তালাক সম্পর্কীয় প্রশ্ন

Marriage and Divorce · Hanafi

Question No: 7147
Questioner: Afrin
Question Asked: 20 Oct 2026, 01:35 PM
Reviewed & Published: 20 Oct 2026, 03:42 PM
Views: 31
Tokens: 12,995
This answer is according to the 'Hanafi' school of thought.
This answer was reviewed and published by .

Question

আসসালামু আলাইকুম, আমি একজন নারী বয়স ৩১। ২০২০ সালে আমার প্রথম স্বামীর সাথে তীব্র সাংসারিক অশান্তির কারনে তালাক নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেই। তখন সে তালাক নিজ থেকে দিতে চায়না কাবিনের টাকা পরিশোধ করতে হবে তাই এবং আমাকে তালাকের কাগজ পাঠাতে বলে। এবং আমি স্থানীয় উকিলের মাধ্যমে তালাকের কাগজ তৈরি করে তাতে সই করি এবং উকিল বলেন সে ছেলের বাড়ি এবং তার এলাকার চেয়ারম্যান বরাবর কাগজ পাঠিয়ে দিবেন। শুধু আমাকে একটা তালাক নোটিশের কপি দিয়ে সংরক্ষণ করতে বলেন।আমি সেই কপিটার ছবি ও কাবিননামায় আমাকে যে তালাকের অধিকার দেওয়া হয়েছে সেই ১৮ নং কলামের ছবি প্রথম স্বামীর নিকট মেইল করে পাঠাই যেহেতু ডাকযোগে সময় লাগতে পারে যেতে তাই এবং মৌখিক ভাবেও পরে " আমাকে দেওয়া তালাকে তাহবীজের অধিকারে আপনার থেকে তালাক গ্রহন করলাম " এ কথা বলি এবং মেসেজে লিখেও পাঠাই যেন শরীয়া মতেও সহীহ হয় তাই।কিন্তু তখন তিনি তালাক মানেনা বলে অস্বীকার করেন। এরপর তার সাথে যোগাযোগ বন্ধ করে দেই এবং তিনিও আর যোগাযোগ করেনি। ১ বছর পর তিনি নতুন বিয়ে করবেন আমাকে জানান এবং আমি রাজি থাকলে আমার সাথেই কাবিন করবেন বলেন কিন্তু আমি রাজি হইনা এবং সে অন্যত্র বিয়ে করেন। এবং আরও ১.৫ বছর পর আমার বিয়ে ঠিক হয় যেহেতু সেও নতুন বিয়ে করছে এবং তালাক দেওয়ার পর ২.৫ বছর পার হয়েছে তাই নতুন বিয়ে করি। এবং এরপর ৪বছর আর কোন যোগাযোগ ছিল না কয়েকমাস আগে আমার সেই প্রথম স্বামী কোনভাবে আমার নাম্বার জোগার করেন এবং যোগাযোগ করে যানান যে তিনি তালাকের কাগজ হাতে পায়নি মানে তার বাড়িতে নাকি পৌছায়নি এবং চেয়ারম্যানের কাছে গিয়েও নাকি কাগজ পায়নি এবং তালাক নামায় তার সই ছিলনা তাই এটা নাকি বৈধ না। সে এখন আমাকে তালাক নামায় সই দিতে রাজি। তখন আমি জানাই যদি কাগজ না পেয়ে থাকে তাহলে তালাকের সময় ৩মাসে কেন জানায়নি? এবং পরবর্তী তিন বছরেও তো সে জানায়নি এখন একথার কী মানে আছে? তখন সে বলে তার ভয় ছিল আমরা ক্ষতি করবো তাই তখন যোগাযোগ করেনি।এরপর আমি ফোন কেটে দেই এবং উকিলের কাছে যোগাযোগ করি কিন্তু সেই উকিল বর্তমানে বেচে নেই তাই তার কাছে এ বিষয়ে কিছু জানতে পারিনি। তবে আমার কাছে সেই তালাকের কপি এখনও আছে। আর দ্বিতীয় বিষয় হলো কাবিনের সময় কাজী সাহেব সবার সামনে জিজ্ঞেস করেন যে মেয়েকে তালাকের অধিকার দিবেন কিনা তখন ছেলে পক্ষ থেকে না করে কিন্তু আমাদের পক্ষ থেকে দিতে বলেন এবং পরে ছেলেপক্ষ সেটা মেনে নেয়। এসময় আমার প্রাক্তন স্বামী উপস্থিত ছিলেন এবং সব শুনেছেন কিন্তু তিনি হ্যা, না কিছু বলেননি। এবং কাবিনে সই করার সময় কী লেখা ছিল তাও খেয়াল করেনি। এগুলো তার জবানে বর্নিত। প্রশ্ন হলো আমার তালাকে তাহবিজের অধিকার কি বৈধ ছিল? (কাবিননামায় শর্তসাপেক্ষে দেওয়া ছিল) দ্বিতীয় প্রশ্ন আমি কিছু ই মিথ্যা বলছি না এবং আমি কোন অসৎ পথও অবলম্বন করিনি। কিন্তু উকিলসাহেব কোন ভুল করেছিলেন নাকি কোন কারনে কাগজ পৌছায়নি তা আমার জানা নেই এই অবস্থায় আমার তালাকটি কী শরীয়া মতে বৈধ হয়েছে? দীর্ঘদিন ধরে দুশ্চিন্তায় আছি কারন আমি বর্তমানে বিবাহিত। দয়াকরে উত্তর দিয়ে সাহায্য করুন।

