভরণপোষণ (নাফাকা) ও বাসস্থান (সুকনা) প্রদানের সামর্থ্য অপরিহার্য। হাদিসে এসেছে:

يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ "হে যুবকগণ! তোমাদের মধ্যে যে সামর্থ্য রাখে, সে যেন বিবাহ করে।" (সহিহ বুখারি: ৫০৬৫)

সামর্থ্য (বা'আহ) বলতে শুধু যৌন সামর্থ্য নয়; বরং মোহর, ভরণপোষণ ও বাসস্থানের সামর্থ্য বোঝায়। (শরহু মাআনিল আসার: ৩/৯৫)

আপনার স্বামীর ক্ষেত্রে: ঋণগ্রস্ত, আয় সীমিত, বাসস্থান নেই—এমতাবস্থায় দ্বিতীয় বিবাহ উভয়ের হক আদায়ে সামর্থ্য না থাকলে তা শরীয়াহসম্মত নয় এবং প্রথম স্ত্রীর প্রতি জুলুমের কারণ হবে।


৩. "মাসনা" (মাসনুন) শব্দের ভুল প্রয়োগ

আপনার স্বামী "মাসনা" বলতে সম্ভবত "মাসনুন" বা "সুন্নাহ" বোঝাতে চাচ্ছেন। কিন্তু দ্বিতীয় বিবাহ সুন্নাহ নয়; এটি মুবাহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর একাধিক বিবাহ ছিল বিশেষ প্রেক্ষাপটে (বিধবা, এতিম, দাওয়াতি প্রয়োজনে)। সাধারণ মুসলিমের জন্য এটি সুন্নাহ হিসেবে পালনীয় নয়।

আশরাফ আলী থানভী (রহ.) বলেছেন:

"একাধিক বিবাহ সুন্নাহ নয়; বরং প্রয়োজনে অনুমোদিত। প্রয়োজনের বাইরে গেলে তা ফিতনার কারণ হয়।" (বেহেশতী জেওর)


৪. স্ত্রী হিসেবে আপনার করণীয়

ক) ধৈর্য ও দোয়া

আল্লাহ তাআলা বলেন:

وَاصْبِرُوا ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ "তোমরা ধৈর্য ধারণ করো; নিশ্চয়ই আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন।" (সূরা আনফাল: ৪৬)

খ) স্বামীর সাথে শান্তিপূর্ণ আলোচনা

  • তার সামর্থ্য ও ঋণের কথা স্মরণ করিয়ে দিন।
  • দ্বিতীয় বিবাহে ভরণপোষণ ও বাসস্থানের দায়িত্ব কতটা কঠিন হবে তা বুঝিয়ে দিন।
  • আপনার কষ্ট ও মেয়ের ভবিষ্যতের কথা জানান।
  • রাগ বা তর্ক নয়; বরং ভালোবাসা ও যুক্তি দিয়ে কথা বলুন।

গ) দ্বিতীয় বিবাহে সম্মতি দেওয়া বাধ্যতামূলক নয়

শরীয়াহ অনুযায়ী প্রথম স্ত্রীর অনুমতি নেওয়া আবশ্যক নয়

তবে আপনি সম্মতি দিতে বাধ্য নন।

আপনি যদি সম্মতি না দেন, তবুও শরীয়াহ তাকে বাধা দিতে পারে না—তবে সামর্থ্য না থাকলে তা গুনাহের কারণ হবে।

ঘ) শর্ত আরোপ

আপনি চাইলে স্বামীর সাথে শর্তযুক্ত চুক্তি করতে পারেন—যেমন: "দ্বিতীয় বিবাহ করলে আমার ও মেয়ের ভরণপোষণ নিশ্চিত করতে হবে" ইত্যাদি। তবে এটি শরীয়াহর মূল বিধান পরিবর্তন করে না।

ঙ) পারিবারিক মধ্যস্থতা

  • উভয় পরিবারের বড়দের বা বিশ্বস্ত আলেমকে মধ্যস্থতা করতে দিন।

চ) নিজের অধিকার রক্ষা

  • আপনার নিজের আয়ের সম্পদ আপনার; তা স্বামীকে দিতে বাধ্য নন।
  • মেয়ের ভরণপোষণে স্বামীর দায়িত্ব রয়েছে।
  • প্রয়োজনে পারিবারিক পরামর্শকের সাহায্য নিন।

ছ) তালাকের কথা ভাবা

শরীয়াহ তালাকের অনুমতি দিলেও তা সর্বশেষ উপায়। রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেছেন:

"আল্লাহর নিকট সবচেয়ে অপছন্দনীয় হালাল বিষয় হলো তালাক।" (সুনানে আবু দাউদ: ২১৭৮)

তাই আগে সবর, আলোচনা ও মধ্যস্থতা; তালাক কেবল তখনই যখন আর কোনো পথ না থাকে।


৫. সিহর (জাদু) সম্পর্কে

আপনার শ্বশুরবাড়ির সবাই সিহরে আক্রান্ত বলে মনে করছেন। শরীয়াহ অনুযায়ী:

  • সিহর সত্য, কিন্তু এর প্রতিকার কুরআন-সুন্নাহর মাধ্যমে।
  • রুকইয়াহ শরীয়াহ (কুরআন-সুন্নাহভিত্তিক ঝাড়ফুঁক) করান।
  • সূরা ফালাক, সূরা নাস, আয়াতুল কুরসি নিয়মিত পড়ুন।
  • সকাল-সন্ধ্যা রাসূল ﷺ-এর মাসনুন দোয়া পড়ুন।
  • কোনো কুফরি বা শিরকি পদ্ধতিতে জাদু নষ্ট করতে যাবেন না।
  • প্রয়োজনে বিশ্বস্ত আলেম/রাকী-এর সাহায্য নিন।

والله أعلم بالصواب والسلام


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.