Answer

বিসমিল্লাহির রহমানির রহীম

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারাকাতুহু।

বোন, আপনার মনে জমে থাকা সমস্ত ভয়, দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি দূর করে দিন। হানাফী ফিকহ ও ইসলামী শরীআতের অকাট্য মূলনীতি অনুযায়ী আপনার ১ম স্বামীর সাথে আপনার তালাক ২০২০ সালেই সম্পূর্ণরূপে সহীহ ও কার্যকর হয়ে গেছে। পরবর্তীতে ইদ্দত পার হওয়ার পর সম্পন্ন হওয়া আপনার বর্তমান ২য় বিবাহটি শতভাগ হালাল, বৈধ ও শরীআতসম্মত রয়েছে।


১. কাবিননামায় (১৮ নং কলামে) দেওয়া আপনার ‘তালাকে তাফবীয’-এর অধিকারটি কি শরীআত মতে বৈধ ছিল?

  • শরয়ী সিদ্ধান্ত: হ্যাঁ, আপনার তালাকে তাফবীজের (তালাকের অর্পিত ক্ষমতা) অধিকারটি সম্পূর্ণরূপে বৈধ ও শরীআতসম্মত ছিল ।

  • ফিকহী কারণ ও ব্যাখ্যা: ১. তাফবীযে তালাকের শরয়ী বৈধতা: ইসলামি শরীআতে বিবাহের সময় স্বামী কর্তৃক স্ত্রীকে তালাকের ক্ষমতা অর্পণ করা (যাকে ফিকহের পরিভাষায় ‘তাফবীযে তালাক’ বলা হয়) সম্পূর্ণরূপে জায়েয ও বৈধ। ২. স্বাক্ষর ও মৌখিক সম্মতির মর্যাদা: বিবাহের আকদের সময় মেয়ে পক্ষের দাবি বা শর্ত অনুযায়ী কাবিননামার ১৮ নম্বর ঘরে তালাকে তাফবীজের শর্ত লিপিবদ্ধ করা হয় এবং স্বামী তাতে কোনো আপত্তি না জানিয়ে কাবিননামায় স্বাক্ষর করেন। ফিকহের বিচারে স্বামী উক্ত তাফবীজের শর্ত মেনে নিয়েছেন বলেই সাব্যস্ত হয়। ৩. পড়ে দেখা না দেখা বা মুখে না বলার হুকুম: স্বামী কাবিননামায় স্বাক্ষর করার অর্থই হলো তিনি তাতে লিখিত শর্তাবলীতে সম্মতি দিয়েছেন । তিনি না পড়ে স্বাক্ষর করেছেন বা মুখে আলাদা করে কিছু বলেননি—এ অজুহাতে তাফবীযের শরয়ী অধিকার বাতিল হয় না ।

  • সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:

    • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৬৯–২৭১ (অধ্যায়: কাবিননামায় 'তাফবীযে তালাক' ও প্রচলিত কাবিননামায় স্বাক্ষরের শর'য়ী বিধান)।
    • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড/২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩৩১–৩৩২ (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক, ৩য় পরিচ্ছেদ: তাফবীযে তালাকের বিবরণ — স্ত্রীকে অধিকার প্রদান)।

২. তালাকের নোটিশ স্বামী না পাওয়া সত্ত্বেও এবং সই না করা সত্ত্বেও কি তালাকটি শরীআত মতে সহীহ হয়েছিল? এবং আপনার বর্তমান বিবাহ কি বৈধ?

  • শরয়ী সিদ্ধান্ত: হ্যাঁ, আপনার তালাকটি ২০২০ সালেই শরীআত অনুযায়ী অকাট্যভাবে সম্পন্ন হয়েছিল এবং পরবর্তীতে ইদ্দত অতিক্রান্ত হওয়ার পর সম্পন্ন হওয়া আপনার বর্তমান ২য় বিবাহটিও শতভাগ বৈধ ও হালাল ।

  • ফিকহী কারণ ও ব্যাখ্যা: ১. তাফবীয প্রয়োগে স্বামীর স্বাক্ষরের প্রয়োজন নেই: তালাকে তাফবীয প্রয়োগ করার অর্থ হলো—স্বামী ইতিপূর্বেই স্ত্রীকে তালাক প্রয়োগের ক্ষমতা প্রদান করে দিয়েছেন। তাই স্ত্রী যখন সেই ক্ষমতাবলে বলেন বা লেখেন যে—"আমি আমার স্বামী প্রদত্ত তালাকে তাফবীজের অধিকারে নিজের ওপর তালাক গ্রহণ করলাম", তখন সঙ্গে সঙ্গে ১টি তালাকে বায়েইন (তালাকে বাইন) পতিত হয়ে বিবাহ বিচ্ছেদ ঘটে যায়। এতে স্বামীর নতুন করে সই করা, রাজি হওয়া বা মেনে নেওয়ার কোনোই প্রয়োজন পড়ে না । ২. নোটিশ বা চিঠি পৌঁছানো শর্ত নয়: আপনি যখন উকিল সাহেবের মাধ্যমে লিখিতভাবে এবং নিজে ইমেইল, মেসেজ ও মৌখিকভাবে স্বামীকে স্পষ্টভাবে উচ্চারণ করে জানিয়েছেন যে—"আমাকে দেওয়া তালাকে তাফবীজের অধিকারে আপনার থেকে তালাক গ্রহণ করলাম", তখনই আপনার ওপর তালাকে বায়েইন পতিত হয়ে গেছে । ডাকযোগে চেয়ারম্যানের কাছে বা তার বাড়ি চিঠি পৌঁছানো অথবা না পৌঁছানো—তালাক কার্যকর হওয়ার জন্য শরীআতে শর্ত নয়। ৩. ইদ্দত পূরণের পর ২য় বিবাহ সম্পন্ন হওয়া: ২০২০ সালে তালাকে বায়েইন পতিত হওয়ার পর আপনার ৩টি হায়েয/মাসিক অতিবাহিত হওয়ার সাথে সাথে আপনার 'ইদ্দত' পূর্ণ হয়ে গেছে। ইদ্দত শেষ হওয়ার পর নারী যেকোনো স্থানে নতুন বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার জন্য স্বাধীন ও মুক্ত হয়ে যান। ৪. দীর্ঘ সময় পর ১ম স্বামীর দাবির কোনো শরয়ী মূল্য নেই: দীর্ঘ ৪ বছর পর আপনার ১ম স্বামী যে দাবি করছেন যে—"তিনি কাগজ পাননি তাই তালাক হয়নি"—ইসলামি ফিকহের দৃষ্টিতে তার এ দাবির বিন্দুমাত্র কোনো শরয়ী ভিত্তি বা আইনি গ্রহণযোগ্যতা নেই।

  • সংযুক্ত কিতাব, ভলিউম ও পৃষ্ঠা নম্বর:

    • দরসুল ফিকহ (১ম খণ্ড), পৃষ্ঠা: ২৭১–২৭২ (অধ্যায়: তাফবীযে তালাক প্রয়োগের মাধ্যমে নিজেকে মুক্ত করা এবং ইদ্দত শেষে অন্যত্র বিবাহ করা সংক্রান্ত ফিকহী বিধান) ।
    • ফাতাওয়ায়ে আলমগীরী (১ম খণ্ড/২য় খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৩১০ & ৩৩৪–৩৩৫ (অধ্যায়: কিতাবুত তালাক — তাফবীযে তালাক প্রয়োগের ফলে তালাকে বাইন হওয়া এবং লিখিত তালাকের কার্যকারিতা)।
    • ফাতাওয়া মাহমুদিয়া (১২শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৯৩ / (১১শ খণ্ড), পৃষ্ঠা: ৯৩ (অধ্যায়: কিতাবুন নিকাহ/তালাক — ইদ্দত পার হওয়ার পর ২য় বিবাহ সহীহ হওয়া)।

সারসংক্ষেপ ও পরামর্শ:

আপনি কোনো অসৎ পথ অবলম্বন করেননি এবং শরীআতের সঠিক নিয়মে তাফবীজের মাধ্যমে নিজেকে মুক্ত করেছিলেন। সুতরাং বর্তমান স্বামীকে নিয়ে আপনি সম্পূর্ণ নিশ্চিন্তে, প্রফুল্ল মনে ও নির্ভাবনায় সংসার পরিচালনা করুন। ১ম স্বামীর কোনো অন্যায্য কথায় কান দেওয়া বা দুশ্চিন্তা করার প্রয়োজন নেই।


আল্লাহু আ’লাম।


This site is protected by reCAPTCHA and the Google Privacy Policy and Terms of Service apply.